চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিবাদী কণ্ঠে বলে উঠল, আমরা ১৪৪ ধারা ভাঙবই ভাঙব’

গবেষণামূলক ও সাক্ষাতকারভিত্তিক গ্রন্থ ‘ভাষা সংগ্রামীর বাংলাদেশ’ থেকে সংক্ষেপিত

ভাষা সংগ্রামী রওশন আরা বাচ্চু। ১৯৩২ সালের ১৭ ডিসেম্বর সিলেটের কুলাউরা থানার উছলাপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা এ এম আরেফ আলী ও মা মনিরুন্নেছা খানম। ভাষা সংগ্রামী রওশন আরা বাচ্চু ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। ২১শে ফেব্রুয়ারিতে যেসব ছাত্রনেতা ১৪৪ ধারা ভেঙে সামনে এগিয়ে গেছেন তিনি তাদের অন্যতম।

বিজ্ঞাপন

রওশন আরা বাচ্চু ১৯৪৭ সালে পিরোজপুর গার্লস স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে ভর্তি হন। বিএম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে স্মাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালে তিনি পাশ করেন। পরে ১৯৫৬ সালে বিএড এবং ১৯৭৪ সালে ইতিহাসে এমএ পাশ করেন। তিনি গণতান্ত্রিক প্রগ্রেসিভ ফ্রন্টের সাথে ছাত্র রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। পেশাগত জীবনে তিনি শিক্ষকতা করেছেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এর মধ্যে আছে, ঢাকার আনন্দময়ী স্কুল, লিটল অ্যাঞ্জেলস, আজিমপুর গার্লস স্কুল, নজরুল একাডেমি, কাকলি হাই স্কুল এবং আলেমা একাডেমি। ২০০০ সালে তিনি বিএড কলেজ থেকে অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হিসেবে ইডেন মহিলা কলেজ এবং বাংলা বাজার বালিকা বিদ্যালয় থেকে ছাত্রীদের সংগঠিত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার ছাত্র সমাবেশে নিয়ে আসেন তিনি। এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারীদের একজন। পুলিশের লাঠিচার্জে তিনি আহতও হয়েছিলেন।

২০০৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ভাষা সংগ্রামী রওশন আরা বাচ্চুর সাক্ষাতকার নিয়েছেন তারিকুল ইসলাম মাসুম

তা. ই. মাসুম: আমি আপনার কিছু সাধারণ তথ্য নিয়ে নেই। জন্ম কত সালে?রওশন আরা বাচ্চু: ওহ… আচ্ছা।
তা. ই. মাসুম: জেলা, থানা, গ্রাম?
রওশন আরা বাচ্চু: জেলা সিলেট, থানা কুলাউড়া, গ্রাম উছলাপাড়া।
তা. ই. মাসুম: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন কবে?
রওশন আরা বাচ্চু: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই ১৯৪৮ সনে।
তা. ই. মাসুম: কোন বিভাগে?
রওশন আরা বাচ্চু : দর্শন।
তা. ই. মাসুম: পাশ করলেন কবে?
রওশন আরা বাচ্চু: পাশ করছি তো ১৯৫৩ সনে, এমএ।
তা. ই. মাসুম: ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হলেন কী ভাবে?
রওশন আরা বাচ্চু: বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি কেন উঠল? এ দেশটা যখন দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে (হিন্দু-মুসলমান হিসেবে, ভারত এবং পাকিস্তান) ভাগ হলো। দেশ যখন ভাগ হলো আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পাবো বলে আশা ছিল।
কিন্তু দেশ ভাগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা বুঝতে পারলাম যে, আমরা ষড়যন্ত্রের শিকার। আমাদের যে আশা উদ্দীপনা ছিল, দেখলাম যে সবকিছুর সাথে একটা বিশ্বাসঘাতকতা জড়িত। আর আমরা একটা ষড়যন্ত্রের শিকার। সুতরাং, তখন আমাদের ভেতরে একটা বিদ্রোহ ভাব, অসন্তোষ ভাব জমা হতে লাগল। এই সমস্যার ভিতরে আমরা ছাত্র-ছাত্রীরা যখন পড়ে গেলাম তখন আমাদের যে পুঞ্জীভূত একটা আক্রোশ। এই আক্রোশটা আমাদের ছাত্রদের মধ্যে একটা সম্প্রীতি স্থাপন করল।

