চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সাক্ষাতকারে ধান ভানতে শিবের গীত

আল-জাজিরা কাতারের দোহা থেকে সম্প্রচারিত একটি সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল। গত ৫ আগস্ট দুপুরের দিকে বাংলাদেশী আলোকচিত্রী ড. শহিদুল আলম আল-জাজিরাকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশে ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ পরিস্থিতি নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ হাজির করেন। সাক্ষাতকার প্রচারিত হবার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর সেদিন সন্ধ্যায় ড. শহিদুল আলমকে তার বাসভবন থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। পরবর্তীসময় তাকে তথ্য-প্রযুক্তি আইনে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

প্রথমেই জানা দরকার কে এই ড. শহিদুল আলম? কেন তিনি নন্দিত এবং নিন্দিত?
ড. শহিদুল আলম পদক জয়ী ফটো এজেন্সি দৃক এবং এশিয়ার সবচেয়ে নামকরা ফটোগ্রাফি স্কুল ‘পাঠশালা’র প্রতিষ্ঠাতা। এই স্কুলে পড়তে প্রতি বছর বিদেশ থেকে বহু শিক্ষার্থী এবং অসংখ্য অতিথি শিক্ষক আসেন বাংলাদেশে। এছাড়াও ড. শহিদুল আলম বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক ইন্সটিটিউট ও সাউথ এশিয়ান ইন্সটিটিউট অব ফটোগ্রাফি প্রতিষ্ঠা করেছেন।

তবে তার সবচেয়ে সফল সৃষ্টি হলো ‘ছবি মেলা’। এই আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনীতে বিশ্বের সব জায়গা থেকে আলোকচিত্রের কাজ জমা পড়ে। আর অংশগ্রহণ করতে ঢাকায় আসেন বিশ্বের সেরা সব ফটোগ্রাফাররা। শহিদুল আলম পড়ালেখা করেছেন প্রাণ রসায়ন বিষয়ে।

তবে শহিদুল আলম বাংলাদেশের মানুষের কাছে অন্য অনেক পরিচয়ে পরিচিত। তিনি ছিলেন বেগম খালেদা জিয়ার ফটোগ্রাফার এবং মুভি নির্মাতা। তিনি জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক বানানোর জন্য মুভিতে জিয়ার নকল কণ্ঠ ব্যবহার করেছিলেন। অভিযোগ আছে এই ড. শহিদুল আলম, মাহমুদুর রহমান ও ফরহাদ মজহার গং’রা গণজাগরণের তরুণ প্রজন্মকে “নাস্তিক” উপাধিতে ভূষিত করেছিল। এমন কি ঢাকার মতিঝিলে হেফাজত ইসলামের ঘটনায় সাড়ে তিন হাজার আলেম হত্যার গুজবের অন্যতম নায়কও তিনি। সরকারি সূত্র মতে, যে সংগঠনটি এই গুজবের বৈধতা দিতে চেষ্টা করেছিল সেই সংস্থা “অধিকার”-এর অন্যতম একজন তিনি। অর্থাৎ তথ্য বিকৃতি ঘটানোতে তার জুড়ি মেলা ভার। তবে শহিদুল আলম-এর বিরূদ্ধে সবচে বড় অভিযোগ হল তিনি কুখ্যাত রাজাকার সবুর খান পরিবারের সদস্য।

ড. শহিদুল আলম গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ পরিস্থিতি নিয়ে আল-জাজিরাকে যে সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন তা কেন বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা অনুযায়ী একটি অপরাধ সেটি জানা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের সংবিধান অনুসারে কোন ব্যক্তিই আইনের উর্ধ্বে নন। তা তিনি বিখ্যাত বা কূখ্যাত ব্যক্তিই হন, আইন সকলের জন্য সমান। তবে সবার আগে জানা দরকার তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাতে কী বলা আছে।

তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা তে উল্লেখ করা হয়েছে ইলেক্ট্রনিক ফরমে মিথ্যা, অশ্লীল অথবা মানহানিকর তথ্য প্রকাশ সংক্রান্ত অপরাধ ও তার দণ্ড। ৫৭(১) ধারা অনুযায়ী, কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন অথবা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হয়, তা হলে তার এই কাজ হবে একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া ৫৭(২) ধারা অনুযায়ী, কোন ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন অপরাধ করলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বৎসর এবং সর্বনিম্ন সাত বৎসর কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন৷

সোজা কথায় উপরের ধারাতে বর্ণিত অপরাধ তখনি সঙ্ঘটিত হবে যখন কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েব সাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন-
(ক) যা নাকি মিথ্যা;
(খ) যা নাকি অশ্লীল;
(গ) যা নাকি সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারে;
(ঘ) যার দ্বারা মানহানি ঘটে;
(ঙ) যার দ্বারা আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়;
(চ) যার দ্বারা রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়;
(ছ) যা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে; অথবা
(জ) যার দ্বারা কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হয়।

