চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সুরে, ছন্দে মাখামাখি ফোকফেস্টের রাত

তৃতীয় বারের মতো রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে জমে উঠেছে ঢাকা আন্তর্জাতিক ফোসফেস্ট। প্রথম দিনে আসরের পরিবেশনায় ছিল বাংলাদেশের বাউলিয়ানা, বাউলশিল্পী ফকির শাহাবুদ্দিন, তিব্বতের শিল্পী তেনজিন চো’য়েগাল, ব্রাজিলের মোরিসিও টিজুমবাহ ও সেক্সটেট এবং আসামের বিখ্যাত শিল্পী পাপন-

লালন হাছনে ‘বাউলিয়ানা’র মাতামাতি:
বাউলিয়ানা মঞ্চে উঠে সম্রাট লালন সাঁইজির ‘ধন্য ধন্য বলি তারে’ গান দিয়ে মাতিয়ে দিলেন দর্শক-শ্রোতাদের প্রথমেই। মানুষ বাংলার গানে ছন্দে জমজমাট পরিবেশের আমেজে ভেসে যাচ্ছিলো। বাউলা কে বানাইলো রে – সিলেট অঞ্চলের হাছন রাজার গানও নিয়ে এল বাউলিয়ানা। এইভাবে একের পর এক বাউল গানে মেতে উঠলো শ্রোতারা বাউলিয়ানার সাথে সাথে।

আত্মসমর্পণের গানে মাতালেন ফকির শাহাবুদ্দিন:
বাউলশিল্পী ফকির শাহাবুদ্দিন মঞ্চে উঠেই বলেন ‘বাউল গানের প্রথম কথাই হচ্ছে আত্মসমর্পণ করা। ঐ মালিকের কাছে।’ আত্মপ্রেম এর মধ্য দিয়ে দয়ালের কাছে আত্মসমর্পণের গান দিয়েই শুরু হয় তাঁর পরিবেশনা। বাঁশির সুরের ঘোরে মাতেন দর্শক তখন। শিল্পীর গলায়
“আমি পাপী আমি গুনাহগার।
নিজ গুণে কর ক্ষমা আমারে…
দয়া কর আমারে… ওহে দীনবন্ধু।
দয়া কর আমারে!”
দূরবীন শাহ-এর গান শুরু করেন শিল্পী “জ্ঞানের সাগর দূরবীন শাহ, রসের সাগর করিম শাহ…” এই কথা বলার মধ্য দিয়ে। আর তারপর সেই বহু প্রচলিত গানে দর্শক মাতোয়ারা। যখন শিল্পীর গলায় শোনা যায়- ‘বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরীতি শিখাইছে… কী জাদু করিয়া বন্দে মায়া লাগাইছে!’ এরকম একের পর এক গানে বাউল গানের ভক্তদের সাথে নিয়ে আসর জমিয়ে রেখেছিলেন শিল্পী ফকির শাহাবুদ্দিন।

‘গ্রামের নজোয়ান হিন্দু-মুসলমান মিলিয়া বাউলা গান আর ঘাটু গান গাইতাম,
আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম…’ – এই গানের রেশ রেখে শেষ করলেন শিল্পী তাঁর পরিবেশনা।

পাহাড়ের সুরে ভাসালেন তিব্বতের শিল্পী তেনজিন চো’য়েগাল:
তিব্বতের এই শিল্পী তাঁর পরিবেশনা শুরু করেন ‘হাকসূত্র’ শিরোনামের গান দিয়ে,শিল্পী ইংরেজি অনুবাদে বুঝিয়ে দিলেন এ গান বলে যায় ‘gone gone gone beyond gone for the beyond …’। শান্ত ধীর লয়ে সুর যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল এ গানের শুরুতে। ধ্যানমগ্ন হয়ে যাওয়ার মতোন এক আবেশে! গুন গুন করেই শুরু হয় গান। গানের মাঝে শিল্পী কথা বলছিলেন দর্শক-শ্রোতার সাথে, জানাচ্ছিলে এটাই তাঁর প্রথম সফর বাংলাদেশে। জানাচ্ছিলেন হিন্দি বলতে পারলেও বাংলা বলতে পারেন না তিনি। দালাই লামা-র লেখা গান গাওয়ার আগে ভালোবাসার সেই গানের কথা জানিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি। বলছিলেন – ‘drops of rain wash away the love songs.. Written on the sand … but love though unwritten remains long after in the heart…’
এইভাবে একের পর এক গানে ভালোবাসায় আবেগে মানুষ খুঁজে পায় সুরে সুরে মিলনের আভাস। একই বিষণ্নতা একই আবেগ আর অনুভূতি কথা বলে যায় দেশের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের মনে মনে!

