চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

স্মৃতি পুরাণ প্রথম প্রেম এবং …

এক
ছোটবেলার এই এক দোষ যা কিছু দেখতাম তার সবই ভালো লেগে যেত।
ভালোলাগার সেসব বিষয় আবার লুকিয়ে চুরিয়ে রাখতে হতো যাতে কেউ জানতে না পারে।
মধ্যবিত্ত কালচারে ভালোলাগা না লাগার এই লুকোছাপার ব্যাপারটা মহামারি আকারে রূপ নিত।
আমার ছোটবেলাটা কেটেছে অনেকটা কাবলিওয়ালাদের মতো।
তারা সুদে টাকা খাটানোর জন্যে যেমন এদিক সেদিক দৌড়ঝাঁপ করত আমিও তেমনি ঘন ঘন আশ্রয়স্থল পরিবর্তন করার জন্য এদিক সেদিক দৌড়ঝাঁপ করতাম।
কখনো পুরান ঢাকা।
কখনো গ্রামে ফুফুদের বাড়ি
কখনো আজিমপুর কলোনি।
কখনো পূর্ব নাখালপাড়া।
কখনো দিক্বিদিক শূন্য…
আমার সেইসব দিনে মাথা গোঁজার অন্তহীন দুশ্চিন্তাময় ভোগান্তির দিনগুলোতেও কিছু কিছু ভালোলাগার ব্যাপার জীবনে ঘটেছিল।
তখন টেলিভিশনে দুর্দান্ত সব সিরিয়াল দেখানো হতো।
তখন আজিমপুর কমিউনিটি সেন্টারের টেবিল টেনিস রুমের পাশেই ছিল টেলিভিশন ঘর। তারপাশের রুমে সন্ধ্যের পর অনেক রাত অবদি মুরুব্বিরা গম্ভীর হয়ে কার্ড খেলতেন। কাচ্চু। ব্রে। রাশান ব্রে নাকি বিদঘুটে নামের কার্ড তারা খেলতেন। সারাদিন অফিস করে আসা বড়দের এই কার্ড খেলা আমার কাচে খুব ভালো লাগত। বড়দের কার্ড খেলা দেখে আমি ভাবতাম আমিও বড় হয়ে এদের মতো এরকম ভাব গম্ভীর পরিবেশে ভারিক্কি চালে কার্ড খেলব। পাকিয়ে পাকিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়িয়ে দিয়ে সিগারেট খাব।

বিজ্ঞাপন

দুই
খুব মনে আছে সিক্সে পড়ার সময় আমি প্রথম প্রেমে পড়েছিলাম লিন্ডসে ওয়াগনার নামের এক অদ্ভুত সুন্দর এক মহিলার। সাদা কালো ছবিতে কি যে অসহনীয় মায়াবি সুন্দর লাগত তাকে!
তারপর নাটক দেখে রিনি রেজা নামের এক সাদামাটা সুন্দরী মহিলার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম।
সেসময় নাটক দেখার কল্যাণে আমি ধারাবাহিকভাবে আরও কয়েকজনের প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছিলাম।

বিজ্ঞাপন

এইরকম করে একসময় গান শুনতে শুনতে ভয়ানক রকমের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম নাজিয়া হাসানের। নাজিয়া হাসান তখন মারমার কাটকাট এক ক্রেজের নাম।
নাজিয়াকে দেখে মনে হতো এ মেয়ে নির্ঘাত ভিন গ্রহ থেকে আসা কেউ।

তিন
ছোটবেলায় আজিমপুর কলোনিতে দেখতাম মহল্লার বড় ভাইদের যারা আমাদের দিনমান রাস্তাঘাটে বিনে পয়সায় প্রায় অকাতরে নীতি নৈতিকতার জ্ঞান দিয়ে হেদায়েত করতেন তাদের দেখতাম বিরহে উতলা হয়ে কমিউনিটি সেন্টারের দোতলায় ভোমা ভোমা ( ভোমা মানে বিশাল ) সাইজের সাউন্ড বক্সের মুখ তাদের ভালো লাগা কিংবা প্রত্যাখ্যাত প্রেয়সীদের বিল্ডিঙের দিকে তাক করে ফুল ভলিউমে নাজিয়া হাসানের গান ছেড়ে দিত,
শুন মেরে মেহবুব,
শুন মেরে শ্বাস
শুন মেরে গীত,
ডিসকো দিওয়ানি,
আপ জেয়সা কোই,
ডুম ডুম দি দি
লেকিন মেরি দিল
বুম বুম…
বড়দের সেই সব ভালো লাগার ছিটেফোঁটা উত্তরাধিকার সূত্রে আমাদের দিকেও ধাবিত হতো।
বড় হতে হতে এখন অনুভব করি ছোটবেলার প্রকাশ না করা অগুন ভালোলাগারা এখনো মনে দোলা জাগায়।

এখনো সময় পেলে পুরনো দিনের সেসব মানুষের কথা বলি।
তাদের ছবি দেখি।
তাদের গান শুনি।
ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। আমি যখন এসব দেখি বা শুনি তারা আমার দিকে অবাক নয়নে তাকায়। ভাইবোনরা নিজেদের মধ্যে কিসব বলাবলি করে। কখনো হাসে। ফরাসি সৌরভের মতো চোখেমুখে বিস্ময় জাগানো দৃষ্টি ছড়িয়ে আমাকে বলে, ছোটবেলায় তুমি এসব গানও শুনতা!
তাদের বিস্ময় জাগানো প্রশ্নের বিপরীতে আমি যুতসই কোনো জবাব খুঁজে পাই না।
কি জবাব দেব?
তারা জানে না ঐ বয়সে এসব ভালো লাগার কথা তাদের বাবা কাউকে বলতে পারত না। বলার মতো পরিস্থিতিও ছিল না।