চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সাংবাদিকরা কেন বিদেশি কূটনীতিকদের এত বেশি পাত্তা দেন?

‘বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?’ ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ কি আছে?’ ‘বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে মিথ্যে মামলা ধরপাকড়ের পরও কি আপনি মনে করেন যে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ আছে?’

‘আপনি কি মনে করেন সরকার ঠিক কাজ করছে?’ ‘আপনি কি মনে করেন বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে ঢোকানো ঠিক হয়েছে?’ ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী?’

বিজ্ঞাপন

কোনো বিদেশি কূটনীতিককে দেখলেই আমাদের দেশের সাংবাদিকরা এ ধরনের প্রশ্ন নিয়ে হামলে পড়েন। যেন ওই বিদেশি ভদ্রলোক বললেই সেটা খাঁটি হয়ে যাবে, তা না হলে ওটা মিথ্যে! আমাদের দেশের সাংবাদিকতা পেশার এটা একটা বড় দুর্বলতা। কাকে সম্মান দিতে হবে, কাকে, কী জিজ্ঞেস করতে হবে, কীভাবে মোক্ষম প্রশ্নটা করে উত্তর বের করে আনতে হবে-সেটা বেশিরভাগ সাংবাদিকই জানেন না। তাদের সে বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণও নেই। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো বিকারও নেই।

ঔপনিবেশিক-মানসিকতার কারণে বিদেশিদের প্রতি এমনিতেই আমাদের একটা মোহ আছে। ওরা বেশি জানে, ভালো বোঝে, ওদের কথার গুরুত্ব আছে-এমনটা অনেকেই মনে করেন। ফলে বিদেশিরা আমাদের কাছে পাত্তা পায় বেশি। আর কোনো বিদেশি দূতাবাসের চাকরিজীবী হলে তো কথাই নেই। আমরা হুমড়ি খেয়ে পরি। যেন সে সব-জান্তা শমশের। সে সব জানে সব বোঝে। এবং তার এই মত-মন্তব্যের উপরই নির্ভর করছে আমাদের ভবিষ্যৎ, টিকে থাকা এবং বেঁচে থাকা!

পৃথিবীর আর কোনো দেশে বিদেশি কূটনীতিকরা সাংবাদিকদের কাছে এত পাত্তা পান না। নিজেদের দেশের রাজনীতি নিয়ে তাদের মতামত কেউ কখনও জানতে চেয়েছেন বলে শুনিনি। আমাদের রাজনীতিবিদরাই এজন্য প্রধানত দায়ী। তারাই বিদেশি কূটনীতিকদের রাজনীতি নিয়ে, অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে নাক গলানোর সুযোগ করে দিয়েছেন। কিছুদিন পরপরই তাদের ডেকে এনে ব্রিফিং দেন। প্রতিপক্ষ সম্পর্কে নালিশ করেন। প্রতিকার চান। এমনকি হস্তক্ষেপেরও অনুরোধ জানান। আর এই ‘নিধিরাম সর্দারেরাও’ এসব বেশ উপভোগ করেন। তারা নানা অনুষ্ঠানে যান। গিয়ে আমাদের জন্য নসিহত করেন। মিডিয়ায় সেসব নসিহত ফলাও করে প্রচারও করা হয়।

আমাদের দেশে নির্বাচন এলে বিদেশি রাষ্ট্রদূতেরা নিজেরা যেমন তৎপর হয়ে উঠেন, তেমনি আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের সক্রিয় করে তোলে। গরিব দেশ বলে আমাদের বাংলাদেশে বিদেশি কূটনৈতিকদের প্রকাশ্য কর্ম-তৎপরতা অতীতেও দেখা গেছে, এখনও চলছে, ভবিষ্যতেও হয়তো চলবে। যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের নেতারা কূটনীতিকদের বেশি দৌড়াদৌড়ি পছন্দ করেন না; কিন্তু বিরোধী দলে থাকলে তারাই আবার কূটনীতিকদের কাছে ধর্না দেন।বিএনপি নেতা-বৈঠক-বিদেশি কূটনীতিক

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন ঢাকাস্থ বিদেশি কূটনীতিকরা। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নির্বাচন কমিশনসহ রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অনাস্থা নিয়ে তারা নানা ধরনের মন্তব্য করছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার। যা রীতিমতো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত নাক গলানো এবং দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপের শামিল।

মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ক্ষোভের কারণ যদিও ভিন্ন। তার দেশের এক প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমতি না দেয়ায় তিনি মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আগ্রহ প্রকাশ করা মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশন’- ‘অ্যানফেল’কে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এবং পররাষ্ট্র দপ্তর অর্থায়ন করে থাকে। এই প্রতিষ্ঠানের ৩২ জন প্রতিনিধিকে ভিসা না দেয়ায় চটেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত।

