চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হো চি মিন এর দেশে ৬

গন্তব্য সা পা শহর

পাহাড়ী রাস্তার বাঁকেই সুন্দর সাজানো বাহারি ফুলের বাগান রয়েছে। বিচিত্র তাদের রং এবং আকার। বর্ষার দোপাটি ফুলের সঙ্গে অনেক মিল আছে।

যেদিন সা পা শহরে যাচ্ছি সেদিন বাংলাদেশে ঈদ উদযাপন চলছে। খুব ভোরে বাংলাদেশ হাউজ থেকে রওনা করেছি ট্রাভেল এজেন্সি অফিসের উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে মিনি বাস আমাদের তুলে নিবে। সকাল সকাল রওনা করায় রাস্তা ফাঁকা ছিলো। নির্ধারিত সময়ের ২০ মিনিট আগে পৌঁছে গেলাম। অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সকালের নাস্তা পর্ব সারা হলো। এর মধ্যে অফিসের ঝাপি খুললো। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর কাঙ্খিত গাড়ি আসলো।

বিজ্ঞাপন

আগেই বলেছি এসব ট্রিপের আয়োজন খুবই সৃশৃংখল। কয়েকটি সার্ভিস এতে সমন্বিতভাবে কাজ করে। ট্রাভেল এজেন্সিগুলো বাস সার্ভিসের কাছে নির্ধরিত দিনের ট্যুরিস্টের তালিকা দিয়ে রাখে। খোনে ট্যুরিস্টদের নাম এবং তাদের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়। সেই তালিকা ধরে শহরের বিভিন্ন স্পট থেকে ট্যুরিস্কদের গাড়ীতে তোলা হয়।

এবারে ট্রিপটি আমাদের জন্য ব্যতিক্রমী। কারণ এখানে যেয়ে কী কী করবো সে সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণা ছিল না। ট্রিপের প্রতিটি স্টেপে আমরা নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করছিলাম। মিনি বাসে আমাদের কাছ থেকে খাবারের কোন সীমাবদ্ধতা আছে (ভেজ/নন ভেজ) কী না, সেটা জেনে নেয়া হলো। আমরা জানিয়ে দিলাম শুকরের মাংস ছাড়া আমরা সবকিছু খেতে অভ্যস্ত।

১০ মিনিট চলার পর মিনিবাস আমাদের নামিয়ে দিল। কাছে একটি বিশাল আকারের বাস দাঁড়িয়ে ছিলো। গাইড আমাদের সেই বাসে উঠতে বললেন। বাসের দরজায় পৌঁছে আমাদের চোখ কপালে। বাসটি ততোক্ষণে অর্ধেক ভরা। চোখ কপালে তোলার প্রথম কারণ জুতা খুলে আমাদের বাসে উঠতে হবে। চালকের হাতে পলিথিন ধরা। জুতা খুলে সেই পলিথিনে রাখতে হবে। নিজ নিজ জুতার পলিথিন হাতে নিয়ে বাসের ভেতরে ঢুকতে হবে। দ্বিতল বাসটি চেয়ারকোচ না। সবার জন্য শুয়ে শুয়ে ভ্রমণের ব্যবস্থা। বিষয়টি আমাদের কাছে একেবারেই নতুন। বাসে ওয়াইফাইয়ের ব্যবস্থা আছে। সবার আগে সেটি আবিষ্কার করেছে ফিদেল। কারণ সে সবার সামনের সিটে। তার সামনে বড় টিভি মনিটর। সেখানে ওয়াইফাইয়ের পাসওয়ার্ড লেখা।

বাসের যাত্রীদের মধ্যে ভিয়েতনামী নাগরিক বেশী। ট্যুরিস্ট অল্প কয়েকজন। ভিয়েতনামীদের দেখে বিত্তবান মনে হয়েছে। লম্বা জার্নির জন্য বাসের সার্বিক আয়োজন অতুলনীয় মনে হয়েছে। দোতলার সিটগুলোতেও সিট বেল্ট আছে। রাতের ঘুম কম হওয়ায় আমরা অল্প সময়েই ঘুমিয়ে পড়লাম। সা পা শহরে পৌঁছার কথা দুপুর একটার মধ্যে। দিনের বাকি সময়ে যাতে ঘোরাঘুরি করতে পারি সে চিন্তা করে ঘুমানোই ভাল।

