এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
এবারের ফিফা বিশ্বকাপ হতে চলেছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, দীর্ঘতম। প্রতিযোগিতাপূর্ণ আসরের প্রত্যাশা তো থাকছেই। প্রথমবার অংশ নিচ্ছে ৪৮ দেশ। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। ম্যাচ হবে ১০৪টি। ১১ জুন, আজ রাত ১টায় মেক্সিকো-সাউথ আফ্রিকা ম্যাচ দিয়ে উঠবে মহাযজ্ঞের পর্দা।
বিশ্বকাপ মানে আবেগ, উন্মাদনা আর স্বপ্ন। নিজেকে, নিজেদের প্রমাণের সুযোগ। ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু আবেগের গল্পও নয়; ফুটবল রাজনীতির পরিবর্তন, বিশ্বায়নের নতুন অধ্যায় এবং প্রতিভার সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় মধ্যরাতে যে পর্দা উঠবে, নামবে ১৯ জুলাইতে।
মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী বাঁশি বাজবে। শুরু হবে ফুটবল উৎসব, পর্দা নামবে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের মধ্য দিয়ে। জেনে নেয়া যাক আসরের খুঁটিনাটি-
বাংলাদেশে যেভাবে বিশ্বকাপ দেখা যাবে
বিশ্বকাপ সরাসরি দেখাবে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেডের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আইস্ক্রিন। জনপ্রিয় ওটিটি মাধ্যমটি ছাড়াও খেলা দেখা যাবে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সময় টিভি, সরকারি চ্যানেল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এবং ক্রীড়াভিত্তিক টিভি চ্যানেল টি-স্পোর্টসে। পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম টফি এবং মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠান রবির অ্যাপ ও গ্রামীণফোনের বায়োস্কোপ অ্যাপে বিশ্বকাপ দেখা যাবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যা থাকছে
তিন আয়োজক দেশের তিনটি ভিন্ন স্টেডিয়ামে জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এবারের আসর। প্রতিটি আয়োজক দেশের নিজস্ব উদ্বোধনী ম্যাচের ঠিক ৯০ মিনিট আগে অনুষ্ঠানগুলো শুরু হবে। উদ্বোধনীর ঐতিহাসিক সূচনা হবে মেক্সিকো সিটির বিখ্যাত এস্তাদিও আজতেকাতে। বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ৩০ মিনিটে শুরু হতে চলা প্রথম অনুষ্ঠানে মূল আকর্ষণ লাতিন পপ কুইন শাকিরা এবং নাইজেরিয়ান আফ্রোবিটস শিল্পী বার্না বয়। তারা যৌথভাবে আসরের অফিসিয়াল থিম সং ‘দাই দাই’ পরিবেশন করবেন। মেক্সিকোর সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও আধুনিক ল্যাটিন সুরের মিশেলে সাজানো উদ্বোধনীতে আরও পারফর্ম করবেন জনপ্রিয় তারকা জে বালভিন এবং বিখ্যাত পপ ব্যান্ড মানা।
পরদিন কানাডার টরন্টোর বিএমও ফিল্ডে হবে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় উদ্বোধনী আয়োজন। বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ৩০ মিনিটে শুরু হতে চলা অনুষ্ঠানে মূলত কানাডিয়ান সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্য তুলে ধরা হবে। জমকালো মঞ্চ মাতাতে সমবেত হবেন মাইকেল বুবলে, অ্যালানিস মরিসেট এবং আলিসিয়া কারার মতো বিশ্বখ্যাত ও জনপ্রিয় কানাডিয়ান সংগীতশিল্পীরা।
জেসি রেয়েজ এবং ফিলিস্তিনি শিল্পী এলিয়ানা সঙ্গীত পরিবেশন করবেন এবং মাইকেল বুলে সন্ধ্যার প্রাক-ম্যাচ বিনোদনের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে থাকবেন। নোরা ফাতেহি, আলানিস মরিসেট, আলেসিয়া কারা, উইলিয়াম প্রিন্স, ভেজেড্রিম এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডিজে সঞ্জয় এ অনুষ্ঠানের লাইন-আপ সম্পূর্ণ করবেন।
১৩ জুন উদ্বোধনীর শেষ ও সবচেয়ে আকর্ষণীয় আসর বসবে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে। বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে শুরু হতে চলা শেষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়েছে খাঁটি হলিউড ঘরানায়। বিশ্ব কাঁপাতে মঞ্চে পারফর্ম করবেন পপ তারকা ক্যাটি পেরি, বিখ্যাত কোরিয়ান ব্যান্ড ব্ল্যাকপিংক-এর জনপ্রিয় সদস্য লিসা, ফিউচার এবং ল্যাটিন সেনসেশন অ্যানিত্তার মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মেগাস্টাররা।
