চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হো চি মিন এর দেশে ৭

গ্রামে যেতে আমাদেরকে আরো নীচের দিকে নামতে হচ্ছে। নামতে নামতে ভাবছিলাম একই রকম পথ দিয়ে আমাদের উপরের দিকে উঠতে হবে। পাহাড়ী রাস্তায় নামা যতটুকু কষ্টের ওঠাটা ঠিক দ্বিগুণ কষ্টের। বাড়তি দম লাগে। ততক্ষণে বৃষ্টি থেমে গেছে। রেইনকোট ব্যাগে ঢুকিয়ে হাঁটা আর ছবি তোলা চলছে। ট্যুর গাইডের সঙ্গে ওই এলাকা সম্পর্কে গল্পও চলছে। আলাপে আলাপে জানা গেল এরকম গাইডের দায়িত্ব পালন করতে করতেই ইংরেজীতে কথা বলা শিখেছে কো।

বিজ্ঞাপন

এক ঘন্টা হাাঁটার পর বিশাল এক ঝরণার মুখে পড়লাম। হয়েকটা ছোট ঝরণা মিলিত হয়েছে সেখানে। বিকেলের সোনা রোদে সেই ঝরণার সামনে দাঁড়িয়ে শরীর মনজুড়ে প্রশান্তি নেমে এলো। ঝরণা সেখান থেকে তিরতিরে নদী আরো নীচে নেমে গিয়েছে। সেই নদীর ওপর ঝুলন্ত ব্রিজ। সব আয়োজনই ট্যুরিস্টদের কথা বিবেচনা করে। ব্রিজের দুপাশে মিস্টি সব ফুলের টব ঝুলছে। চলছে কুয়াশা বৃষ্টি। ব্রিজ পার হলেই একপাশে দেখা গেল বিশেষ কাপড় বোনা চলছে। স্থানীয় একটি গাছের ছাল দিয়ে সুতা বানিয়ে, নিজেদের তৈরী রং দিয়ে রুমাল, টেবিল ম্যাট থেকে বিছানার চাদর পর্যন্ত বানানো চলছে। সেখানেও রয়েছে গয়না-গাঁটির ফেরিওয়ালা।
গাইড কো জানালো, চাইলে আমরা স্থানীয়দের নাচ-গানও দেখতে পারি। মাত্র কয়েকজন জড়ো হলেই শিল্পীরা তাদের পরিবেশনা শুরু করবেন। কী আশ্চর্য কোন উপলক্ষ নাই দর্শক জুটলেই নাচ-গান! সত্যিই তাই, পর্যটক-স্থানীয় মিলে ১০-১২ জন স্টেজের সামনের আসনে বসার পরই শুরু হলো গীতি-নাট্য। এরপর বাঁশ নৃত্য। সেই নাচে গেস্টদেরও অংশ নেয়ার সুযোগ।

এবার ফেরার পালা। পথের ধারে এক বৃদ্ধ বাদককেও দেখা গেল। তিনি আপন মনে গাইছেন। পথচারীরা তাকে ২-৪ টাকা দিয়ে যাচ্ছেন। অর্ধেক পথ হাঁটার পর ক্ষুদে পর্যটক ফিদেল আর চলতে পারে না। তার আগে থেকেই হুটহাট কয়েকটা স্কুটি আমাদের পাশ কাটিয়ে গেল। তাদের প্রশ্ন ‘আর ইউ ওকে?’ মানে হোটেলে ফিরতে স্কুটি লাগবে কি? বেশী কষ্ট হয়ে যাচ্ছে আশঙ্কায় ফিদেল আর তার বাবা স্কুটিতে করেই হোটেলে ফিরলো। গাইডসহ আমরা চার নারী হেঁটে হোটেলে ফিরলাম। তার আগে দু’বার পথের ধারে বসে দম নিয়েছি।

হোটেল থেকে জানিয়েছে পরদিন আমাদের জন্য রয়েছে ট্র্যাকিং। খুব ভোরে উঠে পাহাড়ে সকাল দেখার ইচ্ছা। আগেও দেখা হয়েছে। কিন্তু বার বার দেখায় কোন বিরক্তি নেই। সেই সময়টা নেশা লাগার মতো মনে হয়। পাহাড়ের গায়ে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। মেঘের পাশেই পাহাড়ের গায়ে সূর্য কিরণের ঝিলিক লাগে। এখনই যে চূড়াটি পরিষ্কার দেখা যেতো মুহূর্তেই মেঘ এসে সেটাকে ঢেকে দিচ্ছে। হোটেল রুমের বেডে শুয়ে শুয়ে সে দৃশ্য স্বর্গীয় অনুভূতি এনে দেয়। প্রকৃতি এতো সুন্দর হয়!