এর কিছুদিন পর ভাষার প্রশ্ন আসল, যখন তারা বাংলার পরিবর্তে উর্দু রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা করল তখন বিদ্রোহ, বিস্ফোরিত হওয়ার মতো অবস্থা জন্ম দেয়, বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে ছিল। ঠিক এই সময়ে, আমি তো ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ে ভর্তি হলাম।

এসেই দেখি এই ভাষার প্রশ্ন তো আছেই আমাদের, হ্যাঁ? তারপরে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখলাম যে, আমরা এরমধ্যে বেতন বৃদ্ধির একটা সংগ্রামের মধ্যে পড়ে গেছি। ছেলে-মেয়েদের মধ্যে অসন্তোষ, এরমধ্যে সরকারের দমন নীতি চলছে। শিক্ষা সংকোচ, তারপরে বেতন বৃদ্ধি, এই সব নানারকম…, এইসব নানাবিধ সমস্যা তখন ছিল। এই সমস্যার ভিতরে তখন, আমরা ছাত্র-ছাত্রীরা যখন পড়ে গেলাম, তখন আমাদের যে একটা পুঞ্জীভূত আক্রোস, সেই আক্রোসটা আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে একটা সম্প্রীতি তৈরি করে।

তখনই কথা চলছিল যে, আরবি হরফে বাংলা লেখা হবে, আর রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে। এই ধরনের কথাবার্তা শুনে শুনে আমাদের অসন্তোষ দিন দিন পুঞ্জীভূত হয়ে হয়ে, ঠিক যেই সময়ে নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করল পল্টন ময়দানে, ২৭ জানুয়ারি যে, উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা, সেই সময়ে বিক্ষোভে ছাত্র-ছাত্রীরা ফেটে পরল। তারা নিজেদের মধ্যে একটা সিদ্ধান্ত হলো যে, ৩০ তারিখ আমতলায় আমরা এটার প্রতিবাদ জানিয়ে মিটিং করব। তো, প্রতিবাদ জানিয়ে ৩০ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে আমরা মিটিং করলাম।

মিটিংয়ের ফলস্বরূপ এই দাঁড়াল যে, আমরা একটা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করব এবং আমাদের মাতৃভাষাটাকে যেকোনভাবেই হোক অর্জন করতে হবে। এমন একটা মনোভাব নিয়ে আমরা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। ওইদিনই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে, চৌঠা ফেব্রুয়ারি আমরা হরতাল পালন করব। তো চৌঠা ফেব্রুয়ারি হরতাল করলাম, সভা করলাম। তা. ই. মাসুম: এটার আয়োজক ছিলেন কে, মানে কারা নেতৃত্ব দিলেন?
রওশন আরা বাচ্চু: নেতৃত্ব তখন, নেতৃত্ব কী বলব? এটা বলব যে, এটা কারা আয়োজন করেছে? এটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্ম পরিষদ ছিল, সংগ্রাম পরিষদ, কর্ম পরিষদ না। বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ এটা, এটা আমরা আয়োজন করেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ আয়োজন করেছিল।
তা. ই. মাসুম: ওই পরিষদের মেম্বার কারা ছিলেন?
রওশন আরা বাচ্চু: ওই পরিষদে মেম্বার ছিলাম, ঐ পরিষদে আমরা সবাই সম্পৃক্ত হয়ে গেছি। তার কারণ, এটা তখন কে আয়োজন করেছে অতকিছু মনে নাই আমার।
তা. ই. মাসুম: এটা কোনো বড় বিষয় ছিল না।
রওশন আরা বাচ্চু: হ্যাঁ। ওখানে কে কে মেম্বার হইছে বা খাতায় কী লেখা আছে সেটা বড় কথা না। আমরাতো রাষ্ট্রভাষার জন্য সবাই সংগ্রাম করছি। এটাকে বলব, বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গেলাম। সবাই প্রস্তুত।
৩১ জানুয়ারি ঢাকার বার লাইব্রেরিতে মিটিং হলো। সেখানে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলো। সেই কমিটিতে রাজনৈতিক নেতা ও ছাত্ররাও ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, বিভিন্ন হলের প্রতিনিধি। এই রকম সবাই সম্পৃক্ত হলো।
তা. ই. মাসুম: আপনারা কী উদ্দেশ্য নিয়ে ভাষা আন্দোলন করেছিলেন?
রওশন আরা বাচ্চু: আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে অর্জন করতে চেয়েছি। আমাদের মাতৃভাষা যদি বাংলা না হয়, তবে আমাদের যে শিক্ষা-সংস্কৃতি সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের অস্তিত্ব বিলীন হবে। কোনো জাতির যদি নিজস্ব মাতৃভাষা না থাকে তবে সে জাতির মেরুদণ্ড ভেঙ্গে যায়। সুতরাং আমরা আমাদের মেরুদণ্ড সোজা রেখে জগতের সামনে দাঁড়াবার জন্য আমাদের মাতৃভাষাটাকে নানান ত্যাগ ও তিতিক্ষার মাধ্যমে অর্জন করতে চেয়েছি। আগামী প্রজন্ম যেন শিক্ষার মাধ্যম হিসেব মাতৃভাষা বাংলাকে পায়।
তা. ই. মাসুম: এ ৬০ বছরে আমরা কী পেয়েছি?
রওশন আরা বাচ্চু: এই ৬০ বছরে আশানুরূপ তো কোনো কিছু হয়নি আমাদের? আমরা একটা সুন্দর দেশ চেয়েছিলাম। আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি, আমাদের মেধা-মনন, সবকিছুই যেন বিপথে যাচ্ছে। এদিকে আমাদের আরও লক্ষ্য রাখতে হবে। লক্ষ্য না করলে, আমরা আরো পিছিয়ে যাব। আর ৬০ বছরে একদম পিছিয়ে গেছি, তাও না। আমরাও এগিয়ে আছি, যেহেতু আমরা গ্লোবাল ভিলেজে বাস করছি, তাদের মতো চলাফেরা আমাদের, আমরা এখন মোবাইলের অধিকারী, আমরা এখন এদেশ থেকে অন্যদেশে ই (যেগাযোগ) করতে পেরেছি। বিজ্ঞান আমাদের অনেক কিছু এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে। ঐ ৪ জানুয়ারির সভার পর আমরা গ্রামে-গঞ্জে স্কুল কলেজে আমাদের প্রতিনিধি পাঠিয়ে পতাকা দিবস পালন করেছি।
তা. ই. মাসুম: পতাকা দিবস কবে ছিল?
রওশন আরা বাচ্চু: আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ১৯৫২ সালে যখন রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন আসল, আমরা ৪ তারিখ ধর্মঘট পালন করব। ধর্মঘট পালন করে সিদ্ধান্ত নিলাম রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন প্রদেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। স্কুল কলেজ, জেলায় জেলায়, গ্রামেগঞ্জে প্রতিনিধি পাঠিয়ে আমরা পতাকা দিবস পালন করি ১১ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি। এ সময় জানানো হলো সভা, ধর্মঘট মিছিল করে ঢাকার রাস্তা প্রদক্ষিণ করলাম।

সেসময় মেয়েদের অবস্থা, মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে কথা বলতে পারতো না। মেয়েরা ইউনিভার্সিটিতে কথা বললে ১০ টাকা ফাইন, আর বহিষ্কার করতো। অভিভাবকরা পড়াশুনা বন্ধ করে দিতেন। এই রকম ভয় ছিল। ইউনিভার্সিটিতে মেয়েদের সংখ্যা কম ছিল, এজন্য বিভিন্ন স্কুল-কলেজ থেকে ছাত্রী আনতাম (সভা-মিছিলে)। মুসলিম গার্লস স্কুল, ইডেন কলেজ, বাংলা বাজার স্কুল, এসব জায়গা থেকে ছাত্রী নিয়ে আসতাম। এবং এই সময়ে তাদের নিয়ে আমরা আমতলায় মিটিং-মিছিল করতাম।
তা. ই. মাসুম: ২১শে ফেব্রুয়ারিতে কোন কোন জায়গা থেকে লোক নিয়ে আসছিলেন?
রওশন আরা বাচ্চু: ২১শে ফেব্রুয়ারি দলে দলে ভাগ হয়ে আমরা সব জায়গা থেকেই এনেছি। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি আমি গিয়েছিলাম কামরুন্নেসা স্কুলে। আমি গেলাম, তারপরে রোকেয়া আপা উনি গেলেন, ছাত্রীদের নিয়ে যখন আসি, তখন বেলা ১০টা-১১টা। ইউনিভার্সিটি (অঙ্গন) ছাত্র-ছাত্রীতে ভর্তি হয়ে গেল। ছাত্র-ছাত্রীরা মধু’র দোকানে তুমুল ঝগড়া-ঝাটি করছে। ১৪৪ ধারা ভাঙবে কি ভাঙবে না এই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। গেটের কাছে ৩ ট্রাক পুলিশ নেমে পজিশন নিয়ে নিল। কিছু পুলিশ লাঠি হাতে ব্যারিকেড তৈরি করল।

সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিবাদী কণ্ঠে বলে উঠল, আমরা ১৪৪ ধারা ভাঙবই ভাঙব। এবং তারা জোর গলায় হাত উঁচিয়ে বলছিল, ১৪৪ ধারা ভাঙবই ভাঙব। এইভাবে দৃঢ়চিত্তে তারা তাদের কথাগুলি বলতে লাগল। ভেতরে তখন তুমুলভাবে ১৪৪ ধারা ভাঙা না ভাঙার আলোচনা চলছিল। মধুদা’র দোকানে নেতাকর্মীরা জমা হয়েছেন। এবং টেবিল থাপড়িয়ে যার যার মতামত ব্যক্ত করছেন। তুমুল ঝগড়াঝাটি। এই সময় বেলা প্রায় ১২টার দিকে গাজীউল হকের সভাপতিত্বে সভা শুরু হয়।
শামসুল হক (আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক) প্রথম বক্তব্য রাখেন ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে। তারপর এই সময়ে নানা রকম বিক্ষোভ দেখা দিল সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে।

বিজ্ঞাপন

তখন আব্দুল মতিন, যিনি ভাষা মতিন নামে খ্যাত। তার বক্তব্য রাখার দায়িত্ব দেয়া হল। তিনি নিজে বক্তব্য না রেখে ছাত্র-ছাত্রীদের ১৪৪ ধারা ভাঙার বা না ভাঙার দায়িত্ব দিলেন। তিনি বললেন, আপনারা কী চান? ১৪৪ ধারা ভাঙবেন? না, ভাঙবেন না?তখন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিবাদী কণ্ঠে বললেন, ১৪৪ ধারা ভাঙবই ভাঙব। এবং তারা জোর গলায়, হাত উঁচিয়ে বলল, আমরা ১৪৪ ধারা ভাঙবই ভাঙব।

তখন সভাপতির ভাষণে গাজিউল হক বললেন, তাহলে আমরা ১৪৪ ধারা ভাঙব, এই সিদ্ধান্ত নিলাম। তখন প্রশ্ন আসল কীভাবে ভাঙব ১৪৪ ধারা?কেউ বলল ২ জন ২ জন করে বের হব। কেউ বলল ৪ জন ৪ জন করে বের হব। আবার কেউ কেউ বলল, ১০ জন ১০ জন করে বের হব। আব্দুস সামাদ আজাদের সিদ্ধান্তে ১০ জন ১০ জন করে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা। মোহাম্মদ সুলতান একটা লিস্ট করতে লাগলেন, যাতে বিপদ আসলে বা যাতে ক’জন মারা যায় সে জন্য লিস্ট করার দরকার হলো। আব্দুল মতিনও হতে পারে, এজন্য এটা করতে লাগলাম।

সিদ্ধান্ত হলো মেয়েরা প্রত্যেকটি দলের অগ্রভাগে একজন মেয়ে থাকবে। এইখানে আমরা গেটের কাছে চলে গেলাম। তখন কিন্তু দেখা গেল ছাত্রী কম। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী কম, অন্যান্য ছাত্রী আছে। ওদেরকে আমরা বলেছিলাম তোমরা বাড়ি যাও, সেই ছোট্ট মেয়েগুলো ক্যাম্পাসে বসেছিল, আমরা চলে আসার পরও। ওরা বলেছিল, বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। এরপরে একে একে আমাদের ব্যাচ বের হয়। আমি তৃতীয় ব্যাচে গেছি। প্রথম দুই ব্যাচে যারা ছিল তাদের পুলিশ ধরে নিয়ে যায়।