জার্নি শুরুর দু’ঘন্টা পর বাস থামলো। আমাদের গাড়িতে অবশ্য কোন গাইড ছিলেন না। বাস চালকও ইংরেজী জানেন না তেমন। আকার-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন আমাদের জন্য বিরতির সময় ৩০ মিনিট। একটি মার্কেটের সামনে বিশাল ফাকা জায়গা। সেখানে আরো বাস দাঁড়ানো। মার্কেটে বেশীরভাগই খাবার হোটেল। ভাষায় প্রতিবন্ধকতা, তাই খাবার অর্ডার দেয়া হলো না। ব্রেড-কুকিজ আর ফল কিনলাম।

সফরের পুরো সময়ে আমাদের সবচেয়ে পছন্দের ছিল ভিয়েতনামের ফল। আমাদের দেশের যে শরিফা ফল বিরল হয়ে পড়েছে সেটা সেখানকার বাজারগুলোতে সয়লাব। দামেও সস্তা। ড্রাগন ফ্রুট, রামবুটান, থাই কাঁঠাল, পেপে, আম, আমড়াও সুলভ। আর রয়েছে ভিয়েতনামী লিচু। এই লিচু সবচেয়ে সুলভ। স্থানীয়রা ফলটিকে কী নামে ডাকে সেটা জানা সম্ভব হয়নি। দেখলে লিচুর সঙ্গে মিল নেই কিন্তু স্বাদে একই। বীচিগুলো গোল আকৃতির। ফলের চামড়া মসৃণ, আমাদের লিচুর মতো নয়। আকারেও ছোট।

বিজ্ঞাপন

বিরতির সময়শেষে আবারো চলা শুরু। সা পা শহরে পৌঁছানোর আগে আরো দু’বার বিরতি দেয়া হলো। তৃতীয় বিরতির পর খেয়াল করলাম বাসটি পাহাড় বেয়ে উপরের দিকে উঠতে শুরু করেছে। এতবড় বাস পাহাড় বেয়ে উঠছে! নেপালেও বাসে করে পাহাড় বেয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা আছে কিন্তু সেই বাসগুলো আমাদের দেশের সিটি বাসের মতো ছোট। প্রায় ৪৫ মিনিট পাহাড় বেয়ে ওঠার পর সা পা শহরে পৌঁছালাম। ছোট্ট সেই শহরের মাঝে শান্ত একটা ছোট লেক। বৃষ্টি পড়ছিলো সে সময়।

এবার কোথায় যাব কার সঙ্গে যাব ভাবতে ভাবতে দেখলাম বড় বড় করে আমার নাম লেখা কাগজ হাতে একজন বাসের গেইটের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। নামার পর তিনি আমাদের নিয়ে আরেকটি মিনিবাসে করে হোটেলের উদ্দেশ্যে ছুটলেন। মিনিবাসের সবাই বিদেশী।

হোটেলে পৌাঁনোর পরই লাঞ্চের ব্যবস্থা। লাঞ্চে আমাদের টেবিলে বসলেন দুই অস্ট্রেলিয় বান্ধবী। তাদের একজন পেশায় নার্স। তারা সা পা ট্রিপে আমাদেরই গ্রুপে। খেতে খেতে আলাপ হলো। কয়েক মাস আগে আমি অস্ট্রেলিয়া ঘুরে এসেছি জেনে আগ্রহের সঙ্গে খোঁজ খবর নিলেন। ফিদেলকে দেখে প্রশ্ন করলেন, সে এই প্রথম বিদেশ সফর করছে কি না। এটি তার তৃতীয় বিদেশ সফর জেনে মহিলা চোখ কপালে তুলনে। বললেন, প্রথমবার বিদেশ যেতে আমাকে ২০ বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