সা পা-য় দুই ধরণের ট্রাকিংয়ের ব্যবস্থা আছে। একটি ১২ কিলোমিটার আরেকটি ৪ কিলোমিটারের। ক্ষুদে পর্যটকের জন্য আমরা গেলাম ৪ কিলোমিটারের ট্র্যাকিং। এবার আমাদের গাইড শো। ট্র্যাকিংয়ের জন্যও টিকিট কাটতে হয়। এবার পাহার বেয়ে ওঠার পালা। সব ট্রিপেই কিছু বিষয় কমন। যেমন সুন্দর সাজানো বাগান এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন। পথের ধারে কৃত্রিম ঘোড়া, মিকি মাউস, বাঘ ইত্যাতি সাজানো হরয়ে। বাচ্চারা যেহেতু এই পথে যায় সে কারণে এসব আয়োজন। পাহাড় বেয়ে বেয়ে চূড়ায় উঠলাম। চূড়া থেকে খুব কাছে সা পা শহর চোখে পড়ে। এক চিলতে শহরটিকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে উঁচু উঁচু পাহাড়। অনাবিল সে দৃশ্য।

এবার হোটেলে ফেরার পালা। হোটেলে ফিরে চেক আউট করে লাঞ্চ। বিকেল ৩টায় ফিরতি বাস ধরতে হবে। কিন্তু চেক আউট করার পর আমাদের অন্য প্ল্যান রয়েছে। রাষ্ট্রদূত সামিনা আপা বলে দিয়েছেন, সময় পেলে কেবল কার-এ সা পা’র সর্বোচ্চ পাহাড় ফ্যানসিপান’র চূড়া দেখে আসা উচিত। কেবল কার-এর যেতে আসতে কত সময় লাগতে পারে, হোটেল থেকে কত দূরে, কীভাবে যেতে হবে সে বিষয়ে খোঁজ খবর নেয়া হলো। হোটেলের রিসিপশন থেকে সেখানে যেতে নিরুৎসাতিহ করা হচ্ছিলো। কারণ আমরা ফিরতি বাস মিস করতে পারি। মিস করলে নিজ খরচায় হ্যানয় ফিরতে হবে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু আমরা কেবল কার-এ যাবই। বিশেষ করে আমি। এতো কাছে এসে এটা মিস করতে কষ্ট লাগছিল। লাঞ্চের সময় খাবার দিতে দেরি করে হোটেলের লোকজন আমাদের দেরি করিয়ে দিল। মনটা খারাপ হওয়া শুরু করলো। আমার মনের ভাব দেখে সজল না করার সাহস পেল না। আমরা দুই ঘন্টা সময় হাতে নিয়ে রীতিমতো দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে কেবল স্টেশনের পৌাঁলাম। স্টেশনের মহিলা জানলো আমাদের তিন ঘন্টা লাগবে। আমি আরো দমে গেলাম। অবস্থা বেগতিক দেখে সজল বললো, আমরা নিজ খরচায় হ্যানয় যাব তারপরও দেখে যাব।
সবকিছু বিবেচনা করে ঠিক হলো আমরা পুরো পথ যাব না অর্ধেক পথ যেয়ে ফিরে আসবো। কেবল কার-এ যেতে ১০ মিনিট পথ বিশেষ ট্রেনে যেতে হয়। তারপর কেবল কার। ট্রেন থেকে নেমে কেবল কার-এ বসে আমাদের খুশি আর ধরে না। সবার এক কথা, এটা বাদ দিয়ে গেলে বিশাল ভুল হতো। এই কেবল কার গিনেজ বুক এ নাম লিখিয়েছে। এটি বিশ্বের দ্রুততম এবং সবচেয়ে দীর্ঘতম কেবল কার।

