ময়মনসিংহ নগরীর একটি পশুচিকিৎসকের চেম্বারে ঢুকে তাকে জুতা দিয়ে মারধর, ভাঙচুর ও টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে করা মামলায় আফরিন রশিদ সেঁজুতি নামে এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
রোববার (২৩ আগস্ট) নগরীর মাসকান্দা এলাকায় আফরিনের বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি একই এলাকার হারুনুর রশিদের মেয়ে।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মামলার আসামি আফরিন রশিদ সেঁজুতিকে গ্রেপ্তার করে ময়মনসিংহ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে। ঘটনায় জড়িত অন্য আসামিদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
এর আগে গত ২১ আগস্ট সন্ধ্যায় নগরীর জিলা স্কুলের পাশের একটি গলিতে ‘ডক্টরস পেট কেয়ার’ নামে চেম্বারে হামলার ঘটনা ঘটে। পরদিন ভুক্তভোগী চিকিৎসক আশিকুর রহমান ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় অভিযোগ দেন। এতে মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তালহাজুর রহমান প্রতীক, আফরিন রশিদ সেঁজুতি ও সাকিবসহ আরও চার-পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এক নারী চেম্বারে ঢুকে জুতা খুলে চিকিৎসক আশিকুর রহমানকে মারধর করছেন। পাশে দাঁড়িয়ে তালহাজুর রহমান প্রতীক মোবাইল ফোনে ঘটনার ভিডিও ধারণ করছেন। পরে তাকেও চিকিৎসকের ওপর হামলা করতে দেখা যায়।
ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মহানগর ছাত্রদলের ওই নেতাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।
চিকিৎসক আশিকুর রহমানের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল। শুক্রবার সন্ধ্যায় চেম্বারে এসে চাঁদার জন্য চাপ দিলে তিনি প্রতিবাদ করেন। এরপর সিসিটিভির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তাকে লোহার রড দিয়ে মারধর করা হয়।
আশিকুরের দাবি, তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে চেম্বারের কর্মী ঈশান আহমেদ, তার স্ত্রী তাওহিয়া আক্তার ও চিকিৎসকের স্ত্রী সাজনিন তাসনিন সিদ্দিকীকেও মারধর ও টানাহেঁচড়া করা হয়। হামলার পর চেম্বারের ক্যাশ বাক্স থেকে ৩ লাখ ২০ হাজার ১৫০ টাকা নিয়ে যাওয়া হয়। এ ছাড়া চেম্বারের মালামাল ভাঙচুর করে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার ক্ষতি করা হয়েছে।
তবে হামলার পেছনে চাঁদা দাবির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত বিরোধ এবং এক বছর আগের একটি ঘটনাও রয়েছে বলে দাবি করেছেন আশিকুর রহমান।
তার ভাষ্য, আফরিন রশিদ সেঁজুতি একটি বিড়ালের মৃত বাচ্চা প্রসবের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্য এক চিকিৎসককে নিয়ে লেখালেখির পেছনে আশিকুরের হাত রয়েছে, এমন ভুল ধারণা থেকেও হামলা হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে সাকিবুল হাসানের দাবি, গত ১৭ আগস্ট সেঁজুতি একটি গর্ভবতী পার্সিয়ান বিড়ালকে কেওয়াটখালীর ভেটেরিনারি চিকিৎসক আব্দুল হান্নানের কাছে রেখে যান। সেখানে বিড়ালটি মারা যায়। পরে বিড়ালের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে ফেসবুকে লেখালেখি হলে আশিকুর রহমান ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে সেঁজুতিকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। এ কারণেই আশিকুরকে মারধর করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সাকিবুল জানান, এ ঘটনায় তারাও থানায় অভিযোগ করেছেন। তবে তাদের কোনো অভিযোগ থানায় পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ওসি মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম।
এদিকে মো. লাক মিয়া নামে এক ব্যক্তি লিখিত অভিযোগে দাবি করেন, গর্ভবতী হওয়ায় ১৭ আগস্ট তাদের পোষা পার্সিয়ান বিড়ালটি চিকিৎসক আব্দুল হান্নানের কাছে নেওয়া হয়। চিকিৎসক বিড়ালটিকে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখার কথা বলে একটি ইনজেকশন দেন। পরদিন ফোন করে তারা জানতে পারেন, বিড়ালটি মারা গেছে।
লাক মিয়ার অভিযোগ, চিকিৎসকের অবহেলা ও অপচিকিৎসার কারণে বিড়ালটির মৃত্যু হয়েছে। তবে চিকিৎসক আশিকুর রহমানকে মারধরের বিষয়ে তার অভিযোগে কোনো বক্তব্য নেই।
অন্যদিকে চিকিৎসক আব্দুল হান্নানের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করা হয়েছে, ২০ আগস্ট অভি, ঝলক, পলক, সেঁজুতি, রিফাতসহ অজ্ঞাত আরও তিনজন তার চেম্বারে হামলা চালান। তাকে না পেয়ে তার সহকারীকে মারধর এবং চেম্বারে ভাঙচুর করা হয়। এ সময় মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
পোস্টে আরও বলা হয়, এরই ধারাবাহিকতায় পরদিন ২১ আগস্ট একই ব্যক্তিরা চিকিৎসক আশিকুর রহমানের ক্লিনিকে হামলা চালিয়ে তাকে মারধর করেন।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে আফরিন রশিদ সেঁজুতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার অন্য আসামিদেরও আইনের আওতায় আনতে থানা পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।









