চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সংগঠনবিমুখ নারী: ভার্চুয়াল নেটওয়ার্ক আর বিদেশী তহবিলে সীমাবদ্ধ নারী সংগঠন

বেগম রোকেয়ার সাংগঠনিক আন্দোলনের শতবর্ষপূর্তিতে নারী আন্দোলনের সংগঠক এবং গবেষকরা বলেছেন, একশ বছরে অনেক সূচকে বাংলাদেশের নারী এগিয়ে গেলেও গুণগত উত্তরণ এখনো অনেক দেরি। এজন্য নারী সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি, বরং আরো বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় নারী সংগঠন বিমুখ উল্লেখ করে তারা বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে নারী সংগঠন ও মুক্তির আন্দোলন শুধুই বিদেশী তহবিল নির্ভর যা উদ্বেগজনক। অনলাইনের বর্তমান দুনিয়ায় নারী এক ধরনের যোগাযোগ নেটওয়ার্কের মধ্যে থাকলেও অনেকক্ষেত্রে তা শুধুই ভার্চুয়াল উল্লেখ করে তারা এও বলেছেন, চেতনার যোগাযোগকে প্রয়োগের জায়গায় নিয়ে যেতে না পারলে তা খুব বেশি দূর এগিয়ে যেতে পারবে না।

এ ভূ-খণ্ডের নারী আন্দোলনের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া ১৯১৬ সালে মুসলিম বাঙালি নারীদের সংগঠিত করার জন্য ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মুসলিম নারীর জাগরণের জন্য এটাই ছিল প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক এবং সাংগঠনিক উদ্যোগ। বেগম রোকেয়া মূলতঃ নারীশিক্ষার বিস্তার এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামে নিয়োজিত থাকলেও সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তখনকার প্রেক্ষাপটে ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করেন। এ বছর মুসলিম নারী সংগঠন প্রতিষ্ঠার শতবর্ষপূর্তির অনেক আগেই অবশ্য অন্য সব ক্ষেত্রের মতো নারী সংগঠনেও ধর্মীয় পরিচয়ের ভেদাভেদ চলে গেছে। তবে, সে পথটাও খুব সহজ ছিল না।

বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ও নারী গবেষক মালেকা বেগম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বেগম রোকেয়া ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তৎকালীন কলকাতায়, মুসলিম নারীদের জন্য। তিনি যে আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে যাদের জন্য সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তারা একশ বছর পর অনেকদূর এগিয়েছে। কিন্তু সে সময়টাও মনে রাখা উচিত যখন ‘৪৭ সালের পর একই সংগঠন করা শামসুন নাহার মাহমুদ ঢাকায় আসলেন। তিনি এখানে সংগঠনের কাজ শুরু করলেন। ঢাকায় রোকেয়াকে পরিচিত করালেন শামসুন নাহার মাহমুদ, সুফিয়া কামাল, আনোয়ারা বাহারসহ আরো অনেকে। তাদের জন্য কাজটা খুব সহজ ছিল না।

মালেকা বেগম
মালেকা বেগম

নারী–পুরুষের যে বৈষম্য এখন বিরাজ করছে, যে বৈষম্যের কথা রোকেয়া তার নিজের সময়ে বলেছেন, আজ পর্যন্ত সেটা দূর হয়নি। সম্পদের সমঅধিকারের কথা বলেছেন তিনি, সেটা অর্জন হয়নি। যৌতুকপ্রথা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন, এক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হলেও এখনও সেই সমস্যা আছে। মুসলিম নারীদের পক্ষে এরকম মৌলিক অনেক প্রশ্ন তুলেছিলেন বেগম রোকেয়া।

