চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হুট করে বঙ্গবন্ধুর উপর ছবি করার ঘোষণা দেইনি: আশরাফ শিশির

সাক্ষাৎকার

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ট্রিলোজি নির্মাণ করবেন আশরাফ শিশির

সরকারি অনুদানে নির্মিত ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ছবি ‘গাড়িওয়ালা’ নির্মাণ করে আলোচনায় আসেন আশরাফ শিশির। ছবিটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ‘আমরা একটি সিনেমা বানাবো’ নামের চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যাচ্ছেন। যে ছবিটি দৈর্ঘ্যের দিক দিয়ে ‘ওয়ার্ল্ড রেকর্ড’ করতে চলেছে। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় ছবিটির দৈর্ঘ্য ২১ ঘন্টা! এছাড়াও ‘গোপন’ নামের আরেকটি ছবি নির্মাণ করেছেন আশরাফ শিশির। যা এরইমধ্যে বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে প্রতিযোগিতা করছে। এ বছরের শেষের দিকে প্রেক্ষাগৃহেও মুক্তি দেয়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি। তবে এসবের বাইরে সদ্য নতুন একটি চলচ্চিত্রের ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় আশরাফ শিশির। নতুন চলচ্চিত্রটি তিনি নির্মাণ করবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে নিয়ে। এসসমস্ত বিষয় নিয়েই চ্যানেল আই অনলাইনের মুখোমুখি এই নির্মাতা:

‘আমরা একটি সিনেমা বানাবো’ ছবিটি এই মাসেই সেন্সরে দেয়ার কথা শোনা যাচ্ছিলো। কী অবস্থা এখন?
এটা মোটামুটি ভাবে কমপ্লিট। ছবির শুটিংতো অনেক আগেই হয়েছে। এখন অডিও, কালার গ্রেডিং এগুলোর ফাইনাল কাজ চলছে আরকি। এটার প্রযোজক ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। তাদের সাথে কথা হয়েছে, ঈদের পর সব কাজ শেষ করে হ্যান্ড অভার করে দিবো। সম্ভবত এই মাসেই ছবিটি সেন্সর বোর্ডে জমা পড়তে পারে।

যতোদূর জানি, এই সিনেমার দৈর্ঘ্য ২১ ঘন্টা! সেন্সর বোর্ড এটা দেখে ধাক্কা খাবে না?
এটা শুধু সেন্সর বোর্ড না, ফিল্ম রিলেটেড হোক কিংবা ফিল্মের বাইরের কেউ হোক সে-ই এটা শুনে ধাক্কা খাবে। দেশের বাইরের মানুষও হয়তো ধাক্কায় খাবেন! মানে ধাক্কাটা হবে এটা নিশ্চিত। ছবিটি আসলে ২১ ঘন্টার। কিন্তু এসব ভেবেই আমরা বিকল্প চিন্তা করে রেখেছি। ২১ ঘন্টার ছবিকে আটটি চ্যাপ্টারে ভাগ করবো বলে ভাবছি। হতে পারে এটা চ্যাপ্টার ওয়াইজ রিলিজ হবে। সেক্ষেত্রে হয়তো সেন্সর বা অন্যান্যরাও ধাক্কা খাবেন না।

‘আমরা একটি সিনেমা বানাবো’র দৃশ্য…

সেটা ঠিক আছে। কিন্তু সেন্সর বোর্ডেরতো টানা একুশ ঘন্টা ছবিটা দেখতেও হবে! কী প্রসেসে জমা দিবেন বলে ভাবছেন?
হ্যাঁ। তাতো বটেই। এটাতো সেন্সর বোর্ডের দায়িত্ব। প্রেক্ষাগৃহে চালানো যাবে কিনা এ বিষয়ে সেন্সর বোর্ড অনুমতি দেয়। তো আমরা যখন ছবিটি প্রদর্শনের অনুমতি নিবো তখন আমাদের মূল উদ্দেশ্য থাকবে ছবিটি আমরা কীভাবে প্রদর্শনী করতে চাইছি। আমরা যদি ঠিক করি যে টানা একুশ ঘন্টায় ছবিটি রিলিজ দিবো, তাহলে সেন্সর বোর্ডেও আমরা একুশ ঘন্টার ছবি জমা দিবো। আর যদি মনে করি প্রেক্ষাগৃহের দর্শকদের কথা মাথায় রেখে ছবিটি মুক্তি দিবো, মানে ইন্টারভেলসহ চ্যাপ্টার অনুযায়ি দেই তাহলে সেন্সরবোর্ডেও সেভাবেই জমা দিবো। মানে এখনো চূড়ান্ত নয়, কিন্তু এটা একটা পথ হতে পারে।

