চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সিয়াম সাধনা

ইসলামী শরীয়তের হুকুম-আহকাম পালনে পরকালের মুক্তির পাশাপাশি ইহকালীন কল্যাণও সাধন হয় যথেষ্ট। দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের ফলে একটি সুস্থ-সুন্দর জীবন অতিবাহিত করা যায়। আজ আধুনিক বিজ্ঞান তাই বলছে।

বিজ্ঞাপন

ইসলামের প্রতিটি কাজ গবেষণা করে বিভিন্ন সূক্ষ্ম তথ্য প্রেরণের মাধ্যমে আধুনিক বিজ্ঞান আমাদেরকে আশ্চর্যান্বিত করে তুলছে। বিশেষ করে সিয়াম তথা রোজার গবেষণা। মেডিকেল সাইন্স রোজা নিয়ে গবেষণা করে এমন কিছু তথ্য দিচ্ছে যা আমাদের জন্য ভাবনাতীত।

আনন্দের বিষয় হচ্ছে, বর্তমানে আধুনিক বিজ্ঞানীদের গবেষণার অন্যতম বিষয় রোজা। চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক ইবনে সিনা তার অনেক রোগীকে একাধারে তিন সপ্তাহ রোজা পালনের নির্দেশ দিতেন।

রোজা পালনের মাধ্যমে একজন মানুষের শরীরের বিভিন্ন উন্নতি সাধন হয়। বহু কঠিন রোগ দূরীভূত হয়। রোজা পালনের পূর্বের তুলনায় শরীরের যথেষ্ট উন্নতি হয়। সবকিছুই আমাদের জানতে হবে, বুঝতে হবে এবং উপলব্ধির চেষ্টা করতে হবে।

মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র:
সিয়াম সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের উপর। ফলে তা উজ্জীবিত এবং উর্বরতা লাভ করে। এর মাধ্যমে মানুষের ধ্যান-ধারণা, মানসিকতা সুন্দর হয় এবং স্নায়ুবিক বিষন্নভাব ও দুর্বলতা দূরীভূত হয়। যার দরুন মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহের স্বাভাবিক ভারসাম্য সৃষ্টি হয়, যা সুস্থ স্নায়ুবিক প্রক্রিয়ার পথ প্রদর্শন করে এবং সূক্ষ্ম অনুকোষগুলো জীবাণুমুক্ত ও সবল রাখে (সুন্নতে রাসুল ও আধুনিক বিজ্ঞান)। রোজা মানুষের মানসিকতা নান্দনিক করে তোলে। স্মৃতিশক্তির প্রখরতা বৃদ্ধি পায়।

বিজ্ঞাপন

এ ব্যাপারে ডা. আলেক্স হেইগ বলেন, ‘সিয়াম হতে মানুষের মানসিক শক্তি ও বিশেষ বিশেষ অনুভূতিগুলো উপকৃত হয়। স্মরণশক্তি বাড়ে, মনঃসংযোগ ও শক্তি পরিবর্ধিত হয়।’ (মাহে রমজানের শিক্ষা ও তাৎপর্য: অধ্যাপক সাঈদুর রহমান)

ডায়বেটিস ও গ্যাসট্রিক প্রতিরোধ:
রোজা পালনের মাধ্যমে মানুষের অতিরিক্ত ওজন দুর হয় এবং স্বাভাবিক ওজনে ফিরে আসতে পারে। পাশাপাশি বিপাকক্রিয়া শক্তিশালী হয়। এর ফলে সিয়াম পালনকারী ব্যক্তির ডায়বেটিস প্রতিরোধের ক্ষমতা অনেকাংশে বেড়ে যায়। যারা নিয়মিত গ্যাসট্রিকের যন্ত্রণায় ভোগে তাদের সাথে আলোচনা করে জানা গেছে, রমজানে শরীরে acidity স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকে। ফলে রমজান মাস চলাকালীন তাদের গ্যাসট্রিক যন্ত্রণা দুর হয় এবং বিরামহীনভাবে এক মাস রোজা পালনের ফলে রমজানের পরবর্তী বহুদিন তাদের গ্যাসট্রিকের সমস্যা থাকে না।

