চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সংলাপের হাওয়া

দেশে ফের সংলাপের রাজনীতির বাতাস বইতে শুরু করেছে। সংলাপের এই রাজনীতির সফল হবে কিনা তা এখনই ধারণা করতে না পারলেও এটা বলা যায় যে এই রাজনীতির কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার দৃশ্যমান দূরত্ব কিছুটা হলেও অপসারিত হবে। দূরত্ব অপসারণের এই ইঙ্গিত আপাতদৃষ্টিতে উচ্চাশা-সম মনে হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান বিবেচনায় এটা বলা যায়।

বিজ্ঞাপন

সংলাপের রাজনীতি বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। নিকট অতীতে একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার এবং দেশের পৌনে একশ’র মতো রাজনৈতিক দল সংলাপে বসেছিল। সেই সংলাপের ফল নিয়ে একেক জন একেক মন্তব্য করলেও সে সংলাপ কিন্তু ব্যর্থ হয়ে যায়নি। প্রায় মুখোমুখি থাকা রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনকে ঘিরে সেই সংলাপে অংশ নিয়েছিল এবং তাদের নিজেদের মতামত প্রকাশ শেষে নির্বাচনে অংশ নিয়েও ছিল। সংলাপ শেষে একেক দলের একেক ধরনের মন্তব্য থাকলেও তারা সকলেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ফলে একাদশ সংসদ নির্বাচন হয় অংশগ্রহণমূলক, যেখানে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৩৯ দলের সকল দলই অংশ নেয়।

নির্বাচনপূর্ব সংলাপে ৭৫ দল অংশ নিয়েছিল বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ, যদিও সেই সংলাপের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে প্রথমে চিঠি দেয় ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। চিঠি পাওয়ার পর পরই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হয়। এরপর একে একে সকল দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয় সরকারের পক্ষ থেকে। ড. কামাল হোসেনের প্রথম চিঠির পর পাদপ্রদীপের আলো যখন সরকারবিরোধী নবগঠিত ওই জোটের দিকেই যাচ্ছিল তখনই শেখ হাসিনার এক সিদ্ধান্তে আলো ঘুরে চলে যায় তার সরকারের দিকে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের চাপে সরকার সংলাপে বাধ্য হয়েছে এমন দাবির সুযোগ পায়নি তারা। কারণ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সংলাপের আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি সরকার ওই সময় যুক্তফ্রন্ট, জাতীয় পার্টি, বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই সংলাপ করে। ১৪ দল-সংলাপ-প্রধানমন্ত্রী

ওই সংলাপ থেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কিছুই না পেলেও তারা নির্বাচনে অংশ নেয়। এবং নির্বাচনে তাদের মহাবিপর্যয় ঘটে। ২৯৯ আসনের নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত দলগুলো পায় মাত্র ৭টি আসন, যার মধ্যে রয়েছে বিএনপির ৫ এবং গণফোরামের ২ আসন। বিপরীতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রাপ্ত আসন ২৮৮ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৩টি আসনে। নির্বাচনে এমন বিপুল পরাজয়ের পর বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। তারা ফল বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। ইত্যবসরে তারা জাতীয় সংলাপের আহ্বানও জানায়। তাদের এই প্রস্তাবের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ‘হাস্যকর’ আখ্যা দিলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপের প্রস্তাবকে সমর্থন করে সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নির্বাচনপরবর্তী সংলাপে বসবেন বলে জানান। প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তের কথা গণমাধ্যমকে জানান সেই ওবায়দুল কাদেরই।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিজয়ী প্রার্থীরা সাংসদ হিসেবে শপথ নেবেন না এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে তাদের জোটের পক্ষ থেকে। তবে প্রথমে গণফোরাম শপথের ব্যাপারে ইতিবাচক কথা বললেও জোটের বৈঠকের পর তারা বিএনপির সিদ্ধান্তের সঙ্গেই একাত্ম বলে জানানো হয়। তবে এই সময়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দল গণফোরামের দুই বিজয়ী প্রার্থী সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান তাদের বিভিন্ন মন্তব্যে সংসদে যোগ দেওয়া বিষয়ে তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। গণফোরামের সংসদে যোগ দেওয়া বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে বিএনপির চাপে তারা এখনও শপথ নেননি ঠিক তবে এই দুই প্রার্থী ইতোমধ্যেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিভিন্ন কর্মসূচি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন অথবা তাদেরকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচনের পর গত ১৪ জানুয়ারি ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষনেতারা সিলেট সফর করেছেন। সফরের বিভিন্ন কর্মসূচিতে ছিলেন না সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান। এ সম্পর্কে মোকাব্বির খানের মন্তব্য প্রথমে তিনি সফর সম্পর্কে ‘জানতেন না’, পরে শেষ মুহূর্তে যখন জেনেছেন তখন ‘বিমানের টিকেট পাননি বলে কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকতে পারেননি’। অন্যদিকে সুলতান মনসুরের মন্তব্য, ‘আগামী এক মাস পর্যন্ত তিনি কথা বলতে বা মন্তব্য করতে পারবেন না; তিনি অসুস্থ’। এই দুই নেতার মন্তব্যে ঐক্যফ্রন্টের মধ্যকার বিরোধের বিষয়টি স্পষ্ট।

সরকারবিরোধী এই জোটের মধ্যে এমন যখন অবস্থা তখন সংলাপের আহ্বান প্রথমে জানালেও প্রধানমন্ত্রীর সংলাপ বিয়ক প্রস্তাব গ্রহণ শেষে সংলাপ বিষয়ে ফের সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে গেছে তারা। এখন এই জোটের এক পক্ষ ‘নির্বাচন বাতিল করে সংলাপ’ আবার আরও এক পক্ষ সংলাপের সুনির্দিষ্ট ‘এজেন্ডা’ জেনে সংলাপে বসতে চায়। এতে করে সরকারবিরোধী এই জোটের মধ্যকার সিদ্ধান্তহীনতাজনিত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির প্রমাণ করে। 

