চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘১৯৫১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন হতো ১১ মার্চ’

গবেষণামূলক ও সাক্ষাতকারভিত্তিক গ্রন্থ ‘ভাষা সংগ্রামীর বাংলাদেশ’ থেকে সংক্ষেপিত

ভাষা সংগ্রামী আব্দুল গফুর। ১৯২৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাজবাড়ী (তৎকারীন ফরিদপুর) জেলার চাঁদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আলহাজ মোঃ হাবিব উদ্দিন। আব্দুল গফুর তমদ্দুন মজলিশের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনে জড়িত হন। সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকার সহকারী সম্পাদক থেকে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছন তিনি। ’৬০এর দশকে কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি আবার সাংবাদিকতা পেশায় ফিরে আসেন। সর্বশেষ দৈনিক ইনকিলাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বিজ্ঞাপন

২০০৬ সালের ৩ জানুয়ারি ভাষা সংগ্রামী আব্দুল গফুরের সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন তারিকুল ইসলাম মাসুম

তা. ই মাসুম: ভাষা আন্দোলনে আপনার অংশগ্রহণ বিষয়ে জানতে চাই।
আব্দুল গফুর: ভাষা আন্দোলনের তাত্ত্বিক সূত্রপাত করেছিল তৎকালীন সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিশ। আমি তমদ্দুন মজলিশ প্রতিষ্ঠার এক বছর পরে এর সাথে যুক্ত হই। তমদ্দুন মজলিশ প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর। ব্যাপার হলো এই যে, ভাষা আন্দোলনের প্রশ্নটা উঠল কেন? এটা আমাদের বুঝতে হবে।

প্রশ্নটা উঠল এই জন্য যে, পাশাপাশি দুইটা রাষ্ট্র ভারত আর পাকিস্তান। ভারতে হিন্দি রাষ্ট্রভাষা হবে। তাহলে পাকিস্তানে কী হবে? উর্দুর কথা হচ্ছিল, বাংলার কথা হচ্ছিল। এটা নিয়ে বিতর্কও হচ্ছিল। এই অবস্থায় কোনো সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই পাকিস্তান হয়। স্বাভাবিকভাবেই এ প্রশ্নটা উঠে রাষ্ট্রভাষাও দুটো হতে পারে। কারণ অধিকাংশ লোকের মাতৃভাষা যদি বাংলা হয় সেটাকে বাদ দিয়ে তো অন্যকিছু হতে পারে না। সে হিন্দির বদলে উর্দুর যতই মায়া মমতা থাক।

এর ভেতর থেকে দেখা গেল কী? কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। গভর্নমেন্টের পক্ষ থেকে এর ভেতরে পোস্ট কার্ড বেরিয়ে গেল, পোস্ট কার্ডে ইংরেজির সাথে উর্দু, বাংলা নাই। অথচ ব্রিটিশ আমলেও পোস্ট কার্ডে বাংলা ছিল। ইনভেলাপে বাংলা ছিল। বাংলা আর ইংরেজি ছিল এই বাংলাদেশে। কিন্তু ওখানে দেখা গেল যে, শুধু ইংরেজি আর উর্দু। পোস্ট কার্ডে, মানি অর্ডার ফরমে, ইনভেলাপে এই সব জায়গায়।

এটা অনেকে খেয়াল করে নাই, কিন্তু তমদ্দুন মজলিশের যে ফাউন্ডার ছিলেন প্রফেসর আবুল কাশেম এবং তার যারা সহযোগী ছিলেন। তার সহযোগীদের ভেতরে ছিলেন, আওয়ামী লীগের নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, উনিও ছিলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ওয়াজ ওয়ান অব দ্য ফাউন্ডার মেম্বার অব তমদ্দুন মজলিশ। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ঐ যে, মুজিব নগর গভর্নমেন্টের অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

উনি তার পরে শামসুল আলম, আরো একজন ছিলেন তিনিও আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত ছিলেন উনি এখন বেঁচে আছেন কিনা আমি বলতে পারছি না। ফজলুর রহমান ভূঁইয়া উনি ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের টিকেটে এমপি হয়েছিলেন। এরা তিন জন এবং আবুল কাশেম সাহেব এরাই ছিলে ফাউন্ডার তমদ্দুন মজলিশের। এরা দেখলেন যে বাংলাটাকে পাশ কাটিয়ে উর্দু প্রতিষ্ঠার একটা চক্রান্ত চলছে। তখনই তারা চিন্তা করলেন, এটা তো ঠিক হবে না। আমাদের জন্য খুব ক্ষতিকর হবে। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য। তখন ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরেই মানে, অর্গানাইজেশনটা প্রতিষ্ঠার ২ সপ্তাহের মধ্যে একটা বই বের করলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ নামে। তাতে তিন জনের আর্টিকেল ছিল।

একটা ফাউন্ডর সেক্রেটারি আবুল কাশেম সাহেবের ছিল। আরেকটা ছিল ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেনের। আরেকটা ছিল বিখ্যাত সাহিত্যিক সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমেদ, তার। এই তিনটা আর্টিকেলের একটা পুস্তিকা বের করলেন, তাতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করলে যে কী ক্ষতি হবে সেই সমস্ত জিনিস তুলে ধরা হলো। এবং বাংলা ভাষা আন্দোলনে সকলেই যাতে দলমত নির্বিশেষে এগিয়ে আসে, সে আহ্বান জানানো হলো। এবং ১৯৪৭ সালেই প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদও গঠন করা হয় তমদ্দুন মজলিশের পক্ষ থেকে। তার কনভেনার ছিলেন ঢাকা ইউনিভার্সিটির কেমিস্ট্রি বিভাগের লেকচারার নূরুল হক ভুঁইয়া। উনি পরে ইন্তেকাল করেছেন।

আর দ্বিতীয়টার কনভেনার ছিলেন শামসুল আলম। যিনি একই সাথে তমদ্দুন মজলিশের মেম্বার ছিলেন, মুসলিম ছাত্রলীগেরও মেম্বার ছিলেন। এবং এই দ্বিতীয়টার উদ্যোগেই ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ প্রথম বাংলা ভাষার দাবিতে হরতাল ডাকা হয় সারা পূর্ব পাকিস্তানে। এবং হরতাল সফল হয়। ১১ মার্চের আন্দোলন এত তীব্র আকার ধারণ করে যে, তাতে সেক্রেটারিয়েট অচল হয়ে যায়। সমস্ত কিছু অচল হয়ে যায়। তবে গুলি-গোলা বা খুনা-খুনি হয় নাই। কিন্তু লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস চার্জ এগুলো হয়েছে। ঐ আন্দোলনটায় তখন (খাজা নাজিমুদ্দিন) ভয় পেয়ে যায়। খাজা নাজিম উদ্দিন ছিলেন তখন চিফ মিনিস্টার। উনি ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি, তখন শেখ মুজিব কিন্তু অ্যারেস্ট হয় ঐ ১১ মার্চের আন্দোলনে। শেখ মুজিব কিন্তু ’৫২ সালের আন্দোলনে, তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল না।

