চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সাকিবময় জয়ে রেকর্ড গড়া মহাকাব্য

ইংল্যান্ড ম্যাচে টস জিতে বোলিং নিয়ে কেলেঙ্কারি! পরে বড় হার। কড়া সমালোচনা! ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচে যখন আবারও শুরুতে বল করাকেই শ্রেয় মনে করলেন মাশরাফী, ভ্রু-কুঁচকে যাওয়াই ছিল স্বাভাবিক। হয়ত ছিল কী-বোর্ডে তীরবিদ্ধ করার প্রস্তুতি! তবে রেকর্ড গড়া জয়ে মহাকাব্য লেখার রাতে এখন কেবলই ফুলবর্ষণ! বাংলাদেশের জন্য সুরভিত জয়ের নায়ক চলতি বিশ্বকাপে ব্যাটে-বলে উড়তে থাকা সাকিব আল হাসান।

বিজ্ঞাপন

সাকিবের ব্যাটে এসেছে অপরাজিত ১২৪, আর লিটন দাস অপরাজিত থাকেন ৯৪ রানে। বল হাতে আগে ২ উইকেট নিয়েছেন সাকিব।

সোমবার টন্টনে শুরুতে ব্যাট করে নির্ধারিত ওভারে ৮ উইকেটে ৩২১ রানের বড় লক্ষ্যই দিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। রানবন্যার সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হওয়া বিশ্বকাপে এই ম্যাচের আগ পর্যন্ত যখন কোনো দল তিনশ পেরোনো লক্ষ্য ছুঁতে পারেনি, লক্ষ্যটা তখন আরও বড়ই হয়ে যায়।

সেটি টপকাতে কেবল বিশ্বকাপেই নয়, নিজেদের ওয়ানডে ইতিহাসেরই সর্বোচ্চ রানতাড়ার রেকর্ড গড়তে হত। অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছুটে মাশরাফী বিন মুর্ত্তজার বাংলাদেশ গড়েছে সেই রেকর্ডটাই। সাকিব-লিটনের ঝড় তোলা জুটিতে ৫১ বল আর ৭ উইকেট অক্ষত রেখেই জয়ে নোঙর ফেলেছে।

ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ডটি ছিল বিশ্বকাপেই। গত অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপে নেলসনে স্কটল্যান্ডের দেয়া ৩১৮ রান টপকে ৩২১ করে ফেলেছিল কোয়ার্টারে খেলা বাংলাদেশ। সেই রেকর্ডই নতুন করে লিখল টাইগাররা। ৩ উইকেটে ৩২২ করে। নিজেদের ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ, বিশ্বকাপে নিজেদের সর্বোচ্চ, আর বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান তাড়ার রেকর্ড।

উইন্ডিজ এমনিতেই খুব চেনা প্রতিপক্ষ বাংলাদেশের। গত দেড় বছরে সব ফরম্যাট মিলিয়ে ২০ বার সাক্ষাত, তাতে জয়ের পাল্লাটা টাইগারদের দিকেই ভারী। শেষ ৯ ওয়ানডেতে ৭টিতেই জিতে অপ্রতিরোধ্য ছিল লাল-সবুজরা। টন্টনে সেটি আরেকধাপ এগিয়ে গেল।

টন্টনে তিনশ পেরোনো লক্ষ্যের পেছনে নেমে উদ্বোধনীতে ৫২ তুলে ফেলেন তামিম-সৌম্য। ২টি করে চার-ছয়ে সৌম্য ২৩ বলে ২৯ করে ফিরলে ভাঙে জুটি। তামিম ফেরেন ৫৩ বলে ৪৮ করে। মুশফিক তখন ১ রানে সাজঘরে হাঁটা দিলে শঙ্কাই জেগেছিল!

