চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হাতির দেশে কয়েক দিন

ব্যাংককের স্কাই টাওয়ারে ডিনার দিয়ে আমাদের সেদিনের বেড়ানো শেষ। এবার গাইডের সঙ্গে বিদায়ের পালা। কারণ পরদিন তিনি পর্যটকদের বড় একটা দল নিয়ে পাতায়া দ্বীপে যাবেন। তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেদিন ট্যাক্সিতে করে আমরা হোটেলে ফিরলাম।

বিজ্ঞাপন

ট্যুর গাইড জেনি
আমাদের ট্যুর গাইড জেনি সম্পর্কে কয়েকটা কথা না বললেই নয়। ৫৩ বছর বয়সী জেনি একজন ফ্রিল্যান্সার গাইড। ১০ থেকে ১২ বছর আগে তিনি থাইল্যান্ডের কোন একটা ট্যুরিজম এজেন্সির কর্মী ছিলেন। থাইল্যান্ডের দক্ষিণের এক প্রভিন্সের বাসিন্দা তারা। রাজধানী ব্যাংকক থেকে আট ঘন্টার দূরত্বে তাদের নিবাস। বাবা-মায়ের ছয় সন্তানের একজন জেনি। সবাইকে লেখাপড়া করানোর সামর্থ্য ছিলো না জেনির মা-বাবার। অগ্যতা হোটেলে চাকরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করেছেন জেনি। স্বামী পুলিশের কর্মকর্তা। সাধারণ মানুষ পুলিশ পছন্দ করে না বলে তিনি স্বামীকে সরকারি কর্মকর্তা বলে পরিচয় দেন। এক ছেলে, এক মেয়ের মা জেনি। মেয়ে পড়াশুনা শেষ করে কর্মজীবন শুরু করেছে। ছেলে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে।

পুলিশ স্বামী ব্যাংককের কোলাহল এড়াতে ব্যাংককের পাশের প্রভিন্সে পোস্টিং নিয়েছেন। পরিবারের চার সদস্য থাইল্যান্ডের চার জায়গায় বাস করেন। তবে তারা মাঝে মাঝে এক জায়গায় পারিবারিক সময় কাটাতে সমবেত হন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে ট্যুরিস্ট না থাকলে জেনি চলে যান স্বামীর কাছে। রিলাক্স করতে চাইলে আট ঘন্টা নিজে ড্রাইভ করে চলে যান মায়ের কাছে। বাবা মারা গেছেন সাত বছর আগে। গল্পে গল্পে জানা গেলো, প্রথম সন্তান জন্মের পর জেনি কাজ থেকে আড়াই বছরের গ্যাপ নিয়েছিলেন। পরে আবার শুরু করেছেন। মেয়ে জন্মের পর জেনির মা, বোন, বোনের মেয়েরা তাকে সহায়তা করেছেন। তাই কাজ ছাড়েননি। এই বয়সেও জেনি কাজ করে যাচ্ছেন, কারণ তিনি দিনের পর দিন অলস সময় কাটাতে চান না। ফ্রিল্যান্সার হওয়ার কারণে ইচ্ছে মতো কাজ করতে পারেন আবার রিলাক্স করতেও পারেন। জেনিকে নিয়ে এতো কথা বলার কারণ তার বয়সে আমাদের দেশের মায়েরা কী করেন? নাতি-নাতনীর সঙ্গে অবসর সময় কাটান। এই বয়সে আমাদের মা-খালারা ট্যুরিস্ট নিয়ে এ রাজ্য সে রাজ্য ঘুরছেন, দেশ দেখাচ্ছেন, দেশের ভালো-মন্দ বিদেশিদের কাছে উপস্থাপন করছেন, সকাল থেকে রাত অবধি ট্যুরিস্টদের সঙ্গে হাঁটছেন, ঘুরছেন সে কথা কি আমরা ভাবতে পারি। সে কারণে যুবতী দেখতে জেনির কাছ থেকে আমি উদ্যমী, গতিশীল মানুষ হতেই শিখি।

ট্যুর গাইড জেনির সঙ্গে আমরা

ব্যাংকে অবস্থানের চতুর্থ দিন আমাদের ঘুরাঘুরি নিজেরা নিজেরা। নো গাইড। সজল যেহেতু এর আগে চারবার থাইল্যান্ড গিয়েছে সে কারণে ব্যাংককের ট্যুরিস্ট জোন সম্পর্কে তার ভালো ধারণা আছে। তাই আমাদের মা-ছেলের কোন চিন্তা নেই! কিন্তু আগের রাত থেকেই ফিদেলের বাগড়া। সে কোথাও যাবে না। হোটেলে থাকবে। কারণ তার সুইমিং পুলে নামা হয়নি একবারও। অথচ রুমের জানালা দিয়ে তাকালেই কত মানুষকে সাঁতার কাটতে দেখা যায়! এতোটা মিস করা ঠিক হচ্ছে না। এটাই ফিদেলের বক্তব্য।

