চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘হৃদমা আমি আকাশে উড়বো, তোমাকে নিবো না’

জীবনের প্রথম এবং শেষবারের মতো আকাশে উড়েছিল আড়াই বছরের তামাররা প্রিয়ক। সেই আকাশে উড়া নিয়ে তার চোখে ছিল কতো স্বপ্ন, কতো কল্পনা। এইতো, প্লেনে ওঠার আগের দিনও আঙ্গুল উঁচিয়ে আকাশ দেখিয়ে সে বলেছিল, আমি ওই আকাশে উড়বো।

হ্যাঁ, তামাররা আকাশে উড়েছে ঠিকই। কিন্তু ফিরে আসেনি। সেই আকাশই এখন তার শেষ ঠিকানা, চিরসঙ্গী।

বিজ্ঞাপন

সোমবার নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় ইউএস বাংলার উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে বাবা এফ এইচ প্রিয়কের সঙ্গে মারা গেছে ছোট্ট এ শিশুটিও। এই ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়েছেন তামাররার  মা এনী প্রিয়কও।

নেপালে যাত্রা করার আগে কয়েকদিন কখনো মা-বাবার পেছনে, আবার কখনো স্বজনদের পেছনে ঘুরে ফিরে একটি কথাই বলেছিল তামাররা। আকাশে উড়বে সে। না ফেরার দেশে চলে যাওয়া শিশুটির ছবি তোলার ভীষণ নেশা ছিল। ফটোগ্রাফার বাবার হাতে তোলা অসংখ্য ছবি রয়ে গেলো ছবি হয়েই। বাবা আর মেয়ে একই সাথে চলে গেলেন পরপারে।

ইউএস বাংলার বিধ্বস্ত উড়োজাহাজে ৩২ বাংলাদেশির মধ্যে শ্রীপুরের নগর হাওলা গ্রামের যাত্রী ছিলেন প্রিয়ক দম্পতি এবং তাদের আড়াই বছরের মেয়ে তামাররা। এফ এইচ প্রিয়ক (৩২) আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত ফটোগ্রাফার, তার স্ত্রী অ্যানি প্রিয়ক (২৬)। একই উড়োজাহাজে ছিলেন প্রিয়কের মামাতো ভাই মেহেদী হাসান মাসুম (৩০), মাসুমের স্ত্রী সৈয়দা কামরুন্নাহার স্বর্ণা (২৫)।

প্রিয়ক গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার নগরহাওলা গ্রামের মৃত শরাফত আলীর একমাত্র ছেলে।

প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা ছোট্ট তামাররা অাধো আধো বোলে বেশিরভাগ কথাই বলতো ইংরেজিতে। আর তাই চাচারাও বলতো বড় হয়ে আমাদের তামাররা অনেক শিক্ষিত হবে। তামাররা তার নিজের আলোয় আলোকিত করবে পুরো বংশের মুখ। কিন্তু সেই অালোই নিভে গেলো চিরতরে।

তামাররা ছিল তার বাবা-মার একমাত্র সন্তান। তেমনি তার বাবা এফ এইচ প্রিয়কও ছিলেন তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। বছর ছয়েক আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান প্রিয়কের বাবা। প্রিয় সন্তান আর নাতনীকে হারিয়ে পাগলপ্রায় প্রিয়কের মা। সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলছেন বারবার।

ঘর আলো করে থাকা ছোট্ট শিশুটিকে হারিয়ে স্বজনদের কান্না যেনো থামছেই না। বাসার গৃহকর্মীটির সাথেও শিশুটির ছিল ভীষণ সখ্যতা। তাকে সে ডাকতো হৃদমা বলে। সেই হৃদমার কোলে ঘুরে গত কয়েকদিন শিশুটি শুধু একটি কথাই বলেছে, ‘হৃদমা আমি আকাশে উড়বো, আমি প্লেনে চড়বো, কত মজা হবে।’

