চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, পুলিশিং ও নজরদারীর (অপ) সংস্কৃতি

আজকেই বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংবাদপত্র দৈনিক যুগান্তরে ‘নজরদারিতে আসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম’ শীর্ষক একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। যুগান্তরের মতো অনলাইন দৈনিক ‘বাংলা ট্রিবিউন’ পত্রিকায়ও ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যবেক্ষণ’ শিরোনামে এ সংক্রান্ত আরেকটি একটি সংবাদ বিস্তৃত আকারে প্রকাশিত হয়। সংবাদ দুটি হতে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে ‘র‌্যাপিড একশান ব্যাটালিয়ান-র‌্যাব’ এর জন্য মোট ১২৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় (একনেক)  অনুমোদিত হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৮ সালের চলতি মাস নভেম্বর হতে এপ্রিল ২০১৯ সাল পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপন

যদিও শুধু এই একটি প্রকল্পই নয়, বাস্তবে একনেক সভায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য জরুরি ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আরো সাতটি প্রকল্পের জন্য আরো অনেক টাকা বরাদ্দ হয়। নিঃসন্দেহে ঐ প্রকল্পগুলো পুলিশের সেবার মান, পুলিশের তদন্ত ও মামলা কার্যক্রমে অগ্রগতিসহ পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন ব্রাঞ্চের জন্য ইতিবাচক সুফল বয়ে আনবে বলেই আমি মনে করি। কিন্তু কথা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নিয়ন্ত্রণের জন্য তড়িঘড়ি করে অতি অল্প সময়ের শুধুমাত্র ৬ মাসের জন্য কেন এই প্রকল্পটি নেয়া হলো? তা অনেকের কাছেই প্রশ্ন উঠতে পারে। এই বিষয়টি নিয়ে সুধী সমাজ, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সাথে যুক্ত লোকজনসহ সচেতন মানুষের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এই বিষয় নিয়ে ইতোপূর্বে দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক প্রথম আলোসহ বিভিন্ন পত্রিকায় এ সংক্রান্ত সংবাদ, আলোচনা এবং মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশিং বিষয়ে শিক্ষকতার সাথে যুক্ত বলে এই বিষয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করেছি।

উল্লেখিত সংবাদপত্রগুলোর তথ্য মোতাবেক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ভাইভার, হোয়াটসএ্যাপ, ইমো) নিয়ন্ত্রণের জন্য র‌্যাব ও আইসিটি মন্ত্রণালয় যৌথ উদ্যোগে কাজ করবে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারবিরোধী কোন রাষ্ট্রদ্রোহী বক্তব্য, সরকারকে বিব্রত করা, সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষী বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ব্যাহত হতে পারে এমন কোন বক্তব্য এবং নির্বাচনের আগে ও পরে কোন ষড়যন্ত্র কিংবা সরকারকে বিব্রত করার চেষ্টা থেকে মুক্ত রাখার জন্য এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়।

দুয়েকটি পত্রিকায় এমনও এসেছে যে, র‌্যাব ও আইসিটি মন্ত্রণালয় এই কাজের জন্য ২ হাজারের বেশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষজ্ঞ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়োগ দিবে। তারা যে কাজটি করবে তা হলো ফেসবুক, টুইটারসহ অন্যান্য মাধ্যমে যারা বিভিন্ন বিষয়ে স্ট্যাটাস কিংবা সরকারের দৃষ্টিতে অবৈধ কাজ বলে বিবেচিত হবে তাদেরকে চিহ্নিত করে সেই একাউন্ট, ওয়েবসাইটের ওপর নজরদারী বাড়াবে এবং প্রয়োজনে সেসবকে ফিল্টার ও ব্লক করা হবে। কোন একটি প্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে এই বিষয়ে র‌্যাব ও তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিশেষজ্ঞ নজরদারী নিশ্চিত করবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনপ্রশ্ন হলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ কি নতুন বিষয়? যার জন্য আমাদের এই উদ্বেগ! কখনোই নয়। প্রত্যেকটি দেশেই সমাজের সামাজিক স্বাস্থ্য তথা নীতি নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধসহ যুবক তরুণদের জন্য ক্ষতিকারক কনটেন্ট আছে এসব বিষয়কে মোটামুটি চিহ্নিত করা হয়। অনেক উন্নত দেশেই তা করা হয় বলে সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়। আমাদের দেশেও বাংলাদেশে টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি অথরিটির (বিটিআরসি) মাধ্যমে ইতোপূর্বে ফেসবুকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষতিকারক কনটেন্ট চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। যেমন:পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ, ফেসবুকে হয়রানি প্রতিরোধ।