বিজ্ঞাপন

খেয়াল করলে দেখা যায়, নির্বাচনের পর প্রথমে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে আলোচনার শুরু করেছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্টই, কিন্তু তাদের বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রীর পাল্টা প্রস্তাব তাদেরকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। সংলাপ নিয়ে রাজনীতির মাঠে এগিয়ে যাওয়ার যে পদক্ষেপ ফেলেছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সেখানে প্রধানমন্ত্রীর একটা সিদ্ধান্তেই সংলাপের নিয়ন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীকেই ফিরিয়ে দিয়েছে। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনপূর্ব সকল দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন বলে জানানো হওয়ার পর আদতে এই সংলাপ থেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রাপ্তির জায়গাকে সঙ্কুচিত করে দিয়েছে। সকল দল সংলাপে আসলে ইসিতে নিবন্ধিত ৩৯ দলের একেকটা দলের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে না বিএনপি ও গণফোরাম। আর সংলাপে শেষ পর্যন্ত তারা না আসলে সরকার যদি সকল দলের সঙ্গে সংলাপ করেই ফেলে তখন সেখান থেকেও তাদের কোনো প্রাপ্তি ঘটবে না।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল দেশের অনেকের কাছেই বিস্ময় জাগানিয়া। নির্বাচনপূর্ব কোন জরিপ-প্রতিবেদনে এমন ফলের পূর্বাভাস কেউ দেয়নি। সিআরই কিংবা আরডিসি নামের একাধিক প্রতিষ্ঠানের বরাত দিয়ে যেসব জরিপের প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল সেখানে ২৮০-উর্ধ্ব আসনের জয়ের কোন পূর্বাভাস ছিল না। ওইসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে যত লোক আস্থা রাখছিল তারচেয়ে বেশি লোক সে সবকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। তবে সেই সব জরিপকেও ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে নির্বাচনের ফল। আওয়ামী লীগের এমন মহাবিজয় আগে ক’জন লোক বিশ্বাস করেছিল এবং ফলাফলের পর কতজনের বিস্ময় হিমালয়চূড়ায় পৌঁছেছিল সে হিসাবের বাইরে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করে ফল প্রত্যাখ্যান করেছে। বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এমন ফল ধারণা করতেও পারেনি বলে নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত তারা ‘নীরব ভোট বিপ্লব’ এর আশা করেছিল। কিন্তু সেটা হয়নি; যা হয়েছে তাতে করে বিএনপির রাজনীতি, বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী কৌশলসহ জোটগত রাজনীতিই হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

গত দশ বছরে বারবার সরকারবিরোধী আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েও বিএনপি রাজপথে নামতে পারেনি। দশম সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কয়েক মাসের পেট্রোল বোমাবাজি, আগুন সন্ত্রাসের বাইরে তারা সরকারকে কোনোভাবেই বিব্রত করতে পারেনি। তাদের পক্ষ থেকে বারবার উচ্চারিত ‘ঈদের পর আন্দোলন’ বাক্যটি এখন রাজনৈতিক কৌতুকে পরিণত হয়েছে। দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন ও প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়ে তারা ব্যর্থ হয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েও মহা-ফলবিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান, নির্বাচিত সাংসদদের শপথের সিদ্ধান্ত না নিয়ে তারা কার্যত কার্যক্রমহীন এক দলে পরিণত হয়েছে। এমন অবস্থায় বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যে হুমকির মুখে তা বলাই বাহুল্য।

এমন অবস্থায় রাজনীতিতে ফের সংলাপের হাওয়া বইতে শুরু করায় তারা সংলাপে অংশ নেওয়া বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় পৌঁছেছে। অথচ এই সংলাপ ইস্যুতে শুরুতেই তারা পাদপ্রদীপের আলোয় পৌঁছার ইঙ্গিত দিয়েছিল, কিন্তু সে অবস্থায় এখন নেই তারা। এবারও সংলাপের নিয়ন্ত্রণ সহ সামগ্রিক রাজনৈতিক অবস্থার নিয়ন্ত্রণে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রাজনীতিতে সংলাপ-সংলাপ আলোচনা বাইরে যতখানি দৃশ্যমান, ভেতরে তারচেয়ে বেশি সক্রিয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাজনিত বিজয়ের পর রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগ সরকার একের পর পর উন্নয়ন সহযোগী দেশসহ বিশ্বনেতাদের অভিনন্দনের বন্যায় ভাসছে তখন বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কূটনৈতিক পাড়ায় দৌড়ঝাঁপ দিয়েও তাদের জন্য আশাব্যঞ্জক কিছু পায়নি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিতরা শপথ না নিলেও বাকি সাংসদেরা শপথ নিয়েছেন, মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে, সংসদের প্রথম অধিবেশনের তারিখও নির্ধারণ হয়ে গেছে; অর্থাৎ সবকিছুই সরকারের নিয়ন্ত্রণে।

নির্বাচনের পর অংশগ্রহণকারী সকল দলের সঙ্গে বিজয়ী রাজনৈতিক দল বা সরকারের সংলাপের উদ্যোগ সরকারের অবস্থানকেই আরও শক্তিশালী করবে। বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সংলাপে অংশগ্রহণ করুক কিংবা না করুক কেবল সংলাপ হলেই এই সংলাপ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ‘রাজনৈতিক উদারতা’ দেশে-বিদেশে প্রকাশিত হবে। ফল যাই হোক এই সংলাপের উদ্যোগ আগেকার সংলাপের মতই রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ শেখ হাসিনার কাছেই রাখবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)