বিজ্ঞাপন

এখানে বলে রাখা ভালো যে, বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা আছে। এশিয়ার রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ১৯৯১ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিনে একটি নৌঘাঁটি প্রতিষ্ঠার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম থেকেই ওই নৌঘাঁটি প্রতিষ্ঠার ঘোর বিরোধী। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই হাসিনা সরকারের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা বিরোধ চলছে। হাসিনা সরকারকে জব্দ করতে এর আগে বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশে পদ্মাসেতুর অর্থায়ন নিয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কারসাজি করে। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা চালায়। সর্বশেষ তারা বাংলাদেশে ‘মানবাধিকার’ এবং ‘গণতন্ত্র’র প্রশ্ন তুলে সরকার পরিবর্তন ঘটাতে চায়। সে জন্য সিআইএ’র অর্গানাইজেশন ‘অ্যানফ্রেল’কে বাংলাদেশ ভিসা না দেওয়ায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ক্ষোভের কারণ সহজেই বোঝা যায়। উল্লেখ্য, এই ‘অ্যানফ্রেল’কে থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়াতেও ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

যাইহোক, আসলে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দুর্বলতার সুযোগেই কূটনীতিকরা তাদের অপতৎপরতা বৃদ্ধির সুযোগ পাচ্ছে। বিদেশি কূটনীতিকরা যখন হাই প্রোফাইল পলিটিশিয়ানদের সাথে দেখা করেন তখন তারা কী কথা বলেন তা বিস্তারিত জানা যায় না। যে দুই পক্ষ দেখা করেন এবং কথা বলেন তারাও সেই বৈঠকের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেন না। এসব সাক্ষাৎকারের যে তথ্য বিবরণী প্রকাশ করা হয় সেটি গৎ বাঁধা। বলা হয় যে, তারা পরস্পরের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে তাদের মতামত প্রদানের কোনো অধিকার নেই।

কিন্তু নব্বই দশক থেকে দেখছি যে, যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন বিদেশি কূটনীতিকরা, বিশেষ করে বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা, আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলিয়েই চলেছেন। এ ব্যাপারে বড় দুই দলের ভূমিকা বেশ চমকপ্রদ। বিদেশি কূটনীতিকদের দৌড়াদৌড়ি ছুটাছুটি যখন তাদের পক্ষে যায় তখন তারা চুপ করে থাকে, অথবা তাদের সেই তৎপরতাকে পরোক্ষভাবে সমর্থন জানায়। কিন্তু যখনই বিদেশিদের তৎপরতা তাদের অবস্থানের বিপক্ষে যায় তখনই তারা ‘অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ’ বলে চিৎকার শুরু করে।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের রাজনীতিতেও নানা ধরনের সংকট আছে। নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়াদিসহ অনেক ধরনের মতবিরোধ আছে। তবে দেশের প্রশ্নে তারা কিন্তু এক। দেশের ব্যাপারে তারা বাইরের কাউকে নাক গলাতে দেয় না। এই শিক্ষাটা আমাদের নেওয়া উচিত। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। এর একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে। দেশ পরিচালনায় রয়েছে একটি ধারাবাহিক দিকনির্দেশনা। বাংলাদেশে কীভাবে নির্বাচন হবে, কে কীভাবে তা পর্যবেক্ষণ করবে, সেটা ঠিক করব আমরা। আমাদের দেশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংস্থা। দেশের নীতিনির্ধারণ ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপ মেনে নেয়া যায় না।

বিদেশি কূটনীতিকরা আমাদের কোনো বিষয়ে মাথা ঘামাক এটি আমরা চাই না। এটা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য শুভ নয়। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এমন নজির নেই। প্রধান দুই রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে বিদেশিদের আশীর্বাদ নিতে চায় বলেই হয়ত এমন পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রদূতদের বৈঠক করাটা অস্বাভাবিক নয়। রাষ্ট্রদূতরা নিজ দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্টতার প্রয়োজনেই সবার সাথে কথা বলে ধারণাপত্র তৈরি করেন। কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ে মত-মন্তব্য করা তার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।

গণতন্ত্রকে যদি প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে আমাদের দেশ আমাদের মতো করেই পরিচালনা করতে হবে। একটা গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে। আমাদের মারামারি, কটূক্তি কিংবা মতবিরোধ আমাদের দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। বাইরের কাউকে ডেকে এনে নাক গলানোর সুযোগ দেওয়া যাবে না। কোনো মর্যাদাশীল দেশ এটা করে না। কোনো মর্যাদাশীল দেশের রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি এটা করে না। আমাদের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের এই বোধোদয়টা কবে হবে? কবে তারা আমাদের সমস্যাগুলোকে আমাদের মতো করে সমাধানের জন্য উদ্যোগ নেবে? যারা বাইরে গিয়ে অভিযোগ করে তারাই যে ছোট হয় এটা তারা কবে বুঝবে?

তবে এ ব্যাপারে সবার আগে বোধোদয়টা হওয়া দরকার সাংবাদিকদের। বিদেশি কূটনীতিক পেলেই ‘এ ব্যাপারে আপনি কী মনে করেন’, ‘এরপর কী হতে পারে’ জাতীয় প্রশ্নমালা যদি না করা হয়, কূটনীতিকদের অযাচিত বক্তব্য যদি প্রচার ও প্রকাশ না করা হয়, তাহলেই কিন্তু ওই হিরোরা জিরো বনে যাবেন। কথা হলো আমাদের ধামাধরা ও বিদেশি-তোষণ মানসিকতার সাংবাদিক-সম্পাদকরা সেটা পারবেন কি?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)