ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি শিশু যৌন নির্যাতনের ছবি ব্যবহার করে শত শত অর্থের বিনিময়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করেছে মেটা। এর মধ্যে বেশ কিছু বিজ্ঞাপন ভারতে প্রচার করা হয়েছে বলে নতুন এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রচারকর্মীদের সংগঠন টেক ট্রান্সপারেন্সি প্রজেক্ট (টিটিপি) মঙ্গলবার ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত ১০ মাসে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে শিশু যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্ট (সিএসএএম) সম্বলিত ৩৩২টি বিজ্ঞাপন তারা শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে চলতি আগস্ট মাসেই প্রচারিত হয়েছে ২৭৪টি বিজ্ঞাপন।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের দুই মাস আগে, ভারতে ইনস্টাগ্রামে শিশু যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্ট প্রচারের সব বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল দেশটির সরকার। এর আগে বিবিসি আইয়ের এক অনুসন্ধানে ভারতে ইনস্টাগ্রামে অর্থের বিনিময়ে সিএসএএম প্রচারের বিজ্ঞাপন চালানোর তথ্য উঠে এসেছিল।
টিটিপির তথ্য অনুযায়ী, শনাক্ত করা ৩৩২টি বিজ্ঞাপনের মধ্যে ৮৪টি ভারতে প্রচারিত হয়েছে। এর মধ্যে ৭৮টি বিজ্ঞাপনই ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞার নির্দেশ এবং মেটার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রকাশিত হয়।
টিটিপি জানায়, বিজ্ঞাপনগুলোর কয়েকটিতে ইউরোপের একটি রাজপরিবারের সদস্যসহ বাস্তব শিশুদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। পরে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব ছবি বিকৃত করে যৌন নির্যাতনের দৃশ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
এমনকি টিটিপি তাদের অনুসন্ধানের তথ্য মেটাকে জানানোর পরও এক ডজনের বেশি বিজ্ঞাপন মেটার প্ল্যাটফর্মে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
মেটার বক্তব্য
বিবিসির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেটা এক বিবৃতিতে জানায়, বাস্তব বা এআই দিয়ে তৈরি কোনো ধরনের শিশু নির্যাতন তারা সহ্য করে না। নাডিফাই অ্যাপ বা শিশু শোষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ধরনের কনটেন্টও তাদের নীতিমালার অনুমোদিত নয়।
মেটা আরও জানায়, অপরাধীরা শনাক্তকরণ এড়াতে নিয়মিত কৌশল পরিবর্তন করে। তাই অবৈধ কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণের ব্যবস্থা তারা ক্রমাগত জোরদার করছে।
কোম্পানিটি বলেছে, তাদের প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগে মডারেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে সেগুলো যাচাই করা হয়। ছবি, ভিডিও, লেখা ও অডিওর পাশাপাশি বিজ্ঞাপনটি কাদের লক্ষ্য করে দেওয়া হচ্ছে এবং কোন লিংকে ব্যবহারকারীকে পাঠানো হচ্ছে, সেসব বিষয়ও পর্যালোচনা করা হয়।
মেটার দাবি, লঙ্ঘনকারী বিজ্ঞাপন ঠেকাতে তাদের শক্তিশালী ব্যবস্থা রয়েছে এবং কোনো বিজ্ঞাপন প্রাথমিকভাবে শনাক্ত না হলে পরবর্তী পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেও তা ধরার চেষ্টা করা হয়।
ভারতের ৮৪ বিজ্ঞাপনের ৪৩টি নিয়ে মেটার দাবি
টিটিপি জানিয়েছে, তারা মেটার নিজস্ব রিপোর্টিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারতে প্রচারিত ৮৪টি বিজ্ঞাপনের মধ্যে ৫৫টি রিপোর্ট করতে সক্ষম হয়েছে। তবে মেটার সিস্টেমে বিজ্ঞাপন সক্রিয় থাকা অবস্থাতেই অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকে।
এর মধ্যে ৪৩টি বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে টিটিপিকে জানানো হয়, ‘আমরা পর্যালোচনা করে দেখেছি, এই বিজ্ঞাপনটি আমাদের বিজ্ঞাপন নীতিমালা লঙ্ঘন করছে না।’
আরও ১১টি বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে জানানো হয়, সেগুলো আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একটি বিজ্ঞাপন সম্পর্কে এখনও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে টিটিপি।
তবে মেটার কাছে টিটিপি তাদের প্রতিবেদনের তথ্য ও বিজ্ঞাপনগুলোর বিষয়ে সরাসরি জানতে চাইলে সব বিজ্ঞাপনই সরিয়ে নেওয়া হয় বলে দাবি করেছে টিটিপি।
ভারতের আইন ভঙ্গের অভিযোগ
ভারতে শিশু যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া একটি ফৌজদারি অপরাধ। মেটার নিজস্ব নীতিমালাতেও শিশুদের যৌন শোষণ বা বিপদের মুখে ফেলে এমন কনটেন্টযুক্ত বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ।
ভারতে শিশুদের সুরক্ষায় কাজ করা ২৫০টির বেশি সংগঠনের নেটওয়ার্ক ‘জাস্ট রাইটস ফর চিলড্রেন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ভুবন রিবু বলেন, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়টেড চিলড্রেন (এনসিএমইসি)-কে রিপোর্ট করাই যথেষ্ট নয়।