ডাকসু’র জিএস এস এ বারী এটি, ওনার দলে আমিও ছিলাম। মনে প্রত্যয় ছিল, এই প্রত্যয় নিয়ে ১৪৪ ধারা ভাঙতে গেছি। পুলিশের লাঠির মধ্যে হাত দিয়ে নাড়া-নাড়ি করেছি, পাকিস্তানি পুলিশ অনেক শক্তিশালী। এবং জোরা-জুরি করে লাঠির ব্যারিকেড ভেঙে যখন যাচ্ছি, তখন অনেক ছাত্রী গেট দিয়ে হুড়মুড় করে বেরিয়ে যাচ্ছি। তখন পুলিশ লাঠিচার্চ করল, লাঠিচার্জে আমি আঘাত পেয়েছি। তখন পুলিশ ক্যাম্পাসের ভেতরে কাঁদুনে গ্যাসের শেল ফেলছে,আমি তখন এক নজর খালি দেখলাম যে, গাজিউল হকের উপরে একটা কাঁদুনে গ্যাসের শেল পড়েছে। এবং তাকে চ্যাংদোলা করে নিরাপদে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চোখ জ্বালা করছে। সব অন্ধকার হয়ে গেছে। তখন কাঁদুনে গ্যাসের সঙ্গে আমাদের পরিচয় নাই। বেলতলার পুকুরে কেউ কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ল।

এসময় আমি যাচ্ছি অ্যাসেম্বলি হলের দিকে। ইতোমধ্যে ছেলেরা ইট-পাটকেল ছুঁড়তে লাগলো। এইসব এবং কাঁদুনে গ্যাসের মধ্যে দৌঁড় দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে পৌঁছাই। সেখানে লাঠিচার্জ, কাঁদুনে গ্যাস, গুলি হলো। ঠ্যাঁ, ঠ্যাঁ, ঠ্যাঁ শব্দে গুলির মধ্যে গিয়েই দেখি বইয়ের দোকান, রেস্টুরেন্ট, ভাঙা রিক্সার স্তুপ। এই স্তুপের মধ্যে ঢুকে গেছি গুলির ভয়ে। ভাঙা রিক্সার টুকরার মধ্যে ঢুকলাম, পরে সাহসে ভর করে রিক্সার স্তুপের ওপরে উঠে লাফ দিয়ে ড. গনির বাড়ি, ড. গনি প্রভোস্ট ছিলেন। তার বাড়ির মাঝখানে কাঁটাতারের বেড়া টপকাই। একেতো লাঠির আঘাত, তার পরে কাঁদুনে গ্যাস একদম বিধ্বস্ত অবস্থা। আরো বোরখা শামসুন, ডলি, সুরাইয়া, সুফিয়া ইব্রাহীম আর এইরকম আরও কয়েকজন চলে আসে।

আমাকে জিজ্ঞেস করল, অবস্থা কী?আমি বললাম, অবস্থা খুব খারাপ। তখন, গনি সাহেবের বাড়ী থেকে পানি এনে খাওয়ায়। তখন ভাবছি, কতজন মারা গেলা!
অনবরত গুলি, আহত কত? ৩০ জানুয়ারি থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সব বিকেল বেলা যে আন্দোলন সংগ্রাম করলাম। তা কি বিফলে যাবে? বাংলা কি প্রতিষ্ঠিত (রাষ্ট্রভাষা) হবে না?বেশ কিছু আহত হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে অনেককে, তাদের নিয়েও চিন্তা হয়।