নদী তীরের মন্দির

ফিদেলের বাবা তার আবদারে কিছুটা দ্বিধান্বিত! কিন্তু আমি রুমে বসে কাটাবো না। আগের দিনেই জেনেছি, যে নদীর দুপাশে ব্যাংকক শহরের অবস্থান সেই ‘চাও ফ্র্যায়া’ নদীর পাড়ে রয়েছে ‘দ্যা গ্র্যান্ড প্যালেস’। ঘরে বসে না থেকে আমি প্যালেস দেখতে যেতে চাই। সকালের নাস্তার আগে পরে নানা যুক্তিতর্কের পর সকাল সোয়া ১০টায় আমরা হোটেল থেকে বের হলাম। সঙ্গে নিলাম ব্যাংকক শহরের ম্যাপ। সেখানে সুন্দর করে বেড়ানোর স্পটগুলো চিহ্নিত করা আছে। সঙ্গে  দেয়া আছে রাস্তার লোকেশন।

হোটেলের অভ্যর্থনার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের সঙ্গে পরামর্শ করে মেট্রোতে করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। কারণ মেট্রোতে খরচ কম। আর সবচেয়ে সাশ্রয় হয় সময়ের। আমি আর ফিদেল এই প্রথম মেট্রোতে জার্নি করবো। আগে কুয়ালালামপুরো মেট্রোরেল দেখলেও তাতে যাতায়াত করার সুযোগ হয়নি। আমাদের ঢাকা শহরেও মেট্রোরেল হচ্ছে। সবকিছু চিন্তা করে আগ্রহ কম নয়। মেট্রোতে অর্ধেক দূরত্ব পার করে আমাদের নদীপথে কিছু পথ যেতে হবে।
পরিকল্পনামতো চলতে থাকলাম। নদীতে জার্নি বেশ উত্তেজনাপূর্ণ। কারণ নদীটা খুব বেশি চওড়া না হলেও ঢেউ প্রচুর। ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকা চলে দ্রুত গতিতে। যেন জাহাজে চেপেছি। ইঞ্জিনের শব্দে কান পাতা দায়। নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে দেখলাম নদীর বাম পাশে থাই নৌবাহিনীর সদরদপ্তর। ডানপাশে গ্র্যান্ড প্যালেস। মিনিট তিনেক হেঁটে রাজবাড়িমতো দেখতে এক প্রাসাদে ঢুকলাম। প্রতিজনের টিকিট একশ বাথ। কিন্তু আমাদের গাইডের কাছে জেনেছিলাম, গ্র্যান্ড প্যালেসের টিকিটমূল্য ৫শ বাথ।

বিজ্ঞাপন

৪৬ মিটার দীর্ঘ বুদ্ধ

বিভ্রান্তি নিয়েই ঢুকলাম। কিন্তু ঢুকেই অভিভূত! বিশাল আকারের বুদ্ধ শুয়ে আছেন। প্রকাণ্ড বুদ্ধকে দেখতে দেখতে এবং ছবি তুলতে তুলতে জানলাম, ব্যাংককের সবচেয়ে পুরনো বৌদ্ধ মন্দির। এখানে মোট এক হাজার বুদ্ধমূর্তি রয়েছে। থাইল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া মন্দির থেকে এই মূর্তিগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। ১৭৮২ সালে রাজা রামা-১ এর শাসনকালে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। রাজা রামা-৩ এর শাসনামলে এই মন্দিরটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়। যা শেষ করতে সময় লাগে ১৬ বছর। ৪৬ মিটার দীর্ঘ ১৫ মিটার উচু গোল্ড প্লেটেড বুদ্ধমূর্তির জন্য এই মন্দিরটি বিখ্যাত। এটি গৌতম বুদ্ধের ঘুমন্ত অবস্থার মূর্তি। এছাড়া ৩২ মিটার উচু বুদ্ধমূর্তিও রয়েছে।

রাজার প্রাসাদ দেখতে গিয়ে আমরা ঢুকে পড়েছি মন্দিরে। কী যে সুন্দর তার দেয়াল, খিলান, ছাদের কারুকাজ! একটা থেকে আরেকটা সুন্দর-ছিমছাম। ঘুরতে ঘুরতে দেখলাম বিভিন্ন সময়ে থাই রাজা মন্দির পরিদর্শন করেছেন। সেসব ছবি সযতনে সাজানো রয়েছে। বুদ্ধমূর্তিগুলোর পাশাপাশি থাইল্যান্ডের ইতিহাসও বর্ণনা করা আছে। সবকিছু দেখে মস্তিষ্কে ধারণ করতে হলে ওই মন্দিরেই একদিন কাটাতে হবে।

