অনেকরাতে ঘুম ভেঙে গেলে টের পাই আমার মাথার কাছে মা বসে আছেন। কপালে জলপট্টি দিয়ে মা আমার মাথা টিপে দিচ্ছেন। মা’র মুখটা শুকনো। ঠোঁট শুকিয়ে চৌচির। আমি চোখ তুলে মাকে দেখি। মা আমার মাথায় হাত দিয়ে চুপ করে বসে আছেন। কোন কথা বলছেন না। মা রেগে গেলে কথা বলেন না। চুপ থাকেন।
তুমি কখন এলে!
আমি ছল করার চেষ্টা করি যাতে মা’র মেজাজটা গলে যায়। ওমা ! তাতে কোন কাজ হয় না। মা আগের মত রাগ-রাগ মুখ করে জলপট্টিটাকে নতুন করে ভিজিয়ে আমার কপালে চেপে ধরলেন। আমার শরীরের জ্বর তখন আমাকে গেছো সাপের মত আরও বেশি করে পেঁচিয়ে থাকে। আমার সারা শরীর টগবগ করে ফুটছে।
মা আমার দিকে যেন ক্যামন করে তাকান কোন কারণ ছাড়া। আমার ভেতরটা খা-খা করতে থাকে।
কখন থেকে জ্বর বাঁধিয়েছিস ? রাগ মেশানো গলায় মা বললেন।
মা’র কথায় আমি কী বলবো! জ্বরটাকে তো আমি আমার শরীরে নিজে থেকে বাঁধাই নি। জ্বরটাই যে গায়ে পড়ে আমার শরীরে এসে হুড়মুড় করে এসে বাঁধা পড়েছে সেটা মাকে বোঝাই কী করে!
দুপুরের পর থেকে বলে আমি মাথাটাকে মা’র নিকটবর্তী করি।
আহ ! মা’র শরীরের ঘ্রাণ কী সুন্দর ! গত মাসে বাবা আমার জন্য ফ্রান্স থেকে পৃথিবীর সেরা পারফিউম এনে দিয়ে বলেছিলেন, খোকা এটা হল নাম্বার ওয়ান পারফিউম ইন ইউনিভার্স, বুঝলি ? এর দাম কত জানিস ? আটানব্বই ইউরো বলে বাবা হো হো করে হেসে উঠেছিলেন।
আমি চোখ বন্ধ করে নাক টেনে মা’র শরীরের ঘ্রাণ চেটে পুটে নিতে থাকি। মা আমার মাথায় বিলি কেটে দিতে দিতে বললেন,
তোর বাপ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় নি ?
ছোট মেয়েরা রেগে গেলে যেমন গাল ফুলিয়ে, চোখ রাঙিয়ে কথা বলে আমার মাও তেমনি আমার সঙ্গে কথা বলে উঠলেন। আমি মা’র কথা শুনে চুপ করে শুয়ে শুয়ে পৃথিবীর নাম্বার ওয়ান পারফিউমের চেয়েও বেশি সেরা ঘ্রাণ নিতে থাকি। বিনে পয়সায়।
কিরে কথা বলছিস না কেন? তোর বাপকে ডাক্তারের কথা বলিস নি?
না, অস্ফূট স্বরে জবাব দিয়ে আমি অন্ধকারে মাকে দেখতে থাকি। জানালা দিয়ে বাইরের ছিটেফোটা আলো এসে পড়েছে ঘরে। ছোপ ছোপ ডোরাকাটা শাড়ি । কুচি দেয়া ফুল তোলা লম্বা হাতার ব্লাউজ। পাকা পেঁপের মত মা’র গায়ের রং ছাপিয়ে ঘরের ভেতর এসে পড়ছে বাইরের আলো। আমি অন্ধকারে শুয়ে সেই আলোর টের পাই। ঘরের ভেতর আলোর বন্যা। ঘ্রাণের বন্যা। জ্বরের বন্যা।
কেন তোর বাপকে জ্বরের কথা বলিস নি ?
বাবা সারাদিন কতো ব্যস্ত থাকে। তুমি দেখো না !