কিন্ত ’৪৮ সালের আন্দোলনে হি হ্যাজ অ্যাক্টিভ রোল। উনি অ্যারেস্ট হন তারপরে কাশেম সাহেব আহত হন। তারপরে আরো অনেক অ্যারেস্ট ও আহত হয়। তারপরে তমুদ্দিন মজলিশ তো প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর। আর ১৯৪৮ সালের ফোর্থ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা হয় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। আজকে যেটা ছাত্রলীগ নামে পরিচিত। ওটাই হয় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নামে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি, নঈমুদ্দীন তার সভাপতি।

’৪৭ সালের আন্দোলন শুধু তমদ্দুন মজলিশ একা করেছে। আর ’৪৮ সালের আন্দোলন মুসলিম ছাত্রলীগ তমদ্দুন মজলিশ যৌথভাবে করেছে। আর তখন যে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ দ্বিতীয়টা হলো সেটার কনভেনার হলেন শামসুল আলম। তিনি একই সাথে তমদ্দুন মজলিশের মেম্বার ছিলেন, ছাত্রলীগেরও মেম্বার ছিলেন।

’৪৭ সালের আরো কিছু বলা দরকার আছে, কারণ ’৪৭ এ যে শুধু রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছে তা নয়, ওখানে অনেকগুলো মিটিংও হয়। তখন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে, এখন যেটা মেডিকেল কলেজ ইমার্জেন্সি ওখানে ছিল তখন ইউনিভার্সিটি। সেখানে মিটিং হয়, প্রতিবাদ সভা হয় বেশ কতগুলো। ফজলুল হক হলে মিটিং হয়। এমনকি তখন নূরুল আমিনও দেখা গেছে, রাষ্ট্রভাষার পক্ষে কথা বলেছে। তখন উনি মন্ত্রী, বোধ হয় সিভিল সার্ভেন্ট মন্ত্রী।

যাইহোক পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন যখন হয় তখন কিন্তু বাংলাদেশ বা তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে কোনো পত্রিকা, ঠিক লং টার্মের বা দীর্ঘজীবী কোনো পত্রিকা ছিলা না ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে। দৈনিক আজাদ পত্রিকা কলকাতা থেকে বের হতো, তখনও ঢাকায় আসে নাই। আর দৈনিক আজাদ একটু মুসলিম লীগ মাইন্ডেড ছিল বলে এ আন্দোলনকে তারা কখনো সমর্থন করতো, আবার কখনো সমর্থন করতো না।

দৈনিক ইত্তেহাদ যেটা বের হতো আবুল মনসুর আহমেদের সম্পাদনায় সেটাও কলকাতা থেকে বের হতো। ইত্তেহাদ তো আর আসে নাই এদিকে, আজাদ প্রায় ২ বছর পরে আসে। ’৪৮ সালের ১১ মার্চ এই আন্দোলনটা হয় তখন একটা ব্যাপার ঘটেছিল। আমি তখন তমদ্দুন মজলিশের সঙ্গে কেবল সম্পৃক্ত হচ্ছি। কাশেম সাহেবের সাথে আমার পরিচয় আগেই হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। কিন্তু তখনও আমি জয়েন করি নাই। ইতোমধ্যে তমদ্দুন মজলিশের আরেকজন নেতা শাহেদ আলী, বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক শাহেদ আলী। তার গল্প পড়তাম আগে। তার বেশ ভক্ত ছিলাম গল্প পড়ে। ওনার সাথে বেশ সম্পর্ক হলো। উনি তখন সিলেট থেকে এসেছেন এমএ পড়তে ঢাকায়। তিনি কাশেম সাহেবের বাসায় উঠেছেন। কাশেম সাহেবের বাসা ছিল ১৯ নম্বর আজিমপুর রোড।ভার্চুয়ালি ঐটাই ছিল তমদ্দুন মজলিশের হেড কোয়ার্টার। এবং ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার বলতেও ঐটাই বোঝায়। ওখানে যেয়ে আবার কাশেম সাহেবের সাথে নতুন করে পরিচয় হলো। কোন সময় যে শাহেদ আলীর প্রভাবে আমি ভাষা আন্দোলন, তমদ্দুন মজলিশ সবকিছুর ভেতরে ঢুকে পড়েছি এটা অনেকটা নিজেও টের পাইনি।

সে যাই হোক, ’৪৮ সালে আন্দোলনের সময় অনুভব করা গেল, ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে পত্রিকা দরকার। এর আগে ঐ আজাদের কথা বললাম, আর এখান থেকে দুটো স্বল্পায়ু পত্রিকা বেরিয়েছিল। সাপ্তাহিক ইনসাফ, আরেকটা হলো সাপ্তাহিক ইনসান। এ পত্রিকাটা বের করেছিলেন আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী নামে এক ভদ্রলোক। উনি কলকাতা মেডিকেল কলেজে পড়তেন, পার্টিশনের পর ঢাকায় চলে আসেন। আর মেডিকেলে পড়া হয় নাই। উনি পত্রিকা বের করেছিলেন। পরবর্তীকালে উনি মারা যান। তো ঐ পত্রিকাটা বের করার অল্প কিছু দিন পরেই আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী মারা যান। সাপ্তাহিক ইনসাফ এবং সাপ্তাহিক ইনসান।