কিন্তু বর্তমানে সমস্যা হলো সরকার সাম্প্রতিককালে বিরোধীদল, সুধী সমাজের সদস্যবৃন্দ, সরকারের গঠনমূলক সমালোচনাকারী, সংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেনীপেশার মানুষের পত্রিকায় বিবৃতি, মন্তব্য ও মতামত নিয়ন্ত্রণ কিংবা স্বাধীন মত প্রকাশসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণের জন্য টেলিফোন, মোবাইলে আড়িপাতাসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন একাউন্টে নজরদারি করছে,যা উদ্বেগজনক। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠন করার স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতাসহ সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও হচ্ছে একটি চিরন্তন ও গ্রহণযোগ্য মৌলিক মানবাধিকার। আমাদের সংবিধানের মৌলিক অধিকার অংশেও এসবের বিশেষ স্বীকৃতি ১৯৭২ এর সংবিধান থেকেই স্বীকৃত। বিশেষ করে বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ৩৭, ৩৮, ৩৯ অনুচ্ছেদগুলোতে মানুষের আইনদৃষ্টিতে সমতা, চলাফেরা, সংগঠন কিংবা বাকস্বাধীনতা বিষয়ে ইতিবাচক বক্তব্য আছে। সংবিধানের মৌলচেতনার সাথে সাংঘর্ষিক হলেও দণ্ডবিধিসহ অন্যান্য প্রচলিত আইনেও কোন মানুষকে নিয়ন্ত্রণ, বাকস্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে যুক্তিসঙ্গত বা ন্যায়সঙ্গত কারণ উল্লেখ করা হয়েছে।

আমার কথা হলো আইনে এসব লেখা থাকা সত্ত্বেও সরকার কেন মানুষের মতামত, ব্যক্তিগত অভিমত, লেখালেখির স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করবে? আমরা ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখতে পাই যে, যেসব রাষ্ট্র চেতনাগতভাবে সর্বাত্মক বা স্বৈরতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ছিলো সেসব দেশে এই ধরণের নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের জন্য মিশর ও তুরস্কেও কিছুদিন আগেই এসব আইন হয়েছে। সর্বাত্মক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ইরান, মিসর, সাউথ কোরিয়া, গণচীনে জনগণের মত প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণের জন্য ইন্টারনেট সাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রিত আছে। আমেরিকা, রাশিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি, ষড়যন্ত্র ও নীলনকশা ঠেকাতে অনেক সময় এসব করে থাকে।

কিন্তু সেইসব রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কর্মী-সমর্থকগণ এসব বিষয়ে সরব থাকেন। বিশেষ করে আমেরিকায় নোয়াম চমস্কি, রামজে ক্লার্ক, ম্যালকম এক্স; ইউরোপের দেশগুলোতে স্লাভোজ জিজেকসহ বামধারার অনেক প্রগতিশীল লেখক সাহিত্যিক, দার্শনিকসহ অনেকেই কথা বলেন। ভারতবর্ষে অরুন্ধুতী রায় সহ বাংলাদেশেও অনেকেই এসব নিয়ে কথা বলেন বা বলতে চান। একটি বিষয় ইদানিং লক্ষ্য করলে দেখবেন যে, বিভিন্ন সময়েই রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে ব্যক্তিগত আলোচনা ও কথোপকথন ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। আমার কথা হলো, মানুষের ব্যক্তিগত আলাপ আলোচনা কিংবা রাজনৈতিক পরামর্শ বা সংলাপকে কি এভাবে ফাঁস করে দেয়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ নয়?

যদি কারো আলোচনায় রাষ্ট্রের স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্ববিরোধী এবং ষড়যন্ত্রমূলক সহিংস ও উদ্বেগজনক কনটেন্ট থাকে সেসব বিষয়ে দায়িত্বশীল বাহিনী বা কর্মকর্তারা গোপনীয়তার সহিত ব্যবস্থা নিতে পারে কিন্তু সব বিষয় বা তথ্যকেই জনপরিসরে ফাঁস বা পাব্লিক করে দেয়া এক ধরণের অভদ্রতা, অসৌজন্যমূলক কিংবা অনেকক্ষেত্রেই তা মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে আমার মতো অনেকেই মনে করে। পাঠক একটু খেয়াল করলে দেখবেন, গ্রামাঞ্চলে যেসব মানুষের অন্যের কথা চুপিচুপি শোনার অভ্যাস ছিলো তাদেরকে বেশিরভাগ মানুষ নেতিবাচকভাবেই দেখতেন। শিক্ষিত মানুষ মাত্রই এসব বিষয়ে সংবেদনশীল হবেন। এটাই চিরন্তন ও প্রত্যাশিত। অন্যের ভাবনা চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর শ্রদ্ধাশীল থাকবেন। কিন্তু আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও আমরা সে সংস্কৃতি ভুলতে বসেছি এটাই আমার কাছে দুঃখজনক।

