সাফে শিরোপাজয়ী বাংলাদেশ দলের ফুটবলারদের পদচারণায় বুধবার মুখরিত হয়ে উঠেছিল চ্যানেল আই প্রাঙ্গণ। কর্মচঞ্চল পরিবেশের মাঝে বইছিল লাল-সবুজের চ্যাম্পিয়ন হাওয়া। সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি নিয়ে হাজির ফুটবলকন্যাদের কলকাকলিতে উৎসবের রেণু ছড়িয়ে পড়েছিল। হরেক গল্পের আমেজ ঠাসবুননে যেমন গেঁথে গেছে নানান স্বপ্নের শতরঞ্জি, তেমনি ছড়িয়ে দিয়ে গেছে মেয়েদের ফুটবলার হওয়ার অনেক সংগ্রামী অমসৃণ গল্পও।
সকাল ১১টায় বাফুফের বাসে চড়ে চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে আসেন শিরোপাজয়ী বীরকন্যারা, তাদের ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নেয়া হয়। ছিল উপহার পর্ব, তারকা কথন অনুষ্ঠানে মনের দুয়ার খোলার পর্বও। চ্যানেল আইয়ের বার্তা বিভাগের প্রধান ও পরিচালক শাইখ সিরাজ সাফজয়ী ফুটবলারদের সাদরে বরণ করে নেন। অভিনন্দন জানিয়ে নারী ফুটবল নিয়ে দেন গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। রাখেন বিশেষ অনুরোধ।
‘আমি খুব সচেতন এবং সততার সাথে বলছি, আজকে আমাদের দেশে অনেক বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে। তারা অনেক সামাজিক কাজ করেন, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এমন কাজও আছে, যেখানে অপচয় হয়। কিন্তু যেখানে দেশটার নারী ফুটবল দল একটার পর একটা এত বড় অর্জন নিয়ে আসছে, আমাদের মনে হয়, কর্পোরেট যারা আছে, সবার একটু গভীর দৃষ্টি দেয়া দরকার। মহিলা ফুটবল দলকে যদি আমরা আরও এগিয়ে নিতে চাই বা এর স্থায়িত্ব বাড়াতে চাই, বাফুফে একা পারবে না। একটা দেশে নানা অঙ্গনে বাজেট থাকে। সরকার ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তো স্পোর্টসকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কতইবা দেবেন? এখানে কর্পোরেটদের অনেক বড় ভূমিকা আছে বলে আমি মনে করি। আমাদের কর্পোরেটরা যদি এগিয়ে আসে, এদের সফলতার ধারাবাহিকতাটাকে এগিয়ে নেন।’
‘এখন তো আমরা গর্ব করে বলতেই পারি, সাউথ ইস্ট এশিয়ায় আমাদের নারী ফুটবল দল যথেষ্ট একটা জায়গায় চলে গেছে। এটা যেন বৈশ্বিক অবস্থানে যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, ভারতের মতো একটা দলকে হারিয়ে এসেছে। এটা আরেকটা বড় বিষয়। সবার প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে, যে যার অঙ্গন থেকে আমরা পারি নারী ফুটবল দলের সাথে থাকা, এদেরকে মোটিভেট করা, ওদেরকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা। অনুশীলনের উপরে কিছু নাই। এরজন্য যে সময় ও ব্যয়, যে নিবেদন ও সামর্থ্য, অর্জন করাটা খুব দরকার। অর্থ সাহায্য থেকে শুরু করে সবকিছুই এখানে লাগবে।’
নিয়মিত ছেলেদের ফুটবল লিগ হলেও মাঠে গড়িয়েও যেন নারী ফুটবল লিগে একটা ভাটার টান থাকেই। একের পর এক সাফল্য এনে দিলেও ক্লাবগুলোর নারী দল গড়ায় রয়েছে উদাসীনতা। পৃষ্ঠপোষকতা থাকছে, সেটা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। চ্যাম্পিয়ন তারকা-কোচদের সঙ্গে কথন পর্বে শাইখ সিরাজ বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
‘পুরুষ ফুটবলের ঘরোয়া লিগ আছে। মহিলা লিগ আছে, কিন্তু সেটা প্রাণবন্ত না। জাতীয় দল থেকে বাদ পড়লে সে কিন্তু অস্তিত্বহীন। সেই অর্থে তার আর কোনকিছুই থাকছে না। নারী ফুটবল লিগটাকে যদি আরও শক্তিশালী করা যায়, ভালো হয়। কর্পোরেট হাউজগুলোর প্রতি অনুরোধ থাকবে, নারী ফুটবল দলকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সবার অবস্থান থেকে একটা পদক্ষেপ থাকাটা খুব দরকার।’
শ্বাসরুদ্ধকর পেনাল্টি শ্যুটআউটে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন মেয়েদের প্রশংসায় ভাসান চ্যানেল আইয়ের বার্তা প্রধান। তাদের অর্জনকে সমীহ করে স্মরণ করিয়ে দেন, ‘যেকোনো সাফল্যের পেছনে কিন্তু পেইনফুল যাত্রাগুলো থাকে। সাফল্যে যেতে হলে ঘাত-প্রতিঘাত আসবেই। সেই সাফল্যই তত বড় সাফল্য হয়, যেটা টিকে থাকে।’
‘আসলে ওদেরকে সংবর্ধনা জানালে ওরা কতটা সম্মানিত হয় জানি না। আমরা সম্মানিত হই সবচেয়ে বেশি। তাদের সাফল্যের কাজগুলোকে জাতির সামনে তুলে ধরার একটা প্ল্যাটফর্ম টেলিভিশন। অন্য মাধ্যমও আছে। আমরা আমাদের জায়গা থেকে মনে করি এটুকু সময় যেন ওদের জন্য দেয়া যায়, তাহলে পুরো জাতি দেখতে পায়। স্পন্সর আর কর্পোরেট হাউজগুলোর এগিয়ে আসাটা খুব দরকার। এটা ছাড়া আসলে একটা টিমকে চালানো কঠিন।’
‘নারী ফুটবলে আমরা একের পর এক চ্যাম্পিয়ন হচ্ছি। গর্বে বুকটা ভরে যায়। আমি মাঝেমধ্যে খুব বিস্মিত হই, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে, প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এরা উঠে আসছে। এদের জীবনকে বোঝার বয়সই তো হয়নি। আমরা বলি ১৮-তে পরিপক্ব হয়। আর তারা সেখানে খেলছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফিরে আসছে। এটা বিশাল ব্যাপার।’
‘চ্যানেল আইয়ের জায়গা থেকে আমরা বলতে পারি, এটা স্পোর্টস চ্যানেল না। আমাদের এটা জেনারেল এন্টারটেইনমেন্ট চ্যানেল। তারপর সবাই বলি হৃদয়ে বাংলাদেশ। আমাদের সেই দায়িত্বশীলতা থেকে সংবর্ধনার কাজ করি। তারা বেশি সম্মানিত হচ্ছে, জাতি হচ্ছে। ওদের গল্প শুনলে আমি বিস্মিত হই। মানুষের স্কিল কত, কোন পরিবার থেকে এসেছে, জীবন কতটা দেখেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভিন্ন দেশে অন্যদেশের বিপক্ষে খেলে দেশের জন্য শিরোপা জিতে এসেছে। স্যালুট, তোমাদের সবাইকে ধন্যবাদ।’









