চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সালমা, শাবনুর ও হাফিজার গল্প

একইরকম চারটি ঘটনা ঘটেছে পরপর। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমনটা আমাদের নজরে আসেনি। এটা নিছক কাকতালীয় নাকি সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যম এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার বলে ঘটনাগুলো সামনে আসছে, তা নিয়ে একাডেমিক তর্ক চলতে পারে।

বিজ্ঞাপন

প্রথম ঘটনা ঘটে মাদারীপুরে, অমর একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে। শিবচর উপজেলার বালুর মাঠে সন্তান প্রসব করেন সালমা নামে এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারী। নবজাতকের কান্নার শব্দ শুনে স্থানীয় চার তরুণ মা ও সন্তানকে উদ্ধার করে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। এ নিয়ে প্রথমে ফেসবুক এবং পরে মূলধারার গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। ওই নবজাতকের দত্তক নিতে এগিয়ে আসেন সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

সাংবাদিকরা তার পরিচয় জানলেও তিনি সবাইকে অনুরোধ করেছেন পরিচয়টি গোপন রাখতে। এটি নিঃসন্দেহে ভালো সিদ্ধান্ত। কারণ পরিচয় প্রকাশ করা হলে বড় হয়ে ওই মেয়েটি (যার নাম রাখা হয়েছে হুমায়রা) সত্য জেনে যাবে এবং পিতৃহীনতার যন্ত্রণা তাকে কষ্ট দেবে। বালুর মাঠে ধুলোবালির মধ্যে অবহেলায় জন্ম নেয়া এই শিশুটিকে একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ ঠিকানার সন্ধান যারা দিলেন, তারা নিশ্চয়ই মহৎ কাজ করেছেন। শিশুটির মায়ের দায়িত্ব নিয়েছেন ঢাকার শামীম আহমেদ। চিকিৎসার পর অনেকটা সুস্থ হওযায় শামীম আহমেদের বাসায় রাখা হয়েছে তাকে।

মাদারীপুরের এই ঘটনার কিছুদিন পরে একইরকম ঘটনা ঘটে রাজবাড়ীতে। সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিনে, ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে। এদিন বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া বাজারে রাস্তার পাশে সন্তান প্রসব করেন আরেক মানসিক ভারসাম্যহীন নারী। স্থানীয়রা যাকে ‘শাবনুর পাগলী’ নামে চেনে। সন্তান প্রসবের পর স্থানীয় দুই নারী তাকে বালিয়াকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। এখানেও নবজাতককে দত্তক নিতে আগ্রহ দেখান অনেকে। তবে এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারের পরে পুলিশের সহায়তায় শাবনুর নামে ওই নারীর পরিবার খুঁজে পায় পুলিশ এবং উত্তরের জেলা নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় পরিবারের কাছে পৌঁছে দেয়। নবজাতকটিও রয়েছে তার মায়ের কাছে। চিকিৎসক বলেছিলেন, শাবনুরের মানসিক অবস্থা যা, তাতে উন্নত চিকিৎসায় তাকে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলা সম্ভব।

মাদারীপুরের শিশু হুমায়রার মতো শাবনুরের এই সন্তানটিরও পিতৃপরিচয় নেই। অর্থাৎ জন্ম নিবন্ধনের সময় তার মায়ের নাম লিখিত হবে ঠিকই, কিন্তু বাবার নামের ঘরে হয় মিথ্যা তথ্য দিতে হবে অথবা ঘরটি শূন্য রাখা হবে। কিন্তু শূন্য রাখলে ভবিষ্যতে বড় হয়ে এ নিয়ে যখন সে প্রশ্ন তুলবে, তার কোনো জবাব দিতে পারবে না তার পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র। এই শিশুটি একদিন হয়তো দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠবে। কিন্তু তখন যদি সে জানতে পারে, তার বাবার পরিচয় নেই, তখন তার কী অনুভূতি হবে ?

মাদারীপুর ও রাজবাড়ীর এই ঘটনার ৬ দিন পরে ১৪ মার্চ সিলেটের রাস্তায় সন্তান প্রসব করেন মানসিক ভারসাম্যহীন আরেক নারী। সেই দৃশ্য দেখে এগিয়ে যান তিন যুবক। কল করেন জরুরি সহায়তার হটলাইন ৯৯৯ নম্বরে। পুলিশের সহায়তায় নবজাতক ও মাকে উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেলে নিয়ে যান তারা। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ৩১ মার্চ সকাল থেকে ওই নারীকে হাসপাতালে পাওয়া যাচ্ছে না। সম্ভবত লোকজনের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি চলে গেছেন। তবে নবজাতক ছেলেটি হাসপাতালে রয়েছে। সিলেটের সাংবাদিক মাইদুল রাসেল আমাকে জানিয়েছেন, ওই নারীর খোঁজ চলছে।

বিজ্ঞাপন

মার্চ মাসেই দখিনের জেলা বরগুনার বামনা উপজেলায় ঘটে আরেকটি ঘটনা। হাফিজা নামে মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীর পেছনে একপা দুপা করে হাঁটছিলো তার অবুঝ সন্তান। হাঁটতে হাঁটতে শিশুটি ক্লান্ত হয়ে রাস্তায় বসে পড়ে। মা কিছুদূর গিয়ে যখন ছেলেকে না পান, দৌড়ে ছুটে আসেন। কোলে তুলে নিয়ে আবার পথ চলেন। কুড়িয়ে পাওয়া খাবার খান। স্থানীয়রা এই দৃশ্য দেখে পুলিশকে জানায়। পরে বামনা থানা পুলিশ হাফিজা ও তার সন্তানকে উদ্ধার করে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রকান্দা গ্রামে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেয়।