বেগম রোকেয়ার নারী সংগঠন গঠনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে নারী আন্দোলনের আরেক পথিকৃৎ এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ব্যক্তি বেগম রোকেয়া নারী অধিকার বাস্তবায়নের স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে উঠেছিলেন তার আত্ম অন্বেষার কারণে। নারী অধিকার আন্দোলনের চিন্তাধারার মূল কথা বলতে তিনি বুঝিয়েছেন নারী একজন মানুষ। জন্মের পর পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী একজন নারী হিসেবে গড়ে ওঠে। তাকে এই প্রক্রিয়ায় নারী বানানো হয়। তেমনি পুরুষও মানুষ না হয়ে পুরুষ হয়ে ওঠে। সাংগঠনিক আন্দোলনের ফলে নারী অবনমিত অবস্থা থেকে মুক্ত হয়েছে। পৃথিবী থেকে দাস প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও নারী মানসিক দাসত্বে আবদ্ধ।

‘নারী না হয়ে মানবসন্তান হিসেবে, কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে সংগঠিত হতে হবে, একত্রিত হতে হবে,’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেগম রোকেয়া ক্ষয়িষ্ণু সামন্তবাদী প্রথাকে ব্যঙ্গ করে তার লেখায়, সাহিত্য সম্মেলনে তুলে ধরেছেন। সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজন অনুধাবন করেছেন। চিন্তায় তিনি ছিলেন প্রাগ্রসর। তার চিন্তার যে আলো সে আলোর পথেই হাঁটছে এখনকার নারীরা।

বর্তমানে নারীরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত। নারীর অগ্রগতি অনেক ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিকতা লাভ করেছে। কিন্তু তারপরও সামষ্টিকভাবে নারী এখনও পিছিয়ে রয়েছে।

লেখক ও উন্নয়নকর্মী চিররঞ্জন সরকার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বেগম রোকেয়ার ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’-এর পথ ধরে এদেশে অনেক নারী সংগঠন গড়ে উঠেছে। তারা নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন-সংগ্রামও করেছে, এখনও করছে। বর্তমানে নারীরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত। নারীর অগ্রগতি অনেক ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিকতা লাভ করেছে। কিন্তু তারপরও সামষ্টিকভাবে নারী এখনও পিছিয়ে রয়েছে। খাদ্য, চিকিৎসা, সুযোগসুবিধা, মজুরিতে রয়েছে বৈষম্য, সম্পদ ও সম্পত্তিতে অধিকার নেই, গৃহস্থালি কাজের আর্থিক স্বীকৃতি নেই, শতকরা প্রায় ৭০ জন নারী সহিংসতার শিকার হচ্ছে। তাতে মনে হয়, এদেশের নারী আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি।

begum-rokeaআলাদা সংগঠন যে কারণে দরকার
মালেকা বেগম দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, এখনও সাংগঠনিকভাবে আন্দোলন জরুরি, কারণ ব্যক্তির প্রতিবাদে হয়তো ব্যক্তিস্বার্থ সুরক্ষিত হয়; কিন্তু সমষ্টির দাবি আদায়ে সংগঠনের প্রয়োজন। সাংবিধানিক অধিকার আদায়ে সংগঠন লাগবে। নারীর অধিকার আদায়ে অতীতে রাষ্ট্র এগিয়ে আসেনি। রাষ্ট্রের কাছে চাইতে হয়েছে। এখনো নারী নির্যাতন করে অপরাধী সাজা পায় না, আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। এখনো নারীকে রাস্তায় কোপানো হয়। ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে অহরহ। আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গে অনেক পুরনো ধরণের নির্যাতন হয়তো বন্ধ হয়েছে, কিন্তু নির্যাতনের নতুন নতুন মাত্রাও যোগ হয়েছে।

সেন্ট্রাল ওমেন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মালেকা বেগম বলেন: নারী আন্দোলনের শুরুতে একেকটি ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে, দাবি উত্থাপন করা হয়েছে তারপর আইনের কথা বলা হয়েছে। রোকেয়ার পর লীলা নাগ, শামসুন নাহার মাহমুদ, সুফিয়া কামাল, মনোরমা বসুরা আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। এর ফলশ্রুতিতে নারী শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। নারী ঘরের বাইরে সাবলীল হয়েছে। রাজনীতি করছে, সরকারের অংশ হচ্ছে। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, পারিবারিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী অংশ নিচ্ছে। তবে এখনও সেই অর্জন সম্পূর্ণ হয়নি। হতাশ হওয়ার অবশ্য কিছু নাই। সময়ের সাথে সাথে আন্দোলনের চেহারা পরিবর্তন হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আন্দোলনের ইস্যুও পরিবর্তন হবে। নারীর পাশে পুরুষকে থাকতে হবে। প্রগতিশীল পুরুষসমাজ যুগে যুগে নারীর পাশে ছিলেন, এখনো আছেন। আজীবন বলে যেতে হবে, এতেই হবে পরিবর্তন।