আর পুলিশ যদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে মানুষের উপর নজরদারি কিংবা খবরদারী করে তার উদ্দেশ্যে কী হবে? সংবাদে বলা হয়েছে যে, সরকারের জন্য বিব্রতকর এমন কোন স্ট্যাটাস, মন্তব্য, মতামতকে নজরদারির আওতায় আনা হবে। এখন কথা হলো যে, কোন স্ট্যাটাস, মন্তব্য বা মতামত বিষয়টি সরকারের জন্য বিব্রতকর তার মানদণ্ড কে নির্ধারণ করে দেবে? বলা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ এর অন্তর্ভুক্ত কোন সদস্য সম্পর্কে নেতিবাচক ও বিব্রতকর প্রচারণা চালালে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক-ফেসবুকের তথ্য চুরি

আমার প্রশ্ন হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশ এবং র‌্যাব যেহেতু সরকারের আদেশ হুবুহু বাস্তবায়ন করে তবে কি তারা সরকারের আদেশ-নির্দেশের বাইরে যেতে পারবে? অনেকে মনে করে আধুনিক রাষ্ট্রে যেহেতু ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি ক্রিয়াশীল সেহেতু ক্রিমিন্যাল জাস্টিজ সিস্টেমের সবগুলো প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন একেবারেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। আদর্শিকভাবেই হয়তো পুলিশের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ আছে। বাস্তবে শুধু বাংলাদেশে নয় এমনকি ইউরোপসহ দক্ষিণ আমেরিকার উন্নত রাষ্ট্রগুলোতেও পুলিশের সাথে রাজনীতির ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল এবং আছে।

বিজ্ঞাপন

পুলিশের উৎপত্তি এবং বিকাশের সাথে রাজনৈতিক ব্যবস্থা কিংবা সরকারের রাজনীতির ওতপ্রোত সম্পর্ক ঐতিহাসিক কাল থেকেই আছে। যেমন ধরুন, পুলিশ বিজ্ঞান বিকাশের প্রাথমিক ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে তা একসময় সামরিক বিজ্ঞান বা সরকার ব্যবস্থাপনা (cameralist science) বিজ্ঞান হিসেবে চিহ্নিত ছিলো। ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের অনেকে দেশেই পুলিশ বিজ্ঞান বিকশিত হয়েছিলো একেবারের সরকারি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে থেকেই। এবং এখানে দেখা যায় যে ঐসব দেশসহ অনেক ইউরোপের দেশে পুলিশ সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় কিংবা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনেই ছিল।

অন্যদিকে, আমেরিকায় পুলিশ বিজ্ঞান বিকাশের সাথে সরাসরি যুক্ত তাদের রাষ্ট্রীয় রাজনীতি ও মতাদর্শ। বিভিন্ন বইপত্র থেকে দেখা যায়, আমেরিকায় পুলিশের দুর্নীতি, অত্যাচার নির্যাতন, এমনকি ক্ষমতার প্রদর্শন তাদের রাজনীতির সরাসরি ফসল। রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট মতাদর্শের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে তাদের দেশে পুলিশের মধ্যে বিদ্রোহ এবং ক্যু পর্যন্ত হয়েছিলো। ১৯৭০ এর দশকে ক্যাম্পাসগুলোতে পুলিশের নিয়ন্ত্রণ এবং ভায়োলেন্সের জন্য সরাসরি দায়ী হলো আমেরিকার যুদ্ধের পক্ষের রাজনীতির সক্রিয় ফসল। তাই রবার্ট রেইনার নামক একজন বৃটিশ সমাজবিজ্ঞানী, পুলিশ বিশেষজ্ঞ, অপরাধবিজ্ঞানী একবার মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘আদতে পুলিশিংয়ের মূল কার্যক্রমে বাস্তবে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত। রাষ্ট্র এবং সরকার পুলিশকে যা নির্দেশ করবে পুলিশ তাই সরাসরিভাবে করতে বাধ্য হবে।’

