চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সিরিয়াল কিলার

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপরিচিত শব্দ ‘সিরিয়াল কিলিং’ এবং সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে সামগ্রিক বিষয়টির সামাজিক-রাজনৈতিক দিকের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাবেক ছাত্র নেতা চৌধুরী জহিরুল ইসলাম। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘দু’দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কম গুরুত্বপূর্ণ খবর বাংলাদেশের মিডিয়ায় বেশ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। খবরটি ছিল- ডেভিড ফ্রাঙ্কলিন নামে মিশিগানের একজন সিরিয়াল কিলার দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন ২০ বছর পর!

ফ্রাঙ্কলিন একজন আফ্রিকান আমেরিকান যিনি হত্যা করেছেন ৯ জন নারী ও এক কিশোরীকে। হত্যার পর মৃতদের মিশিয়ে দেয়া হত বর্জের সঙ্গে, কারন ফ্রাঙ্কলিনের পেশা ছিল বর্জ সংগ্রহ।

এফবিআই-এর হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় ১৫,০০০ নাগরিক। এর এক শতাংশ হিসাবে, সিরিয়াল কিলিং এর শিকার হয় ১৫০ জন। এবং সংস্থাটির হিসাবে সিরিয়াল কিলারের সংখ্যা ২৫ থেকে ৫০। সে হিসাবে সিরিয়াল কিলাররা প্রতিবছর গড়ে ৩ থেকে ৬ জনকে হত্যা করে, যারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। যুক্তরাস্ট্রের মিডিয়ায় সিরিয়াল কিলিং অনেকটা এন্টারটেইনমেন্ট।

সিরিয়াল কিলারদের সংবাদ অনেকটা রং চটিয়ে প্রচার করা হয় দর্শক (রীডার) কাড়ার জন্য।সিরিয়াল কিলারদের সম্পর্কে ধারণাগুলো এরকম- এক. সব সিরিয়াল কিলারই পুরুষ, দুই. যুক্তরাষ্ট্র বহু ভাষিক ও বর্ণের দেশ হলেও সিরিয়াল কিলারদের প্রায় সবাই ককেশিয়ান অর্থাৎ সাদা, তিন. সিরিয়াল কিলাররা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন একাকী জীবনে অভ্যস্থ, চার. সিরিয়াল কিলাররা এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে ভ্রমণ করে এবং হত্যা করে, পাঁচ. এরা হয় মানসিক বিকারগ্রস্থ নয়তো শয়তানি বুদ্ধিতে প্রখর।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাল বিষয়গুলো গ্রহণ করার জন্য দেশটির পুলিশি ভূমিকা জগতজুড়ে স্বীকৃত। এই যেমন গণতন্ত্র, ফ্রিডম অব স্পীচ, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, অর্থ উপার্জন ও বিনিয়োগের অবাধ স্বাধীনতা ইত্যাদি। আজ যেমন চারদিকে বাজার অর্থনীতির জোয়ার, তেমনি হত্যা, খুন, রাহাজানির মত অপরাধগুলোও যুক্তরাষ্ট্র থেকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে যাবে এটাও স্বাভাবিক।

যুক্তরাষ্ট্রে সিরিয়াল কিলিং-এর বহুবিধ রূপ আছে। যৌনতা একটি বড় কারন, তবে ধর্মীয় কারণও যে নেই তা নয়। এমনকি চাকরি হারানো কিংবা কর্পোরেট আগ্রাসনের শিকার হয়েও অনেকে হত্যাকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, সাময়িকী সম্পাদক হত্যার কারন অনুসন্ধান করা যায় সহজেই। কিন্তু হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ‘সামাজিক বিষয়ে’ সমাজের দৃষ্টি কাড়ার প্রবণতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবণতার মিল পাওয়া যায়।

প্রায়শ সিরিয়াল কিলারদের মেন্টর থাকে, যাদের কাছ থেকে তারা হত্যার প্রণোদনা পায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সিরিয়াল কিলারদের কেউ না কেউ আড়ালে থেকে প্রণোদনা দিচ্ছে। তারা মিশে আছে সমাজে। এদেরকে খোঁজে বের করতে পারলে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের একটি জবাব পাওয়া যেতে পারে। আগে এসব প্রণোদনা দেয়া হত সরাসরি, সাক্ষাতে। এখন ইন্টারনেটেও সম্ভব। তাই সম্ভাব্য সব উৎস খুঁজে দেখা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে মসজিদের ইমাম, রাজনৈতিক নেতা কেউই এই সন্দেহের তালিকামুক্ত নন।

কারণ ক্ষমতার পালাবদলে সামাজিক অস্তিরতা গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। যে সমাজে হত্যাকাণ্ড যত বেশি সেখানে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা তত বেশি। আর সরকার পরিবর্তনে যারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে, সন্দেহের তালিকায় তারাই থাকবে উপরের দিকে।

বাংলাদেশে গণতন্ত্র ক্ষণভঙ্গুর, আমরা জানি। কিন্তু এই ক্ষণভঙ্গুর গণতন্ত্র কারো কারো জন্য আশীর্বাদের, যারা শ্রমজীবীদের সম্পদের সিংহ ভাগ বিনা পরিশ্রমে ভোগ করে চলে দিনের পর দিন। রাস্ট্রীয় সম্পদ চুরি-চামারি-বাটপারির মাধ্যমে আত্মসাৎ করাই যাদের সারা জীবনের পেশা। সমাজে গণতন্ত্র না থাকলে, প্রতিবাদ না থাকলে, মানুষ সংগঠিত হওয়ার শক্তি না পেলে এঁদের পোয়া বারো। সমাজে এক ধরনের আতঙ্ক জিইয়ে রাখাও এদের দায়িত্ব।

১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটলেও সামাজিক ন্যায়বিচার কায়েমের জন্য যে গণঅভ্যুত্থান ছিল অপরিহার্য তা না হওয়ার জন্যও দায়ী স্বেচ্ছাচারিতার গণতন্ত্র। এই একটি ব্যাপারে মিল দু’টি দলেরই। দুটি দলেই গণতন্ত্র নেই। হাসিনা-খালেদা উভয়ের পুত্ররাই ক্ষমতার সম্ভাব্য পরবর্তি দাবিদার! ক্ষমতাই যাদের জীবনের একমাত্র আরাধনা, তাদের কাছে মানুষের জীবনের মূল্য দাবি করা অন্যায়!

আফ্রিকার দেশগুলোর মত আতঙ্কের জনপদে কখনো গণঅভ্যুত্থান সঙ্ঘটিত হয় না, আমাদের রাজপুত্ররা তা ভাল করেই জানে। এরা আরও জানে- ক্ষমতায় না থাকলেও পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে এদের আয়েশী জীবনে কখনো, কোনো ঘাটতি হবে না। এদের আরাম আয়েশের যোগান দিতে কেউ যদি ব্যাঙ্কের টাকা লুট করে জাহাজ ভর্তি করে চালান দেয়, তবুও তাদের বুক কাঁপবে না।

দুনিয়ার সব বড় চোরগুলো নিউইয়র্ক, অথবা লণ্ডনে ঘাঁটি গাড়লেও তাতে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ব্রিটিশ প্রশাসনের বিন্দুমাত্র টনক নড়বে না। কারন তারা জানে তাদের বড় শহরগুলোতে যত বেশি চোরের সমাবেশ ঘটবে, তত তাদের অর্থনীতিতে সম্পদের প্রবাহ বাড়বে। হাজার বছরের ইতিহাসে পৃথিবীর সব বড় শহরগুলোই গড়ে উঠেছে বড় অঙ্কের চুরি করা সম্পদে!’