সারদিনের সঙ্গী হলেও সেই হৃদমাকেই সে চায়নি প্লেনে নিতে। আর তাই যখনই হৃদমা তার সাথে প্লেনে চড়তে চাইতো তখনই শিশুটি বলতো: ‘তোমাকে নিবো না, তুমি ভয় পাবা।’

শিশুটির বাড়ির আশেপাশের প্রায় সবাই জেনে গিয়েছিল অল্পদিন বাদেই সে প্লেনে চড়ে তার বাবা-মায়ের সাথে নেপালে যাবে। প্রিয়জনদের কাউকে কাউকে প্রতিশ্রুতিও দিয়ে রেখেছিল উপহার আনার। কিন্তু সেই প্রিয় মুখটিই চলে গেছে সব প্রতিশ্রুতির ঊর্ধ্বে।

বিজ্ঞাপন

আর কোনদিনই খিলখিল করে হেসে উঠবে না ছোট্ট তামাররা। দাদির গলা জড়িয়ে ধরে গল্প শুনতে চাইবে না। চাচাদের দেখলে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলবে না, ‘চকলেট দাও।’ আর উপহার পাওয়ার পর মিষ্টি হাসি দিয়ে বলবে না, ‘থ্যাঙ্ক ইউ।’

জানা গেছে, নেপাল থেকে প্রিয়কের মামাতো ভাই সোমবার রাতে তার স্বজনদের সাথে ফোনে যোগাযোগ করেন।

তিনি জানিয়েছেন, ‘প্রিয়কের স্ত্রী অ্যানি ও স্বর্ণা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে প্রিয়ক ও তার মেয়েকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’

তবে নেপাল কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনায় নিহতদের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে; যেখানে তামাররা প্রিয়ক এবং তার বাবার নাম রয়েছে।

প্রিয়কের চাচাত ভাই লুৎফর রহমান চ্যানেল অাই অনলাইনকে বলেন: ভীষণ চঞ্চল ছিল শিশু তামাররা। হাসি আনন্দে ভরিয়ে রাখতো বাড়ি। যেখানেই যাবে সেখানেই ছবি তুলতে চাইতো।’

লুৎফর রহমান জানান: সোমবার ছয় দিনের ভ্রমণে নেপালে রওনা হন তারা। গত বছর থেকেই দুই পরিবার মার্চে নেপাল ভ্রমণের পরিকল্পনা করে আসছিল।

একই উড়োজাহাজটি ছিল আরেক শিশুর অনিরুদ্ধ জামান (৮)। অরণি বিদ্যােলয়ের এ শিক্ষার্থী তার বাবা রফিকুজ্জামান রিমু ও মা বিপাশার সাথে নেপালে বেড়াতে গিয়ে এ মর্মান্তিক ঘটনার শিকার হয়। বাবা-মায়ের সাথে নিহত হয় সেও।

সোমবার দুপুরে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

বিধ্বস্ত উড়োজাহাজটিতে ৬৭ যাত্রীর মধ্যে ৩২ জন বাংলাদেশি, ৩৩ জন নেপালি, একজন মালদ্বীপের এবং একজন চীনের নাগরিক। উড়োজাহাজটিতে ৬৭ যাত্রীর পাশাপাশি চার জন ক্রু ছিলেন বলে ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

৭৮ জন ধারণক্ষমতার বোমবার্ডিয়ার ড্যাশ ৮ কিউ৪০০ উড়োজাহাজটিতে ৩৭ জন পুরুষ ও ২৭ জন নারী ছাড়াও উড়োজাহাজটিতে ছিলো শিশু।

সোমবার দুপুর তিনটার দিকে ত্রিভুবন এয়ারপোর্টের কাছাকাছি এ দুর্ঘটনা ঘটে। বিমানটি ঢাকা থেকে ছেড়ে গিয়ে দুপুর ২টা ২০ মিনিটে নেপালে অবতরণ করার সময়েই দুর্ঘটনার শিকার হয়।