এইটা বলছি এই জন্য যে, একটা নিজস্ব পত্রিকার অভাব সকলেই অনুভব করতে লাগলেন। তখনই ১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর বের হলো বিখ্যাত পত্রিকা ভাষা আন্দোলনের সাপ্তাহিক সৈনিক নামে তমদ্দুন মজলিশের পক্ষ থেকে। এটার প্রিন্টার পাবলিশার ছিলেন প্রফেসর আবুল কাশেম, আর প্রধান সম্পাদক ছিলেন শাহেদ আলী। আর অন্যতম সম্পাদক ছিলেন এনামুল হক। উনি এখনো বেঁচে আছেন, উনি থাকেন বোধ হয় উত্তরাতে। ঐ যে রেডিও এবং টেলিভিশনের ডিরেক্টর জেনারেল হইছিলেন এনামুল হক বাংলাদেশ হওয়ার পরে, উনি ছিলেন অন্যতম সম্পাদক আর আমি, সানাউল্লাহ নূরী এরা ছিলাম সহকারী সম্পাদক। সানাউল্লাহ নূরী, আমি, আর দৈনিক বাংলায় মোস্তফা কামাল বলে এক ভদ্রলোক। এখনো বেঁচে আছেন। উনি দৈনিক বাংলায় ছিলেন এসিস্ট্যান্ট এডিটর। আমরা এই তিন জন ছিলাম এসিস্ট্যান্ট এডিটর।

’৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর পত্রিকাটি বের হলো। মালিক-শ্রমিকদের ভেতরের বিভিন্ন দল, আরো অনেকে মিলে সকলেই সমর্থন দিল। তাদের সমর্থনে ১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর এ পত্রিকাটা বের হলো। এর একটা অফিস ছিল ৪৮ নম্বর কাপ্তান বাজার আর আরেকটা অফিস ছিল ১৯ নাম্বার আজিমপুর। বিভিন্ন প্রেসে ছাপা হতো। পরের দিকে বছর দুয়েক পরে নিজেদের একটা প্রেস হয়।

তো, ’৪৮ সালের যে ভাষা আন্দোলন, সেই ভাষা আন্দোলনের সময় এমন ভয় পেয়ে যায় খাজা নাজিম উদ্দিন। হি ওয়াজ দ্য চিফ মিনিস্টার। যখন দেখলেন যে একেবারে অচলাবস্থা, ১১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত প্রত্যেক দিনই একেবারে বিরাট আন্দোলন হচ্ছে। তখন সেক্রেটারিয়েটটার কোনো ঘেরাও ছিল না। কাঁটাতারের বেড়া ছিল। আমরা কাঁটাতারের বেড়া ডিঙ্গিয়ে অনেকবার ঢুকছি। ঢুকে যাকে সামনে পাইছি তার কাছ থেকে ওয়াদা আদায় করছি যে, বাংলা ভাষাকে সমর্থন করতে হবে। মন্ত্রী পইলে মন্ত্রী, কোনো সেক্রেটারি পাইলে সেক্রেটারি। এরকমভাবে আদায় করা হইছে। তো এইভাবে আমি তমদ্দুন মজলিশের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হই।

এবং ১৯৪৮ সালে যে পত্রিকাটা (সাপ্তাহিক সৈনিক) বের হলো সেই পত্রিকায় রেগুলার সাংবাদিক হিসেবে কাজ করি। ঐ বছরই আন্দোলন হওয়ার কয়েকদিন পরই কিন্তু পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, উনি ঢাকায় আসেন।

তা. ই. মাসুম: উনি কবে আসলেন?আব্দুল গফুর: উনি আসলেন ১৯ মার্চ ’৪৮।

তা. ই. মাসুম: ১১ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত এক বড় আন্দোলন হওয়ার তিন দিন পরে উনি ১৯ মার্চ আসলেন?
আব্দুল গফুর: ১৫ মার্চে নাজিম উদ্দিন ভয় পেয়ে, যে কথাটি বলা হয়নি, সমস্ত দাবি দাওয়া মেনে নিয়ে চুক্তি সম্পাদন করলেন। চুক্তি স্বাক্ষর করলেন নাজিম উদ্দিন ১৫ মার্চ। এবং চুক্তি স্বাক্ষরের অন্যতম শর্ত ছিল, যাদেরকে জেলে নেওয়া হয়েছে তাদের সেই দিনের মধ্যে মুক্তি দেওয়া হবে। এবং সেই দিনের ভেতরেই তাদেরকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তি দেওয়া হলো। এবং বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা করা হবে এবং পশ্চিম পাকিস্তানে অর্থাৎ পুরো পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সুপারিশ করা হবে। এইসব ওয়াদা দেওয়া হলো।

এখন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সাহেব আসলেন ১৯ মার্চ। এসে ২১ মার্চ উনি এই ঘোড়দৌড় ময়দান (রেসকোর্স ময়দান) যেটা বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঐ গাছগুলো তখন ছিল না। সেই ঘোড়দৌড় মাঠে উনি একটা বিশাল জনসভায় ভাষণ দিলেন। সে বক্তৃতাতে, ওনাকে নাজিম উদ্দিন যা বুঝিয়েছে উনি তাই বুঝেছেন, উনি বললেন, উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে। কেউ কেউ প্রতিবাদ করলেন তার। কিন্তু এত বিশাল জনসভা চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কেউ প্রতিবাদ করে বা কি করছে সেটা হয়তো উনি (জিন্নাহ) টেরও পান নাই।

এরপরে ২৪ মার্চ একটা স্পেশাল কনভোকেশন হল কার্জন হলে ঢাকা বিশ্ববদ্যালয়ের। ঐ কনভোকেশনে আবারও উনি একই কথা উচ্চারণ করলেন। তখন ছাত্রদের ভেতর থেকে অনেকে, যারা উপস্থিত ছিল কেউ কেউ এর প্রতিবাদ করল। যেমন, নঈমুদ্দীন প্রতিবাদ করছেন, আব্দুল মতিন সাহেব বোধ হয় প্রতিবাদ করেছন, এই রকম আরো কেউ কেউে প্রতিবদ করছে।

তা. ই. মাসুম: নঈমুদ্দীন সাহেব কি আছেন?
আব্দুল গফুর: না, মারা গেছেন। নঈমুদ্দীন ছিলেন ফাস্ট কনভেনার ছাত্রলীগের। যেহেতু একটা হলের ভেতর থেকে প্রতিবাদ উঠেছে। যে ছাত্ররা গতকাল পর্যন্ত ছিল কায়েদে আযমের অন্ধ সমর্থক, পাকিস্তান আন্দোলন করেছে। সেই তারা তার মুখের ওপর প্রতিবাদ করবে, এটা তিনি কল্পনা করতে পারেন নাই। উনি কিছুক্ষণ চুপ করে শুনেছেন, আমি তো ওখানে ছিলাম না, কারণ আমি তখনও গ্র্যাজুয়েট হই নাই। শুনেছি। তো, তারপরে তিনি থেমে থেমে বক্তৃতা শর্ট করে উনি চলে গেলেন।