তিনি বলেন, ‘শিশু যৌন নির্যাতনের কনটেন্ট ভারতীয় আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলো তা না করে স্পষ্টভাবে ভারতীয় আইন লঙ্ঘন করছে।’
বিবিসির আগের অনুসন্ধানের তথ্যের ভিত্তিতে জাস্ট রাইটস ফর চিলড্রেন ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন করেছে। এতে শিশু যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্ট প্রচারকারীদের শনাক্ত ও বাধ্যতামূলকভাবে রিপোর্ট করার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর নির্দেশনা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
এআই অ্যাপের বিজ্ঞাপনে শিশু নির্যাতনের ছবি
টিটিপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে সিএসএএম সম্বলিত ৩৩২টি বিজ্ঞাপন শনাক্ত করেছে। সব বিজ্ঞাপনই এনসিএমইসিকে রিপোর্ট করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
প্রায় সব বিজ্ঞাপনেই প্রথমে কোনো শিশুর ছবি দেখানো হয়। এরপর ভিডিও চলার সময় এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে ছবিটি পরিবর্তন করে শিশুটিকে যৌন নির্যাতনের দৃশ্যে দেখানো হয় বলে টিটিপি দাবি করেছে।
ভারতে প্রচারিত একটি বিজ্ঞাপনের উদাহরণ দিয়ে টিটিপি জানিয়েছে, সেখানে এক কিশোরী মেয়ের ছবিকে এআই দিয়ে এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছিল যাতে তাকে যৌন কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেখা যায়। বিজ্ঞাপনটির সঙ্গে এমন একটি বার্তাও ছিল যাতে বলা হয়, কোনো বিধিনিষেধ নেই এবং চরিত্রগুলো বাস্তব মানুষ। বিবিসি অবশ্য বিজ্ঞাপনটি নিজে দেখেনি।
টিটিপির দাবি, আগস্টে দুই সপ্তাহের মধ্যে ভারতে ৫০টির বেশি ভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে ওই বিজ্ঞাপনটি প্রচার করা হয়েছিল।
বিজ্ঞাপনগুলো এআই অ্যাপের দিকে নিয়ে যেত
টিটিপির অনুসন্ধানে পাওয়া ৩৩২টি বিজ্ঞাপনের বেশিরভাগই ব্যবহারকারীদের এআই দিয়ে ছবি বা ভিডিও তৈরির অ্যাপের দিকে নিয়ে যেত। এসব অ্যাপের অধিকাংশই চীনা ডেভেলপারদের তৈরি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
টিটিপির অভিযোগ, শিশু যৌন নির্যাতনের ছবি ব্যবহার করে এসব অ্যাপের বিজ্ঞাপন দেওয়ার মাধ্যমে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে যে অ্যাপগুলো ব্যবহার করে এ ধরনের কনটেন্ট তৈরি বা দেখা সম্ভব।
মেটা জানিয়েছে, এআই ব্যবহার করে সম্মতি ছাড়া ভুয়া নগ্ন বা যৌন ছবি তৈরির ‘নাডিফাই’ অ্যাপের প্রচার তাদের নীতিমালায় নিষিদ্ধ।
প্ল্যাটফর্ম বদলে অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ
ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের সাইবার সিকিউরিটি ব্যুরোর পরিচালক ও দেশটির শীর্ষ সাইবার পুলিশ কর্মকর্তাদের একজন শিখা গোয়েল বিবিসিকে বলেন, শিশু যৌন নির্যাতনের কনটেন্ট মোকাবিলায় অন্যতম বড় সমস্যা হলো ব্যবহারকারীরা খুব সহজেই এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে চলে যেতে পারে। এতে তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরকারের সাম্প্রতিক আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্ব পাবে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।
এর আগে বিবিসির অনুসন্ধানে পাওয়া বিজ্ঞাপনগুলো ব্যবহারকারীদের মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামের দিকেও নিয়ে যেত। সেখানে মাত্র ৯৯ রুপি বা প্রায় ১ দশমিক ০৫ ডলারে এসব কনটেন্ট কেনার সুযোগ দেওয়া হতো বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে।
মেটার বিজ্ঞাপন ব্যবস্থায় প্রশ্ন
টিটিপি জানিয়েছে, শিশু যৌন নির্যাতনের কনটেন্টযুক্ত কয়েকটি বিজ্ঞাপন চীনে মেটার নিজস্ব বিজ্ঞাপন সংস্থার অংশীদারদের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল। এসব অংশীদারকে রিসেলার বলা হয়। তারা চীনের বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপন ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে প্রচারে সহায়তা করে। টিটিপির প্রশ্নের জবাব দেননি এসব রিসেলার।
টিটিপি আরও জানিয়েছে, তাদের প্রতিবেদনের তথ্য মেটাকে জানানোর পরও নতুন বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি বিজ্ঞাপনের বিস্তারিত তথ্য মেটাকে দেওয়া হয়েছিল, যার ১১টি ১ ও ২ সেপ্টেম্বর ভারতে প্রচারিত হয়।
মেটা অবশ্য বলেছে, তারা নিয়মিতভাবে প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন পর্যবেক্ষণ করে এবং নীতিমালা লঙ্ঘনকারী বিজ্ঞাপন শনাক্ত হলে সেগুলো সরিয়ে ফেলে ও সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।
কোম্পানিটির ভাষ্য, কোনো ব্যবস্থাই শতভাগ নিখুঁত নয় এবং অপরাধীরা বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন উপায়ে প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তাব্যবস্থা ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে।









