নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পেছনে একটি হিমবাহ ধসে পড়ার ঘটনা প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের বরফ দ্রুত গলে যাওয়ার ঝুঁকিও এতে স্পষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
এক সাক্ষাৎকারে তারা জানান, প্রথম দিকে ভূমিকম্পের খবর ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ভূমিকম্পের কম্পনে ভূমিধসের সৃষ্টি হয়ে সেখান থেকে বন্যা হয়েছে। ওই বন্যায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, দুর্যোগটির কারণ ছিল হিমবাহ ধস। অর্থাৎ একটি হিমবাহ বা এর কোনো অংশ ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া।
ইউএসজিএসের তথ্য এবং ঘটনাটি বিশ্লেষণ করা বিজ্ঞানীদের মতে, ধসে পড়া হিমবাহটি উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ার সময় এত শক্তিশালী আঘাত তৈরি হয় যে তা ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে রেকর্ড হয়।
ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ড. সাইমন কুক বিবিসিকে জানান, তাঁর দল নেপালের লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে একটি হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ার বিষয়টি শনাক্ত করেছে। ওই স্থানটি বন্যাকবলিত এলাকা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে।
তার ধারণা, হিমবাহটি উত্তর-পশ্চিম দিকে ধসে পড়ে পরে নদীর প্রবাহের সঙ্গে পশ্চিম দিকে এগিয়ে যায়।
আন্তঃসরকারি বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) জানিয়েছে, উচ্চ পার্বত্য এলাকা থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস নেমে থাকতে পারে।
এর ফলে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথরের ধ্বংসাবশেষ লেন্দে খোলা নদীতে গিয়ে পড়ে। এটি ভোতে কোশি নদীর একটি শাখা। এতে নদীতে হঠাৎ পানির প্রবল স্রোত তৈরি হয় এবং পানি, পলি ও বড় বড় পাথর ভাটির দিকে ছুটে যায়।
আইসিআইএমওডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে ভাটির দিকের নদীগুলোতে পানির উচ্চতা ৭ থেকে ৯ মিটার বেড়ে যায়। পানির স্রোতে কয়েকটি পানি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ভেসে যায় অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাইক সিয়ার্ল বলেন, ভূমিধস থেকে বন্যা তৈরি হওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েক ঘণ্টা, এমনকি কয়েক দিনও সময় নিতে পারে।
তার মতে, বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে প্রথমে ভূমিধস হয়েছিল। এরপর পানি জমে নদীর প্রবাহ আটকে যায় এবং পরে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার মতো করে একসঙ্গে বিপুল পানির ঢল নেমে আসে।
পাহাড়ের ভূপ্রকৃতিও বাড়িয়েছে বন্যার তীব্রতা
এলাকার ভূপ্রকৃতিও বন্যার ভয়াবহতা বাড়িয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। অধ্যাপক সিয়ার্ল জানান, লাংটাং লিরুং হিমালয়ের উঁচু অংশের শীর্ষে অবস্থিত। পাহাড়টির দুই পাশে রয়েছে অত্যন্ত খাড়া উপত্যকা। এসব সংকীর্ণ পথ দিয়ে পানি আরও বেশি গতিতে নিচের দিকে নেমে আসতে পারে।
তবে বুধবার (২৬ আগস্ট) ঠিক কী কারণে হিমবাহটি ধসে পড়ল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অধ্যাপক সিয়ার্ল জানান, দীর্ঘমেয়াদি টেকটোনিক গতিবিধির কারণে হিমালয় পর্বতমালা ধীরে ধীরে উঁচু হচ্ছে। একটি ভূত্বকীয় প্লেট অন্যটিকে ওপরের দিকে ঠেলে দেওয়ার ফলে এই প্রক্রিয়া চলছে।
তিনি বলেন, পাহাড় যত উঁচু হচ্ছে, হিমবাহও তত খাড়া হয়ে উঠছে। ফলে এর কিছু অংশ ধসে পড়া স্বাভাবিক। তবে সাধারণত ছোট ছোট অংশ ভেঙে নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে দেয় এবং পরে পানির স্রোতে সেগুলো সরে যায়।
কিন্তু এবারের ঘটনায় পুরো হিমবাহ একসঙ্গে ধসে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে, যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের বন্যা প্রায়ই ঘটে, কিন্তু এত বড় মাত্রায় নয়।
জলবায়ু পরিবর্তনও কি দায়ী?
বিজ্ঞানীদের ধারণা, বুধবারের ভয়াবহ ঘটনার পেছনে দুটি প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করতে পারে। একটি হলো হিমালয়ের ভূ-গঠনগত পরিবর্তন এবং অন্যটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হিমবাহ গলে যাওয়া।
বছরের পর বছর ধরে বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের বরফ ও পারমাফ্রস্ট, অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে জমাট থাকা মাটি গলে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন।
আইসিআইএমওডির চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো ২০০০ সালের তুলনায় বর্তমানে দ্বিগুণ গতিতে বরফ হারাচ্ছে। এর ফলে বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
ড. সাইমন কুক জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত, সুইজারল্যান্ড ও ইতালিতেও হিমবাহ ধসের কারণে বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে।
২০২১ সালে ভারতের উত্তরাঞ্চলের চামোলিতে হিমালয়ের একটি বড় অংশের হিমবাহ ধসে পড়ে। এতে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ ও পানির ঢল নিচের দিকে নেমে প্রায় ২০০ মানুষের মৃত্যু হয়। পরে বিজ্ঞানীরা হিসাব করে জানান, ওই ধসের আঘাতের শক্তি প্রায় ১৫টি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের সমান ছিল।
নেপালেও একই অঞ্চলে গত বছর তিব্বতের একটি হিমবাহ হ্রদ উপচে পড়ার কারণে বন্যা হয়েছিল।
আইসিআইএমওডির বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফারুক আজম বলেন, পৃথিবীর হিমায়িত অঞ্চল বা ক্রায়োস্ফিয়ারে দুর্যোগের ঘটনা ক্রমেই বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। পরিবর্তনের গতি অত্যন্ত দ্রুত।
কোনো একটি নির্দিষ্ট দুর্যোগ সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন বলে মনে করেন ড. কুক। তবে এ ধরনের ঘটনার ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থাকার সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়।
তার মতে, পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহ সংকুচিত হবে এবং তুষার গলার পরিমাণ বাড়বে। একই সঙ্গে পাহাড়ের ঢালকে ধরে রাখা পারমাফ্রস্ট উষ্ণ হয়ে গলে যেতে পারে।
এর ফলে ভবিষ্যতে ভূমিধস, ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ, হিমবাহের গলিত পানি, হিমবাহ হ্রদের আকস্মিক বিস্ফোরণ ও হিমবাহ ধসের মতো ঘটনা আরও বাড়তে পারে। জলবায়ু উষ্ণায়নের কারণে উচ্চ পার্বত্য পরিবেশ ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে বলেই মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।