যদিও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কল্যাণমূলক দেশগুলোতে পুলিশ অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই রাজনীতির উর্ধ্বে থাকে। ফলে সেসব দেশ তো বটেই ফ্রান্স, জার্মানি, বৃটেন ও আমেরিকায় পুলিশের উপর জনগণের তৃপ্তি ও কনফিডেন্সের মাত্রা অনেক বেশি। বিপরীতে বাংলাদেশে পুলিশের উপর জনগণের তৃপ্তি, নির্ভরতার মাত্রা অত্যন্ত কম। অধিকাংশ ইউরোপীয় রাষ্ট্রই যেহেতু রাজনৈতিকভাবে পুলিশকে নিয়ন্ত্রণ করে সেহেতু বাংলাদেশের মতো উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রে পুলিশ কিভাবে রাজনীতিমুক্তভাবে নজরদারী করবে তা বোধগম্য নয়। এবং সঙ্গত কারণেই পুলিশ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে মানুষের রাজনৈতিক পরিসর মিটিং মিছিল সমাবেশতো বটেই এমনকি ব্যক্তিগত পরিসরে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য নজরদারি করছে। মানুষের রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমের জুঁজুর ভয় দেখিয়ে মানুষের টেলিফোনে আড়িপাতা, ব্যাংক লেনদেনের উপর নজরদারিসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ক্রিমিন্যাল প্রোফাইলিং, বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন, ডিএনএ প্রোফাইলিং, সিসিটিভি প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি করা হচ্ছে।

এসব নজরদারি কিংবা খবরদারীর ইতিহাস শুধুমাত্র বাংলাদেশে নয় বরং তা অধিকাংশই পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে উদ্ভাবিত। মানুষের উপর ক্ষমতা কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকল্পে যুগে যুগে ক্ষমতার নির্মাণ, প্রয়োগ ও বিকাশের ক্ষেত্রে নতুন নতুন প্রযুক্তি, দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বুঝতে গেলে আমাদেরকে ফ্রান্সের সমাজতাত্ত্বিক, দার্শনিক, লেখক মিশেল ফুঁকোর তত্ত্বের কাছে যেতে হবে। ফুঁকো তার ‘ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিস’ বইয়ে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

তিনি দেখান যে, ক্ষমতা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কাঠামোগত বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে যায়। যার প্রথমটি হলো, সার্বভৌম ক্ষমতা। সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয় ব্যক্তির সরাসরি শরীরে। বিভিন্ন রাষ্ট্রে নিবর্তমূলক কার্যক্রম যেমন লাঠিচার্জ, বেত্রাঘাত, ব্রান্ডিংয়ের মাধ্যমে এই ক্ষমতা প্রয়োগ হয় ব্যক্তির উপর। এ জন্য আদিকালের রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতো। কিন্তু এই আনুষ্ঠানিক শাস্তির মধ্যে বিদ্রোহ হওয়ার ভয় থেকেই তারা বিকশিত করলো শৃঙ্খলাগত ক্ষমতা। এই শৃঙ্খলাগত ক্ষমতার মাধ্যমে মানুষকে ‘ডিসিপ্লিনিং’ করা হয় রুটিন জীবনের মধ্যে আবদ্ধ রেখে।

বিশেষ করে আধুনিক কালের কারাগার, কারখানা ও স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ ধরণের প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিকে রাষ্ট্রকতৃক তৈরিকৃত মতাদর্শের অভ্যস্ত করে তোলা হয়। এখানে আত্মীকৃত মতাদর্শের মাধ্যমে মানুষকে ‘আইন মান্যকারী বা শৃঙ্খলায়িত মানবে’ রূপান্তরিত করে তোলা হয়। তৃতীয় পর্যায়ে মানুষের উপর ক্ষমতার প্রয়োগ হয় বিভিন্ন ধরণের পরিসংখ্যানিক তথ্য উপাত্ত ব্যবস্থাপনার সিস্টেম আবিষ্কার করে। এই ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিষয়কে ফুঁকো চিহ্নিত করে ‘জৈব ক্ষমতা’ নাম দিয়ে। এর প্রয়োগ হয় গভর্নমেন্টালিটি প্রকল্পের মাধ্যমে। রাষ্ট্র তার বিভিন্ন ক্ষেত্রকে ব্যবস্থাপনার কৌশল ও পদ্ধতি ব্যবহার করতে গিয়ে ব্যক্তির উপর জৈব ক্ষমতার প্রয়োগ করে। বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যক্তিকে যেভাবে ‘ফাঁদে’র মধ্যে আবদ্ধ করা হচ্ছে তাই জৈব ক্ষমতার মূল বক্তব্য।

