যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাগরিকত্ব বিষয়ক নতুন নির্দেশনার ফলে দেশটিতে বসবাসরত ভারতীয়দের সন্তানদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে, অনেক অভিবাসী পরিবার তাদের সন্তানের নাগরিকত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকবে, এবং তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ভবিষ্যতে বসবাস ও কর্মসংস্থান আরও জটিল হয়ে উঠবে।
আজ (১১ ফেব্রুয়ারি) মঙ্গলবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, আইনগত দিক থেকে, এই ধরনের পরিবর্তন ভারতীয় অভিবাসী সমাজের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে, বিশেষ করে সেইসব পরিবার যারা দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের জন্য অপেক্ষা করছে। এটি শুধু তাদের বর্তমান অবস্থা নয়, ভবিষ্যতেও তাদের সন্তানদের নাগরিকত্ব নিয়ে সমস্যা তৈরি করতে পারে। এভাবে, এই ইস্যু অনেক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ এবং নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির ভবিষ্যৎকেই নির্দেশ করছে।
এইচ-ওয়ানবি ভিসাধারীদের উদ্বেগ
নেহা সাতপুতে ও অক্ষয় পিসে, এই ভারতীয় দম্পতি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছেন। তারা দক্ষ বিদেশী কর্মীদের ভিসা (এইচ-ওয়ানবি ভিসা) হোল্ডার। ২৬ ফেব্রুয়ারিতে জন্ম নেওয়া পুত্রসন্তানের যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার অপেক্ষা করেছিলেন।
এতদিন পর্যন্ত, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সন্তানের নাগরিকত্ব পিতামাতার অভিবাসন অবস্থার উপর নির্ভরশীল ছিল না। এখন, এই পরিবর্তনের ফলে নেহা ও অক্ষয়ের মতো বহু ভারতীয় অভিবাসী পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছেন। তাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: তাদের সন্তানের নাগরিকত্ব কী হবে?
পাঁচ মিলিয়নেরও বেশি ভারতীয় এইচ-ওয়ানবি ভিসাধারী, যাদের অধিকাংশই দক্ষ কর্মী, বর্তমানে এই আদেশের কারণে তারা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
ছাত্র ও কর্ম ভিসাধারীদের উদ্বেগ
এই নির্দেশনা শুধু এইচ-ওয়ানবি ভিসাধারীদের ওপর নয়, বরং ছাত্র ভিসাধারী ভারতীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। যেসব ভারতীয়রা যুক্তরাষ্ট্রে ছাত্র বা কর্ম ভিসায় রয়েছেন, তাদের জন্য এই নির্দেশের কারণে তাদের সন্তানদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগও বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে।

চিকিৎসকদের উদ্বেগ
ডা. সতীশ কাঠুলা, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাসোসিয়েশন অফ ফিজিশিয়ানস অফ ইন্ডিয়ান অরিজিন এর প্রেসিডেন্ট। তিনি জানিয়েছেন, ভারতে জন্ম নেওয়া ভারতীয় চিকিৎসকদের সন্তানদের নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে এই আইন বাধা সৃষ্টি করতে পারে, যা তাদের পেশাদার জীবনকে কঠিন করে তুলবে।
নির্দেশ বাতিল
এই নতুন নির্দেশনা নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হলেও ম্যারিল্যান্ডের একজন ফেডারেল জজ এই নির্দেশটি বাতিল করেছেন এবং সিয়াটল কোর্টের প্রাথমিক দুই সপ্তাহের সময় বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে, আপাতত এই রায় কার্যকর হবে না, তবে উচ্চ আদালত যে কোনো সময় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে।
অভিবাসন নীতি বিশ্লেষকদের মতামত
নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক অভিবাসন আইনজীবী সাইরাস মেহতা জানিয়েছেন, ভারতীয় অভিবাসীদের উদ্বেগ যথাযথ, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, এখানে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিকে অ-অভিবাসী মর্যাদা দেওয়ার কোনো বিধান নেই। এর মানে হলো, এই নতুন আইন কার্যকর হলে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া ভারতীয় শিশুদের নাগরিকত্ব পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
এদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যত পিতামাতারা অনলাইন গ্রুপে এই নির্দেশের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই জানতে চাচ্ছেন, যদি এই নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তাদের সন্তানরা কিভাবে নাগরিকত্ব পাবে এবং তাদের কি নতুন আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই নির্দেশের ফলে বিশেষ করে গ্রিন কার্ডের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা ভারতীয় অভিবাসীদের জন্য আরও জটিলতা সৃষ্টি হবে। বর্তমানে, ভারতীয়রা প্রতি বছর ৭২ শতাংশ এইচ-ওয়ানবি ভিসা পেয়ে থাকে এবং গ্রিন কার্ডের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করার ফলে তারা নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য অনেক বেশি সময় অপেক্ষা করছে।
অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত ভারতীয় চিকিৎসকরা, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়, তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরছেন। তারা বলছেন, যদি এই নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়, তবে তা তাদের কর্মজীবন এবং পরিবারের পরিকল্পনা বিপর্যস্ত করতে পারে।
এখন, ভারতীয় অভিবাসী পরিবারগুলো জানাতে চাইছে, তাদের সন্তানের জন্য কি নতুন আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, এবং আগামী দিনগুলোতে তাদের পরিবারে কি ধরনের প্রভাব পড়বে। ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ, যদি কার্যকর হয়, তা যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় অভিবাসী পরিবারের ভবিষ্যৎকে নতুন প্রশ্নের সম্মুখীন করবে।