তাই বলে তুই জ্বরের কথা তোর বাপকে বলবি না? বলে মা আমার মাথাটাকে কোলে টেনে নিলেন । আমার জ্বর তখন আহ্লাদ পেয়ে ওপরের দিকে উঠতে থাকে।
তোর বাপ যত ব্যস্ত থাকুক তাতে কী? তুই তোর কথা তোর বাপকে বলবি না এটা ক্যামন ? বলে মা আমার বিছানার কাছে চুপচাপ বসে থাকেন। বসে থাকেন তো বসেই থাকেন। চুপচাপ।
আমিও আমার ঘরে মা’র মত চুপচাপ বসে থাকি। কোন কথা বলি না। কী কথা বলবো ? বাবা প্রতিদিন সকালবেলা অফিসে যাবার সময় আমার ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে শার্টের হাতা ঠিক করতে করতে বলেন,
রুমি , নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখো।কেউ এসে তোমাকে হাত ধরে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে দেবে না, বুঝলে ?
আমি বুঝি না, জানি না কীভাবে নিজের পায়ে নিজেকে একা একা দাঁড়ানো শিখতে হয় । বাবা তার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কথা বলতে গিয়ে মাঝে মধ্যে রুমিকে বলেন, তোর দাদা আমাকে হাতে ধরে ধরে সবকিছু শিখিয়ে দিয়েছেন। তোর দাদা না থাকলে একা একা আমি কোনকিছুই করতে পারতাম না রে রুমি। আমার সবকিছু তোর দাদু করে দিয়েছেন। আমি তখন ভাবি আমার দাদু যদি বাবাকে সবকিছু শিখিয়ে দিতে পারেন তাহলে বাবা কেনো আমাকে শেখাবেন না ? বাবা তাহলে কেনো আমাকে বলেন, রুমি কেউ এসে তোমাকে হাত ধরে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে দেবে না। তোমার কাজ তোমাকেই করতে হবে।
আমি মাকে বললাম,
মা, বাবা সবসময় আমাকে এই কথা বলে কেনো, কেউ এসে হাত ধরে নিজের পায়ে তোমাকে দাঁড় করিয়ে দেবে না। অথচ দেখো বাবাই আবার বলেন, তোর দাদু না থাকলে আমি একা একা কিছুই করতে পারতাম না রে রুমি। বলো মা, আমি কী আমার বাবার ছেলে না!
আমার কথা শুনে মা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
আমি তার কী জানি!
তুমি না জানলে কে জানবে ?
আমার কথার কোন জবাব না দিয়ে মা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। যাবার সময় মা’র শরীরের ধাক্কা লেগে দরজার পর্দাগুলো কেঁপে কেঁপে উঠল । আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে পর্দা কাঁপিয়ে মা’র চলে যাওয়া দেখি।

দুই
আমার মা মাঝে মধ্যে ঘুমের ভেতর এসে আমার সঙ্গে দেখা করেন। কথা বলেন । কতোদিন হয়ে গেল মা’র দেখা পাই না। আমার যখন জ্বর আসে তখন মা’র দেখা মেলে। জ্বরের মধ্যে আবোল-তাবোল বকতে থাকলে মা আমার মাথায় হাত রেখে কত কথা যে বলেন!
সন্ধ্যা হয়ে এল। আমাদের পাশে কাজলদের বাড়ি। কাজলদের মাধবীলতার ঝাড় থেকে একটা তীব্র ঘ্রাণ এসে আমার নাকে লাগে। আমার মা কাজলদের মাধবীলতার গন্ধ খুব পছন্দ করতেন । প্রায় সন্ধ্যায় মা কাজলের বোন সরলাকে বলতেন,
তর বাপ যে কোত্থেকে গন্ধ-পাগল করা এই গাছ আমদানী করল!
সরলা তখন উল্টো মাকে বলত, কেন মাসি, তোমার বুঝি মাধবীলতা খুব পছন্দ !
পছন্দ মানে ! এর ওপর কী কোন ফুল হয় ! সন্ধ্যের পর এই ফুল যখন গন্ধ দেয় তখন আমার মাথার ভেতরটা কেমন খালি হয়ে যায়।
আমার মা’র কথা শুনে সরলা তো ভীষণ অবাক ! বলে কী সুরাইয়া মাসী !
তিন
মাধবীলতার গন্ধ আস্তে আস্তে আমার মাথার ভেতর ঢুকতে থাকে। আমার মাথার ভেতরটা খালি হতে থাকে। শিকার পেলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার যেমন শিকারের পিছু ছুটতে থাকে জ্বরও আমার পিছু নিতে থাকে অতি দ্রুত। আমার সেদিকে কোন খেয়াল থাকে না । আমার নাকে কেবল মাধবীলতার গন্ধটা লেগে থাকে।
কী অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ !









