জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি সহযোগিতা জোরদারে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার আইনপ্রণেতারা। বিদ্যমান চুক্তিগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য কার্যকর ব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
সোমবার ৭ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট এ তথ্য প্রকাশ করে ।
ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে অনুষ্ঠিত দুই দিনের ‘সাউথ এশিয়ান পার্লামেন্টারি ডায়ালগ অন এনভায়রনমেন্ট, ক্লাইমেট অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ সম্মেলনের শেষ দিনে এ আহ্বান জানানো হয়। ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই সংলাপের আয়োজন করে সাউথ এশিয়া রিজিওনাল পার্লামেন্টারি ফোরাম ফর ক্লাইমেট, এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (এসএআরপিএফ)। ভুটানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি এতে আয়োজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।
নেপালে সাম্প্রতিক হিমবাহ-সম্পর্কিত ভয়াবহ দুর্যোগের পর দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের প্রস্তাবগুলো সামনে এসেছে। সর্বশেষ হিসাবে ওই দুর্যোগে নেপালে অন্তত ১ হাজার ৩৫৫ জন নিহত এবং প্রায় ৫ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা দক্ষিণ এশিয়া ক্লাইমেট কো-অপারেশন কাউন্সিল (এসএসিসিসি) গঠনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার বিষয়ে একমত হন। প্রস্তাবিত এই কাউন্সিলের লক্ষ্য হবে জলবায়ু, জ্বালানি ও পরিবেশ ইস্যুতে রাজনৈতিক গুরুত্ব ধরে রাখা এবং বিদ্যমান উদ্যোগগুলোকে বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করা। তবে নতুন কাউন্সিলটি সার্ক, বিমসটেক, বিবিআইএন বা সাসেপের কার্যক্রমের পুনরাবৃত্তি করবে না।
দক্ষিণ এশিয়ায় একটি আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড গড়ে তোলার পদক্ষেপের পক্ষেও মত দিয়েছেন আইনপ্রণেতারা। এ ক্ষেত্রে অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের পরস্পর পরিপূরক জ্বালানি সম্পদকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আলোচনায় বলা হয়, নেপালে আনুমানিক ৪২ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। ভুটানে প্রযুক্তিগতভাবে ৩০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও এর মাত্র প্রায় ১২ শতাংশ কাজে লাগানো হয়েছে। অন্যদিকে ভারতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা ২ লাখ ৫৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
দুর্যোগ মোকাবিলায় আঞ্চলিক প্রস্তুতি ও তথ্য বিনিময়ের একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাবও এসেছে সম্মেলনে। এর আওতায় অভিন্ন আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, হিমালয়ের বিভিন্ন অববাহিকায় হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ ও বন্যা পর্যবেক্ষণ এবং সীমান্ত পেরিয়ে জলবায়ু ঝুঁকি সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের কথা বলা হয়েছে।
অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র যেসব দেশ ভাগ করে নেয়, সেসব দেশের মধ্যে দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন। এতে দুর্যোগের সময় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
এসএআরপিএফ-এর সহপরিচালক অধ্যাপক মুকুল শর্মা ও সুমেধা বসু এবং জাতিসংঘের প্রকল্প সেবা দপ্তর (ইউএনওপিএস)-এর প্রধান জলবায়ু কর্মকর্তা সামান্থা স্ট্র্যাটন-শর্ট সীমান্ত পেরিয়ে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার এবং জলবায়ু ঝুঁকি সংক্রান্ত তথ্য আরও বেশি ভাগাভাগির ওপর গুরুত্ব দেন। সম্মেলনে সামান্থা স্ট্র্যাটন-শর্ট ‘সাউথ এশিয়া এনার্জি ট্রানজিশন স্ট্যাটাস রিপোর্ট ২০২৬’ উপস্থাপন করেন।
সম্মেলনে এসএসিসিসি-এর সম্ভাব্য কাঠামোর একটি রূপরেখা তৈরির জন্য কাজ করতে এসএআরপিএফ-কে আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি জাতীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় পর্যায়ে অন্যান্য প্রস্তাব বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এসব উদ্যোগে সার্ক, বিমসটেক, বিবিআইএন, সাসেপের পাশাপাশি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংলাপে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে, জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদমন্ত্রী লিয়নপো সোনাম তাশি, কৃষি ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ইয়োনতেন ফুন্টশো এবং ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির ডেপুটি স্পিকার সাংগে খাণ্ডুসহ দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন।
এসএআরপিএফ-এর চেয়ারম্যান ও ভারতের লোকসভার সদস্য সঞ্জয় জয়সওয়াল এবং সংগঠনটির সহপরিচালক মুকুল শর্মা ও সুমেধা বসু দুই দিনের এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।
বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার সংসদ সদস্য ও আইনপ্রণেতাদের নিয়ে এসএআরপিএফ একটি নির্দলীয় প্ল্যাটফর্ম। জলবায়ু, জ্বালানি ও পরিবেশ বিষয়ে আঞ্চলিক সংসদীয় সহযোগিতা এবং নীতিগত সংলাপ এগিয়ে নেওয়াই এই প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য।