পুরো টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী পর্বগুলোর মূল থিম তৈরি করা হয়েছে ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফিকে কেন্দ্র করে, যা প্রতিটি দেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হবে। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল অনুরাগী টেলিভিশনের পাশাপাশি বিভিন্ন অনলাইন ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে জমকালো আয়োজন সরাসরি উপভোগ করতে পারবেন।
নতুন ফরম্যাট: কীভাবে হবে প্রতি রাউন্ড
১৯৯৮ সাল থেকে বিশ্বকাপে খেলত ৩২ দল। এবার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮-এ। ৪৮ দলকে ভাগ করা হয়েছে ১২ গ্রুপে, প্রতি গ্রুপে থাকবে ৪টি করে দেশ। প্রতিটি দেশ খেলবে তিনটি করে ম্যাচ। গ্রুপপর্ব শেষে ১২ গ্রুপের শীর্ষ দুই দল (মোট ২৪টি) এবং সেরা ৮টি তৃতীয় স্থান অধিকারী দল উঠে যাবে নতুন সংযোজিত রাউন্ড অব ৩২-এ। এ রাউন্ড থেকে শুরু হবে নকআউট পর্বের লড়াই। শেষপর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হতে হলে কোন দলকে খেলতে হবে সর্বোচ্চ ৮টি ম্যাচ।
কয় স্টেডিয়ামে খেলা হবে
এই প্রথম তিনটি দেশ যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। বিশ্বকাপের ম্যাচ হবে ১৬টি স্টেডিয়ামে। সবচেয়ে বেশি ম্যাচ হবে যুক্তরাষ্ট্রে। মেক্সিকো ইতিহাসে প্রথম দেশ হিসেবে তৃতীয়বার বিশ্বকাপের আয়োজক হচ্ছে। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা উদ্বোধনী ম্যাচের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে হবে মহারণের ফাইনাল।
মেক্সিকো এপর্যন্ত একমাত্র দেশ, যারা তিনটি বিশ্বকাপের স্বাগতিক হল। ১৯৭০, ১৯৮৬ এবং ২০২৬ আসরের আয়োজক দেশ তারা। দুটি করে বিশ্বকাপ আয়োজন করে দ্বিতীয়তে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইতালি। কানাডার বিশ্বকাপ আয়োজনে অভিষেক হতে চলেছে এবার।
বিশ্বকাপে এপর্যন্ত সবচেয়ে ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামগুলোর একটি হল মেক্সিকো সিটি এস্তাদিও আজতেকা। এখানে বিশ্বকাপ বেশকিছু স্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী। পেলে ১৯৭০ আসরে ব্রাজিলের হয়ে এখানে বিশ্বকাপ জিতেছেন। ডিয়েগো ম্যারাডোনা ১৯৮৬ আসরে আর্জেন্টিনার হয়ে একই কীর্তি গড়েছেন। এ মাঠেই ‘৮৬তে হয়েছিল ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলটি। এবারের বিশ্বকাপে এই স্টেডিয়ামে ফাইনাল না হলেও উদ্বোধনী ম্যাটি হচ্ছে।
উদ্বোধনী ম্যাচে সব ঠিক থাকলে মেক্সিকোর হয়ে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামবেন গোলরক্ষক গুইলের্মো ওচোয়া। লিওনেল মেসি এবং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে তিনি একমাত্র খেলোয়াড় হবেন, যারা সবচেয়ে বেশি ৬টি বিশ্বকাপ খেলতে চলেছেন।
এবারের মহাযজ্ঞে হতে চলেছে সবচেয়ে বেশি দিনব্যাপী খেলা কোন ফুটবল বিশ্বকাপ। ৩৯ দিন চলবে আসর। গ্রুপর্বের শেষ ম্যাচগুলোর দিনে একই রাতে মাঠে গড়াবে ৬টি করে খেলা, যেটি আগে কখনও হয়নি।
স্টেডিয়াম তালিকা
যুক্তরাষ্ট্র (১১টি): মেটলাইফ স্টেডিয়াম (নিউ জার্সি), সোফাই স্টেডিয়াম (লস অ্যাঞ্জেলেস), এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়াম (ডালাস), মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম (আটলান্টা), হার্ড রক স্টেডিয়াম (মিয়ামি), অ্যারোহেড স্টেডিয়াম (কানসাস সিটি), লিভাইস স্টেডিয়াম (সান্টা ক্লারা), লিংকন ফিন্যান্সিয়াল ফিল্ড (ফিলাডেলফিয়া), জিলেট স্টেডিয়াম (বোস্টন), লুমেন ফিল্ড (সিয়াটল), এনআরজি স্টেডিয়াম (হিউস্টন)।
কানাডা (২টি): টরন্টো স্টেডিয়াম ও বিসি প্লেস (ভ্যাঙ্কুভার)
মেক্সিকো (৩টি): এস্তাদিও আজতেকা (মেক্সিকো সিটি), এস্তাদিও বিবিভিএ (মন্টেরে) ও এস্তাদিও আকরন (গুয়াদালাহারা)।
মাঠের খেলা নিয়ন্ত্রণে থাকছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থাকছে ভালোভাবেই। রেফারির সিদ্ধান্ত, দলের কৌশল, খেলোয়াড়ের শরীর, দর্শকের নিরাপত্তা সবকিছুতে নজর রাখবে প্রযুক্তি।
চার দেশের অভিষেক
উজবেকিস্তান, জর্ডান, কুরাসাও এবং কেপ ভার্দে প্রথমবার অংশ নিচ্ছে বিশ্বকাপে।
কারা হতে পারেন টুর্নামেন্টের বড় তারকা?