চ্যাপ্টার অয়েতে না করলে টানা ২১ ঘন্টাতো পসিবল না…!
যেহেতু ‘আমরা একটি সিনেমা বানাবো’ একটি ছবি, প্রেক্ষাগৃহে একুশ ঘন্টা যদি নাও দেখাতে পারি তবে এটা নিশ্চিত এই ছবির প্রিমিয়ারটা আমরা টানা একুশ ঘন্টায় করার চেষ্টা করবো।

টানা একুশ ঘন্টা!
হ্যাঁ। টানা একুশ ঘন্টা! দুই তিন ধরে দেখলেন, তারপর ছবির সমালোচনা করে চলে গেলেন!

বহুদিন আগে ‘অ্যাম্বিয়েন্স’ নামের একটি ছবির ট্রেলার দেখেছিলাম ৭ ঘন্টা ২০ মিনিটের। ছবিটির দৈর্ঘ্য হবে ৭২০ ঘন্টা। যা মুক্তি পাবে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে। সেই হিসেবে দৈর্ঘ্যের দিক দিয়ে আপনার এই ছবিটি মোটামুটি আশাজাগানিয়া…!
এখানে একটু পার্থক্য আছে। অ্যাম্বিয়েন্স কিংবা এরকম যে লংগেস্ট ছবিগুলো আছে, এগুলো কিন্তু এক্সপেরিমেন্টাল। কিন্তু ‘আমরা একটি সিনেমা বানাবো’ একটি ফিকশন ফিল্ম। এটা আগাগোড়া ফিকশন। একইরকম ইনশিয়িটিভে, একইরকম ক্রু নিয়ে, একই রকম আর্টিস্ট টিম নিয়ে এরকম দৈর্ঘ্যের সিনেমা পৃথিবীতে হয়নি। এটা ওয়ার্ল্ড রেকর্ড। দিস ইজ নট অ্যা এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম, নট অ্যা মুভি সিরিজ, নট অ্যা ওয়েব সিরিজ এন্ড নট অ্যা ধারাবাহিক।

২১ ঘন্টার এই ছবি তাহলে সিনেমা হলে মুক্তির প্ল্যান কী?
ছবি মুক্তি নিয়ে আসলে পরিস্থিতি নির্ভর করবে অনেক কিছুর উপর। আগে দেখতে হবে এই ছবিটির কমার্শিয়াল ভেল্যু আছে কতোটুকু! তারপর ছবিটি আবার সাদাকালো। তো সিনেমা হলে কোন পদ্ধতিতে দেয়া যায়, নাকি সিনেমা হলে যাওয়ার আগে ছবিটি দেশের বাইরে কোনো ফেস্টিভাল ঘুরে আসবে কিনা এসব কিছু সিদ্ধান্ত নিবেন প্রযোজক।