এরপরে উনি এই সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সঙ্গে কয়েকদফা বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে ওনার যুক্তি উনি দিলেন। সংগ্রাম পরিষদের নেতারা তাদের যুক্তি দিলেন। এটা এক ধরনের ফেইলিওর বলা চলে। এটা আর কিছু হল না। এরপরে নাজিম উদ্দিন করলেন কি, কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ চলে যাওয়ার পর। উনি (নাজিমুদ্দিন) বলতে লাগলেন, জিন্নাহ সাহেব হলেন আমাদের সকলের নেতা, উনি যেটা বলে গেছেন তার বিরুদ্ধে আমি যেতে পারব না। এই, এরপর জিনিসটা ধীরে ধীরে ধামাচাপা পড়ে গেল।

কারণ অলি আহাদ সাহেবও তখন, বলতে স্বীকার করলেন, ওনার (জিন্নাহর) এত ব্যাপক জনপ্রিয়তা তখন, তখন তার বক্তব্যের বিরুদ্ধে সরাসরি একটা আন্দোলন শুরু করা এটা সেই সময় কঠিন ছিল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রত্যেকের মনের ভেতরে একটা ক্ষোভ। ছাই চাপা ক্ষোভ চলতে লাগল। তো সেটা, পরবর্তীকালে একটা সুযোগ আসার অপেক্ষায় ছিল। এর ভেতরে কী করল! পাকিস্তানের শাসকরা, তারা একটা উদ্যোগ নিল যে, বাংলা ভাষার হরফ বদলাবে। এটাকে উর্দু হরফ করতে হবে। এই কথা যখন আসল তার বিরুদ্ধে তমদ্দুন মজলিশ প্রতিবাদ করল।

ফজুলল হক হলে একটা মিটিং হলো। সেই মিটিংএ আমি একটা প্রবন্ধ পড়লাম। বাংলা একাডেমির বইতে সেটা প্রকাশও হয়েছে। বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে শয়তানী চক্রান্ত আমরা বরদাশত করব না। সৈনিকে পরবর্তীকালে বেরিয়েছে। বাংলা একাডেমি থেকে একটা বইও বেরিয়েছে। ছাত্রলীগ এবং অন্যান্য অর্গানাইজশেনও এর প্রতিবাদ করেছে। তো, চারদিকে যখন প্রতিবাদ উঠল তখন গভর্নমেন্ট এটায় পিছুটান দিল। চুপচাপ হয়ে গেল।তা. ই. মাসুম: স্যার, এটা কি ’৪৮ এরপরে?
আব্দুল গফুর: ’৪৮ এরপরে, এটা ’৪৯-’৫০ এই সময়ে। এর মধ্যে কিন্তু আরো কিছু কিছু অর্গানাইজেশন ভাষা আন্দোলনের সমর্থক জন্ম নিচ্ছে। যেমন ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ জন্ম হল। তারা তো অনেকেই ছাত্রলীগের, যারা একটু পরিণত বয়সের হয়েছে তারা। ওখানে মওলানা ভাসানীকে সভাপতি করে আতাউর রহমানকে সহ-সভাপতি, আর শামসুল আলমকে (শামসুল হককে) সেক্রেটারি আর শেখ মুজিবুর রহমান আর খন্দকার মোশতাককে জয়েন্ট সেক্রেটারি আর ইয়ার মোহাম্মদ খানকে ট্রেজারার করে আওয়ামী মুসলিম লীগের একটা কমিটি ফর্ম করা হয়। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, তারা তো অতীতেও ভাষা আন্দোলনে ছিল, তারাও ভাষা আন্দোলনে অ্যাক্টিভ হলো।

এরপর ১৯৫১ সালেই বোধ হয় আরো দুইটা অর্গানাইজেশন পরপর জন্ম নিল। তার একটা হলো যুবলীগ। যেটার সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন অলি আহাদ সাহেব তখন। আর প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আলী, আসামের মাহমুদ আলী। উনি এখন পাকিস্তানে, উনি এখনো বেঁচে আছেন। ওরাও ভাষা আন্দোলনকে সমর্থন করল। একটু বাম ঘেঁষা ছিল অর্গানাইজেশনটা। বাম ঘেঁষা হলেও তাদের ভেতরে কেউ কেউ জাতীয়তাবাদীও ছিল, আবার কেউ কেউ বাম ঘেঁষা ছিল। তোয়াহা সাহেব ছিলেন ওর ভেতরে, আরো অনেকে ছিলেন।

আবার এর পরপর একটা ছোট্ট অর্গানাইজেশন অল্প কিছুদিনের জন্য জন্ম নিয়েছিল। সেটার নাম ইসলামিক ব্রাদারহুড। তার ভিতরে ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমেদ ছিলেন, ইব্রাহিম তাহা ছিলেন, এইরকম কয়েকজন ছিলেন। এরাও ইসলামিক অর্গানাইজেশন হলেও ভাষা আন্দোলনকে সমর্থন করেছিল। এই ১৯৪৮ থেকে ’৫১ পর্যন্ত প্রত্যেক বছরই রাষ্ট্রভাষা দিবস পালিত হতো ১১ মার্চ। কারণ, তখন পর্যন্ত ১১ মার্চ হলো আমাদের সবচাইতে বড় প্রাপ্তি। ওটা রাষ্ট্রভাষা দিবস হিসেবে পালিত হতো ১৯৫১ পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপন

৫২ সালে কী হলো? এর ভিতের কায়েদে আযম মারা গেলেন, তার জায়গায় নাজিম উদ্দিন গভর্নর জেনারেল হইছিলেন। এবং প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী ছিলেন। লিয়াকত আলী একবার আসলেন অবশ্য ’৪৯ সালের দিকে। উনি যখন আসলেন, ওনাকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (ডাকসু) পক্ষ থেকে একটা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ডাকসু’র পক্ষ থেকে। সংবর্ধনা সভায় যে মানপত্র পড়া হয়, সেই মানপত্রটা পড়েছিলেন তখন গোলাম আযম সাহেব।