এই বিশ্বকাপ হতে পারে কয়েকটি প্রজন্মের মিলনমেলা। লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো থেকে শুরু করে আছেন হালের কাইলিয়ান এমবাপে, লামিন ইয়ামাল, ভিনিসিয়াস জুনিয়র, আর্লিং হালান্ড, জুড বেলিংহ্যামের মতো তারকারা।
মেসি ও রোনালদোর সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হতে পারে লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ। দুই মহাতারকার লাস্ট ড্যান্স দেখার অপেক্ষা।
শক্তিমত্তায় এগিয়ে যে দেশগুলো
কাগজে-কলমে শক্তিশালী দলই যে সবসময় ট্রফি জেতে না- তা বিশ্বকাপের ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে। চোট, স্নায়ুচাপ, ভাগ্য আর নির্দিষ্ট দিনের পারফরম্যান্স শেষপর্যন্ত নির্ধারণ করে সোনালি ট্রফির মালিক কে হবেন। তবুও সাম্প্রতিক ফর্ম, স্কোয়াডের গভীরতা এবং অভিজ্ঞতার বিচারে ৬টি দল সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, স্পেন, বর্তমান রানার্সআপ ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রাজিল, ইংল্যান্ড ও পর্তুগাল।
ডার্ক হর্স হতে পারে যে দেশগুলো
বিশ্বকাপের ইতিহাস বলে, চমক সবসময়ই থাকে। সেই হিসেবে এবারের আসরে ডার্ক হস হতে পারে মরক্কো, কলম্বিয়া, সেনেগাল, নরওয়ে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
প্রাইজমানি
২০২৬ বিশ্বকাপে দলগুলোর জন্য পারফরম্যান্সভিত্তিক প্রাইজমানি ৫০ শতাংশের বেশি বাড়িয়ে করা হয়েছে ৬৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অংশগ্রহণকারী ৪৮ দেশের প্রত্যেকে প্রস্তুতি খরচ বাবদ পাবে ১৫ লাখ ডলার। কোন ম্যাচ না জিতে বিদায় নিলেও প্রতিটি দেশের জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার নিশ্চিত। মেটলাইফের মঞ্চে যারা সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে, সেই চ্যাম্পিয়ন দল ফিরবে রেকর্ড ৫ কোটি ডলার নিয়ে। রানার্সআপ পাবে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
অন্যদিকে, ডাইনামিক প্রাইসিং মডেলে গ্রুপপর্বের সবচেয়ে সস্তা টিকিটের দাম শুরু ৭০০ ডলার থেকে এবং ফাইনালের ক্যাটাগরি-১ টিকিটের দাম অফিসিয়াল চ্যানেলে ছাড়িয়েছে ১০ হাজার ডলার। সম্প্রচার অধিকার ও স্পনসরশিপ থেকে ফিফার প্রত্যাশিত আয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯০ কোটি ডলার।
আশঙ্কা বনাম নতুন সম্ভাবনা
৪৮ দলের বিশ্বকাপে প্রতিযোগিতার মান কমে যেতে পারে- এমন আশঙ্কা আছে। তবে বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মতে, বর্ধিত কলেবর ছোট দেশগুলোর জন্য এক নতুন সুযোগের দরজা খুলে দেবে। এটা হতে পারে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য! ব্রাজিলের মতো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা যেমন নতুন করে ট্রফির স্বপ্ন দেখছে, তেমনি প্রথমবার অংশ নেয়া কোন দেশও বুক বাঁধছে অদম্য আত্মবিশ্বাসে- অসম্ভবকে সম্ভব করতে।
২০২৬ সালের গ্রীষ্মে উত্তর আমেরিকার আকাশের তলে তাই শুধু ফুটবল মাঠের লড়াই হবে না, সেখানে মুখোমুখি দাঁড়াবে- ইতিহাস ও ঐতিহ্য, আবেগ ও আত্মপরিচয় এবং কোটি কোটি মানুষের লালিত স্বপ্ন। সবশেষে- বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত কেবল কোন টুর্নামেন্টের নাম নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্মিলিত অনুভূতির নামও।









