চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

স্বপ্নের মানুষেরা

জীবনে গর্ব করার মতো যদি কোনো কিছু করে থাকি, তবে সেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া। ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখিনি কখনো। কারণ আমি লেখাপড়ায় চরম ফাঁকিবাজ। একটাই স্বপ্ন ছিলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বো। কোন বিভাগে পড়বো তাও ঠিকঠাক ভাবিনি। সৌভাগ্যবশত ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করলাম। আমার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুয়ার খুললো। আমি পছন্দ করলাম গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ। ভর্তির আগে এ বিভাগ সম্পর্কে অল্পস্বল্প জানতাম। এ জানা পারিবারিক কারণে। সে অবশ্য অন্য গল্প। এখানে সেসব খুব প্রাসঙ্গিক না। ক্লাস শুরু করার পর বুঝলাম, বিভাগ সম্পর্কে আমার জানার পরিসর ছিলো খুব সামান্য।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া স্বপ্ন হলে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিমণ্ডলে নিজের বসবাস একরকম স্বপ্নে বাস করার মতো। আগেই শুনেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরই বিশাল। কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই বোঝা যায় পড়ার সুযোগ পেলেও সেখানে আমি ধূলিকণার সমান। ছিলামও তাই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের যে বিভাগে পড়ি, সেখানকার শিক্ষক, চরম মেধাবী সব শিক্ষার্থীরা আমার কাছে স্বপ্নের মানুষের মতোই। এ কথার মধ্যে এক চুলও অতিরঞ্জন নেই।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের নাম তখনও অত সুপরিচিত নয়। কেবল ঢাকা আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েই এ বিষয়টি পড়ানো হতো। এখন ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন। ক্লাস শুরুর পর একেকজন শিক্ষক আমার কাছে একেকটা বিস্ময়ের নাম।

অধ্যাপক কিউ এ আই এম নুর উদ্দীন, অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান, অধ্যাপক গোলাম রহমান, অধ্যাপক আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলী, অধ্যাপক সিতারা পারভীন, অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, অধ্যাপক শামসুল মজিদ হারুন, অধ্যাপক শাহেদ কামাল, অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিনসহ অন্যরা। আমরা অনার্স শেষ করার পর একঝাক নতুন শিক্ষক এই বহরে যোগ হয়েছিলেন।
সকল শিক্ষক সম্পর্কে ছোট্ট পরিসরে অভিজ্ঞতা বিনিময় সম্ভব না। আজ কেবল দু’জন শিক্ষক সম্পর্কে লেখার চেষ্টা করছি। পরম শ্রদ্ধেয় এ শিক্ষকরা আমার চোখে এখনও স্বপ্নের মানুষ। শিক্ষক পারিবারের সদস্য হওয়ায় শিক্ষকদের সম্পর্কে আমার জানাশোনা আর সবার চেয়ে কিছুটা হলেও আলাদা। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ তার সাধ্যমতো আয়োজনে দুই শিক্ষকের অগ্রায়ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলো।

প্রথমে বলি আহাদুজ্জামান স্যারের কথা। প্রথম যেদিন তাঁর ক্লাস করেছি সেদিন থেকেই আমার বদ্ধমূল ধারণা, তিনি একজন ধ্যানী মানুষ। যিনি জ্ঞানের আরাধনা করেন। আমি আহাদ স্যার সম্পর্কে এখনও সেই ধারণাই পোষণ করি।

আজকের অগ্রায়ন অনুষ্ঠানে স্যারের সাবেক শিক্ষার্থীরা তাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি খুলে বসেছিলেন। তাদের অভিজ্ঞতা জেনে আমার বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয়েছে। যদিও নিজের বক্তব্যে আহাদ স্যার দাবি করেছেন, তিনি কেবলই শিক্ষকসুলভ আচরণ করা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করেছেন। ক্লাসরুমের সঙ্কট থাকায় তিনি বটতলায় ক্লাস নিয়েছেন, কলাভবনের করিডোরে ক্লাস নিয়েছেন, এমনকি গ্রন্থাগার ভবনের সামনে কোনো একটা টপিক শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

