অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অর্থায়নের অভাবে বাংলাদেশে রুফটপ (ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুত) অগ্রগতি আটকে আছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্টজনরা।
মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর গুলশানে ওয়েস্টিন হোটেলে টেকসই জ্বালানির ভবিষ্যত শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
অর্থায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অভাবে রুফটপ সোলার খাতে বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হচ্ছে না। বর্তমানে এই খাতে সীমিত প্রণোদনা থাকলেও তা তাৎক্ষণিক কার্যকারিতা পাচ্ছে না বলেও অভিমত খাত সংস্লিষ্টদের।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) এবং অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ-গভর্নর নূরুন নাহার। অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএসআরইএ’র সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক পরিচালক খোন্দকার মোরশেদ মিল্লাত।
অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ বিভাগ, স্রেডা, ইডকল, বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন অর্থায়ন সংস্থার উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের নেতৃবৃন্দ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বিএসআরইএ’র সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, ‘নতুন নীতিমালায় ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যার মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ৩,০০০ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু এই খাতে সম্ভাবনা থাকলেও বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে অর্থায়ন। বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আসছে মাত্র ৫.৬ শতাংশ বিদ্যুৎ। যা আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে রুফটপ সোলারের কোনো বিকল্প নেই। এটিই এখন সবচেয়ে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য, টেকসই ও কার্যকর সমাধান। আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক ও শিল্প কারখানার অসংখ্য ছাদ আজ পরিছন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে রূপান্তরের অপেক্ষায় আছে। এখানেই বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ।
আমাদের মূল সমস্যা প্রযুক্তি নয়, ইচ্ছাশক্তিও নয়, সমস্যার নাম অর্থায়ন। এই খাতে দীর্ঘমেয়াদি ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের সুযোগ সীমিত। অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক এখনও ঝুঁকি ভেবে রুফটপ সোলারে ঋণ দিতে অনাগ্রহী। নেট মিটারিং সুবিধা থাকলেও অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় সময়ের ব্যয় হয়, আর বাণিজ্যিক ব্যাংক ও এনবিএফআই থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও সাশ্রয়ী ঋণ পাওয়ায় সমস্যা রয়েছে।
ইউটিলিটি কোম্পানিতে একক ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ ব্যবস্থা চালু করলে অনুমোদন প্রক্রিয়ার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। ছোট ছোট প্রকল্পগুলোর জন্য একত্রিকরণ, বান্ডেলিং ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা টুল না থাকায় এগুলো বিনিয়োগকারীদের কাছে এখনও যথেষ্ট আকর্ষণীয় নয়, এবং এই সমস্যা সমাধান না হলে প্রকল্পের অর্থায়ন সীমিত থাকবে। অর্থাৎ আমাদের রুফটপ সোলারের সম্ভাবনা এখনও সঠিক আর্থিক ইকোসিস্টেমের অপেক্ষায় আছে। ‘
বিএসআরইএ’র সভাপতি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যেই গ্রিন ফাইন্যান্সকে উৎসাহিত করতে পুনঃঅর্থায়ন স্কিম, গ্রিন ব্যাংকিং নির্দেশিকা এবং টেকসই অর্থায়ন নীতি প্রণয়ন করেছে, যা প্রশংসনীয়। তবে এখন সময় এসেছে আরও এক ধাপ এগোনোর।
বাংলাদেশ ব্যাংক রুফটপ সোলার অর্থায়ন সক্রিয় করতে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল বিস্তৃত করতে পারে, ক্রেডিট গ্যারান্টি চালু করতে পারে এবং ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স মডেল উৎসাহিত করতে পারে। বাণিজ্যিক ব্যাংক ও এনবিএফআইগুলো লিজিং, প্রজেক্ট ফাইন্যান্সিং, পে-অ্যাজ-ইউ-সেভ” মডেল এবং গ্রিন বন্ডের মতো নতুন আর্থিক প্রডাক্ট তৈরি করতে পারে। এতে বিনিয়োগ ঝুঁকি কমবে, আবার টেকসই মুনাফাও আসবে।
ইডকল ইতিমধ্যেই অফ-গ্রিড সোলার ও বড় প্রকল্পে সফলতা দেখিয়েছে। এখন তাদের দক্ষতা রুফটপ সোলার স্কেল-আপের দিকে পরিচালিত করতে হবে, বিশেষত শিল্প ও আবাসিক খাতে। আমরা যদি সফল হই, তবে রুফটপ সোলার শুধু আমাদের গ্যাস ও জ্বালানি আমদানির চাপ কমাবে না, এটি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করবে এবং হাজারো নতুন সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।’
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি সফল করতে সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিদ্যুৎ বিভাগ ও স্রেডা-কে নীতি আরও স্বচ্ছ, গতিশীল ও বেসরকারি খাতবান্ধব করতে হবে।