মালেকা বেগম বলেন, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় নারী সংগঠনের দাবির প্রেক্ষিতে বর্তমান সরকারেরও বড় অবদান রয়েছে। গণতন্ত্রের সুফল নারী পাচ্ছে। নারীর অগ্রগতিতে বর্তমান সরকারের বড় অবদান রয়েছে। তারপরও পারিবারের মধ্যে সরকারের কোনো দায়িত্ব আছে কী না এই প্রশ্ন যখন আসে তখন সংগঠনের দায়িত্ব সামনে চলে আসে। কারণ পরিবারের অনেক বিষয় কেবল স্বামী-স্ত্রীর গণ্ডিবদ্ধ না। এগুলো সামাজিক বিষয়। তারপরও সরকারের অনেক আইন নারী প্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এখানেই সংগঠনের প্রয়োজন।

১৯৯৫ সালে বেইজিং সম্মেলনের পর্যালোচনা সভা হয়েছে ২০০৫ সালে। সেখানে নারী সংগঠনগুলো অনুধাবন করেছে নারীদের আরো অনেক পথ হাঁটতে হবে।

নারী আন্দোলনের এখনকার পরিপ্রেক্ষিত ভিন্ন বলে মনে করছেন আয়শা খানম। তিনি বলেন: ১৯৯৫ সালে বেইজিং সম্মেলনের পর্যালোচনা সভা হয়েছে ২০০৫ সালে। সেখানে নারী সংগঠনগুলো অনুধাবন করেছে নারীদের আরো অনেক পথ হাঁটতে হবে। অবশ্যই অবশ্যই নারীদের জন্য আলাদা প্ল্যাটফর্ম দরকার। জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। সেটা বাস্তবায়নের জন্যই নারী আন্দোলন দরকার। প্রাকৃতিক, দৈহিক, সামাজিক সমতা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। নারী এখনো যেসব বাধার মুখে পড়ছে সেসব দূর করতে আরো অনেক কাজ বাকি।

তবে, নারী আন্দোলন বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মালেকা বেগম বলেছেন, এখন সাংগঠনিকভাবে নারী আন্দোলন হচ্ছে না তেমন, আন্দোলন হলেও তা হয় বিদেশী ফান্ডে।

আয়েশা খানম
আয়েশা খানম

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন: প্রতিনিধি স্থানীয়রা মাঠে থাকলেও নারীরা সংঘবদ্ধভাবে মাঠে নামছেন না। এখনকার গৃহিণীকে সহজে রাস্তায় নামানো যাচ্ছে না। গত শতকে যেভাবে নারী তার অধিকার আদায়ে মাঠে নেমেছে, সাংগঠনিকভাবে এখন তেমন আন্দোলন নেই। কেবল মানববন্ধন করে অধিকার আদায় করা যায় না। এখন আন্দোলন হয় স্যোশাল মিডিয়ায়। যার বড় ধরণের সুদূরপ্রয়াসী প্রভাব নেই। তরুণীদের আমরা আন্দোলন গড়ে তুলতে দেখছি না। কিন্তু তরুণীরাই তো এক সময় আন্দোলন সংগ্রামের মূল প্রাণ ছিলো। এখন আন্দোলন হচ্ছে ব্যক্তি পর্যায়ে, ব্যক্তি উদ্যোগে। আত্মপ্রচেষ্টায় তারা বাল্যবিবাহের বিপক্ষে কথা বলছে, শিক্ষা অর্জনের দাবি তুলছে। এসব দাবি আদায়ে একসময় সাংগঠনিকভাবে নারীরা কাজ করেছে।

