বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সময় ছিল স্বপ্নের কর্মস্থল হিসেবে পরিচিত। উচ্চ বেতন, আধুনিক কর্মপরিবেশ ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কর্মীদের কাছে মেটা ও লিঙ্কডইনের মতো প্রতিষ্ঠানকে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিল। তবে সাম্প্রতিক ছাঁটাইয়ের ঢেউ সেই বাস্তবতায় বড় ধাক্কা এনে দিয়েছে।
আজ (২০ মে) বুধবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এনডিটিভি জানিয়েছে, সম্প্রতি মেটা প্রায় ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। একই সময়ে লিঙ্কডইনও ৬০০ কর্মীকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়। কিন্তু বিষয়টি এখন শুধু চাকরি হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং কর্মীদের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক কর্মী এখন প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই ইমেইল পরীক্ষা করেন চাকরি আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য। কেউ কেউ জানিয়েছেন, অফিসের অভ্যন্তরীণ গ্রুপ চ্যাট এখন ভরে গেছে অন্ধকার রসিকতা, ‘ডুমসডে’ মিম ও অনিশ্চয়তার কথায়।
কর্মীদের অনেকের অভিযোগ, তারা এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছেন, যা একসময় তাদের নিজেদের চাকরিই প্রতিস্থাপন করতে পারে। এতে কর্মীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একজন দীর্ঘদিনের মেটা কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন সকালে অফিসে যাওয়ার আগে ইমেইল চেক করতাম। মনে হতো, হয়তো আজই চাকরি হারাব।
এই পরিস্থিতির মানসিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ভারতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ও গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ডা. সাজিদ কাজমি বলেন, চাকরি হারানোর ভয় বা হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়া মানুষের জীবনে বড় ধরনের মানসিক আঘাত তৈরি করে। এতে উদ্বেগ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসহীনতা এমনকি পরিচয় সংকটও দেখা দিতে পারে।
এদিকে প্রযুক্তি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, এআইভিত্তিক ভবিষ্যতের দিকে দ্রুত ঝুঁকছে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মীসংখ্যা কমিয়ে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। মেটার সঙ্গে যুক্ত সাইবার নিরাপত্তা গবেষক শুভম ভামারে বলেন, মেটা এখন পুরোপুরি এআইকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। এমনকি তাদের ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রকল্পও এখন পেছনে পড়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষের পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ছে।
তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও উদ্যোক্তাদের একাংশ মনে করেন, এআই মানুষের সৃজনশীলতা, সহমর্মিতা ও গ্রাহক বোঝার ক্ষমতার বিকল্প হতে পারবে না। তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। লিঙ্কডইনের সাম্প্রতিক ছাঁটাই নিয়েও একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি রাজস্ব বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে, তারপরও কর্মী কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
লাভজনক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন এআই-নির্ভর ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের পুনর্গঠন করছে। এক সময় ‘নিরাপদ প্রযুক্তি চাকরি’ হিসেবে যে ধারণা ছিল, তা এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অনেক কর্মীর ভাষায়, চাকরি হারানোর আগেই আমরা নিজেদের অপ্রয়োজনীয় মনে করতে শুরু করেছি।