জনগণের উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর হেজিমনি বা আধিপত্য সৃষ্টির লক্ষ্যে গোটা ব্যবস্থায় একটি নজরদারির সংস্কৃতি তৈরি করেছে রাষ্ট্র। বাংলাদেশের জনগণের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য যুগে যুগে বিভিন্ন কাল আইন তৈরি করা হয়েছে, সাম্প্রতিককালে আইসিটি আইন তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, “কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েব সাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হয়, তাহা ইহলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ এবং কোন ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বৎসর এবং অন্যূন সাত বৎসর কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদরণ্ড দণ্ডিত হইবেন।”

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের আইনে শাস্তির বিধান “অনধিক দশ বৎসর কারাদণ্ড” থাকলেও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (সংশোধন) আইন, ২০১৩ (২০১৩ সনের ৪২ নং আইন) এর ৪ ধারা বলে শাস্তির বিধান বাড়িয়ে “অনধিক চৌদ্দ বৎসর এবং অন্যূন সাত বৎসর কারাদণ্ড করা হয়। এই আইনের প্রয়োগের জন্যই সম্প্রতি সরকার র‌্যাবকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেয়া হয়। সরকার এর মাধ্যমে বিরোধীদলের সাথে যুক্ত রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থক-নেতা, সরকারের সমালোচনাকারী সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সুধী সমাজের সদস্যে, বিরোধী মতাদর্শে বিশ্বাসী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে আইনের মারপ্যাচে এনে নিয়ন্ত্রণ করবেন। যে কেউ যখন কোন বিষয়ে মতামত প্রদান করবেন তখন তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী তকমা দিয়ে, ভিন্ন মতাদর্শের সমর্থনকারী হিসেবে উগ্র জঙ্গিবাদী কিংবা বাম হিসেবে চিহ্নিত করে যেকোন সময় তাকে হেনস্থা করতে পারে। ক্রিমিন্যাল প্রোফাইলিং, বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন, ডিএনএ প্রোফাইলিং, সিসিটিভি প্রযুক্তির মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। 

ইদানিং পুলিশের বিভিন্ন সংস্থাও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে মিডিয়াম হিসেবে নিচ্ছে। এর মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা যেতে পাবে বটে কিন্তু তাকে কোনভাবেই ভয়ের সংস্কৃতির তৈরির মাধ্যমে জনগণের নিয়ন্ত্রণকে ভালো চোখে দেখার সুযোগ নেই। যদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় তবে সমাজ ও রাষ্ট্রজুড়ে এক ধরণের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হবে।

আমরা যারা লেখালেখির মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারি বলে মনে করি তারা প্রত্যেকেই এই ভয়ের সংস্কৃতির প্রভাবে সেল্ফ সেন্সরড হতে বাধ্য হতে পারে। যা স্বাধীনভাবে জ্ঞান চিন্তার অবাধ বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। উদাহরণস্বরুপ দেখুন, এই যে ভয়ের সংস্কৃতি রাষ্ট্রজুড়ে জারি হয়েছে তার গুরত্বপূর্ণ সিম্পটম আমরা দেখতে পাই ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আর রাজী এবং আলোকচিত্রী শিল্পী শহীদুল ইসলামের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে।

কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই যেহেতু সর্বাত্মক রাষ্ট্রের মতো ফ্যাসিবাদী পুলিশী রাষ্ট্র হতে পারেনা বা হওয়া উচিত নয় সেহেতু বাংলাদেশে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী মত দমন কিংবা সাধারণ জনগণের নিপীড়নের জোয়াল চাপিয়ে দেয়ার জন্য গণমাধ্যম বিশেষ সামাজিক গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা একেবারেই কাম্য নয়। রাষ্ট্রের কাজ জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি পুলিশী রাষ্ট্রের নজরদারি থেকে বের হয়ে আসা। তাই আমি অবিলম্বে সামাজিক যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টা থেকে র‌্যাব, তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় তথা সরকারকে সরে আসতে আহ্বান জানাই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)