চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সালমান শাহ: হত্যা-আত্মহত্যা’র দ্বন্দ্বে ২ দশক

মাথায় কাপড় বাঁধা স্টাইল ৯০’র দশকে এতোটাই জনপ্রিয় হয়ে যায় যে পাড়া-মহল্লার তরুণদের মাথায় কাপড় বাঁধায় হিড়িক পড়ে গিয়েছিলো সেসময়। বাংলা চলচ্চিত্রের একজন নায়ক নব্বইয়ের দশকে যে কতোটা ফ্যাশন সচেতন ছিলেন সেটা বর্তমান সময়ের অনুকরণীয় প্রজন্মের ফ্যাশন সচেতনতায় স্পষ্ট ফুটে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

সালমান শাহ। নামটি ৯০ দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের এক ধুমকেতুর। যিনি হুট করে এসে বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকদের মন জয় করে খুব চট করে বিদায় নিয়েছেন। অনেকের মতেই সালমান শাহ এমন একজন অভিনেতা ছিলেন যিনি যে কোনো স্টাইলে-ই মানিয়ে নিতেন পারতেন। অনেকে সালমান শাহকে অনুকরণ করেন। এমন কি বলিউডের অভিনেতারা পর্যন্ত সালমান শাহের স্টাইল অনুকরণ করেন।

চিত্রনায়ক সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। আজও তার মৃত্যুবার্ষিকীতে কান্নায় বুক ভাসান পরিবারের সদস্যরা। সঙ্গে সারা দেশের লাখো-কোটি ভক্ত। সালমান শাহর মৃত্যুবার্ষিকীতে ভক্তরা ঢাকায় তার মায়ের বাসায় ভিড় করেন। অনেকে চলে যান সিলেটে শাহজালাল (রহ.) মাজারের পেছনে তার কবরস্থানে। সেখানে  ভক্তরা তাঁর কবর জিয়ারত করেন। প্রিয় নায়কের রূহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন।

সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যুর পর তার বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী খুব ভেঙে পড়েন। ওই শোকেই তিনি মারা যান। মা নীলা চৌধুরী জাতীয় পার্টি থেকে এখন আওয়ামী লীগ নেত্রী। তারও বয়স হয়েছে। তিনি ছেলে হত্যার বিচার চান। তিনি সব সময়ই বলে আসছেন, ‘আমার ছেলে আত্মহত্যা করতে পারে না। তাকে পরিকল্পনা করে হত্যার পর রশিতে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। এ কথা শুধু আমি না, তার সব ভক্তও বিশ্বাস করে। আমি সালমান হত্যার বিচার চাই।’

সালমানের অভিনয় জীবন শুরু বিটিভিতে। ১২ বছর বয়সে প্রথম টিভিতে অভিনয় করেন সালমান। বিটিভিতে সালমান সর্বশেষ অভিনয় করেছেন অরুণ চৌধুরীর প্যাকেজ নাটক ‘নয়ন’-এ। ওই নাটকে সালমানের বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন শমী কায়সার। এ ছাড়া মামুনুর রশীদ রচিত ধারাবাহিক নাটক ‘ইতিকথা’য় অভিনয় করে সুনাম কুড়িয়েছেন।

নীলা চৌধুরী বলেন, এ দেশে কতো হত্যার বিচার হয়েছে, কিন্তু সালমান শাহ হত্যার বিচার হলো না। পুলিশও মামলাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেছে। ওই সময় সালমানের বাবা বারবার সংজ্ঞা হারাচ্ছিলেন। এর পর তার কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে রমনা থানায় অপমৃত্যু মামলা করা হয়। আমরা মনে করি না এটা কোনোভাবেই অপমৃত্যু। এ কারণে তার স্ত্রী, শ্বশুর ও শাশুড়িকে আসামি করে হত্যা মামলা করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ কাউকেই গ্রেফতার করেনি। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমার সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার বিচার পেলাম না।’

তিনি জানান, ‘এখনো হুমকি পাই। অনেক সময় অধিক রাতেও ফোন করে প্রথমে সালমানের ভক্ত বলে পরিচয় দিয়ে পরে মামলা তুলে নেয়ার জন্য হুমকি দিতে থাকে। অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালিও করা হয়। আমার ছোট ছেলে লন্ডনে থাকে। তাকেও হুমকি দেয়া হয়।’

