চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হ্যাঁ, মেয়েরাই পারে

অর্থ-বিত্ত-খ্যাতি-প্রত্যাশার ভিড়ে ও চাপে যখন আমাদের ছেলেদের ক্রিকেট দল সাফল্য ভুলতে বসেছে, ঠিক তখন টি-২০ নারী এশিয়া কাপের ফাইনালে শেষ বলের নাটকীয়তায় ভারতকে ৪ উইকেটে হারিয়ে ঐতিহাসিক শিরোপা লাভ করেছে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। এই ক্রিকেটাররা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। এশিয়ার শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিজয়মালা ছিনিয়ে এনেছে, দেশের জন্য বয়ে এনেছে অনন্য গৌরব।

বিজ্ঞাপন

এশিয়া কাপে পুরষ দলের গৌরব কেবল রানার্সআপ ঘিরে, সেখানে এশিয়া কাপে নয়া ইতিহাস রচনা করেছে বাংলাদেশের নারীরা। ফাইনালে টানা ছয়বারের চ্যাম্পিয়ন শক্তিশালী ভারতকে ৩ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপ জয় করল লাল-সবুজের দেশ। নারীদের হাত ধরেই ক্রিকেটে প্রথমবার বহুজাতিক কোনও টুর্নামেন্টে এই প্রথম শিরোপা আসলো বাংলাদেশের ঘরে।

কুয়ালালামপুরে এশিয়া কাপের ফাইনালে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশি মেয়েদের আঁটসাঁট বোলিংয়ে ৯ উইকেটে মাত্র ১১২ রান তুলে ভারত।  জবাবে উত্তেজনা ছড়িয়ে শেষ বলে (তিন উইকেট হাতে রেখে) অবিস্মরণীয় জয় তুলে নেয় সালমা বাহিনী।

বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে সম্মানিত করার এই নেপথ্য নায়িকারা অন্ধকার থেকে উঠে এসেছে আলোর মঞ্চে। তারা এসেছে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাম থেকে। এই কিশোরীদের কারও কারও বাবা কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী বা সামান্য মাইনের চাকুরে। তৃণমূলের অভাবী পরিবারের কিশোরীরাও যে সুযোগ পেলে জাতীয় মর্যাদা বয়ে আনতে পারে সেটা দেখিয়ে দিয়েছে এই ক্রিকেটাররা।

এর আগে মেয়েদের জাতীয় লিগের ম্যাচ ফি ৬০০ টাকা জেনে বিস্মিত হয়েছিলেন দেশের মানুষ। ক্রিকেট বাণিজ্যিকীকরণের যুগে ক্রিকেট বোর্ডের ম্যাচে ফি কেন এত কম সেটি নিয়ে সমালোচনা কম হয়নি।  কিন্তু তারপরও সুযোগসুবিধা বাড়েনি।  নিয়মিত কোচ নেই, ভালো ফিজিও নেই, সার্বক্ষণিক ম্যানেজার নেই। নারী ক্রিকেটের প্রধান ও একমাত্র নির্বাচক সাবেক ক্রিকেটার আতহার আলী খান। পাশাপাশি দলের ম্যানেজারও তিনি। পেশাদার ধারাভাষ্যকার হওয়ায় সারা বছর দেশ-বিদেশে ব্যস্ত থাকতে হয়। অনেক সময় মাঠে না গিয়েই সারতে হয় জাতীয় দল নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

নারী ক্রিকেটারদের দীর্ঘদিনের অনুযোগ, খুব বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পান না তারা। যেটি উন্নতির পথে অন্যতম অন্তরায়।  এই টুর্নামেন্ট শুরুর আগে শেষ কবে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন সেটিই প্রায় ভুলতে বসেছিলেন রুমানা-জাহানারা-সালমারা। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে সবশেষ শ্রীলঙ্কার মাটিতে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে খেলেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলেছেন তারও আগের মাসে, সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে।  ডিসেম্বরে রুমানারা ভারত সফর করলেও সেটি ছিল ‘এ’ দলের ছায়ায়। গত এক বছর সিরিজ আয়োজন করতে পারেনি বিসিবির উইমেন্স উইং।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু সব উপেক্ষা প্রতিকূলতা তুচ্ছ করে দেশের অকুতোভয় ক্রিকেটাররা যেন রবি ঠাকুরের গানকে অন্তরে ধারণ করে মাঠে নেমেছিলেন, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে….।’ শিরোপা জয় করে সব রকম উপেক্ষা আর অবজ্ঞার জবাব দিলেন এশিয়া কাপ জয়ী বাংলার অপরাজেয় মেয়েরা।

