এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্জন করার কথা ভাবলে আমাদের সামনে প্রায়ই দুটি পথ এসে দাঁড়ায় পরিশ্রম এবং আত্মপক্ষের চকচকে প্রচারণা। প্রথম পথটি কঠিন, কিন্তু জেনুইন। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, দক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং নিজের কাজকে নিজের হয়ে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার মানসিকতা।
দ্বিতীয় পথটি শুরুতে তুলনামূলক সহজ মনে হতে পারে। যথেষ্ট আত্মপ্রচার, কৌশলী যোগাযোগ এবং নিজের সম্পর্কে যত্নসহকারে তৈরি করা গল্পের মাধ্যমে একজন মানুষ কখনো কখনো প্রকৃত যোগ্যতা অর্জনের আগেই সাফল্যের একটি চেহারা তৈরি করে ফেলতে পারেন। কিন্তু এই পথের একটি লুকানো মূল্য আছে। যখন যোগ্যতার চেয়ে ভাবমূর্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, আর মেধার জায়গা দখল করে নেয় কৌশল ও কারসাজি, তখন একজন মানুষ ধীরে ধীরে পেশাগত স্বীকৃতির চেয়েও মূল্যবান কিছু হারাতে শুরু করেন, তা হল নিজের আত্মসম্মান ও মানসিক শান্তি।
এটি কোনো পরামর্শ নয়। বরং মানুষ এবং বিভিন্ন পেশাগত পরিবেশকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে আমার মধ্যে তৈরি হওয়া একটি গভীর উপলব্ধি।
এমন মানুষকে দেখা যায়, যারা হঠাৎ করেই নিজেদের গল্পের ‘হিরো’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছেন। অসাধারণ কাজের মাধ্যমে নয়, বরং নিজেদের সম্পর্কে অত্যন্ত যত্নসহকারে তৈরি করা একটি গল্পের মাধ্যমে। যাদের নিজেদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ নেই। যে কাজে নিজেদের তারা ‘প্রখ্যাত’ দাবি করেন, সেই কাজে তারা এতটুকু দক্ষ নন। কিন্তু প্রতারণায় আকাশচুম্বী। পেশাগত সীমারেখা অতিক্রম করা, সহকর্মীদের নিয়ে নানা কথা ছড়ানো, অন্যদের নিজেদের পক্ষে নিতে চেষ্টা করা, নিজের চারপাশে একটি দল বা বলয় তৈরি করা, কিংবা বারবার নিজেকে সবার চেয়ে বেশি যোগ্য বা নীতিবান হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করাই এদের দৈনন্দিন রুটিন।
হয়তো এসব কৌশল স্বল্পমেয়াদে কিছু ফল দিতে পারে। এগুলো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। এমনকি অর্থ, পদবি এবং সাময়িক প্রভাবও এনে দিতে পারে।
কিন্তু অভিনয় শেষ হয়ে গেলে কী থাকে?
কারসাজির মাধ্যমে তৈরি করা ভাবমূর্তিকে টিকিয়ে রাখতে হয় অবিরাম। একজন মানুষ যখন যোগ্যতার পরিবর্তে ভাবমূর্তির পথ বেছে নেন, তখন তিনি ধীরে ধীরে এমন এক অন্তহীন প্রতিযোগিতায় আটকে যেতে পারেন, যেখানে তাকে সবসময় অন্যদের কাছে নিজের তৈরি করা সেই ভাবমূর্তিকে প্রমাণ করে যেতে হয়।
প্রতিটি নতুন অর্জনকে প্রচার করতে হয়, ডিফেন্ড করতে হয় কিংবা কখনও কখনও বাড়িয়ে উপস্থাপন করতে হয়। প্রতিটি সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে হুমকি। প্রতিটি সমালোচনার জবাব দিতে হয়।
আর এভাবেই একসময় পেশাগত উন্নতির অর্থ আরও ভালো মানুষ বা পেশাজীবী হয়ে ওঠা থেকে বদলে গিয়ে আরও ভালো দেখানোর প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। যেটি আপাত দৃষ্টিতে চকচকে মনে হলেও ভেতরে সৃষ্টি হয় দগদগে ক্ষত। আমার কাছে এটাই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
নিজের অর্জনের কথা বলা বা নিজের কাজকে মানুষের সামনে তুলে ধরা-এতে কোনো ভুল নেই। পেশাগত পরিচিতি তৈরি করা কিংবা নিজের কাজকে দৃশ্যমান করাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিজের কাজকে তুলে ধরা এবং একটি কৃত্রিম ভাবমূর্তি তৈরি করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে।
একটি তৈরি হয় যোগ্যতা ও কাজের ভিত্তিতে। অন্যটি নির্ভর করে মানুষের চোখে নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে তার ওপর।
অর্থ এবং পদবি নিঃসন্দেহে একজন মানুষকে সমাজে একটি অবস্থান দিতে পারে। কিন্তু পেশাগত অবস্থান চিরস্থায়ী নয়। পদবি বদলায়, প্রতিষ্ঠান বদলায়, মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যায়—এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিটি পদ ও অবস্থানেরই একটি সমাপ্তি আছে। শেষ পর্যন্ত থেকে যায় পদবির আড়ালের মানুষটি। অন্যদের চোখে কী সে হিসেব বাদ, নিজের বিবেকের কাছে লজ্জিত হতেই হয় সেটাকে কী তখন জয় ধরে নেয় বিবেক? নাকি বিবেক প্রশ্ন ছুড়ে দেয় তোমার অতীতের কাজটি ভীষণ লজ্জার!
যদি কোনো নির্দিষ্ট পদ বা সাফল্যের চেহারা অর্জনের জন্য একজন মানুষকে নিজের সততা, মর্যাদা এবং মানসিক শান্তি বিসর্জন দিতে হয়, তাহলে প্রশ্ন জাগে সে আসলে কী অর্জন করল?
অসততার ওপর দাঁড়ানো কোনো অর্জন বাইরে থেকে যতই চমৎকার দেখাক না কেন, তার ভেতরে খুব কমই সত্যিকারের গর্ব থাকে। সেই সাফল্যের আড়ালে থেকে যেতে পারে অপরাধবোধ, অনিরাপত্তা, ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় এবং নিজেকে বারবার প্রমাণ করার এক অন্তহীন তাড়না।
শেষ পর্যন্ত তা এক মরীচিকায় পরিণত হয়—সুখের এমন এক বিশ্বাসযোগ্য বিভ্রম, যা দেখতে যতই কাছে মনে হোক, বাস্তবে কখনোই ধরা দেয় না।
এটা চিরন্তন সত্য যে, সঠিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে হেরে যাওয়া, কপটতার মাধ্যমে জিতে যাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি শান্তির এবং সম্মানের। কারণ প্রতিটি জয় পাওয়ার মতো নয়। এবং প্রতিটি পরাজয়ও ব্যর্থতা নয়। কখনো কখনো নিজের সততা ও আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে সরে আসতে পারাটাই জীবনের সবচেয়ে বড় বিজয়।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