গোলাম আযম সাহেব পড়লেন এই জন্য যে, পড়ার তো কথা ভিপি’র। তখন ভিপি ছিলেন অরবিন্দ বোস বলে একজন হিন্দু। তো এমনিতেই ওরা (পশ্চিম পাকিস্তানিরা) সন্দেহ করে আমরা (পূর্ব বাংলা) হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত, তো অরবিন্দ বোস যদি পড়ে তাহলেই (লিয়াকত আলী খান নাখোশ হবেন) হবে। সেই জন্য ডাকসু’র জিএস গোলাম আযমকে দিয়ে পড়ানো হয়। ওর ভিতরে বাংলা ভাষার কথা বলা হয়।
আর আমি তো বলেছি যে, ’৪৮ থেকে ’৫১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রভাষা দিবস পালিত হত ১১ মার্চ। এদিকে লিয়াকত আলী খান বোধ হয় মারা যান ১৯৫১ সালে।

তারপর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন খাজা নাজিম উদ্দিন। নাজিম উদ্দিন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে উনি ভুলে গেলেন, উনি কী চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন! ভুলে গিয়ে ঠিক ঐরকম ডাটসে ‘উর্দু অ্যান্ড উর্দু শ্যাল বি দ্য ওয়ানলি স্টেট ল্যাংগুয়েজ অব পাকিস্তান’ এরকম পল্টন ময়দানে একটা বক্তৃতা দিলেন জানুয়ারিতে। ’৫২ সালের জানুয়ারিতে।

তো এটা দেয়ার সাথে সাথে তো আমাদের ভিতর মহা ক্ষোভ! আমাদের সাথে তো তুমি ওয়াদা করলে! কায়েদে আযম ওয়াদা করে নাই সেটা আলাদা কথা। তুমি তো ওয়াদা করছ? তুমি তো স্বাক্ষর করছ! আর তুমি এইরকমভাবে এই করলে? তুমি এই এলাকার লোক! সহজভাবেই মানুষ খুব বিক্ষুব্ধ হলো। এবং তখন একটা সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ আবার গঠন করা হয়। এর ভেতরে বলে নেই, ইউনিভার্সিটিরও একটা রাষ্ট্রভাষা ইউনিট করা হইছিল। ওটার কনভেনার ছিলেন আব্দুল মতিন সাহেব।১৯৫২ সালে যে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ করা হলো তার কনভেনার করা হলো তদানিন্তন মুসলিম ছাত্রলীগের অন্যতম নেতা কাজী গোলাম মাহবুবকে। এখন উনি বেঁচে আছেন, অ্যাডভোকেট কাজী গোলাম মাহবুব, বিএনপির সাথে জড়িত। ওনাকে কনভেনার করা হলো, তার ভেতরে মওলানা ভাসানী থাকলেন মেম্বার, তার ভেতরে আবুল হাশিম সাহেব থাকলেন মেম্বার, তারপরে আওয়ামী লীগের থেকে লোক নেয়া হলো, তমদ্দুন মজলিশের পক্ষ থকে ২ জন নেয়া হলো। প্রত্যেকটা অর্গানাইজশেন থেকে ২ জন করে। আর বিভিন্ন হল হলের থেকে ২ জন করে। ভিপি এবং জিএস। এইরকমভাবে নিয়ে একটা বিশাল রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়।

এবং তার থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। যে মিটিংএ এই সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হলো ওটা প্রিজাইড করেছিলেন মওলানা ভাসানী। ওটা ঢাকা ডিস্ট্রিক্ট বার লাইব্রেলি হলে হয়। এবং সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনে, নাজিম উদ্দিনের যে ঘোষণা, তার প্রতিবাদে আমরা বাংলা ভাষার দাবি জানিয়ে আমরা হরতাল এবং অন্যান্য কর্মসূচি পালন করব। এর প্রস্তুতি চলছে, বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে।

হঠাৎ এর ভিতরে দেখা গেল, যেদিন কর্মসূচি তার ঠিক আগের দিন দুপুরে রেডিওতে ঘোষণা করা হইল ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। এবং ঢাকা শহরে অত দিনের জন্য জনসমাবেশ, হরতাল, মিছিল সব নিষিদ্ধ। ১৯৫২ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করে এটা করা হয়।

তখন মিটিং বসল রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের। এটা আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিসে, ৯৪, নবাবপুর রোড। সেখানে সন্ধ্যার পরে মিটিং বসল সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের। সেখানে আমিও ছিলাম। ঐটা প্রিজাইড করলেন আবুল হাশিম সাহেব, বিখ্যাত নেতা। সেই মিটিংএ বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সেই আলোচনার মধ্যে স্থান পায় আমরা আন্দোলন করব, হান্ড্রেড ফোর্টি ফোর ভাঙব কি-না? ভাঙলে তার পরিণতি কী হবে ইত্যাদি। তখন আওয়ামী লীগের যারা নেতা ছিল ওখানে, মেম্বার ছিলেন আতাউর রহমান খান, শামসুল হক এরা। শেখ মুজিব তখন জেলে, অতএব তার উপস্থিত থাকা সম্ভব না। মেজরিটি লোক সিদ্ধান্ত নিল আমরা অন্যভাবে আন্দোলন করব, কিন্তু হান্ড্রেড ফোর্টি ফোর ভাঙব না। এইটা হইল মেজরিটি সিদ্ধান্ত। কিন্তু চার জন লোক এর ভেতরে, তার ভেতরে যুবলীগের অলি আহাদ ছিলেন, আব্দুল মতিন ছিলেন, আরেকজন বোধ হয় এম শামসুল আলম এবং ছাত্রলীগের গোলাম মাওলা। এই চার জন বললেন, যে না, ভাঙতে হবে।

তো তারপরে সিদ্ধান্ত হলো যে, ঠিক আছে, কালকে ওখানে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে যে জমায়েত হবে সেই জমায়েতে এই দুইটা বক্তব্যই প্লেস করা হবে। যে বক্তব্য ওখানকার ছাত্র জনতা মানে সেটিই হবে। বক্তব্যটা কী? বক্তব্যটা হলো আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি উনি বলবেন মেজরিটি সিদ্ধান্ত যেটা হইছে সেটা। আর এটা (১৪৪ ধারা ভাঙা) বোধ হয় আব্দুল মতিন সাহেব বলায় সিদ্ধান্ত হলো।

তো দুটোই দেয়া হলো ওখানে, সকলে তুমুলভাবে গ্রহণ করল যে, হান্ড্রেড ফোর্টি ফোর ভাঙতেই হবে। এবং সেই অনুসারে হান্ড্রেড ফোর্টি ফোর ৪ জন ৪ জন করে ভাঙা হয়। এরপরের ঘটনা তো সকলেরই জানা। রক্তারক্তি হয়ে গেল। ৫-৬ জন তো ঐ দিনই মারা গেল। পরের দিনও ২-১ জন মারা গেছে। তো এইভাবে ভাষা আন্দোলন একটা রক্তাক্ত রূপ নিল। এবং ঐ সময় এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি হলো যে, ওরা তো কারফিউ জারি করল। হান্ড্রেড ফোর্টি ফোর করে যখন কাজ হচ্ছে না তখন কারফিউ দিল।