বাংলাদেশ চলচ্চিত্রে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতোই আবির্ভাব হয়েছিল যে ছেলেটির,তার নাম সালমান শাহ। তবে তার মা-বাবার দেয়া নাম ছিল শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। সিলেটে জন্ম নিলেও বড় হয়েছিলেন ঢাকাতেই। ছোটবেলা থেকেই সংস্কৃতির প্রতি ঝোঁক বাড়ে তার। কৈশোর থেকে তিনি ছিলেন কণ্ঠশিল্পী। শিশু একাডেমীর ছাত্র ছিলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

১৯৮৬ সালে ছায়ানট থেকে পল্লীগীতিতে পাস করে বের হন। প্রথম ছবির পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান। নায়ক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশের পর দেশীয় চলচ্চিত্রে রোমান্টিক ছবি প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। তিনি এ দেশের ছবির দর্শকদের মন কেড়ে নেন। সব শ্রেণীর দর্শকের মনমাতানো নায়ক হয়ে ওঠেন সালমান শাহ।

সালমান বেশ কিছু টিভি বিজ্ঞাপনেও মডেল হয়েছেন। তবে সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির মাধ্যমে ১৯৯২ সালে চলচ্চিত্রে সম্পৃক্ত হন। এ ছবিতে সালমানের বিপরীতে ছিলেন নবাগতা নায়িকা মৌসুমী।

ছবিটি মুক্তি পেলে সুদর্শন অভিনেতা হিসেবে রূপালি পর্দায় এসে সালমান জয় করে নেন দর্শকমন। তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি কখনো। একের পর এক রাজ্য জয়ের মতো সালমানও পরপর অনেক হিট ছবি উপহার দিয়ে দর্শকদের হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সালমানের ওপর ফ্লপ শব্দটি কোনোভাবেই প্রভাব ফেলতে পারেনি।

‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মুক্তির পর তিনি ‘তুমি আমার’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘সুজন সখী’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্নেহ’, ‘প্রেম শক্তি’, ‘কন্যাদান’, ‘দেনমোহর’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘আঞ্জুমান’, ‘মহামিলন’, ‘আশা ভালোবাসা’, ‘বিচার’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘প্রিয়জন’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘জীবন সংসার’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘প্রেম পিয়াসী’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘শুধু তুমি’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘বুকের ভেতরে আগুন’সহ বহু ছবিতে অভিনয় করেন।

চলচ্চিত্রে আসার পর থেকেই সালমান নানা ধরনের গল্প কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। সালমান শাহ মা-বাবার বড় ছেলে। ছোট ভাই চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরান ওরফে ইভান সালমানের চেয়ে সাত বছরের ছোট। খুব ছোটবেলা থেকেই সালমান অভিনয় জগতে প্রবেশ করেন।

সালমানের স্ত্রী সামিরার মায়ের ছোটবেলার বান্ধবী ছিলেন সালমানের মা নীলা চৌধুরী। ছোটবেলায় দুই বান্ধবী ঠিক করেছিলেন সালমান ও সামিরার বিয়ে হবে। বাস্তবে তাই হয়েছে ১৯৯২ সালের ২০ ডিসেম্বর। ২১ বছর বয়সে সালমান বিয়ে করেন। সালমানের মৃত্যুর পর সামিরা অন্যত্র বিয়ে করে সংসার করছেন।

সালমানের মা জানান, ‘আমার স্বামী বিচার দেখে যেতে পারেননি। এই শোকেই তিনি মারা গেছেন। আমি বেঁচে আছি। আমি সালমান হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে চাই। তিনি অভিযোগ করেন,ময়নাতদন্ত রিপোর্টও গায়েব করে দিয়েছে চক্রান্তকারীরা।

চিত্রনায়ক সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যুর ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও তার পরিবারের সদস্য ও ভক্তরা আজ পর্যন্ত জানতে পারলেন না তাকে হত্যা করা হয়েছিল,না কি তিনি আত্মহত্যা করেছেন! এই রহস্যের কী কোন সমাধান হবে না?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)