ভারত কী করছে? কোথায় যেতে চায়? এসব প্রশ্ন ভারতীয়দের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বলা বাহুল্য, তবুও বাস্তবতার খাতিরে বলতে হয়, আগামী ১০ কি ১৫ বছরের মধ্যেই বিশ্ব-রাজনীতিতে ভারত এমন একটি শক্তিশালী অক্ষ হয়ে উঠবে যে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে দেশটিকে জায়গা না দিয়ে হয়তো উপায় থাকবে না বড় বড় মোড়লদের।
এটা বাইরে থেকে যেমন বোঝা যায়, ভারতের মধ্যে থেকে সম্ভবত আরও ভালো বোঝা যায়। ভারতীয় রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে এখন সেরকম একটা ভাবসাব চলে এসেছে। ভারতীয় রাজনীতিক ও কূটনীতিকরা এখন কথায় কথায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে এই আলাপ তুলতে ভুলেন না যে, অর্থনৈতিকভাবে ভারত এখন বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল রাষ্ট্র!
কথাটা ভুলও তো নয়। শুধু আয়তনে নয়, জনসংখ্যার হিসাবেও তো কথাটা সত্য। এতো বড় বাজার! যে কারণে বিশ্বের বড় বড় ব্যবসায়ীরা ভারতে অর্থ লগ্নি করার জন্য বসে আছেন। পাশাপাশি বহু-বৈচিত্র্যময় ভারত এমন এক পর্যটন শিল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যে, সারা বিশ্বকে সে আকৃষ্ট করে ফেলেছে এবং আয়ও করছে অভাবনীয়। বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের হিসাব মতে, ২০১৫ সালে ভারত এই খাতে ১২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে, যা দেশটির মোট জিডিপির ৬.৩%। শুধু কি তাই? প্রায় ৩৮ মিলিয়ন মানুষ এই খাতের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে, যেটা ভারতের মোট চাকুরিরত জনশক্তির ৮.৭%।

এছাড়া ভারতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আরও নানা কারণ তো আছেই। এই সমৃদ্ধিই ভারতকে গ্লোবাল ক্যাপিট্যালিস্ট ব্লকে শক্তিশালী করে তুলছে দিন দিন। সঙ্গে যোগ করতে হবে, ভারতের দীর্ঘদিনের দুই বন্ধু রাষ্ট্র ও দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া যদি নতুন বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নিজেদের ‘আদি ও অনন্ত’ বৈরি সম্পর্ক ভুলে বন্ধুত্ব গড়ে তো তৃতীয় রাষ্ট্র হিসেবে সবচেয়ে লাভবান যে ভারতই হবে, এতে কোন সন্দেহ নেই।
অন্য দিকে ভারত কিন্তু নিজেকে বাইরের দুনিয়ায় গ্রহণযোগ্য পরাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতেও বেশ পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে। সেটারই আভাস মিলছে প্রবাসী ভারতীয় দিবসে (পিবিডি)। ১৯১৫ সালের ৯ জানুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে মহাত্মা গান্ধী স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এই দিনটিকে স্মরণ করার জন্য ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর ৭-৯ জানুয়ারি এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এবার এর ১৫তম আয়োজন ছিল ব্যাঙ্গালোরে। নরেন্দ্র মোদীর সরকার অবশ্য দিবসটি এখন থেকে দু’ বছর অন্তর উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাতে সাড়া আরও বেশি মাত্রায় পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দিবসটি উদযাপিত হয় মূলত ভারতীয় যারা প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছেন ও ভারতীয় বংশোদ্ভুত যারা প্রবাসে জন্মেছেন, তাদের অংশগ্রহণে। নানা কারণেই হয়তো প্রথম প্রজন্ম দেশ ছেড়েছিলেন বা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। তার পর ধীরে ধীরে বংশবৃদ্ধি ঘটেছে বিদেশের মাটিতে। এভাবেই দুনিয়ায় অনাবাসিক ভারতীয় (Non-resident Indian) ও ভারতীয় বংশোদ্ভুত (Person of Indian Origin) প্রবাসীর সংখ্যা যে কোন দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ — ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, ডিসেম্বর ২০১৬ সালের হালনাগাদ হিসাব বলছে সংখ্যাটা প্রায় ৩১ মিলিয়ন। পৃথিবীতে মাত্র ৪২টি দেশের এর চেয়ে বেশি জনসংখ্যা আছে!
এর মধ্যে ১ কোটি ৮০ লক্ষ আছেন ভারতীয় বংশোদ্ভুত, যারা অন্য রাষ্ট্রের নাগরিক। অন্য রাষ্ট্রের পাসপোর্টধারী হওয়ায় ভারতীয় বংশোদ্ভুতদের ব্যাপারে রাষ্ট্রীয়ভাবে ভারতের এতোটা মনোযোগী না হলেও কিন্তু চলে। অথচ, ভারতীয় সরকার এদের ব্যাপারেও সমান মনোযোগী হতে চাইছে। প্রবাসে থাকা বা জন্ম নেওয়া এই জনশক্তিকে তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে কাজে লাগাতে চায়। এজন্য তাদের নানারকম সুযোগ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ভারত। সে লক্ষ্যে গত বছর দিল্লিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে প্রবাসী ভারতীয় কেন্দ্র। ২০০৬ সাল থেকে দেওয়া হচ্ছে ওভারসিস সিটিজেনশিপ অব ইন্ডিয়া (ওসিআই) পাসপোর্ট। যেটা দ্বৈত নাগরিকত্বের পরিচায়ক না হলেও, এই পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ভারতীয় বংশোদ্ভুতরা বিনা ভিসায় আজীবনের জন্য ভারত ভ্রমণ করতে পারবেন। ভারতীয় বংশোদ্ভুতরা যেন সংশ্লিষ্ট দেশে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারেন সেজন্য ভারতীয় দূতাবাসগুলোতেও বিশেষ শাখা চালু করে তাদের দেখভালের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মূলত, বহির্বিশ্বে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান জোরদার এবং নিজের কার্যসিদ্ধিতে এই জনশক্তিতে কাজে লাগানোর ব্যাপারে ভারত সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন ভারতীয় বংশোদ্ভুতরা। যেমন: সুরিনামের উপরাষ্ট্রপতি মাইকেল অশ্বিন সত্যেন্দ্র অধীন, পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী ড. অ্যান্তনিও কস্তা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশীয় বিষয়ক সদ্য সাবেক সহকারী সেক্রেটারি নিশা দেশাই বিশওয়াল প্রমুখ এবার এসেছিলেন অতিথি হয়ে। আছেন অনেক বড় বড় শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবদ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিবিধ পেশার ব্যক্তি। প্রতিবার প্রবাসী দিবসে এমন ৩০ জন ব্যক্তিকে সারা বিশ্বে তাদের বিভিন্ন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানিত করেন ভারতীয় রাষ্ট্রপতি। বলা বাহুল্য, নিজের প্রয়োজনে ভারত রাষ্ট্র এই ব্যক্তিদের কাছ থেকে তাদের সর্বোচ্চ প্রতিদান নেওয়ার চেষ্টা করবে। এটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।
একটা বিষয় স্পষ্ট, ভারত এদের মোটেও বোঝা মনে করে না। করলে প্রবাসী ভারতীয় দিবসের মাধ্যমে এই ব্যক্তিদের দেশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের এমন আনুষ্ঠানিক বন্দোবস্ত করত না। এরা বছরে বা দুই বছরে একবার দেশে ফিরে আসা মানে অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হওয়া। সঙ্গে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ঐক্যকে দৃঢ় করার সুযোগ তৈরির ব্যাপার তো আছেই। এজন্যই ভারত সরকার স্লোগান তুলেছে ‘You can take Indians out of India, but you cannot take India out of Indians.’
উনিশ শতকের মাঝামাঝি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘ম্যানিফেস্ট ডেসটিনি’র হাওয়া বইয়ে দিয়েছিলেন সাংবাদিক-সম্পাদক জন লুইস ও’সালিভান। ১৮৪৫ সালে তিনি তার লেখায় ‘ম্যানিফেস্ট ডেসটিনি’ ফ্রেইজটি ব্যবহার করেছিলেন। খোলা চোখে ফ্রেইজটি ভূখণ্ড একাত্মীকরণ ও বর্ধিতকরণকে ইঙ্গিত করলেও, নেটিভ আমেরিকানদের প্রতি নৃশংসতার সাফাই গাইলেও, মোটা দাগে এর মর্মার্থ আসলে এমন : যুক্তরাষ্ট্র শুধু একটি ভূখণ্ড (টেরিটোরি) নয়, একটি ধারণা (কনসেপ্ট)। আমাদের ভুলে যাওয়ার কথা নয়, ও’সালিভান এই ফ্রেইজটি কয়েন করার মাত্র ১০ বছর আগে, ১৮৩৫ সালে, থমাস বেবিংটন মেকওলে তার বিখ্যাত মিনিটে, রক্তে-মাংসে ভারতীয় কিন্তু মননে ইংরেজ মানুষ তৈরির কথা বলেছিলেন। মেকওলে সাহেবের কথার মর্মার্থও ওই : গ্রেট ব্রিটেন একটা কনসেপ্ট। এই ‘কনসেপ্ট’ ব্যাপারটা অতিঅবশ্যই আধিপত্যবাদী, কিন্তু মেকওলে বা ও’সালিভানের কথা তো আজও মিথ্যে হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রীয় চরিত্রের মধ্যেই সেই সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদী ধারণা বিরাজমান।
ভারত আজকে সেই কাজটিই করার চেষ্টা করছে। ভারত তার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের শক্তি দিয়ে বৈচিত্র্যময় এই বিশ্বের কাছে একটি ‘কনসেপ্ট’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ। হয়তো সময় লাগবে। তবে, ২০৫০ সালের মধ্যেই হয়তো এর পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখা যেতে পারে। এজন্যই ভারতের কাছে তার অনাবাসিক ও বিভিন্ন রাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া ভারতীয় বংশোদ্ভুতরা এতোটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত এদের বলতে চাইছি তার ‘দূত’।
নিজেদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও ভারত পরিবর্তন এনে ফেলেছে বেশ কয়েক বছর হলো। ভারতীয় রাজনীতিতে দল-মত নির্বিশেষে প্রায় সবাই-ই এখন অনেক স্থিতিশীল। গণতন্ত্রের সূত্র মেনে এখানেও ঠিকই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ হচ্ছে, সেটাই গণতন্ত্রের শক্তি; তবে, বহির্বিশ্বের সঙ্গে লেনাদেনার স্বার্থে এরা আগে দেশের স্বার্থ দেখে। বর্হিবিশ্বে ‘ভারত একটি কনসেপ্ট’ ফ্রেইজটি প্রতিষ্ঠিত করতে হলে, দেশের মধ্যে নিজের ‘ঐক্যবদ্ধ ভারত’ রূপটা সুসংহত করা প্রয়োজন। সেটা তারা পেরেছে। এক কালে, এই তো গত ৯০ দশকেই, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, নানা ইস্যুর কারণে অনেকেই মনে করেছিলেন, ভারত আরও ভাগ হবে। আজ সেই জুজু আর নেই। সেই জুজু আর ফিরবেও বলে মনে হয় না। বৃহত্তর ও ঐক্যবদ্ধ ভারতের সঙ্গে থাকার যে সুফল ‘কাশ্মির থেকে কন্যাকুমারী’ প্রতিটি অঞ্চলই ভোগ করছে, নিজেকে মূল ভারত-ভূমি থেকে আলাদা করে নিয়ে তারা সেই সুফল থেকে বঞ্চিত হতে চায় না। নিজের আলাদা ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বকীয়তাকে বজায় রেখেই তারা কেন্দ্রের সঙ্গে পা মেলাতে চায় এবং ‘ভারতীয় ধারণা’কে সাংস্কৃতিকভাবে আরও বিস্তৃত করতে চায়।
একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। দক্ষিণ ভারতের কথাই ধরুন। একদম আলাদা করে এদের চেনা যায়। ‘দক্ষিণ ভারত’ টার্মটা সমগ্র ভারতে যেভাবে প্রচলিত, মনে হয় না আর কোন অঞ্চল এমন সামগ্রিকতা নিয়ে হাজির হতে পেরেছে। দক্ষিণ ভারতে সবকিছুই যেন ভারতের বাকি অঞ্চলের চেয়ে উল্টো! যেমন : বলা হয়ে থাকে ভারত হলো রামভূমি। অথচ এখানে রাম নয়, পূজ্য হলেন রাবণ! এদের, বিশেষত আদিবাসীদের, শারীরিক গড়ন ও গঠনও অনেকটাই ‘রাবণীয়’! পিবিডি কনফারেন্সের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেখলাম, বিভিন্ন মন্দিরে দেখলাম, রাবণকে এরা উচ্চাসনে বসিয়ে রেখেছে। এদের রাবণ-বন্দনা দেখে আমার মাইকেল মধুসূদন দত্তের মহাকাব্যের কথা মনে পড়ে যায়। আজ থেকে ১৯৩ বছর আগে জন্মানো বাঙালি কবিও যে ‘মেঘনাদবধকাব্যে’ রাবনপক্ষকে নায়ক, রামপক্ষকে খলনায়ক বানিয়ে দিয়েছিলেন, এটা কি এরা জানে? জানলে হয়তো ‘মেঘনাদবধকাব্য’ আর যশোরের দত্ত বাবুকে এরা মাথায় তুলে রাখতে পারে! অবশ্য, দু’জন বাঙালি সাহিত্যিককে ভারতীয়রা তো মাথার মুকুট বানিয়েছেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগণমন’ আর বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেশগান ‘বন্দে মাতরম’ ছাড়া তো এদের কোন অনুষ্ঠানই শুরু হয় না!
(চলবে …)
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)