কে মানে, কার কারফিউ? তখন কারফিউ জারি করেছে কিন্তু শত শত, হাজার হাজার লোক ওখান দিয়ে মিছিল করে চলছে। চিৎকার করছে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘নূরুল আমিনের কল্লা চাই’। নূরুল আমিন তখন চিফ মিনিস্টার। এর ভেতরে যারা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতা তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হতে লাগল।

এর ভিতরে একটা মিটিং হলো ঐদিনই ২১শে ফেব্রুয়ারি রাতে আমাদের ঐ মেডিকেল ছাত্রদের রিপ্রেজেন্টেটিভ ছিলেন গোলাম মাওলা। তার রুমে সেইখানে আমিও ছিলাম রাত্রে। সেই সময় শহীদ মিনার করার সিদ্ধান্ত হলো। আর পরের দিন গায়েবানা জানাযা, কারণ লাশগুলোতে মিলিটারিতে নিয়ে গুম করে ফেলেছে। লাশ তো আমরা পাই নাই। তো গায়েবানা জানাযা এবং পরের দিন শোক পালনের জন্য রোজা রাখা এই সিদ্ধান্ত হলো। তো পরের দিন কেউ রোজা ছিল, কেউ ছিল না, গায়োবানা জানাযা হলো এবং মিছিল হলো। এই মিছিলের পরে প্রত্যেক দিন এবং বহুদিন ধরে মিছিল হয়েছে।

সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যারা সদস্য ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হললো। আমি এবং প্রিন্সিপ্যাল আবুল কাশেম সাহেব এরা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের মেম্বার ছিলাম তমদ্দুন মজলিশের পক্ষ থেকে। আমরা ঢাকা থেকে চলে গেলাম। এটা বোধ হয় ২৩ কিংবা ২৪ ফেব্রুয়ারি হবে। ২৩ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক সৈনিকের যেটার সম্পাদক তখন আমি ছিলাম সেখানে আমরা স্পেশাল সংখ্যা বের করলাম এই ২১শে ফেব্রুয়ারির গুলি উপলক্ষ করে। লাল রং দিয়ে। এবং সেটা ভোর বেলা বের হলো এবং বের হওয়ার সাথে সাথেই আমাদের অফিস থেকেই কাড়াকাড়ি করে সমস্ত কয়েক হাজার কপি নিয়ে যায়। আবার রিপ্রিন্ট করতে হলো। এবং পরের দিনও রিপ্রিন্ট হলো। এর পরের দিনই দেখি আমাদের অফিস, তমদ্দুন মজলিসের অফিস বা সাপ্তাহিক সৈনিকের অফিস ১৯ নম্বার আজিমপুর, ঠিক মাঝ রাতে ঘেরাও করে ফেলেছে।

আমরা আগে থেকেই অনুমান করছিলাম যে, আমাদের নামে তো হুলিয়া জারি হয়েছে। আগের থেকে আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল আমরা ২ জন ধরা দিব না। আমরা পেছনের দিক থেকে বেরিয়ে যাব। ততক্ষণ কাশেম সাহেবের ওয়াইফ, মিসেস রাহেলা খাতুন উনি খুব চতুর মহিলা ছিলেন, উনি গেটের সামনে যেয়ে, পুলিশ গেটের সামনে থেকে ধাক্কাচ্ছে। খোলেন, খোলেন! তখন উনি বলছেন, একটা মুসলিম ফ্যামিলিতে এত রাতে আসছেন? আপনারা ভোরে আসেন খুলে দিব। এই রকম তর্ক করতে করতে উনি পৌনে এক ঘণ্টা কাটিয়ে দিলেন। এর মধ্যে আমরা পেছন দিক দিয়ে চলে গেলাম।

আমরা প্রথম ঢাকায় কয়েকদিন থাকলাম তার পরে কাশেম সাহেবের শ্বশুর বাড়ি জামালপুরে, সেখানে চল গেলাম। এবং ওখান থেকে উনি চলে গেলেন চট্টগ্রামে, আমি চলে গেলাম কুষ্টিয়ায়। প্রায় মাস দেড়েক পরে আসলাম। পরে ১৯৫৩ সালে ১১ মার্চ উপলক্ষে একটা মিটিং হলো। সব দলের প্রতিনিধিরাই অংশ নিয়েছিল তাতে। সেখানে কেউ কেউ বলল, যে রাষ্ট্রভাষা ২টা না ৭টা করতে হবে। কী সাতটি? পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বেলুচ, পশতু করতে হবে। তো আমরা মনে করলাম ঐ এলাকার লোকেরা যা চায় নাই। ঐ এলাকার লোকেরা দুইটায়ই খুশী। আমরা এখানে বাংলা দাবি করছি। উর্দু আর বাংলা এর ভেতরে এতগুলো আনলে গোটাই বানচাল করার চক্রান্ত হবে।

ঐ মিটিংএ আমি একটা আর্টিকেল পড়লাম যে, রাষ্ট্রভাষা দুইই মাত্র হবে। ওদের চাইলে ওরা ওদেরটা চাক। ওরা চায়নি আমরা কেন গায়ে পড়ে এত কিছু নিব। কমিউনিস্ট পার্টি, তখন আব্দুস সামাদ আজাদ কমিউনিস্টদের সাথে লিঙ্কড ছিলেন, উনি ঐটা সাপোর্ট করলেন। ওনার বিরুদ্ধে শেখ মুজিব আমার প্রবন্ধকে সাপোর্ট করে বক্তৃতা দিলেন। যাইহোক ওখানে বক্তৃতায় মোটামুটি অধিকাংশ লোক বলল যে, আমরা বাংলা এবং উর্দু এইটার পক্ষে। আর পরে তো ঐ যে গণ-পরিষদ ভেঙে দিল পাকিস্তান গভর্নমেন্ট। তারপরে তো নতুন গণ-পরিষদ হওয়ার আগে ১৯৫৪ সালে ইলেকশন হলো। সেই ইলেকশনে যারা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, তাদের দল যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে তারা পাশ করল।