‘পাড়ায় মহল্লায় এখন সংগঠন হচ্ছে না। এখন ব্যক্তি নারী যে দাবি তুলছে সেটাও তুলছে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে। বিশ্বের দেশে দেশে নারীরা কথা অভিন্ন ইস্যুতে কথা বলছে। তার পরিপ্রেক্ষিতেই আ্ন্দোলন হচ্ছে,’ বলে মনে করেন তিনি। তবে সেটারও মূল্য কম না। সচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে বলে তিনি মনে করেন।

এ বিষয়ে চিররঞ্জন সরকার বলেন, নারীর কথা আলাদাভাবে বলার জন্য আলাদা সংগঠনের দরকার তো আছেই। তবে তা হতে হবে স্বাধীন, নারীর স্বার্থে পরিচালিত। বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামালরা দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে কী করে নারীদের সংগঠন গড়ে তুলতে হয় তা দেখিয়েছেন। এখনো তারাই অনুসরণীয়।

সাফল্য
‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার পর এসেছে লীলা নাগের ‘দীপালি সংঘ’সহ আরো অনেক সংগঠন। সেটা ছিল ব্রিটিশ ভারতীয় প্রেক্ষাপটে। মালেকা বেগম মনে করেন, নারী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে নারীকে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গেলো। পরবর্তী প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামেও নারী সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।

লীলা নাগ জোর করে ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। পাশ করলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মেয়েদের জন্য অনেক স্কুল করলেন। নারী আন্দোলনের শুরুতে সাম্প্রদায়িকতা বাধা দিলো। যে বাধা এখনো আছে।

সামরিক সরকার নারী অধিকার আদায়ে বাধা দিয়েছে, স্বৈরসরকারও বাধা দিয়েছে। বাধা কাটিয়ে প্রতি পদে মেয়েরা এগিয়েছে। একটা সময়ে স্কুল শিক্ষকতার বাইরে অন্য কোনো পেশায় মেয়েদের ভাবা হতো না। এখন এমন কোনো পেশা নেই যেখানে নারীর পদচারণা নেই। এটাই নারী সংগঠনগুলোর অর্জন

মালেকা বেগম জোর দিয়ে বলেন, রোকেয়ার যে প্রগতির চিন্তা, নারীকে নিয়ে যে স্বপ্ন সেখান থেকেই বাংলাদেশের নারী আন্দোলন সূত্র পেয়েছে। এখনও সে পথেই আছে। বেগম সুফিয়া কামাল আমৃত্যু রোকেয়ার স্বপ্ন-সাধনাকে ধারণ করে এগিয়ে নিয়েছেন। প্রতিটি পর্যায়ে এখনো যা ভাবা হচ্ছে সবকিছু রোকেয়াকেন্দ্রিক।school-going-child

‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাষা আন্দোলনে আমরা নারীদের সরব উপস্থিতি দেখেছি, মুক্তিযুদ্ধে দেখেছি নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ। সামরিক সরকার নারী অধিকার আদায়ে বাধা দিয়েছে, স্বৈরসরকারও বাধা দিয়েছে। বাধা কাটিয়ে প্রতি পদে মেয়েরা এগিয়েছে। একটা সময়ে স্কুল শিক্ষকতার বাইরে অন্য কোনো পেশায় মেয়েদের ভাবা হতো না। এখন এমন কোনো পেশা নেই যেখানে নারীর পদচারণা নেই। এটাই নারী সংগঠনগুলোর অর্জন,’ বলে তিনি মনে করেন।