আশরাফ শিশিরের ‘গাড়িওয়ালা’ ছবির একটি দৃশ্য

ঠিকাছে। এবার আসি আপনার নতুন সিনেমার ঘোষণায়। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সিনেমার ঘোষণা দিলেন। ছবির নাম রাখতে চাইছেন ‘৫৭০’। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর তাকে কাপড় কাচার সাবান ৫৭০ দিয়ে গোসল দেয়া হয়েছিলো। নামটা কি এজন্য?
বস্তুগত জায়গা থেকে ‘৫৭০’ নামটির উদ্ভব হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু বাঙালি জাতির জন্য ট্রাজিক একটা অধ্যায়। আমার তিনটা গল্প আছে তার নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে, তার মৃত্যুকে ঘিরে। এই তিনটা গল্প নিয়ে আমি ট্রিলোজি করতে চাই। এর প্রথম অংশটাই হচ্ছে ‘৫৭০’। যিনি একটা দেশের স্বাধীনতা এনে দিলেন, আমার ছবির যে ঘটনাটা তার কয়েক ঘন্টা আগেও যিনি রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন, অথচ তার যে প্রক্রিয়ায় অন্ত্যষ্টিক্রিয়া হয়েছিলো এটা হৃদয়বিদারক। এটা কেন ঘটেছিলো? স্বাধীনতা বিরোধীরা বার বার বলার চেষ্টা করেন যে বঙ্গবন্ধুর জানাজায় কোনো লোক হয়নি, অথচ অমুকের জানাজায় লাখ লাখ লোক হয়েছিলো! আসলে সত্যটা কী? কী ঘটেছিলো? এসবই আসলে আমি আমার নির্মিতব্য ‘৫৭০’ ছবিতে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

বঙ্গবন্ধুর পুরো জীবন নিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর সাধ্যি কিন্তু আমার নাই। আমার ছবিতে মূলত উঠে আসবে যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলো, তারপর ২৪ ঘন্টা! সবাই জানেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কাপড় কাচার সস্তা সাবান(৫৭০) দিয়ে শেষ গোসল করানো হয়েছিলো এবং রিলিফের কাপড় দিয়ে কাফন দেয়া হয়েছিলো। তখনকার সময়ে সেনাবাহিনী একটা হেলিকপ্টারে করে বঙ্গবন্ধুর লাশ টুঙ্গিপাড়া নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। কিন্তু তারা নামতে পারছিলেন না। কারণ নীচে হাজার হাজার মানুষ এসে জড়ো হয়েছিলো। তারপর পুলিশ দিয়ে প্রটেক করে তারা লাশ নিয়ে নেমেছিলো। তাদের উপর নির্দেশ ছিলো, যে কফিনে করে বঙ্গবন্ধুকে গোপালগঞ্জ নেয়া হয়েছিলো সেই কফিনসহ কবর দিয়ে ঢাকায় চলে আসতে হবে। আমি আমার সিনেমায় বঙ্গবন্ধু হত্যার চব্বিশ ঘন্টাকেই সিনেমায় তুলে ধরতে চাই। এজন্য এই ছবির নাম ৫৭০!

বঙ্গবন্ধু হত্যার চব্বিশ ঘন্টায় কি পারিপার্শ্বিক অবস্থাও দেখাবেন?
হ্যাঁ। বঙ্গবন্ধুর দাফন, কাফন নিয়ে ঘটনাগুলো দেখানোর পাশাপাশি আমি দেখাতে চাই সেই সময়ে আর্মি ক্যাম্পগুলোতে কী হচ্ছে, যারা এই ম্যাসাকারটার সঙ্গে জড়িত ছিলো তারা কী করছে, রেডিওতে কারা একাত্মতা প্রকাশ করছে এরকম বেশকিছু ঘটনা প্রবাহ ‘৫৭০’-এ দেখানো হবে। বঙ্গবন্ধুর পুরো জীবনী করতে গেলে যে পরিমাণ বাজেটের প্রয়োজন তা আমাদের নেই। তাছাড়া এটা শুনেছি বিদেশি কিছু নির্মাতারা হয়তো তার জীবনী নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করবেন, বা আমাদের দেশের যারা বড় নির্মাতা আছেন তারা করবেন। আমরা আগে ‘৫৭০’ টা করতে চাই। দেখি পারি কিনা! কারণ বঙ্গবন্ধুর বায়োপিক নিয়ে কাজ করার জন্য শুধু যে অনেক বেশি রিসার্চ আর অনেক প্রস্তুতির প্রয়োজন তা কিন্তু না, বিশাল বাজেটের প্রয়োজন। পিরিওডিক্যাল ফিল্মতো বিরাট আয়োজনের ব্যাপার। আপনি যে সময়ের গল্প দেখাচ্ছেন সেটাতো বাস্তব সম্মত করে দেখাতে হবে! নাটকের মতো কোনো কিছু একটা নির্মাণ করে ফেললেইতো আর হবে না।