মাত্র ৯টা সিট এদের বিরুদ্ধে পাশ করল ৩শ’র মধ্যে। আর সবই যুক্তফ্রন্টের। তো এদের মধ্যে যারা গণ-পরিষদের সদস্য হলো তারা সকলেই রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে। এবং তার বদৌলতেই ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের যেটা প্রথম কনস্টিটিউশন, সেটা হয় কিন্তু দ্বিতীয় গণ-পরিষদে। প্রথম গণ-পরিষদে কোন কনস্টিটিউশন দিতে পারে নাই। দ্বিতীয় পরিষদে ’৫৬ সালে পাকিস্তানের যে কনস্টিটিউশন হয় তাতে উর্দু এবং বাংলা দুটোকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃতি দেয়া হয়। এই হলো ফরমাললি, বলা চলে যে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পরিসমাপ্তি হলো।

কিন্তু ইনফরমালি আমি বলি, এ আন্দোলনটা আরো বাকি ছিল, সেটা কী? আমাদের অন্যতম দাবি ছিল রাষ্ট্র ভাষা শুধু বাংলা ঘোষণা করলেই হবে না, বাংলাকে আমাদের শিক্ষার মাধ্যম করতে হবে। তখন পর্যন্ত ম্যাট্রিকের শিক্ষা বাংলায়ই হয়। কিন্তু কলেজে থেকে ইংরেজি মাধ্যম। এমনকি, ১৯৬৩ সালে আমি কলেজের প্রফেসর হয়ে যাই। তখনো কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার মাধ্যম ছিল ইংরেজি। এখনো উচ্চ শিক্ষার মাধ্যম কিন্তু আমরা বাংলা করতে পারি নাই।

সেজন্য আবুল কাশেম সাহেব উচ্চ পর্যায়ে বাংলা শিক্ষার জন্য বাংলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পুরান ঢাকায় নবকুমার ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়। আমরা ইংরেজি ভাষার গুরুত্বকে অস্বীকার করি না। আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য এখনো ইংরেজি ভাষা দরকার। ইন্ডিয়াতে কিন্তু ইংরেজি ভাষাকে হিন্দির মতই গুরুত্ব দেয়। যার ফলে ওরা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে, অনেক আন্তর্জাতিক পোস্ট পওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা হয়। সেজন্য ইংরেজির গুরুত্ব আমরা অস্বীকার করি না, কিন্তু বাংলাকে নীচের পর্যায়ে এবং কলেজ পর্যায়ে শিক্ষা দেয়া প্রয়োজন আছে।

এটা তেমন বইও অনেকটা গড়ে ওঠে নাই, লেখা হয় নাই। একটা চেষ্টা হচ্ছিল। তো সেটা সরকারের পক্ষ থেকে আরো উদ্যোগ নেয়া দরকার। আর এখন, বাংলাদেশ হওয়ার পরও তো সেটা হয় নাই। আর গণমাধ্যম, বাংলাদেশে ইন্ডিয়ার সব চ্যানেলগুলা চলে। কিন্ত এই চ্যানেল আই বলি, এটিএন বলি, বিটিভি বলি কোনোটাইতো ইন্ডিয়াতে দেখানো হয় না। কালচারালি কিন্ত আমরা, বাংলা ভাষা আন্দোলনের যে উদ্দেশ্য ছিল, কালচারাল স্বাধীনতা অর্জন, সে স্বাধীনতা কিন্ত আমাদের এখনো আসে নাই। আমি মনে করি, যেদিন আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ভারতে দেখানো হবে এবং আমরা ভাষা সংক্রান্ত ব্যাপারে, কালচার সংক্রান্ত ব্যাপারে ওদের ডিকটেশন না মেনে আমারাই ডিকটেট করব।

ভাষা আন্দোলনের জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি, ওরা তো কেউ রক্ত দেয় নাই? পশ্চিম বাংলার লোকেরা তো বাংলা ভাষার জন্য গর্ব করে, কিন্তু তারা তো রক্ত দেয় নাই। তারা ভাষা আন্দোলনের জন্য কিছুই করে নাই। অথচ এখনো আমরা অনেকেই কলকাতামুখী। এবং সবচেয়ে বড় কথা এই যে, আমাদের চ্যানেলগুলো ওদের ওখানে দেখতে দেয় না, আর ওদের চ্যানেলগুলো আমরা দেখি!

তা. ই. মাসুম: শহীদ মিনারের পূর্ণ রূপ পাওয়ার সময় কি এখনো আসেনি?
আব্দুল গফুর: শহীদ মিনারের কথাটা কিন্তু আমরাই প্রথম তুলেছিলাম। শহীদ মিনারটা এই যে ভাষার জন্য যারা রক্ত দিলেন তাদের স্মৃতির প্রতি। আমাদের তো এখন সবসময় ওখানে যাওয়া হয় না, কিন্তু যারা ইউনিভার্সিটি এলাকায় থাকেন তাদের অনেকের কাছে শুনেছি যে, শহীদ মিনারে অনেক সময়ই অসামাজিক কার্যকলাপ ইত্যাদি হয়। মানে এটার পবিত্রতা রক্ষা করার কোনো ব্যবস্থা নাই। আমি মনে করি এটা দুঃখজনক। এটা জাতীয় গৌরবময় স্মৃতির একটা স্মারক। তো সেটার, তার পবিত্রতা রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য।

আর আরেকটা কথা যে, শহীদ মিনারের সাথে একটা জাদুঘর থাকতে পারততো। ভাষা আন্দোলনের যে সমস্ত কার্যকলাপ, যারা শহীদ হয়েছেন তাদের সম্পর্কে, ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে একটা জাদুঘর, ভাষা আন্দোলন জাদুঘরই আমি বলতে পারি সেটা ওখানে থাকতে পারতো। আর বাংলা ভাষা শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে একটা গবেষণাগার বা একাডেমি করবার কথা ছিল, এটা কিন্তু ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে যে ২১ দফার ভিত্তিতে নির্বাচন হয়, এই ২১ দফার দফাটাও কিন্তু ২১শে ফেব্রুয়ারিকে স্মরণ করেই ২১ দফা করা হয়েছিল। একুশ দফার মধ্যে অন্যতম দাবি ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য একটা গবেষণাগার দিতে হবে। আজকে বাংলা একাডেমি যেটা আছে, সেটা কিন্তু সেই দাবিরই ফলশ্রুতি। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পর এই বাংলা একডেমিটা করা হয়। তখন ওখানে বলাও ছিল, গভর্নর হাউজকে বাংলা একাডেমি করার কথা। বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য গবেষণার জন্য যেটা দাবি ছিল, সেটা বাংলা একাডেমি যদি স্বার্থকভাবে গড়ে ওঠে তাহলে হতে পারে।

কিন্তু এরপরেও যেহেতু শহীদ মিনার একটা কমপ্লেক্স হওয়া সুযোগ আছে, ওখানে ভাষা আন্দোলনের একটা মিউজিয়াম অবশ্যই হতে পারে। এবং সেখানে কারা? কতগুলো সংগ্রাম পরিষদ হয়েছে? কারা কারা তার সাথে জড়িত ছিল? কারা উদ্যোগ নেয়? কী কী ডকুমেন্টস আছে?

