সারাদিন একটি কাজ নিয়ে ভাবছেন। কম্পিউটারের সামনে বসে আছেন, খাতা-কলম নিয়ে হিসাব করছেন, এমনকি এক কাপ চা খেয়েও মাথা খাটানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিছুতেই কোনো ভালো আইডিয়া আসছে না।
অথচ হঠাৎ গোসল করতে গেলেন, শাওয়ারের পানি মাথায় পড়তেই মনে হলো, ‘আরে! এভাবে করলেই তো সমস্যার সমাধান!’ কয়েক ঘণ্টা ধরে যে চিন্তাটি মাথায় আসছিল না, সেটিই যেন গোসলের সময় আচমকা হাজির। অনেকের কাছেই বিষয়টি পরিচিত। কিন্তু কেন এমন হয়?
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর পেছনে রয়েছে আমাদের মস্তিষ্কের চিন্তা করার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আমরা যখন কোনো নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য অতিরিক্ত মনোযোগ দিই, তখন অনেক সময় একই চিন্তার মধ্যে আটকে যাই। ‘আইডিয়াটা কী হবে?’, ‘কীভাবে শুরু করব?’ এমন নানা চিন্তা করতে করতে মস্তিষ্কের ওপর একধরনের চাপ তৈরি হয়। ফলে যত বেশি ভাবি, ততই মনে হতে পারে কিছুই মাথায় আসছে না।
গোসলের সময় পরিস্থিতিটা কিছুটা বদলে যায়। তখন আমাদের কোনো প্রতিবেদন লিখতে হচ্ছে না, কারও সঙ্গে বৈঠক করতে হচ্ছে না কিংবা নির্দিষ্ট কোনো সমস্যার সমাধান বের করার জন্য জোর করে চিন্তা করতে হচ্ছে না। পরিচিত ও তুলনামূলক সহজ একটি কাজ করতে করতে মন কিছুটা স্বস্তির অবস্থায় চলে যায়। এই সময় মস্তিষ্ক বিভিন্ন স্মৃতি, চিন্তা ও কল্পনার মধ্যে নিজের মতো করে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পায়।
মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘মন ঘুরে বেড়ানো’। অর্থাৎ আমরা যখন কোনো নির্দিষ্ট কাজের দিকে পুরোপুরি মনোযোগী থাকি না, তখন আমাদের মন অতীতের কোনো ঘটনা, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, কোনো সমস্যা কিংবা নতুন কোনো কল্পনার দিকে চলে যেতে পারে। গোসলের মতো একঘেয়ে ও স্বয়ংক্রিয় কাজের সময় এই ধরনের চিন্তা তুলনামূলকভাবে সহজে হতে পারে। আর একটি চিন্তার সঙ্গে আরেকটি চিন্তার অপ্রত্যাশিত সংযোগ তৈরি হলেই হঠাৎ নতুন কোনো আইডিয়া মাথায় চলে আসতে পারে।
এখানেই মজার ব্যাপার। আপনি গোসলের সময় আসলে আইডিয়া খুঁজছেন না। আপনি শুধু গোসল করছেন। ফলে মস্তিষ্কের ওপর ‘এখনই একটা দারুণ আইডিয়া বের করতে হবে’ এমন চাপ থাকে না। আর অনেক সময় কোনো সমস্যা থেকে সাময়িকভাবে মন সরিয়ে নিলে মস্তিষ্ক পেছনে পেছনে সেটি নিয়ে কাজ করতে পারে। পরে যখন আপনি কিছুটা স্বস্তিতে থাকেন, তখন সমাধানটি হঠাৎ সচেতন চিন্তার মধ্যে চলে আসে।
তাই বিষয়টি গোসলের পানির কোনো বিশেষ ক্ষমতা নয়। শ্যাম্পু কিংবা সাবানও এখানে মূল নায়ক নয়! বরং গোসলের সময় পাওয়া নিরিবিলি পরিবেশ, স্বস্তি এবং কম মানসিক চাপ সৃজনশীল চিন্তার জন্য সহায়ক হতে পারে।
তবে গোসলের সময় আইডিয়া আসার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আইডিয়াটা মনে রাখা! শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে মনে হলো, ‘এই আইডিয়া কোনোভাবেই ভুলব না।’ কিন্তু গোসল শেষ করে তোয়ালে হাতে নিতেই ‘আমি কী যেন ভাবছিলাম?’ অনেকের সঙ্গেই এমন ঘটনা ঘটে। কারণ নতুন কোনো চিন্তা মনে ধরে রাখার সুযোগ না পেলে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি অন্য চিন্তার আড়ালে হারিয়ে যেতে পারে।
তাই গোসলের সময় হঠাৎ কোনো দারুণ আইডিয়া মাথায় এলে সুযোগ পেলেই সেটি লিখে রাখা ভালো। কারণ আপনার মস্তিষ্ক হয়তো শাওয়ারের নিচে আপনাকে যে আইডিয়াটি উপহার দিয়েছে, সেটি পাঁচ মিনিট পরেই ফিরিয়ে নিতে পারে!
সবশেষে বলা যায়, গোসল করলেই যে সবার মাথায় অসাধারণ আইডিয়া আসবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। কারও আইডিয়া আসে হাঁটতে গিয়ে, কারও আসে চা খাওয়ার সময়, আবার কারও আসে ঘুমানোর আগে। আসল বিষয় হলো, যখন মন কিছুটা চাপমুক্ত থাকে এবং মস্তিষ্ককে নিজের মতো করে চিন্তা করার সুযোগ দেওয়া হয়, তখন নতুন ভাবনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
তাই পরেরবার গোসল করতে গিয়ে যদি হঠাৎ জীবনের সেরা কোনো আইডিয়া মাথায় আসে, অবাক হওয়ার কিছু নেই। বরং মনে মনে মস্তিষ্ককে বলুন, ‘সারাদিন এত ব্যস্ত রাখার পর অবশেষে একটু সময় পেয়েছিস, তাই তো!’









