এল নিনোর প্রভাব বিশ্বজুড়ে অনুভূত হতে শুরু করায় চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, এবারের এল নিনো গত ৭০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে এবং এর প্রভাব অন্তত ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর শক্তি দ্রুত বাড়ছে। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার ধরনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। কোথাও খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়বে, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি, বন্যা ও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হতে পারে।
গুতেরেস বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে এল নিনো সুপারসাইজড হয়ে উঠছে। বিজ্ঞান এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের সুযোগ রাখছে না।’ পৃথিবী এখন এমন এক অজানা পরিস্থিতিতে প্রবেশ করেছে এবং সেই পরিস্থিতি ক্রমেই উষ্ণ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডব্লিউএমও মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো সতর্ক করে বলেছেন, এল নিনো বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও অর্থনীতির ওপর ব্যাপক আঘাত হানতে পারে।

এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা, যা প্রশান্ত মহাসাগরে বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ সময় সমুদ্রের উষ্ণ পানি পূর্বদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত তাপ ছেড়ে দেয়।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এলাকায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি ছিল।
তবে পূর্বাভাস বলছে, পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে। নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। এমনটা হলে ১৯৫০ সালের পর এটিই হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো।
সমুদ্রের পানির নিচের তাপমাত্রাও অস্বাভাবিকভাবে বেশি। কিছু এলাকায় তা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বলে জানিয়েছে বিবিসি।
এল নিনোর প্রভাবে আগামী কয়েক মাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। এতে খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কম বৃষ্টিপাতের আশঙ্কায় পানামা খালে জাহাজ চলাচল ১০ শতাংশের বেশি কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বছরে প্রায় ১৪ হাজার জাহাজ এই কৃত্রিম জলপথ ব্যবহার করে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই পথটি পানামার আয়েরও বড় উৎস।
ইন্দোনেশিয়ায় চলতি শুষ্ক মৌসুমে ১ লাখ ৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির কিছু এলাকায় এবার শুষ্ক মৌসুম দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
মধ্য কালিমান্তানের বাসিন্দা ডারউইন রমি বলেন, ‘এক মাসেরও বেশি সময় ধরে আমরা দাবানল দেখছি। ধোঁয়া এত ঘন হয়ে গেছে যে বাইরে বের হলে চোখ জ্বালা করে।’

দাবানল নিয়ন্ত্রণে ইন্দোনেশিয়া কৃত্রিম বৃষ্টির জন্য বিমান মোতায়েন করেছে। ভূমি পরিষ্কারের জন্য আগুন ব্যবহারের অভিযোগে কয়েক ডজন মানুষকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
এল নিনোর প্রভাবে চীনে এ বছর সাতটি টাইফুন আঘাত হানতে পারে বলে দেশটির বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিয়েছেন। জুলাইয়ে চীনে বাভি, নউল ও মেসাক নামে তিনটি টাইফুন আঘাত হানে। এসব ঘটনায় কয়েকজনের মৃত্যু হয়।
আগস্টে টাইফুন ডলফিনের আঘাতে ১০ লাখের বেশি মানুষকে ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়। এর প্রভাবে ভারী বৃষ্টি ও শক্তিশালী বাতাস দেখা দেয়।
অন্যদিকে পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। এতে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সেলেস্তে সাওলো বলেন, ‘খরা ও বন্যার কারণে আমরা ইতোমধ্যে ক্ষয়ক্ষতি দেখতে পাচ্ছি। এল নিনো আরও শক্তিশালী হলে এসব প্রভাব বাড়বে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।’
এল নিনোর প্রভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রাও বাড়তে পারে। ভারত মহাসাগর, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আটলান্টিক ও অস্ট্রেলিয়ার উপকূলীয় কিছু এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পূর্বাভাস রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞান সংস্থার প্রধান গবেষক আলিস্টার হবডে বলেন, এল নিনো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও এটি এমন তীব্র উষ্ণতা তৈরি করতে পারে, যা বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
এবার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ তুলনামূলকভাবে ভয়াবহ সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ থেকে রক্ষা পেতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। এতে প্রবালপ্রাচীরটি পুনরুদ্ধারের জন্য কিছুটা সময় পাবে। তবে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
এর আগে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া ও তাসমানিয়ায় সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের সময় পেঙ্গুইনের খাদ্যসংকট, মাছের ব্যাপক মৃত্যু, ক্ষতিকর শৈবালের বিস্তার ও জেলিফিশের আধিক্য দেখা গিয়েছিল।
এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার করছে। অস্ট্রেলিয়াও সামুদ্রিক দুর্যোগের জন্য আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করেছে। এতে মৎস্য খাতে আর্থিক সহায়তা, গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রাণী স্থানান্তর ও প্রবালপ্রাচীর পর্যবেক্ষণের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার সময় পাওয়া যাবে।
পেরু এল নিনোর ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। দেশটির উপকূল পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে হওয়ায় ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে। প্রতিবেশী ইকুয়েডর ও ব্রাজিলের কিছু এলাকাতেও একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।
চরম আবহাওয়ার প্রস্তুতিতে কাজ করা সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের জলবায়ু সহনশীলতা বিষয়ক প্রধান মিগুয়েল আরেস্তেগুই বলেন, ‘আমরা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। তবে এই উদ্বেগ আতঙ্কে নয়, প্রস্তুতিতে রূপান্তরিত হওয়া দরকার।’
গত মাসের শেষে যুক্তরাষ্ট্র পেরুর উপকূলে ‘উশন্স কমফোর্ট’ জাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। এল নিনো চরম পর্যায়ে পৌঁছালে অতিরিক্ত চিকিৎসা সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম দিতে জাহাজটি ব্যবহার করা হবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনো একা দুর্যোগ সৃষ্টি করে না। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অপরিকল্পিত আবাসন, দুর্বল পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং দুর্বল স্বাস্থ্যসেবার মতো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলো পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
এদিকে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা ইতোমধ্যে বাড়ছে। এর সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা ও অন্যান্য চরম আবহাওয়ার প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।