২০ মিনিটের পথ পাড়ি দেয়ার পর ব্রেক। কেবল কার থেকে নামার পর কুয়াশার মতো সাদা মেঘ ঘিরে ধরলো। দুই ফুট দূরে কিছু দেখা যায় না। মানুষের আনাগোনা কম। সেখানেও বিশাল গির্জা চোখে পড়লো। সেখান থেকে ৬শ’ সিড়ি বেয়ে ওঠার পর আবার কেবল কার ধরতে হবে। আমরা সামনের দিকে না যেয়ে ফেরার পথ ধরলাম। পুরো পথ যেতে মাথাপিছু খরচ প্রায় একশ ডলার।

এবার হাসতে হাসতে এবং দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে হোটেলে ফেরার পালা। তিনটা বাজার ঠিক ৫ মিটিন আগে হাজির। হোটেলের লোকের সাধুবাদও জুটলো। এবার হ্যানয় ফেরার পলা।

সা পা যাওয়া আসার পথে বেশ কয়েকটি বড় বড় পাহাড়ী নদী দেখেছি। কিন্তু কেমন জানি ফাকা ফাকা লেগেছে নদীগুলোকে। কারণ এত বড় বড় নদীর বুকে কোন নৌকা নেই! তীব্র স্রোত নেই। কিন্তু নদীর বুকে ছোট ছোট ঘুর্ণি চোখে পড়ে। আর এসব নদীর নাব্যতা খুব কম। হয়তো কয়েক ফুটে নীচেই পাথর মিলবে। এমন নদীতে নৌকা চালানো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

হ্যনয়তে সেই রাত কাটিয়ে পরদিন সকালের ফ্লাইটে দেশে ফেরা। পুরো ট্রিপ খুব ভালোভাবে শেষ করলেও মনের মধ্যে খচখচ করছিলো। ডা নাং শহরে যাওয়া হলো না। সেখানকার গোল্ডেন ব্রিজি দেখা হলো না। সবচেয়ে বড় আফসোস হো চি মিন সিটিই (পুরনো নাম সায়গন) দেখা হলো না। পর্যটকরা এতো অল্প সময় নিয়ে ভিয়তনাম খুব কমই যান। মোটামুটি এক মাসে পুরো ভিয়েতনাম দেখা সম্ভব। তাছাড়া ঢাকা থেকে আগে হো চি মিন সিটি গিয়ে তারপর হ্যানয় গেলে সুবিধা হতো। হ্যানয় থেকে ঢাকায় ফেরা যেতো। তাতে অল্প খরচেই দুই বড় শহর ঘোরা হতো। কিন্তু হ্যানয় থেকে হো চি মি আবার হো মিন থেকে হ্যানয় যাওয়া সময়সাক্ষে এবং খরচ সাপেক্ষ।

আমরা ভিয়েতনাম সম্পর্কে খুব বেশী কিছু জানি না। তবে ওই দেশ সম্পর্কে জানাশোনা বাড়ছে। ভিয়েতনাম যাচ্ছি শুনে কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন, এতো দেশ থাকতে ভিয়েতনাম যাচ্ছ কেন? আবার ফেরার পর কেউ কেউ জেনে প্রশ্ন করেছেন, ভিয়েতনাম তো যাওয়ার মতো দেশ না। ওখানে বেড়াতে গেলেন কেন? কিন্তু ভিয়েতনাম থেকে ফেরার বেশী কয়েক দিন পরও ফিদেল ভিয়েতনাম যেতে চায় আবার। আমাদের মা-ছেলের আসলে ফিরতে ইচ্ছা করছিলো না। ফিদেল চায় সে ওখানেই পড়াশুনা করবে আর তার মা-বাবাও যেন ওখানে কাজ নিয়ে নেয়। আর ঈদ উদযাপন বাদ দিয়ে দেশের বাইরে যাওয়ার স্বজনদের বেশীরভাগই মনক্ষুণ্ণ। কিন্তু আমরা দুজনেই পেশাগত কারণে একসঙ্গে লম্বা ছুটি পাই না। বছরের একটা সময়েই ছুটিটা জোগাড় করা সম্ভব হয়। তাই বছরের অন্য সময়ে স্বজনদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি। আর এই সময়টা নিজেদের জন্য রেখে দেই।

শেষ