চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সমকাম, সমপ্রেম ও ভারতীয় আদালতের রায়

সাধারণ দৃষ্টিতে সমকামিতা হলো-একই লিঙ্গের প্রতি কামবোধ বা সমলিঙ্গের প্রতি যৌন আকর্ষণবোধ। যদিও সমকামিতাকে কেবল কামবোধ দিয়ে মাপার বিরোধীতা করেন আধুনিক সমাজতাত্ত্বিকরা। তাদের মতে, ‘সম্পর্ক’ কেবল ‘কাম’ দিয়ে হয় না, এর পেছনে থাকে আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা, প্রেম, ভালোলাগা। কাজেই সমকামীদের ‘সমকামী’ না বলে ‘সমপ্রেমী’বললে তা হয় যথার্থ। যারা সমলিঙ্গে সম্পর্কে জড়ান, আকর্ষণ বোধ করেন, তারাও নিজেদের ‘সমপ্রেমী’ বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

বিজ্ঞাপন

সমকাল বলি আর সমপ্রেমই বলি ভারতীয় সমাজে তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল এতদিন। কিন্তু গত ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের সুপ্রিমকোর্ট এক চাঞ্চল্যকর রায়ে বলেছে, সমকামিতা কোনও অপরাধ নয়। এই রায়ের মাধ্যমে সম যৌনতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের মতে, সমাজের বাকি পাঁচজনের থেকে আলাদা নন সমকামীরা। বাকিদের যৌনতার অধিকার থাকলে তা সমকামীদেরও আছে। যৌন অনুভূতি একেবারে প্রাকৃতিক ব্যাপার। এর উপর মানুষের কোনও নিয়ন্ত্রণ চলে না।

পাঁচজন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ বেঞ্চ সহমতে পৌঁছেছেন যে, যৌন পছন্দ একজন ব্যক্তির স্বাধীনতা আর তার ভিত্তিতে বৈষম্য করলে সেটাও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধ।

ভারতের সুপ্রিমকোর্টের এই রায়কে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। ‘‘আমি যা আমি তা-ই। তেমন করেই গ্রহণ করো আমাকে’’, রায় প্রদানের সময় জার্মান কবিকে উদ্ধৃত করে বলেছেন ভারতের প্রধান বিচারপতি। তিনি আরও বলেছেন, ব্যক্তির ইচ্ছেকে সম্মান করাই স্বাধীনতার আসল কথা।

অনেকে এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করছে। এই রায়ের সমর্থকরা বলছে, এর ফলে মুক্তি পেয়েছে প্রাইভেসি। যা ঠিক ‘গোপনীয়তা’ নয়, ব্যক্তিপরিসর। আমি কী রান্না করছি, কী কিনছি, শোবার ঘরে কী করছি, তা আমারই সিদ্ধান্ত। তাতে হাত দেওয়ার কাজটা নিতান্তই অবৈধ। তাদের মতে, ‘‘তুমি কেন সবার মতো হবে না, কেন তুমি আমার মতো নও’’, এ প্রশ্ন ভ্রান্ত, এ দাবিটাই অপরাধ!

পক্ষান্তরে সমকামবিরোধীরা ধর্মের দোহাই দিয়ে এই রায়ের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তারা রায়ের সমালোচনায় সোচ্চার হয়েছে। মূলত ধর্মের দোহাই দিয়েই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমকাম নিষিদ্ধ এবং অনেক ক্ষেত্রে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে দেখা হয়েছে, এখনও দেখা হয়। এই যুক্তিতেই ইংরেজ শাসনামলে সমকামকে আইনবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় একে শাস্তিমূলক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে যা এখনও বলবৎ আছে।

ক্যাথলিক ভাবনায় সমকামিতা শাস্তিযোগ্য। ক্যাথলিক বিবেচনায়, সেখানে শরীরকে ব্যবহার করা হয় উপভোগের জন্য, যা কি না ভয়ানক অপরাধ, কারণ শরীর এবং সঙ্গম নামক মৌলিক পাপটিকে শুধুমাত্র ব্যবহার করা যায় সন্তান উৎপাদনের জন্য। সেটিই প্রকৃতির নির্দেশ, শরীরের বাকি সব ব্যবহার শাস্তিযোগ্য। তাই সমকামীদের ‘অস্বাভাবিক’ ছাপ্পা মেরে তাদের শাস্তি, নিদেনপক্ষে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে রাষ্ট্র, কারণ তাদের যৌনতা সন্তান জন্ম দেয় না, তাদের যৌনতা পরিবার নামে প্রতিষ্ঠানটির টিকে থাকার পথে ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক। সমকামী সম্পর্কে সন্তান হবে কী করে? পরিবার থাকবে কী করে? সন্তান যদি না থাকে, রাষ্ট্র শাসন করবে কাকে? আর পরিবার না থাকলে রাষ্ট্র তার অনুশাসন মানাবে কার মাধ্যমে? হ্যাঁ, দত্তক-গর্ভ ভাড়া ইত্যাদির মাধ্যমে সন্তান এলেও সেটি যেন ঠিক স্বামী-স্ত্রী-গর্ভজাত সন্তানের ‘আদর্শ’ পরিবারের সমতুল নয়। এমন ভাবনা থেকেই ধর্মবিশ্বাসীদের সমকামের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান।