হৃদপিণ্ড ও ধমনীতন্ত্র:
মানবদেহে অতিরিক্ত মেদ বা চর্বির কারণে রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল হলে হৃদপিণ্ড, ধমনীতন্ত্র ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভয়াবহ রোগ সৃজনের মাধ্যমে ব্যক্তিকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করে। কিন্তু নিয়মিত রোজা পালনের ফলে দেহে অতিরিক্ত মেদ-চর্বি হয় না এবং রক্তের কোলেস্টেরলের পরিমাণ স্বাভাবিক থাকে।

পাকস্থলী ও অন্ত্র:
যকৃত ও পাকস্থলীর অবস্থান পাশাপাশি। বিভিন্ন ভেজাল খাদ্যের প্রভাব যকৃতের উপর পড়ে। আর পাকস্থলীর ভিতরে অনায়াসে বিভিন্ন প্রকার খাবার হজম হয়। হজম হলেও সারাদিনে বিভিন্ন প্রকার খাবারের ফলে এক প্রকার ক্ষয় হয়। সাথে সাথে পাকস্থলীর আয়তনও বৃদ্ধি পায়। আর এই আয়তন বর্ধিত হওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর (শরীর বিদ্যা)। কিন্তু দীর্ঘ একমাস রোজা পালন পাকস্থলীকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে। এবং পাকস্থলীকে খাদ্যমুক্ত বা বিশ্রামে রাখে। এতে করে পাকস্থলীর ক্ষয় পূরণ ও পুনর্গঠন হয়। যা প্রতিটি মানুষের সুস্থতার জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। (স্বাস্থ্য বিজ্ঞান ও ইসলাম: ডা. গোলাম মোয়াযযম)

জিহ্বা ও লালাগ্রন্থি:
জিহ্বা মানবদেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। জিহ্বায় অসংখ্য কোষের সমন্বয়ে স্বাদ নলি রয়েছে। এসব নলি দ্বারাই খাবারের বিভিন্ন স্বাদ গ্রহণ করা যায়। আমরা দৈনন্দিন বিরামহীন খাবারের ফলে স্বাদ গ্রহণের এসব নলিতে ফাটল সৃষ্টি হয়। যা স্বাদ গ্রহণে বাঁধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রোজা পালনের ফলে জিহ্বা ও লালাগ্রন্থিগুলো বিশ্রামের সুযোগ পায়। জিহ্বার অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাদ নলিকাগুলো সতেজতা ফিরে পায় এবং খাবারের প্রতি রুচির প্রবণতা ফিরে আসে।

মনের প্রতিক্রিয়া:
শারীরিক বহু রোগ-ব্যাধির অন্যতম কারণ মানসিক অশান্তি বা অমানবিক পীড়া। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা তাই-ই মনে করেন। রমজান মাসে একাধারে রোজা পালনের ফলে রোজা পালনকারী মানসিক শান্তি লাভ করে। মস্তিষ্ক সর্বদা শীতল ও স্বাভাবিক থাকে। এতে মানসিক অশান্তির সম্ভাবনা একেবারেই শূন্য। রোজা পালনকারীর মন সর্বদা পবিত্র চিন্তায়ই ব্যস্ত থাকে। এতে মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি পায়। সেজন্যই রোজা পালনকারীর মানসিক অশান্তির কারণে কোনো রোগ হবার সম্ভাবনা থাকে না।

এভাবে রোজা আমাদের শরীরের বিভিন্ন ভয়াল রোগ দূরীভূত করে। শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। বলা যায়, মুসলমানদের সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে যায় পবিত্র মাহে রমজান। আমার এ ছোট্ট প্রবন্ধের ইতি টানব একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের মাধ্যমে। ১৯৫১ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের বিশ জন চিকিৎসক মিলে গবেষণা করে বলেছেন, “রোজা গ্যাসট্রিক আলসার ও পেট ব্যাথার আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। পুরো বৎসরে যে সমস্ত জৈব বিষ দেহের ভিতর জমা হয়, সেসব বিষাক্ত জৈব রোজার মাধ্যমে জ্বলে, পুড়ে রক্ত পরিষ্কার করে। ফলে শরীর বিষমুক্ত হয়।”