হাফিজার এই সন্তানটিও বড় হবে। কিন্তু বাবার নাম সে কী লিখবে? পিতৃ পরিচয়হীনভাবে বেড়ে উঠবে এই শিশু। কিন্তু সে কোনোদিনই জানবে না, কে তার বাবা? কার ঔরশে তার জন্ম। অথবা সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে মা ও তার পরিবারের লোকেরা একটি মিথ্যে নাম দেবে তার বাবার। কিন্তু এই মিথ্যা পরিচয় নিয়ে যে একটি শিশু বেড়ে উঠবে, তার দায় কার? সমাজের নাকি রাষ্ট্রের নাকি আমাদের সবার?

একজন নারী সন্তান প্রসব করেছেন, তার অর্থ হলো ওই সন্তানের একজন বাবাও আছেন। অর্থাৎ ওই নারীর সাথে কোনো একজন ‘পুরুষ’ শারীরিক সম্পর্ক করেছেন। একজন মানসিক ভারসাম্যহীন নারীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের ঘটনাকি কি ওই পুরুষটির রুচির বিকৃতি? সম্প্রতি আফ্রিকার একটি দেশে পশুর সাথে সঙ্গম করার দায়ে এক যুবককে এলাকা ছাড়া করার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। ফলে এ জাতীয় ঘটনা যে মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা পাশবিক শক্তি এবং বিকৃত রুচিরই বহিঃপ্রকাশ, সে বিষয়ে সন্দেহ কম।

যারা এরকম রাস্তার ধারে মানসিক ভারসাম্যহীন নারীদের দুর্বলতা ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করলো, তারা নিজেরাও সুস্থ কি না? কারণ একজন সুস্থ বিবেকবান মানুষের পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব নয়। সুতরাং পুলিশ ও স্থানীয় মানুষের সহায়তায় সন্তান প্রসবের পরে মা নবজাতকের চিকিৎসা এবং পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া যেমন জরুরি, তেমনি ওই লোকগুলোকে খুঁজে বের করাও জরুরি। আইনের আওতায় নেয়ার আগে তাদেরও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা দরকার। পরপর চারটি ঘটনা যেহেতু ঘটলো, তার মানে ১৭ কোটি মানুষের দেশে এমন বিকৃত রুচির পুরুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়।

আমাদের সতর্ক হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি রাস্তার পাশে কোনো মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে ঘোরাফেরা করতে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় তাকে হয় হাসপাতালে নয়তো কোনো নিরাপদ স্থানে রেখে আসা দরকার। না হলে তাদের পথে-ঘাটে এমন যৌন বিকৃতির শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে। এসব মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের পুনর্বাসনে রাষ্ট্রের যেসব উদ্যোগ রয়েছে, সেগুলোও জোরালো করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি এই মানুষগুলোর পরিবার খুঁজে বের করা যায়। এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক যে অনেক বড় ভূমিকা রাখছে, সেটি এরইমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।

বাংলাদেশে ফেসবুক জনপ্রিয় হবার আগের একটি ঘটনা বলে লেখাটা শেষ করছি। সম্ভবত ২০০২-০৩ সালের শীতকাল। ঝালকাঠি শহরের নতুন কলেজ সড়কের একটি নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে একজন নারীর গোঙানির শব্দ শুনে যত্রতত্র রাখা ইট-সুঁড়কি সরিয়ে ভেতরে গিয়ে দেখি, শীতে কাঁপছেন ওই নারী। চেহারা মলিন। পরনে শাড়ি। নামধাম জিজ্ঞেস করি। জবাব নেই। পরে বোঝা গেলো তিনি কথা বলতে পারেন না। ইশারায় কিছু জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু তারও সাড়া না পেয়ে বুঝলাম তিনি একইসঙ্গে মানসিক ভারসাম্যহীন এবং বোবা। ভবনটির পেছনেই আমার এক বন্ধুর বাসা। খালাম্মাকে ঘটনা খুলে বললে তিনি একটি কাঁথা এবং বালিশ দিয়ে আসেন ওই নারীকে। তাকে খাবার-দাবার দেয়া হয়। তার একটা ছবি তুলে স্থানীয় একটি পত্রিকায় রিপোর্ট করলাম। পরদিনই একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এলো। ছবি দেখে শনাক্ত করেছে তার পরিবার। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় তার বাড়ি। পরিবারের সদস্যরা এলেন। ওই নারীকে শনাক্ত করে জানালেন, তার নাম কোহিনুর বেগম। কিন্তু এত দূর থেকে মানসিক ভারসাম্যহীন এবং বোবা এই নারী কীভাবে ঝালকাঠি শহরের এই নির্মাণাধীন ভবনে এসে পৌঁছালেন, তা জানা যায়নি।

তবে ওই ছোট্ট রিপোর্টটির কারণে কোহিনুর বেগমকে খুঁজে পায় তার পরিবার। ঘটনাটি হয়তো বড় নয়; কিন্তু ৩০০ শব্দের একটি লেখার বিনিময়ে একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষকে তার ঘরে ফিরিয়ে দেয়ার যে আনন্দ, তা পরবর্তীতে অনেক জাতীয় আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়াতেও অনুভব করিনি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)।