আশ্চর্য হবেন আপনি যে, আমি ২০০১ সালে যখন বর্তমান জোট সরকার পাওয়ারে আসে, তখন মোস্তফা জামান আব্বাসী মহাপরিচালক ছিলেন শিল্পকলা একাডেমির। তো, ওনার দাওয়াতে ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে প্রস্তুতি কমিটির একটি সভা কালচারাল মিনিস্ট্রিতে। তো, সেখানে ঐ যে, ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, যে প্রথম পুস্তিকাটি বের হয় দারুন ঐতিহাসিক মূল্য! ঐটার কপি কিন্তু এখনো আমাদের কাছে আছে। সেই বাই কালার প্রিন্ট, সেটা এখনো ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলে, মুহাম্মদ তকীয়ূল্লাহ, উনি প্রিজার্ব করেছিলেন এবং আমাদেরকে দিয়েছিলেন। তমদ্দুন মজলিশের প্রকাশিত সেই পুস্তিকাটা ওনার কাছে এখনো আছে। এবং আমাদের কাছে দিয়েছে। আমি বললাম যে, এইটা একটা ঐতিহাসিক ডকুমেন্ট। এটা পাবলিশ হওয়া উচিৎ। তখনই সবাই বললেন হ্যাঁ, এটা হওয়া উচিৎ। কত বই ভাষা আন্দোলনের ওপর ছাপা হয়েছে, কিন্তু প্রথম ডকুমেন্টটাই ছাপা হইল না। সকলেই বললেন, কিন্তু পরবর্তীকালে মুস্তফা জামান আব্বাসী সাহেব বললেন, আপনি পাঠিয়ে দিবেন।আমি পাঠিয়ে দিলাম। কিন্তু অদ্যবধি, ইতোমধ্যে আব্বাসী সাহেব ওখান থেকে চলে গেছেন, পরে অন্য মহাপরিচালক এসেছেন কিন্তু এ পর্যন্ত এই মূল্যবান ডকুমেন্টটা পাবলিশ করা হয় নাই। আমি মনে করি যে, ভাষা আন্দোলনের যে যত মূল্যবান ডকুমেন্টগুলো সেখানে ঔ জাদুঘরটায় স্থান পেতে পারে। এবং সেটা থাকাও উচিৎ। ভাষা আন্দোলনের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, যেটা আমাদের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। একটা জাদুঘর তার জন্য থাকতেই পারে, এটা উচিৎ।। শহীদ মিনারের কমপ্লেক্সের মধ্যে থাকলে সেটা আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়।

আর এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে যে স্বীকৃতি পেয়েছে ইউএন (জাতিসংঘ) এর ম্যধমে। সেটা আমাদের ভাষা আন্দোলনের একটা বিরাট ব্যাপার। এটা একটা গৌরবজনক প্রাপ্তি আমরা মনে করি। কিন্তু এখানেও একটা জিনিস, আমার বক্তব্য, এত বড় একটা অর্জন, দুজন ছেলে উদ্যোগ নিয়েছিল, তারা যে কাজটা করেছে সেটা একটা বিরাট ব্যাপার। কিন্তু তাদের কাছে আমাদের দেশের পক্ষ থেকে, ভাষা আন্দোলন কেন হলো? কোন পটভূমিতে হয়েছিল? কারা অংশ নিয়েছিল? কারা কী ভূমিকা নিয়েছিলেন? শহীদরা কে কে ছিলেন? ইত্যাদি এগুলো যদি ইংরেজিতে তাদের কাছে পাঠানো হয় তাহলে সেই হিসেবে তারা জানতে পারে এবং পৃথিবীতে একটা প্রচার হতে পারে। কিন্তু, তার কোন ব্যবস্থা হয়েছে বলে আমি জানি না।

অর্থাৎ, এতবড় একটা প্রাপ্তিকেও আমরা কোন রকম গুরুত্ব দিতে পারিনি। এটা আমাদের জন্য তো বিরাট একটা প্রাপ্তি। বাংলাদেশর আর কোনো ঘটনা তো এরকমভাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। তো সেই জিনিসটা স্বীকৃতি পেল আমরা কোনো রকম সুবিচার করতে পারলাম না তার তাদের প্রতি। তাদেরকে জানাতে পারলাম না ভাষা আন্দোলনটা কেন হলো? কোন পটভূমিতে হলো?

এখানে আমি একটা কথা বলি, ভাষা আন্দোলন, যদি ’৪৭ সালে পার্টিশন না হতো তাহলে কিন্তু ভাষা আন্দোলনের প্রশ্ন উঠত না। অথবা, লাহোর প্রস্তাব অনুসারে যদি পার্টিশন হতো তাহলে ভাষা আন্দোলন দরকার হতো না। কারণ তাহলে এদিকে এমনিতেই বাংলা হতো। যদি পার্টিশন না হতো, এমনকি রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত চিন্তা করতেন, সারা ভারত অখণ্ড এবং এখানে একটাই মাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে, সেটা হবে হিন্দি। এটা রবীন্দ্রনাথ নিজে মনে করতেন। তো সেইখানে বাংলা ভাষাভাষী গোটা ভারতের তুলনায় আর কয়জন! সেটা হতো না।

সেই জন্য পার্টিশন হয়েছে বলে এবং লাহোর প্রস্তাব পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয় নাই বলে ভাষা আন্দোলনের সুযোগ আমরা পেয়েছিলাম। অখণ্ড ভারত থাকলে কোন চান্সই ছিল না। আর লাহোর প্রস্তাব যদি পুরোটা বাস্তবায়িত হতো তাহলে পরে ভাষা আন্দোলন প্রয়োজন হতো না। এমনিতেই বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা হতো। ভাষা আন্দোলনের সুযোগটা ইতিহাসের কোন পটভূমিতে আমরা পেলাম সেটা আমাদের স্মরণ করা খুবই প্রয়োজন।

চলবে…