গত কয়েক দশক আগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সমকামিতা, সমলিঙ্গে বিবাহ চালু হয়। ১৯৭৫-এ সমলিঙ্গ কার্যকলাপ প্রথম আইনি স্বীকৃতি পেয়েছিল বেলজিয়ামে। তবে বিবাহ নিয়ে স্বীকৃতি পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ২০০৩ পর্যন্ত। ২০০১-এ নেদারল্যান্ডসে সমলিঙ্গ বিবাহ আইনি ভাবে স্বীকৃতি পায়। নেদারল্যান্ডসই বিশ্বের মধ্যে প্রথম দেশ, যেখানে সমলিঙ্গ বিবাহ আইনত সিদ্ধ। সে দেশে এখনও পর্যন্ত ১৫ হাজার সমলিঙ্গের মানুষ বিয়ে সেরেছেন।

বিজ্ঞাপন

এরপর ধারাবাহিকভাবে স্পেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে, মেক্সিকো, আইল্যান্ড, পর্তুগাল, আর্জেন্টিনা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, আয়ারল্যান্ড ও ফিনল্যান্ডে সমলিঙ্গ বিবাহ স্বীকৃতি পায়।

উল্লেখ্য, যৌন প্রবৃত্তি বা বিভিন্ন ধরনের যৌন বৈশিষ্ট্য লালনকারীদের সমাজে নানা নামে ডাকা হয়। গত শতকের শেষ দিকে “যৌনতা ও লিঙ্গ পরিচয়-ভিত্তিক সংস্কৃতিগুলির” বৈচিত্র্যের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করার জন্য “এলজিবিটি” শব্দটি ব্যবহৃত হয়। সামগ্রিকভাবে “এলজিবিটি” বলতে বোঝায় “লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল ও ট্রান্সজেন্ডার” অর্থাৎ, নারী ও পুরুষ সমকামী, উভকামী ও রূপান্তরকামী। আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধরনের যৌন বৈশিষ্ট্যের মানুষ আছে। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে এলবিটি। L=Lesbian (নারী+নারী বা নারী সমকামী), G=Gay (পুরুষ+পুরুষ বা পুরুষ সমকামী), B= Bisexual man/women (বাইসেক্সুয়াল বা উভকামী), T=Transman/women (ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরকামী)। এছাড়াও ইন্টারসেক্স (Intersex) বা অন্তবর্তী, কিঙ্কি (Kingky) বা বিচিত্রকামী বা কোতি, ক্যুইয়ার (Quier) বা প্রথাবিরোধী যৌন লিঙ্গ পরিচয়ধারী, CIS Women (মেয়ে মেয়ের প্রেমে পড়ে, মেয়ে হতে না চাওয়া সমকামী মেয়ে, যারা খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করেন) ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন যৌন পরিচয়ে পরিচিত মানুষ দেখা যায়। এই ধরনের অন্তর্ভুক্তির স্বীকৃতি হিসেবে আদ্যক্ষরটির একটি জনপ্রিয় পাঠান্তরে ইংরেজি “কিউ” (Q) অক্ষরটি যুক্ত করা হয় যৌনপ্রবৃত্তির স্থলে কুইয়্যার বা কোয়েশ্চেনিং (প্রশ্নরত) বোঝাতে (অর্থাৎ, “এলজিবিটিকিউ”), ১৯৯৬ সাল থেকে নথিভুক্ত।
সমকামিতার সমর্থকরা মনে করেন, সমকামিতা অস্বাভাবিক নয়, এটি কোনও ধরনের জীবনচর্চার সমস্যা নয়, বিকৃত মনোভাবও নয়। আর পাঁচজন মানুষ যে রকম ডান হাতি বা বাঁ হাতি হন, কিংবা খর্বকায় বা লম্বা হন এগুলো যেমন স্বাভাবিক, কেউ স্বেচ্ছায় বেছে নেন না, এ ক্ষেত্রেও তাই। কেউ নিজে এই আচরণের জন্য দায়ী নন।

আমাদের সমাজ একটা নিজস্ব ছক অনুযায়ী পরিচালিত হয়। সামাজিকভাবে কতগুলো জিনিসকে সিদ্ধ কতগুলোকে নিষিদ্ধ হিসেবে দেখা হয়। এখানে নারী-পুরুষকে একটা বিশেষ ছাঁচে ফেলে দেখার মানসিকতা রয়েছে। কেউ যদি এর বাইরে যায় তাহলেই সমাজ তার বিরুদ্ধে খড়গ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমাদের সমাজে একজন পুরুষ একজন নারীকে বিয়ে করবে, তার সঙ্গে যৌনকর্মে রিপ্ত হবে, সন্তান-সন্ততি হবে, নারীরা পুরুষের ইচ্ছায় বা পুরুষের তৈরি নিয়ম ও আচরণ মেনে চলবে-এটাকেই ধ্রুব বলে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। এর বাইরে কোনো কিছু আছে বা থাকতে পারে-সমাজ তা মানতে নারাজ। সমকামীদের তাই আমাদের সমাজে ভীষণ খারাপ হিসেবে দেখা হয়। অথচ সমকামিতা আমাদের সমাজে যুগ যুগ ধরেই ছিল।

কাউকে যদি তার জন্মগত আচরণ লিয়ে লজ্জিত হতে হয় তা হলে তাহলে তা কোনও মতেই মেনে নেওয়া যায় না। সামাজিক কুসংস্কার বা সমাজ চায় না এমন কোনও বিষয় নিয়ে যদি কেউ অবহেলিত হয় সেটিও গ্রহণযোগ্য নয়। আর, এ জন্য বিভিন্ন দেশের এলজিবিটি সম্প্রদায়কে চড়া মূল্য দিতে হয়, তাদের প্রতিদিনই যুদ্ধ করতে হয়।

যৌন বৈশিষ্ট্যে কেউ যে আলাদা তা সহজে অনুধাবন করা যায় না। তারা নিজেদের সমস্যার কথা খোলাখুলি আলোচনা করতে পারেন না, তারা নিজেদের কাউন্সেলিং করাতেও সাহস পান না। একই দুরবস্থা বাবা-মা, অবিভাবকদের। তারাও তাদের সন্তানদের দুঃখ বুঝতে পারেন না। তারাও আঁচ করতে পারেন যে তাদের ছেলেমেয়েরা অবহেলা লাঞ্ছনার শিকার হবে। আর, তাই তারাও ভেঙে পড়েন। তাদের জীবনও কঠিন হয়ে ওঠে। অনেকে ছেলেকে ‘ছেলে’ ও মেয়েকে ‘মেয়ে’ বানানোর জন্য শক্তি প্রয়োগ করে। জোর করে বিয়েও দেয়। তারপর হয়তো দেখা যায়-ছেলেটি ঠিক ছেলে সত্তা নয়, অথবা মেয়েটিও ঠিক মেয়ে সত্তা নয়। তখন শুরু হয় দুঃসহ যন্ত্রণা!
আসলে বাইরে থেকে দেখা ‘ঠিক’ সব সময় ‘ঠিক’ নয়। ভেতরের বা সত্তার বিকাশই আসল কথা। সত্তাকে উপলব্ধি করতে হয়। তবে তাকে চিনতে পারা যায়। আমাদের সমাজে পিতৃতন্ত্রের খাঁচায় সবাইকে ‘ফিট’ করতে চাওয়া হয়। কেউ ‘ফিট’ না করলে তাকে বাধ্য করা হয়।

সমাজে কোনো কিছুই ধ্রুব বা চিরন্তন সত্য নয়। যৌনতা মানে কেবল যৌন কর্ম নয়, যৌনতা বোধ। এর সঙ্গে ভালোবাসা-স্বপ্ন-কল্পনা-আবেগ-অনুভূতি-সম্পর্ক অনেক কিছুই যুক্ত রয়েছে। যৌনতা মানে কেবল বিয়ে-পরিবার-সন্তান নয়। এই বাইরে আমরা অন্য কিছু ভাবি না, ভাবতে পারি না, তেমন ভাবনাকে সমর্থন যোগানো হয় না। যদি তেমন ভাবনার পরিবেশ, স্বাধীনতা দেওয়া যায়, নিজেকে, নিজের চিন্তা-স্বপ্ন-কল্পনা, ভালো লাগা-খারাপ লাগাকে বের করে আনার সুযোগ থাকে তাহলে, নিজেকে যদি সত্যিই আবিস্কার করা যায়, তাহলে দেখা যাবে-বিভিন্ন যৌন পরিচয়ের মানুষ আমাদের চারদিকে ভিড় জমাচ্ছে।

সমাজতাত্ত্বিকরা মনে করেন, সমকামিতাকে আইনগত স্বীকৃতি প্রদান করা উচিত। সমকামিতা যদি আইনি স্বীকৃতি পায় তাহলে এই নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা হবে। তাহলে সমকামিতা নিয়ে মানুষের মনে জমে থাকা ভ্রান্ত ধারণাগুলো পরিষ্কার হবে। সমকামীদের জন্য এটা প্রয়োজনীয়। এটা সমাজের জন্যেও প্রয়োজনীয়।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার এক কবিতায় লিখেছেন, “বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনও বসে/বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে” বিশ্ব এগিয়ে চলেছে সত্যি সত্যি। কিন্তু আমরা বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজে হয়রান হচ্ছি। এই পৃথিবী যখন মানুষের ভালোবাসার মর্যাদা খুঁজতে নিত্যনতুন আইন প্রণয়ন করছে, তখন আমরা সংস্কার ও ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষের অধিকারকে গলা টিপে হত্যা করতে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)