চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হো চি মিন এর দেশে ৫

দেশের বাইরে ঈদ উদযাপন

হা লং বে থেকে যেদিন হ্যানয় ফিরছি, সেদিন ভিয়েতনামে ঈদ উল আজহা। সেখানকার বাংলাদেশ হাউজে আমাদের ডিনারের দাওয়াত। আরো গেস্ট থাকবেন সেখানে। এ এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। গতবছরও ঈদ উল আজহায় দেশে ছিলাম না। থাইল্যান্ড বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে আত্মীয়-পরিচিত কেউ ছিল না। তাই ঈদের বিষয়টি মনে থাকলেও উদযাপন ছিল না। বেড়াতে বেড়াতে মনে হয়েছে পরিবারের অন্যদের কথা। কিন্তু এবার বিদেশে ঈদ উদযাপন।

বিজ্ঞাপন

বিকেল পাঁচটা নাগাদ হ্যানয় পৌঁছালাম। লক্ষ্য ট্রাভেল এজেন্সির অফিস। সেখানে পরের ট্রিপের বুকিং দেয়ার কথা রয়েছে। রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ এই ট্রিপের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এলাকার নাম সা পা। পাহাড়ী এলাকা। জুম চাষের জন্য বিখ্যাত। সমুদ্রের চেয়ে পাহাড় সবসময়েই আমাকে বেশী টানে। আমরা হ্যানয় থেকে দূরে ডা নাং শহর ভ্রমণের পরিকল্পনা বাতিল করে আগেই সা পা ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

আমাদের আগে ভিয়েতনাম সফর করেছেন এমন একজন ডা নাং শহর ঘুরে আসার জন্য বলেছিলেন। সেখানে হ্যানয় থেকে বাসে যেতে লাগে ১৭ ঘণ্টা আর প্লেনে ২ ঘণ্টা। কিন্তু সময়ের স্বল্পতায় ডা নাং সফর বাতিল করলেও সজল সা পা যেতে অবশ্য অত আগ্রহী ছিল না। সে হ্যানয় শহরই আরো খুঁটিয়ে দেখায় আগ্রহী ছিল। কিন্তু শহরের তুলনায় প্রান্তিক অঞ্চল আমার বেশী পছন্দ। আপার পরামর্শে আমি সজলকে সা পা যাওয়ার জন্য পঠালাম। সে রাজিও হলো। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী ট্রাভেল এজেন্সি অফিসে যাওয়া।

সফরের দ্বিতীয় দিন বাংলাদেশ হাউজে কয়েক ঘণ্টা ছিলাম। সেখানে ফিদেল আর রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজের দুই বাচ্চা খুবই আনন্দময় সময় কাটিয়েছে। তারা ফিদেলকে ছাড়তে চাচ্ছিলো না। আবার ফিদেলও তাদের সঙ্গে থেকে যেতে আগ্রহী। তখন আপা খুব করে বলেছিলেন আমরা যেন বাকি সময়টা রাতের বেলা বাংলাদেশ হাউজেই থাকি। তাতে বাচ্চারা ভাল সময় কাটাতে পারবে। ফিদেল এমনকি হা লং বে-তে থাকার সময়েও তাদেরকে মিস করছিলো।

এজেন্সি অফিসে সা পা ট্রিপের বুকিং দিয়ে আমরা জি পি এস ফলো করে হোটেলে ফিরলাম। কোনো ট্যাক্সি নেইনি। জিপিএস ফলো করে ১৫ মিনিট হেঁটে হোটেল পেয়ে গেলাম। ওই সময় ট্রাফিক খুব বেশী থাকায় ট্যাক্সিতে সময় বেশী লাগতো, অতিরিক্ত ভাড়াও গুণতে হতো। তাই হেঁটেই ফিরলাম। জার্নির ধকল থাকলেও কষ্টকর মনে হয়নি।

পরদিন সকাল সাতটায় আমাদের নিয়ে সা পা’র উদ্দেশ্যে বাস ছাড়বে। সাড়ে ৫ ঘণ্টার জার্নি। এক রাত দুই দিনের ট্রিপ। এজেন্সির কর্মকর্তা মহিলার কাছে জানলাম ট্রিপ শেষে হ্যানয় ফিরতে আমাদের রাত ১০টা বাজবে। এটা শুনে বাংলাদেশ হাউজে শিফট হওয়ার বিষয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লাম। সজলের সঙ্গে আলাপ করে ঠিক করলাম ডিনারের রাতটা বাংলাদেশ হাউজে থাকবো, কিন্তু সা পা থেকে ফিরে আবার হোটেলে উঠবো।