মন্দিরের ১০ ভাগের এক ভাগ দেখার পর ফিদেলের উৎসাহ শেষ! তার আর ভালো লাগছে না। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দুপুরে হোটেলে ফিরতে হবে। হোটেলে ফিরে সে সাঁতার কাটবে। একইসঙ্গে তার ক্ষুধাও লেগেছে। যদিও আমরা জানি, ক্ষুধা তার অজুহাত, সে ফিরতে চায়।

তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আরো কিছুক্ষণ কাটালাম। মন্দিরের এখানে সেখানে অনেক দানবাক্স। দানবাক্সের গায়ে বিভিন্ন মন্দিরের নাম লেখা। ‘ওয়াট পো’ নামের মন্দিরের প্রবেশ পথে, এখানে সেখানে সতর্কবাণী লেখা ‘পকেটমার হইতে সাবধান’! হায় রে! দুনিয়ার কোথাও কী পকেট সাবধান না রেখে চলা সম্ভব না! অগত্যা পকেটে (ব্যাগে) চোখ রেখেই ঘুরলাম।
ওয়াট পো থেকে বের হয়েই খাবারের খোঁজ। ব্যাংককের কোথাও অবশ্য খাবার খুঁজতে হয় না। খাবার সামনে এসে হাজির হয়। ছিমছাম একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে লাঞ্চ সারলাম। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিলো পানীয়। তরমুজ, নারিকেল, আম তো আমরা হামেশাই খাই। কিন্তু সেগুলো পরিবেশনার গুণেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিলো। খেতে খেতেই আমরা স্মরণ করলাম, দেশের সবাই সেই সময় কোরবানী নিয়ে ব্যস্ত! এই প্রথম ঈদের দিনে দেশের বাইরে কাটালাম আমরা।

রাজার বাড়ি দেখতে বের হলেও তা না দেখেই ফেরার জন্য রওনা দিলাম। নৌকা জার্নি ফিদেলের পছন্দ হয়নি! তাই সে ট্যাক্সিতে বা টুকটুকে চেপে ফিরতে চায়। অগত্যা টুকটুকে চেপে মেট্রো স্টেশনে রওনা করলাম। ১০ মিনিটের মধ্যে টুকটুক চালক আমাদের গন্তব্যে নামিয়ে দিলেন। কিন্তু কোথায় মেট্রো স্টেশন! ফুটপাতে স্থানীয় একজনকে মেট্রো স্টেশনের কথা জিজ্ঞেস করতেই বললেন, সেখানে কোন স্টেশন নাই। আমরা তখনও প্রাসাদের ধারেকাছেই আছি। বুঝলাম আমরা ছোটখাটো একটা ‘ধরা খেয়েছি’। সেই লোকই বুঝ দেয়ার চেষ্টা করলেন, ভালো-খারাপ সব জায়গাতেই আছে।

রাজদরবার

ওই স্পট পার হয়ে আমরা আরেকটা টুকটুক নিলাম। এবার আর ধরা খেতে হয়নি। টুকটুক চালক মেট্রো স্টেশনের গোড়ায় নামিয়ে দিলেন। টিকঠাক হোটেলের ফিরলাম। ফেরার পথেই রাতের খাবার কিনে নিয়েছিলাম। কিন্তু মনটা খারাপ হলো একটা দৃশ্য দেখে। আমি একাই দেখলাম। ‘মেয়েমানুষ’ বলেই হয়তো চোখে পড়লো। এক মহিলা ফুটপাতে শুয়ে আছে। তার পাশ দিয়ে পানি গাড়িয়ে পড়ছে। সেটা আদতে পানি ছিলো না। সেটা ছিলো ইউরিন! মহিলা ঘুমাচ্ছে কিন্তু শরীরের উপর তার নিয়ন্ত্রণ নাই। উন্নত শহর ব্যাংককেও এই দৃশ্য দেখতে হলো।

গত কয়েক দিনেও খেয়াল করেছি ব্যাংককে ভিক্ষুক খুব কম। উন্নত শহরে হয়তো তাদের থাকারও অধিকার নেই! ঢাকায় যেমন কিছুকিছু এলাকায় ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। দুয়েকজনকে দেখেছি ফুটপাতে গান গেয়ে গেয়ে টাকা তুলছেন। ছিন্নমূল মানুষ ব্যাংককে হাতে গোনা।

এবার পাততাড়ি গোটানোর পালা। পরদিন ঢাকায় ফিরবো আমরা। তাই গোছগাছ শুরু। ফেরার দিন সকালে হোটেলেই নাস্তা সেরে নিয়ে আস্তে আস্তে রেডি হয়ে বেলা ১২টায় চেকআউট করলাম। ব্যাংককে এ কয়েক দিন ঘুরে মনে হলো: সহনশীলতা, নম্রতা, ধৈর্যশীলতা এই বৈশিষ্ট্যগুলো শিখতে পারি থাইল্যান্ড বা তার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে।