চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সাংবাদিকদের সামনে ৫৭ ধারার চেয়েও বড় দেয়াল ৩২

সদ্য বিলুপ্ত তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা সাংবাদিকদের জন্য সরাসরি হুমকি না হলেও ধারাটির অপব্যবহারের কারণে সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ৫৭ ধারাকে ব্যবহার করেছিল সংবাদকর্মী , অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের ওপরে, কয়েকজনকে কারাবরণ পর্যন্ত করতে হয়েছে। সব মিলিয়ে কালো আইনটির বিরুদ্ধে জনমত দানা বেঁধে উঠতে থাকায় এই ধারা বিলুপ্ত করতে দাঁড় করানো হয় ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট। তবে ৫৭ ধারার ভুক্তভোগী ও সরকারি পর্যায়ের অনিয়ম-দুর্নীতি জনগণের নজরে আনা সাংবাদিকদের মতে নতুন আইনের ৩২ ধারা গুপ্তচরবৃত্তি রোধে করা হলেও ৫৭ ধারার মতো এই ধারাটি সাংবাদিকদের সত্য প্রকাশে বাধার দেয়াল হবে বলে মনে করছেন সাংবাদিকরা।

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের ৩২ ধারায় বলা হয়েছে: যদি কোনও ব্যক্তি বে-আইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনও সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ কোনও সংস্থার কোনও ধরনের অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত, কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনও ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ।

বিজ্ঞাপন

আর এই অপরাধের শাস্তি হতে পারে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড এবং ২৫ লাখ টাকা জরিমানা।

‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্নের অভিযোগে ৫৭ ধারার সরাসরি শিকার সাংবাদিক নাজমুল হোসেন। ৫৭ ধারার মতো নতুন আইনেও ‘ভাবমূর্তি’ নামক বিষয়টি অস্পষ্ট থেকে গেলেও আপাতত সাংবাদিক হিসেবে ৩২ ধারাটিই বেশি ভাবাচ্ছে তাকে।

নতুন আইনে গুপ্তচরবৃত্তির রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ও আর্থিক ক্ষতি দমনে ৩২ ধারা যুক্ত করার সরকারি ভাবনা আপাতত মহৎ মনে হলেও ৫৭ ধারার মতো এই ধারাটিও সরাসরি সাংবাদিকদের টার্গেট করবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।

উদ্বেগের কথা জানিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনকে এই সাংবাদিক বলেন: আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। কারণ নতুন ডিজিটাল আইনের অপব্যবহার হওয়ার সুযোগ বেশি। যে কেউ চাইলেই গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ করতে পারেন। স্বভাবতই সাংবাদিকরা প্রধান টার্গেট হবে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতে দুদক নিজেরা তদন্ত শুরু করে সত্যতা পায়। এমন কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। সাংবাদিকতায় নতুন সংকট তৈরি হবে।
সরকার যখন নবম ওয়েজবোর্ড ঘোষণা করে সাংবাদিকদের কাছে বাহবা কুড়ালো ঠিক তখনই নতুন করে বিতর্ক শুরু হলো এই ধারার জন্য।

বিজ্ঞাপন

তাহলে ৫৭ ধারা কী থেকেই গেলো? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন: আমি হতাশ।

নিজেদের অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর তুলনায় অপেক্ষাকৃত প্রগতিশীল দাবি করে আওয়ামী লীগ সরকার। দেশে মোবাইল ফোন, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের পথ করে দিয়েছে এই দলেরই সরকার এমন মন্তব্য করে বর্তমানে ৩২ ধারা যুক্ত করায় হতাশা প্রকাশ করেছেন সাংবাদিকতাকে সদ্য বিদায় জানানো শরিফুল হাসান।

বর্তমানে বেসরকারি সংস্থায় একটি প্রকল্প প্রধান শরিফুল হাসান সাংবাদিক থাকাকালে সরকারি ও প্রভাবশালীদের অনিয়ম প্রকাশ করেছেন নিপূণ দক্ষতায়। অথচ সরকারি দপ্তরে রাষ্ট্রের প্রকৃত স্পর্শকাতর ফাইলের চেয়ে বেশি গোপনীয় থাকা দুর্নীতির তথ্য বের করার পথ বন্ধ করতেই ৩২ ধারা ব্যবহৃত হবে বলে মনে করেন তিনি।

চ্যানেল আই অনলাইনকে শরিফুল হাসান বলেন: সারা পৃথিবীতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে, দেশে তথ্য অধিকার আইন আছে। এই অবস্থায় উচিৎ ছিলো সাংবাদিক ও দুর্নীতির ভুক্তভোগী জনগণকে সামাজিক মাধ্যমে দুর্নীতি এবং দুর্নীতিবাজদের মুখোশ উন্মোচনের পথ সুগম করা। অথচ ৩২ ধারা দিয়ে হচ্ছে তার উল্টো। সাধারণ মানুষ কোন অন্যায়-অনিয়ম-দুর্নীতি দেখলে সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ করতে পারতো, পুলিশ থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি ঘুষ নিতো সেটা রেকর্ড করতে পারতো, ছবি তুলতে পারতো। এখন ৩২ ধারা দিয়ে সেটা রুখে দেয়া যাবে।

‘৩২ ধারায় বেআইনি প্রবেশের কথা বলা হয়েছে। কেউ যদি আগে থেকেই বলে দেয় আমি ওমুক দিন যেয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরবো। তাহলে কোন দিনও অনিয়ম-দুর্নীতির খবর প্রকাশ করা সম্ভব হবে না।সাংবাদিকরা সামাজিক মাধ্যমে ‘আমি গুপ্তচর’ প্ল্যাকার্ড হাতে ৩২ ধারার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন । আমার কাছে মনে হয় এই কালো ধারা দিয়ে দেশকে ৪০-৫০ বছর নয় বরং পিছিয়ে আদিযুগে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আশা করি ৫৭ ধারার চেয়েও বড় দেয়াল ৩২ ধারা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে প্রত্যাহার করা হবে।’

২০০৬ সালের বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইন প্রণয়ন করা হয়। ২০১৩ সালে সংশোধন করে ৫৭ ধারা যুক্ত করা হয়। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারা নিয়ে বিতর্ক চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। ওই আইনের ধারার অপপ্রয়োগে সাংবাদিকসহ নানা পেশার মানুষ ক্রমাগত হয়রানির শিকার হতে থাকলে ধারাটি বাতিলের দাবি ওঠে। অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে সেই ৫৭ ধারা বাতিল করে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- ২০১৮’ এর খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়। তবে অনুমোদন পাওয়া নতুন আইনের ৩২ ধারা জাগাচ্ছে নতুন উদ্বেগ।