কলাভবনের করিডোরে ক্লাস করা সেই সৌভাগ্যবান শিক্ষার্থীদের একজন আমি। আমরা তখন তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। দ্বিতীয় বর্ষে আহাদ স্যার আমাদের যে কোর্সটি পড়াতেন তার নাম ছিলো ‘বাংলাদেশ কালচার এন্ড হেরিটেজ’। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই তার লেকচার শুনতো মন্ত্রমুগ্ধের মতো। তো তৃতীয় বর্ষে কোনো একটা ক্লাস শেষ করে আমরা করিডোরে জড়ো হয়েছি। আহাদ স্যার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ থেমে গেলেন। বললেন, এই তোমরা থার্ড ইয়ারে পড়ো না? বললাম, জ্বী স্যার। তিনি বললেন: একটু দাঁড়াও। গত বর্ষে তোমাদের কোর্সে একটা বিষয় বাদ পড়ে গেছে, সেটা সংক্ষেপে বলে দেই। আমরা ফাঁকিবাজের দল পালানোর অপচেষ্টা করলে কী হবে! তিনি ৪০ মিনিট ওই বিষয়ের উপর কথা বলে তারপর ছাড়লেন। এই হচ্ছেন আমাদের আহাদ স্যার।
চেয়ারপারসনের দায়িত্বে থাকার সময়ে কলা ভবনের পাশের মল চত্বর থেকে শিক্ষার্থীদের ধরে এনে ক্লাসে বসিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা সেখানে ক্রিকেট খেলছিলো। ক্লাস শিক্ষকের আসতে কয়েক মিনিট দেরি হয়েছিলো সেদিন। এই অবসরে দলেবলে মল চত্বরে গিয়ে ক্রিকেট শুরু করেছিলো আমাদের দু’ব্যাচ জুনিয়র শিক্ষার্থীরা। ক্লাস টিচার এসে দেখেন কেউ নেই। আহাদ স্যার ঠিকই খুঁজে খুঁজে মল চত্বর থেকে তাদের ধরে আনলেন।

আবার একদল সেন্ট্রাল লাইব্রেরির বারান্দায় কার্ড খেলার আসর বসিয়েছে। তিনি হয়তো পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। কার্ডের আসর থেকে উঠিয়ে তিনি তাদের ক্লাসে পাঠাতেন। কলাভবনের সিঁড়িতে বসা দেখলেও একই কাজ করতেন আহাদ স্যার। অমনোযোগী শিক্ষার্থীদের পড়ায় মন বসানোর চেষ্টা তার একরকম যুদ্ধ ছিলো। এমন একজন শিক্ষককে কি বিদায় বলা যায়! গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ কি আরেকজন আহাদুজ্জামান স্যারকে পাবে?

পড়ালেখার পাঁচ বছরে আমরা শিক্ষকদের কেবল পড়ানোই পর্যবেক্ষণ করতাম না। তাঁরা কেমন করে কথা বলেন, কেমন করে হাঁটেন, কেমন পোশাক পরেন, সবকিছু খেয়াল করতাম। শামসুল মজিদ হারুন স্যারের হাতে হার্ট শেইপের একটা চাবির রিং থাকতো আমরা সেটাও খেয়াল করতাম। সেসব নিয়ে ক্লাসের ফাঁকে আলোচনা করতাম।

পড়ালেখার বাইরে আমাদের চোখে ফ্যাশন আইকন ছিলেন সিতারা আপা আর আখতার সুলতানা আপা। সিতারা আপার শাড়ী থেকে ছাত্রীদের চোখ সরতো না। আর ছিলো আখতার সুলতানা আপার সামগ্রিক স্টাইল। পড়ানোর বাইরে সকল শিক্ষার্থীর মানসিক আশ্রয় ছিলেন আখতার সুলতানা আপা। বন্ধুদের কেউ বড় কোন দুষ্টুমি করেছে সে কথা অকপটে বলার মানুষ তিনি।

অদৃশ্য এক মাতৃত্ব টের পাওয়া যায় আখতার সুলতানা আপার মধ্যে। অগ্রায়ন বক্তৃতায় সেকথাই বললেন শ্রদ্ধেয় আপা। তাঁর দৃষ্টিতে, বিভাগের পড়তে আসা বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই ঢাকার বাইরের। তারা এই প্রথম পরিবার ছেড়ে বাইরে থাকছে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের মন নরম থাকে। বড় শহরে এসে অনেকখানি অসহায় বোধ করে। হলে, মেসে থাকে, খাবারটাও মানসম্মত থাকে না। সে কারণে তিনি শিক্ষার্থীদের একটু বাড়তি খোঁজ খবর রাখার চেষ্টা করতেন। চরম মানবিকবোধ না থাকলে শিক্ষার্থীর এ বিষয়গুলো এমন দৃষ্টিতে দেখা সম্ভব না।

অগ্রায়ণ অনুষ্ঠানে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সময় সাবেক প্রত্যেক শিক্ষার্থী একবাক্যে আখতার সুলতানা আপার এই মহত্বের কথা বলেছেন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। এমন কৃতজ্ঞতা অর্জন একদিনে সম্ভব না। চাইলেও এমন একজন আখতার সুলতানা হওয়া সম্ভব না।

অগ্রায়নের দিনে পরম শ্রদ্ধেয় দুই শিক্ষকরে প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ নিচ্ছি। এমন শিক্ষকদের সাহচর্যে, পরামর্শে, দিক নির্দেশনায় চরম কঠিন পৃথিবীতে নিজের পথটুকু চিনে নিতে পেরেছি। এই শিক্ষকদের গুরুদক্ষিণা দেয়ার সামর্থ্য অর্জন করতে পারিনি। তবে তাঁদের জন্য রয়েছে অকৃত্রিম ভালবাসা এবং শ্রদ্ধা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)