চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হাকালুকিতে মাছ মরে বাতাসে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ

চলতি বছরে অকাল বৃষ্টি ও আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহ এলাকার হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষিজমির বোরো ধান। ধানের ক্ষতির পর হাওরাঞ্চলের দ্বিতীয় সম্বল মাছও মারা যাচ্ছে।

মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা অংশের হাওরে নিমজ্জিত বোরো ধান পচে পানিতে বিষক্রিয়া সৃষ্টির  ফলে বড় মাছের পোনাসহ বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ মারা যাচ্ছে।

মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত  টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাকালুকি হাওর এবং তীরবর্তী এলাকার বোরো ধান তলিয়ে যায়।

শুক্রবার থেকে আধাপাঁকা বোরো ধান পচে গিয়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে  হাওরের পানি দূষিত হয়ে যায়। এতে ব্যাপক হারে হাওরের রুই, বোয়াল, আইড়, গ্রাসকার্প, কালিয়ারা, বাউশসহ বিভিন্ন প্রজাতির বড় মাছ ও ছোট মাছের পোনা মরে পানিতে ভেসে উঠেছে বলে স্থানীয়রা জানায়।

কৃষি ও মৎস্য সম্পদ সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ বছর হাওরে আগাম বন্যা দেখা দেওয়াই আধাপাঁকা বোরো ধান  পঁচে যায় এবং ধানক্ষেতে অতিমাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগের ফলে পানিতে বিষক্রিয়া সৃষ্টি হয়েই এটা হয়েছে।

মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ‘অকাল বন্যায় তলিয়ে যাওয়া এইসব আধাপাঁকা ধান ও ধানগাছ পঁচে পানির গুণাগুণ নষ্ট করেছে। এছাড়া ধানগাছ এবং ঘাস নিধনের বিষের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবে হঠাৎ পানির পিএইচ কমে গিয়ে স্বাভাবিক ৭ মাত্রা থেকে পিএইচ ৫.৮ মাত্রায় নামায় অ্যামোনিয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং দ্রবীভূত অক্সিজেন হ্রাস (৫ পিপিএম) হওয়ায় ধান ও মাছ পঁচে হাওরের পানি দূষিত হয়ে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।’

হাকালুকির চকিয়া বিলের ইজারাদার আনোয়ার হোসেন জানান, গত দুই বছর ধরে চকিয়া বিলে মাছ ধরা বন্ধ ছিলো। দুই বছরে  বিলে রুই, কাতলসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ১৫ লক্ষাধিক পোনা ছেড়েছিলেন তারা। চলতি বছরের শেষের দিকে আবার এই বিলে মাছ ধরা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও হাওরের পানি দূষিত হয়ে মাছ মারা যাওয়াই তাদেরকে  ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

তিনি আরও জানান, গত দুইদিনে হাওরের প্রায় কয়েক কোটি টাকার মাছ মরে গেছে। হঠাৎ হাওরে মাছ মরে পানিতে ভেসে ওঠতে দেখে সংশ্লিষ্ট মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের অবহিত করেন তারা।  উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা ও উপজেলা মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পানিতে চুনসহ বিভিন্ন ঔষধ প্রয়োগ করে পানি বিষমুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

বড়লেখা উপজেলার তালিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বিদ্যুৎ কান্তি দাস সোমবার  বলেন, ‘শনিবারের তুফানের পরই মাছ মরতে দেখা গেছে। পানির নিচে বোরো ধান পঁচে যাওয়ায় মাছ মরে যাচ্ছে। রোববার সবচেয়ে বেশি মাছ মরেছে এবং পানি দুর্গন্ধ হয়ে গেছে।’

কুলাউড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ জানান, ‘হাওরে আকস্মিক বন্যায় বোরো ধান পঁচে দূর্গন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং ধান ক্ষেতে অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পানি দূষিত হয়ে যায়। পানি দূষিত হয়ে যাওয়াই হাওরের মাছ মরে পানিতে ভেসে ওঠছে। আমরা হাওরের পানি বিষমুক্ত করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে স্থানীয় জেলেদের এখন মাছ না ধরার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।’

বড়লেখা উপজেলা ভারপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা আবু ইউসুফ বলেন, ‘সোমবার হাওর ঘুরে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে মাছ মারা যাবার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। হাওরের পানিতে প্রচন্ড গন্ধ। পানির রঙ বদলে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ১৫-২০ টন মাছ মারা গেছে।’

মৌলভীবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আকম শফিক-উজ-জামান  জানান, ‘কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী হাকালুকি হাওর এলাকায় চলতি বছরে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়। ধান আধাপাঁকা থাকা অবস্থায় পুরো হাওরের বোরো জমি পানিতে তলিয়ে যায়। ধান আধাপাঁকা থাকার কারণে পানিতে পঁচে গিয়ে দূর্গন্ধের সৃষ্টি হয়ে এ মাছ মারা যাচ্ছে।