যেহেতু ড. শহিদুল আলমের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে এবং তা এখন আদালতের বিচারাধীন রয়েছে, সেহেতু তার মামলার মেরিট নিয়ে এই মুহূর্তে কোন মন্তব্য করা আদালত অবমাননার শামিল হবে। আদালতই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে যে ড. শহিদুল আলম আল-জাজিরাকে গত ৫ আগস্ট যে সাক্ষাৎকার প্রদান করেছেন তা তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা অনুযায়ী অপরাধের মধ্যে পড়ে কি না। যেহেতু সাক্ষাৎকারটি ইউটিউবে যে কেউ দেখতে পারেন, সেহেতু আমরা জানার অধিকার রাখি যে ড. শহিদুল আলম সেখানে ঠিক কী বলেছেন।

আল-জাজিরাতে গত ৫ আগস্ট সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ড. শহিদুল আলমকে স্কাইপিতে জিজ্ঞেস করেন, “এই যে বাংলাদেশে এখন নিরাপদ সড়ক নিয়ে আন্দোলন চলছে তা কি শুধুই সড়ক-নিরাপত্তা নিয়ে সীমাবদ্ধ, নাকি এই আন্দোলনের আরও অন্য কোন দিক রয়েছে?” আমরা সকলেই কিন্তু এই প্রশ্নটির নির্মোহ উত্তর জানি। এমনকি আন্দোলনকারী শিশুরা ও তাদের অভিভাবকেরাও কিন্তু এর উত্তর জানত যে তাদের আন্দোলনের একটাই উদ্দেশ্য আর তা হল সড়ককে বিপদ মুক্ত করা। সাধারণ মানুষসহ বহু সেলিব্রটি তখন রাস্তায় আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন শুধু একটি দাবিতে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’। তাদের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলোর সবকটিই ছিল নিরাপদ সড়কের দাবিতে এবং আমি নিজেও মনে করি তাদের প্রত্যেকটি দাবি ছিল যৌক্তিক এবং গঠনমূলক।

শহীদুল আলম

অথচ ড. শহিদুল আলম বলা শুরু করলেন, “বাংলাদেশে এই মুহূর্তে নিরাপদ সড়ক নিয়ে যে আন্দোলন চলছে তা শুধুই সড়ক-নিরাপত্তা নিয়ে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটা আরও অনেক বড় আন্দোলন। এই আন্দোলন অনেক লম্বা সময় ধরে চলে আসছে। এই আন্দোলন মূলত বর্তমানের অনির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, যেই সরকারের কোন জনসমর্থন নেই। বর্তমান সরকার ব্যাংক লুট করছে, গণমাধ্যমের কন্ঠ রোধ করছে, মোবাইল আর ইন্টারনেটের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করছে, বিচার বহির্ভুত হত্যা করছে, প্রতিটি পদে পদে চাঁদাবাজি আর দুর্নীতি করছে, শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি করছে, এসবের তালিকা বলে শেষ করা যাবে না। সাধারণ মানুষের দীর্ঘ দিনের দুঃখ, কষ্ট, আবেগ, আর ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ হল এই চলমান আন্দোলন। এই সরকারের আমলে শুধু মাত্র এই সরকারের নিজ দলের লোকজনই সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাচ্ছে। সরকারের বিপক্ষ দলের লোকজনকে গুম করা হচ্ছে। বর্তমানের আন্দোলন কোটা সংস্কার আন্দোলনেরও একটি অংশ। সাধারণ মানুষ যে বর্তমানে আন্দোলন করছে তার অন্যতম একটি কারণ হল তারা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বাস করেনা। আসলে (বাংলাদেশের) বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তার সকল গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি তার পেটোয়া পুলিশ বাহিনী দিয়ে নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে ক্ষমতায় টিকে আছেন।”

এখন আদালতই বিচার করে দেখবেন আল-জাজিরাকে গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশে সেই সময় চলমান ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ নিয়ে ড. শহিদুল আলম যা বলেছেন তা কি মিথ্যা, মানহানিকর, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টিকারী, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণকারী বা উস্কানিমূলক কিনা। আমরা নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে আমাদের শিশুদের রাস্তায় বিপ্লবী হতে দেখেছি। কিন্তু তাদের এই যৌক্তিক আন্দোলনে কি এসব দাবি আদৌ ছিল? আর যদি না থেকে থাকে তাহলে ড. শহিদুল আলমের মত একজন বৃদ্ধ-বোদ্ধা-বাংলাদেশী নাগরিক কী উদ্দেশ্যে নিয়ে একটি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে “শীবের গীত” গাওয়া শুরু করলেন? কেন করলেন? কি ছিল তার উদ্দেশ্য?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)