বাজেটের প্রসঙ্গ যেহেতু আসলো, তাহলে বলি। ‘৫৭০’-এর প্রযোজক কে?
এই মুহূর্তে এই ছবির প্রযোজক আমি নিজেই। সামনে হয়তো আমরা আরো কিছু মানুষ বা কিছু প্রতিষ্ঠানকে এই কাজে যুক্ত করবো যেন কাজটি ঠিকঠাক আমরা করতে পারি।

‘বঙ্গবন্ধু’কে নিয়ে ত্রিলোজি নির্মাণের কথা বললেন। ‘৫৭০’ প্রসঙ্গেতো জানা হলো। বাকি দুটি নিয়ে বলুন…
এই মুহূর্তে বলা ঠিক হবে না। আগে ‘৫৭০’ সব ফাইনাল হোক। তারপর জানাবো।

২০১৯ সালের ১৫ আগস্টে মুক্তি দেয়ার চিন্তা করছেন ‘৫৭০’। এটা কম সময় মনে হচ্ছে না?
যেহেতু এটি একটি ইতিহাস নির্ভর ছবি, তাই বহু আগ থেকেই এটার উপর কিন্তু আমি রিসার্চ করছি। হুট করে কিন্তু আমি বঙ্গবন্ধুর উপর ছবি করার ঘোষণা দেইনি। হেলিকপ্টারটা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ঠিক কখন ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার দিকে উড়ছে, কতোক্ষণ লাগছে, হেলিকপ্টারটি কতোক্ষণ স্কুলের মাঠের উপর অবস্থান করছিলো এসব কিন্তু আমি জেনেছি, রিসার্চ করেছি। আমরা মনে করি, এক বছর আমাদের জন্য যথেষ্ট সময়। আগামী বছর ১৫ আগস্টের আগেই ছবিটি আমরা শেষ করতে পারবো।

চলতি বছরের ডিসেম্বরে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতে পারে আশরাফ শিশিরের ‘গোপন’

আপনার এই ছবিতে তৎকালীন আর্মি একটা বড় জায়গাজুড়ে রয়েছে। তো এই সময়ে এসে কীভাবে ডিল করবেন?
আমি স্বাধীন দেশের স্বাধীন একজন নাগরিক। আমি একটা গল্প নিয়ে ছবি বানাচ্ছি এবং সেই ছবিটা বানানোর জন্য যে প্রসেসগুলো আছে সব মেনেই করছি। মানে ছবি শুরুর আগে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সমিতিতে রেজিস্ট্রেশন করতে হয় এগুলো আমি করেছি। এখন ছবিটি নির্মাণের পর সেই ছবিটি দেশে প্রদর্শনে কোনো বাধা বিপত্তি আছে কিনা এ বিষয়ে সমস্ত দায়িত্ব নেয় তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধিনে ‘সেন্সর বোর্ড’। ছবি নির্মাণের ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র খসড়া নীতিমালা আমরা অনুসরণ করি। তারপরেও ‘৫৭০’ যেহেতু ইতিহাস নির্ভর ছবি তাই আমাদের ইচ্ছে আছে পুরো ছবিটি শুরু করার আগে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করার। কারণ সেই সময়ে যে হেলিকপ্টারটি বঙ্গবন্ধুকে বহন করে নিয়ে গিয়েছিলো তার মডেলতো আমার জানা নেই। এসব ব্যাপারে অবশ্যই তাদের হেল্প চাইবো। আর ছবিটির মাধ্যমে যেহেতু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমি সত্য প্রকাশেরও উদ্যোগ নিয়েছি তাই পুরো ছবিটি নির্মাণের আগে ছবির গল্পের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যাবো। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় কিংবা তথ্য মন্ত্রণালয়েও হয়তো সাজেশনের জন্য যাবো, স্ক্রিপ্টটা জমা দিবো।

FacebookTwitterInstagramPinterestLinkedInGoogle+YoutubeRedditDribbbleBehanceGithubCodePenEmail