লিটনকে নিয়ে রেকর্ড গড়া ১৮৯ রান যোগ করে সাকিব সব শঙ্কা দূরে ঠেলে দিলেন। ১৩ চারে ৮৩ বলে বিশ্বকাপে নিজের দ্বিতীয় আর বাংলাদেশের চতুর্থ শতক তুলে নিয়েছেন। পরে অবিচ্ছিন্ন জুটিতে লিটনের সঙ্গে যোগ করেন পৌনে দুইশ রান।

বিজ্ঞাপন

শেষপর্যন্ত ১২৪ রানে অপরাজিত থাকেন সাকিব। ইনিংসটি ১৬ চারে সাজানো। আগে বল হাতে নিয়েছেন ২ উইকেট। লিটনও কম যাননি এদিন। তার ৬৯ বলে ৯৪ রানের অপরাজিত ইনিংসটি ৮ চার ও ৪ ছয়ে সাজানো।

পঞ্চম বিশ্বকাপে এসে সেঞ্চুরির দেখা পাওয়া বাংলাদেশ মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ব্যাটে ২০১৫ আসরে টানা দুই ম্যাচে শতক দেখেছিল। ষষ্ঠ আসরে যেয়ে সাকিবের ব্যাটে দুই সেঞ্চুরি দেখল লাল-সবুজরা। তাতে নামের পাশে দুটি করে শতকে ধরে ফেললেন রিয়াদকে।

মাহমুদউল্লাহ গত অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপে অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১০৩ এবং পরের ম্যাচে হ্যামিল্টনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অপরাজিত ১২৮ রানের ইনিংস খেলেছিলেন।

টন্টনে সেঞ্চুরির আগে ২৩ রানে থাকার সময় দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে ছয় হাজার ওয়ানডে রানের মাইলফলক ছুঁয়েছেন সাকিব। সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে আসরে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ছুঁয়েছিলেন আড়াইশ রানের কীর্তি।

তাতে এই ফরম্যাটে অনন্য ডাবলের অভিজাত ক্লাবে এখন সাকিব। তার আগে যে কীর্তি ছুঁয়েছেন কেবল তিনজন, আফ্রিদি, ক্যালিস ও জয়সুরিয়া। টাইগারদের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সবার চেয়ে কম ম্যাচে কীর্তি ছুঁয়ে বাকিদের পেছনে ফেলেছেন।

পাকিস্তানি আফ্রিদির ছয় হাজার ও আড়াইশ রানের ডাবলের কীর্তি ছুঁতে লেগেছিল ২৯৪ ওয়ানডে। প্রোটিয়া ক্যালিসের লেগেছিল ২৯৬, আর লঙ্কান জয়সুরিয়ার ৩০৪ ম্যাচ। সাকিব সবাইকে পেছনে ফেললেন মাত্র ২০২ ম্যাচে এই অভিজাত ক্লাবে নাম লিখিয়ে।

এদিন শচীন-স্মিথের একটি রেকর্ডেও ভাগ বসিয়েছেন মহাকাব্য লেখা সাকিব। মাত্র চতুর্থ ক্রিকেটার হিসেবে বিশ্বকাপের এক আসরের প্রথম চার ইনিংসে ৫০ বা ততোধিক রানের সংগ্রহ গড়ার কীর্তি গড়েছেন।

ইংল্যান্ড আসরের প্রথম তিন ম্যাচের একটি সেঞ্চুরি ও দুটি হাফসেঞ্চুরি নিয়ে সোমবার টন্টনে নামেন সাকিব। ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করেই দারুণ রেকর্ডটি গড়েন। নভজাৎ সিং সিধু, শচীন টেন্ডুলকার ও গ্রায়েম স্মিথ বিশ্বকাপের এক আসরের প্রথম চার ইনিংসে ফিফটি প্লাস রান করার কীর্তি গড়েছেন। টাইগার মহাতারকা পরে তো সেঞ্চুরিতেই রূপ দিলেন মহাকাব্যিক ইনিংসটি।

নিজেদের প্রথম ম্যাচে সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭৫ রানের ইনিংস খেলে দুর্দান্ত শুরু। দ্বিতীয় ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৬৪, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় ম্যাচে ১২১, আর পরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচ ভেসে গেলে মাঠে নামা হয়নি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চতুর্থ ইনিংসে পেলেন ব্যাক-টু-ব্যাক সেঞ্চুরির স্বাদ। তাতে ইংল্যান্ড আসরে সেমিফাইনালে খেলার স্বপ্ন জেগে থাকল রঙিন হয়েই।