এরপরে হঠাৎ তাকিয়ে দেখি, মুনির চৌধুরী যাচ্ছেন, কবীর চৌধুরীর ভাই। মুনির ভাই বলে ডাক দিলাম, তখন প্রায় সন্ধ্যা। তখন তার কাছে জানতে চাইলাম বাকীদের কী অবস্থা?বললেন, খুব খারাপ অবস্থা। তিনি আমাদের খবরও জানলেন।
সেই সন্ধ্যায় হোস্টেলে ফিরলাম। নাজু আপা ঔষধ আর খাবারের ব্যবস্থা করলেন। ডাক্তার ডাকলেন। ডাক্তার দেখে ঔষধ দিলেন। এইভাবে শেষ হলো ২১শে ফেব্রুয়ারি। এরপর দিন ২২শে ফেব্রুয়ারি। সেই সময় কিছু রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেছে, সারা রাত মাইকে ঘোষণা করা হয় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। ১৪৪ ধারা জারির মাইকিং করা হয়। এদিকে ছাত্ররা কান্না জড়িত কণ্ঠে বলছে, আমাদের শহীদদের লাশগুলো যত্নের সাথে রেখেছি, আগামীকাল জানাযা হবে। আপনারা সকালে জানাযায় আসবেন। পরে বলল, রাখতে পারলামনা আমাদের শহীদদের লাশ। আমাদের শহীদদের লাশ ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।

করুণ কণ্ঠে এসব ঘোষণা আমাদের মনকে শোকাভিভূত করে তোলে।
পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি গায়েবানা জানাযা হলো। মাওলানা ভাসানী সাহেব ছিলেন গায়েবানা জানাযায়। ফজলুল হক সাহেবও (শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক) গিয়েছিলেন সেই জানাযায়। এছাড়া তারা আর কিছু করেছেন বলে মনে পড়ছে না।
ছেলেরা সেদিন মিছিল করেছে, বাঁশের মাথায় শহীদের রক্তমাখা জামা নিয়ে মিছিল করেছে। সেই মিছিলে আবারো গুলি হয়। সেই গুলিতে আরো মারা যায় কেউ কেউ।

২৩ ফেব্রুয়ারি শহীদদের স্মরণে মেডিকলে কলেজের ছাত্রদের উদ্যোগে শহীদ মিনার নির্মিত হয়। বদরুল আলম একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি একজন ছাত্রনেতাও ছিলেন। তারই (এবং ডা, সাঈদ হায়দারের) আঁকা নকশায় শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। তখন মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদ মিনার তৈরি করে মেডিকেলের ছাত্ররা। ২৪ তারিখও ছেলেদের গ্রেপ্তার করল পুলিশ। এরপর আবার ২৬ তারিখ ঐ শহীদ মিনার ভেঙে দিল পুলিশ।

২৫ তারিখ আমাদের ইউনিভার্সিটিতে ডক্টর শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে ইউনিভার্সিটি টিচার্স কমিটির যে মিটিং হয়েছে, সেই মিটিংয়ে তারা এই জালিম জুলুমের বিরুদ্ধে প্রস্তাব নেয়। এইভাবে আন্দোলন চলতে থাকে। এই সব দেখে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয় ২৫ তারিখ। হল ত্যাগ করতে বলে কর্তৃপক্ষ। আমি ২৬ তারিখ হলত্যাগ করি এবং দেশের বাড়ি চলে যাই। ভয় ছিল যেকোন সময় গ্রেপ্তার হতে পারি। এই কারণে ভীতিতে ছিলাম। সেই সময়ের রাজনীতি এটা, আমাদের এখনকার মতো রাজনীতি এত সহজ ছিল না।

তারপরে যারা আন্দোলন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা হওয়ায় তারা অ্যারেস্ট হয়ে গেল অনেকে। অনেকে গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে চলে গেল।
সব নেতাকর্মীরা যখন ভেগে গেল তখন, অলি আহাদ ও মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের নেৃতত্বে ২৬ তারিখ পর্যন্ত আন্দোলন চলে। এরপর আন্দোলন কিছুদিনের জন্য স্থিমিত হয়ে গেলো।
তা. ই. মাসুম: ২১শে ফেব্রুয়ারি বা ভাষা আন্দোলন কী দিয়েছে আমাদের?
রওশন আরা বাচ্চু: একুশে আমাদের বড় পাওয়া, একুশ আমাদের শিক্ষা দেয় মাথা নত না করার। এই মাথা নত না করা শিখিয়েছে আমাদের একুশ। একুশ আমাদের অহংকার। একুশ আমাদের চেতনার উৎস।

চলবে…