বিজ্ঞাপন

সেই রাতে হোটেলের রুম ফাঁকা আছে কী না খোঁজ নেয়া হলো। হ্যাঁ, আমাদের সৌভাগ্য যে, রুম আছে। সেই রুম বুকিং দিয়ে দুই লাগেজ থেকে দরকারী জিনিস একটায় নিলাম। অদরকারী জিনিসগুলো অন্যটায় চালান করে হোটেলে সেটি রেখে বাংলাদেশ হাউজের উদ্দেশে রওনা হলাম।

হোটেল থেকে বেশ দূরে বাংলাদেশ হাউজ। হোটেলের স্টাফ ট্যাক্সি ডেকে লোকেশন বুঝিয়ে দিলেন। তারা জানিয়ে দিলেন, অফিস ছুটির সময় হওয়ায় তখনো ট্রাফিকের চাপ রয়েছে। ট্যাক্সিতে চলার সময় আমি ফোনে জিপিএস চালিয়ে রাখতাম। তাতে বোঝা যেত ঠিক ট্রাকে চলছি কী না। বাংলাদেশ হাউজে যাবার সময় দেখলাম, ট্যাক্সি চালক রাস্তাঘাট খুব ভাল চেনেন। একটু ঘুরিয়ে হলেও ট্রাফিক জ্যাম এড়িয়ে আমাদেরকে গন্তব্যে পৌঁছে দিলেন।

তখনো অন্য কোনো অতিথি আসেননি। আমরাই প্রথম। সে সময় আপার লক্ষ্মী দুই বাচ্চা হোমওয়ার্ক করছে। ঈদের দিনেও তারা স্কুলে গিয়েছে। পরের দিনও তাদের স্কুল রয়েছে। তাই অতিথিরা আসার আগেই পড়াশুনা শেষ করতে হবে। আপাও সারাদিন নানান মিটিং শেষে হোমমেকারকে রান্নার ডিরেকশন দিতে দিতে গলদঘর্ম অবস্থা।

হ্যানয়তে সেদিন বাংলাদেশ দূতাবাসে ছুটি থাকলেও ভিয়েতনামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খোলা ছিল। পূর্ব নির্ধারিত মিটিং থাকায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। ঈদ এবং গুরুত্বপূর্ণ দিবসে বিশ্বের বড় বড় নেতারা শুভেচ্ছা জানিয়ে থাকেন। কিন্তু যে দেশের উৎসব সে দেশের প্রবাসী নাগরিকদের উৎসব উদযাপনে ছুটিছাটার বিষয়টা উপেক্ষিতই থেকে যায়।

সন্ধ্যা সাতটায় অন্য অতিথিরা এসে পড়লেন। তারাও বাংলাদেশি। অতিথিরা সেনা কর্মকর্তা। তারা সে সময়ে একটা এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে হ্যানয়ে অবস্থান করছিলেন। প্রোগ্রামে কর্মকর্তাদের স্ত্রীরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাই স্ত্রী-সন্তানসহ ভিয়েতনাম গিয়েছিলেন তারা। বাংলাদেশ দূতাবাসে অন্য কর্মকর্তারাও দাওয়াতে আমন্ত্রিত। সবাই একসাথে হওয়ার পর নিজেদেরকে এক টুকরো বাংলাদেশ মনে হচ্ছিলো। ব্যতিক্রমী ঈদ উদযাপান। বড়রা গল্পে ব্যস্ত আর ছোটরা খেলায় ব্যস্ত। ছোটদের মধ্যে একটু বড়রা টিভির সামনে অথবা মোবাইল ডিভাইসে।

পরদিন যেহেতু অফিস, স্কুল আছে তাছাড়া অন্য গেস্টরা হোটেলে/বাসায় ফিরবেন, সেহেতু ডিনারে বসার তাড়া এলো। তার আগে শুভেচ্ছা স্মারক বিনিময়ের পালা। ডিনারের পর ফটোসেশন। ড্রয়িং রুমের নানা কর্নারে ছবি তুললেও একটি কর্নারে ছবি তুলতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে হলো। একটি দেয়ালে সবার উপরে বঙ্গবন্ধুর ছবি, তার নীচে আমাদের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ছবি। ছবিগুলোর নীচে দেয়াল লাগোয়া সাইড টেবিলে স্মারক বই। পাশে বাংলাদেশের পতাকা। কূটনৈতিক আচারের অংশ হিসেবে এগুলো স্থাপন করা হলেও বিদেশের মাটিতে এই আয়োজন দেখলে বাড়তি আবেগ ভর করে। গর্বে মাথাটা একটু বেশী উঁচু হয়ে ওঠে। বিশ্বের সব দেশের নাগরিকের কি এই অনুভূতি হয়?

চলবে