দেশের জন্য এই অনন্য গৌরব বয়ে আনা এই নারী ক্রিকেট দলের সদস্যদের এই পথ চলাটা কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। অন্তত আমাদের মত পশ্চাৎপদ, মৌলবাদী ধ্যানধারণাপুষ্ট বাংলাদেশে। একটি মেয়ে এবং তাঁর শরীর এমনই নিরাপত্তার বলয়ে পরিবেষ্টিত, যা শেষ পর্যন্ত রক্ষণশীলতার নামান্তর। জার্সি পড়ে মেয়েরা খেলবে, দৌড়াবে, শরীর দোল খাবে, অংসখ্য লোলুপ দৃষ্টি তাকিয়ে দেখবে-অভিভাবকরা তা মানবেন কীভাবে? পুরুষ কোচও একটা বিরাট সমস্যা। যদি গায়ে হাত দেয়! কানে ফিসফিসিয়ে মন্ত্রটি পড়ে দেওয়ার জন্য বহু খালা-ফুপু মজুত থাকে। কী হবে খেলে? সেই তো বিয়ে করে বাচ্চা মানুষ করতে হবে! যেন মরতে হবে বলে কেউ আর বেঁচে থাকার জন্য ভাত খায় না! বেশি খেলাধুলা করলে মেয়েদের স্বাভাবিক শ্রী যদি নষ্ট হয়ে যায়!

মেয়ে বলেই ‘হার্ডল’ এসেছে পদে পদে। ঘরে, বাইরে, জীবনের সর্বত্র। সমাজ, সংস্কার, পিছুটান অনবরত সামনে এগিয়ে চলার গতির পায়ে লাগাম পরানোর চেষ্টা করছে। থমকে দিতে চেয়েছে এগিয়ে চলার গতি।  কিন্তু অদম্য জেদ, অফুরান উৎসাহ-উদ্দীপনার কাছে তা হার মেনেছে বার বার।  ‘মুখোশ’-এর যাবতীয় চক্রান্ত ভেস্তে দিয়ে মেয়েরাই হয়ে উঠছেন ‘মুখ’।  আশা করি ভবিষ্যতও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।

ক্রিকেটে বাংলাদেশের মেয়েদের এই ভূমিকা দেখে একটা কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছে–তা হল, আমরা সচরাচর তেমন কোনও ঘটনা প্রসঙ্গে যে বলে থাকি-‘মেয়েরাও পারে’-সেই কথাটা পাল্টে এবার থেকে বলা শুরু হোক, ‘হ্যাঁ, মেয়েরাই পারে’৷ এই কথাটা মুখে মুখে চালু না হওয়া পর্যন্ত বোধ হয় কন্যাসন্তানের গুরুত্বটা সমাজের সর্বস্তরে সকলের মর্মে সঠিকভাবে পৌঁছবে না৷ আর এই গুরুত্বটা যথাযথভাবে না বোঝা বা বোঝানো পর্যন্ত দেশের সকল কন্যাসন্তানকে নিরাপদে রক্ষা করাও সম্ভব হবে না৷

পরিশেষে আবারও স্যালুট জানাই বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দলকে! ছেলেরা যা পারেনি, তা তো ওরাই করে দেখিয়েছে! এখন ওরাই হোক বাংলাদেশের নারীর সেরা বিজ্ঞাপন৷

আশা করি কর্তাব্যক্তিরা এবার আরেকটু উদার ও মনোযোগী হবেন প্রমীলা ক্রিকেটের ব্যাপারে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যার পাশাপাশি পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা পেলে এভাবেই এগিয়ে যাবে আমাদের নারীরা। এগিয়ে যাবে লাল সবুজের আমাদের প্রিয় সুন্দর দেশটিও।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)