ড্রামের উন্মাতাল ছন্দে ব্রাজিলের মোরিসিও টিজুমবাহ এবং সেক্সটেট:
ব্রাজিল থেকে এসেছেন মোরিসিও টিজুমবাহ এবং সেক্সটেট। ব্রাজিলিয়ান এই শিল্পী একের পর এক গেয়ে যাচ্ছিলেন। শিল্পী এবং তাঁর দল গাইছিলেন ড্রামের ছন্দের তালে তালে। ভাষা পৃথক, অজানা-অচেনা। কিন্তু ছন্দ সুর আর তালে তালে মানুষ একাত্ম হল গানের সাথে। মঞ্চ ছাড়ার আগে শিল্পী তাঁর নিজস্ব ভাষায় বললেন ‘এও চি এমো’ যার অর্থ আমি তোমাদের ভালোবাসি। আর বাংলায় বললেন – ‘আমি বাংলা ভালোবাসি।’

আসামের পাপন-এ শ্রোতারা উচ্ছ্বসিত:
আসামের শিল্পী পাপন-এর জন্য আগ্রহ খানিকটা বেশিই ছিল দর্শক-শ্রোতার। বোঝাই যায় পাপনের মঞ্চে আগমনে দর্শকের উচ্ছ্বাসে। মূলত শিল্পী পাপন ফোক গানের ফিউশনের জন্যই জনপ্রিয়। শিল্পী পাপন বাংলাতেই কথা শুরু করলেন। জানালেন ধন্যবাদ বাংলাদেশকে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। আসামের একটা গান দিয়ে শুরু হল তাঁর পরিবেশনা। আসামের গানের সুরে বাংলার সুরের স্বাদ ভেসে এল। শিল্পী পাপন গানের মাঝে মাঝে বললেন জীবনকে দেখতে, জানতে। তরুণদের বলে দিলেন – ফেসবুকে কী হচ্ছে, কে কী বলে দিল তাই জীবন নয়, জীবন তোমার চারপাশে তাকে দেখো, জানো।

গাইলেন ‘ও জিলে ও জিলে ও জিলে ও বান্দে আপ…’ বললেন জীবনকে যাপন করতে হবে উপভোগে, আনন্দে!
আসামের শিল্পী পাপন গাইলেন বাংলা গানও। উচ্ছ্বাসপূর্ণ পাহাড়ের গানের সুরে ছন্দে ঝুমুর নাচের ছন্দের তালে শিল্পী পাপন আর্মি স্টেডিয়ামের দর্শকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিলেন নাচের ছন্দ।

এসমস্ত আয়োজনের মাঝে মাঝে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের দেশ সম্পর্কে অডিও-ভিজ্যুয়াল তথ্যচিত্র দেখানো হয়েছে অনুষ্ঠানের মাঝে মাঝে স্ক্রিনে। এই তথ্যচিত্রে দেশগুলোর জনগোষ্ঠী-শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে মূল তথ্যগুলো উঠে এসেছে। উঠে এসেছে নানান দেশের নানান বাদ্যযন্ত্রের কথাও। তবে এ তথ্যচিত্র আরও নান্দনিকভাবে উপস্থাপিত হতে পারতো, এর নির্মাণ হতে পারতো অধিক নান্দনিক। সর্বোপরি আনন্দে গানে সুরে মানুষ কাছে এল মানুষের। বাঙালি উৎসবপ্রিয় জাতি। আর গানের উপলক্ষ্যে মানুষ এসে জমছে মানুষের মাঝে, মঞ্চের কাছে, ময়দানে। এটিই সবচে ইতিবাচক দিক এই অস্থির সময়ে নিঃসন্দেহে।

উৎসবের দ্বিতীয় দিনে গান পরিবেশন করবে লোকসঙ্গীতের দল বাউলা। একক কণ্ঠে গান শোনাবেন দেশের দুই শিল্পী আরিফ দেওয়ান ও শাহজাহান মুন্সি। এদিনের পরিবেশনায় আরও অংশ নেবে নেপালের লোকগানের দল কুটুম্বা, পাকিস্তানের দল মিকাল হাসান ব্যান্ড। অন্যেদিকে এই দিনের বিশেষ আকর্ষণ দুই বোনের ভারতীয় দল ‘নুরান সিস্টার্স’।