লাঞ্চের পর আমরা ঝরনা আর আদিবাসীদের গ্রাম দেখতে যাব। যেখানে গেলে জুম চাস কাছ থেকে দেখা যাবে আর গ্রামের আদীবাসীরা কীভাবে কাপড় বোনে সেসব দেখতে পাব। লাঞ্চ শেষ হওয়ার আগেই আমাদের গাইড উপস্থিত। গাইড বলতে হালকা-পাতলা গড়নের ১৮-২০ বছর বয়সী মেয়ে ‘কো’।

বিকাল তিনটায় রওনা হলাম। তখন মাঝারি বৃষ্টি পড়ছিলো। হোটেলের কাউন্টার থেকে ১০ হাজার ডং দিয়ে একেকটা রেইন কোট কিনলাম। বাংলাদেশ টাকায় যার দাম সাড়ে তিনশ’ টাকা। পাতলা পরিথিনের রেইন কোট। ২০ হাজার ডং দিয়ে বুট জুতা কিনলাম। পাহাড়ী রাস্তায় বুট ছাড়া হাঁটা রিস্কি। কিন্তু এগুলো পরে হাঁটা কষ্টকর। গরম লাগে, হাঁটতে অন্য জুতার চেয়ে বেশী কষ্ট হয়।

ঐতিহ্যবাহী গয়না কেনা-বেচা

হোটেল থেকে হাঁটার শুরুতেই ঝোলা কাঁধে কয়েকটি মহিলা আমাদের ঘিরে ধরে গল্প জুড়ে দিল। কথায় কথায় বুঝলাম, তারা স্থানীয় পণ্যের ফেরিওয়ালা। বেশীরভাগই গয়না। তাছাড়া রয়েছে ছোট রুমাল, ব্যাগ, হাতের ব্যন্ড। তারা আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকলো। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার পাশে বাড়িঘর চোখে পড়ে, ঘরের সামনে ছোট ছোট দোকান। সবখানেই প্রায় একই ধরণের পণ্য। গয়নাগুলো রূপা বা টিনের। সেগুলোতে রঙ্গিন পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। ট্রাডিশনাল পোশাকগুলো বাহারি রঙের। আমদের পার্বত্য অঞ্চলের নারী-পুরুষের পোশাকগুলো যেমন রঙ্গের হয় অনেকটা তেমনই। পোশাকের ধরনেও অনেক মিল আছে। আমরা থামি বলে চিনি যে পোশাককে সে ধরণের। সেগুলো সঙ্গে কিছু যোগ-বিয়োগ আছে।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা উঁচু থেকে নীচের দিকে নামছিলাম। পাহাড়ী রাস্তার বাঁকেই সুন্দর সাজানো বাহারি ফুলের বাগান রয়েছে। বিচিত্র তাদের রং এবং আকার। বর্ষার দোপাটি ফুলের সঙ্গে অনেক মিল আছে। সেগুলো চিনা মাটির টব এবং মাটিতে লাগানো। একটা বিষয় খেয়াল করলাম, দেশে যেমন মাটি বা প্লাস্টিকের টব ব্যবহার করি, ভিয়েতনামের কোথাও তেমন টব নেই। সবই বিভিন্ন আকারের চিনা মাটির সাদা বা নীলচে সাদা রঙ্গের টব। কয়েক দিন সেখানে থেকে বুঝলাম, গড়ে দুই ফুট মাটি খুঁড়লেই পাথরের দেখা মেলে। মাটির চেয়ে পাথর বেশী সেখানে। তাই মাটির টব না বানিয়ে তারা পাথর দিয়েই এসব বানায়। পাথর, ঝরনা, সমুদ্র নানারকম প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ ভিয়েতনাম।

কৃত্রিম বাগান দেখে চলেছি গ্রামের পানে। গ্রামে যেতে ট্যুরিস্টদের টিকিট কাটতে হয়। গাইড কো তার দলের মাথা গুণে টিকিট করে ফেললো। যে গ্রামে যাচ্ছি তার নাম ‘ক্যাট ক্যাট’। যেখানে টিকিট কাউন্টার তার পাশেই বড় বিলবোর্ডে ট্রিপের ম্যাপ আঁকা রয়েছে।

চলবে