সঙ্গে তিনি এও বলেন: শিক্ষার অধিকার, সম্পদের উত্তরাধিকার এসব দাবি সাংগঠনিকভাবেই অর্জিত হয়েছে। এনজিও চালু হওয়ার পর মেয়ে সাইকেলে চেপে যাতায়াত শুরু করেছে। তার আগে ভাস্কর নভেরা সাইকেলে চাপতেন আর শামীম সিকদার শার্টপ্যান্ট পরতেন। তাদের বাইরে সাধারণ নারীরা এসবে সাহস করতেন না। কিন্তু এনজিও আসার পর বিভিন্ন কাজে ঘরের বাইরে যাতায়াত করতে নারীরা আরো সাবলীল হয়ে উঠলো। জেলা শহরগুলোতে মেয়েরা দল বেঁধে সাইকেলে চেপে স্কুলে যাচ্ছে। তাদের ঘাঁটাতে পুরুষরা সাহস করছে না। কিন্তু শুরুটা এমন সহজ ছিল না। যে মেয়ের মা সাইকেলে চেপে এনজিওতে যেতো তাকে স্কুলে সবাই ব্যঙ্গ করতো।

জেন্ডার শিক্ষাকে নারী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে করেন মালেকা বেগম। যার পথ ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ওমেন্স স্টাডিজ বিভাগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইমেরিটাস অধ্যাপক নাজমা চৌধুরীর উদ্যোগে।

আয়শা খানমের চোখে নারী সংগঠনের আন্দোলনের সাফল্য হিমালয়সম। নারী অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এ অর্জন সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত নারীদের অর্জন না। সমাজের আপামর নারী নিজের অস্তিত্বের প্রয়োজনে বেরিয়ে এসেছে। নানারকম প্রতিকূলতা, নির্যাতন, নিরাপত্তাহীনতা, অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠে নারী নিজেকে শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করেছে। শিক্ষা-মেধা মননে আপামর নারীর পাশাপাশি নারী সংগঠনের নেত্রীরা কাণ্ডারীর ভূমিকা রেখেছেন।

ব্যর্থতা
আয়শা খানম বলেছেন, এতকিছুর পরও নারী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে, এখনো আমাদের সামনে এসেছে রিশা, তনু, নার্গিস, তৃষারা। নারীর উপর থেকে মানসিক দাসত্ব এখনো যায়নি। মানুষের স্বীকৃতি এখনো অর্জিত হয়নি। যৌন হয়রানির বাড়তি চিন্তা নিয়ে নারীকে পথে ঘাটে মাঠে চলতে হয়। পুরুষ এখনো নারীর সহযোগী-বন্ধু হয়নি। গাড়ি যেমন এক চাকায় চলতে পারে না তেমনি সমাজের একটি অঙ্গকে অকেজো রেখে সমাজ অগ্রসর হতে পারে না। নারী আর পুরুষকে পরস্পর সহযোগী হতে হবে। শত্রু মনোভাব রেখে সফল হওয়া সম্ভব না।

চিররঞ্জন সরকার
চিররঞ্জন সরকার

এ ধারাবাহিকতায় চিররঞ্জন সরকার বলেন, আজ দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণ বৃত্তে আর বিদেশি সাহায্য-নির্ভরতার কাছে নারীমুক্তির আন্দোলন যেন মুখ থুবড়ে পড়েছে।

তার মতে নারী অধিকারের প্রশ্নগুলো যখন আন্তর্জাতিক হয়ে উঠলো এবং এজেন্ডা নির্ধারিত হলো বিদেশ থেকেই, তখন থেকে নারী আন্দোলনও যেন একটু করে নিজস্বতা হারাতে শুরু করলো। মেয়েদের সংকটের মূল চেহারা যে রাজনৈতিক, সেই অতি-কষ্টে লাভ-করা উপলব্ধিটা যেন হারিয়ে যাচ্ছে। এটাই এখানকার নারী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা বলে মনে করেন তিনি।

‘যে পরিবর্তনটা মেয়েরা চায় তা কেবল ‘উন্নয়ন’ নামক সর্বসংকটনাশক বটিকা নয়, তা ক্ষমতার ভারসাম্যে বদল, সে বোধটাও ফিকে হয়ে এসেছে। আলাদা স্বাধীন সংগঠন ছাড়া নারী আন্দোলনকে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের জায়গায় ফিরিয়ে আনা যাবে বলে মনে করি না।’

করণীয়
করণীয় প্রশ্নে মালেকা বেগম বলেন: এখন পরিবারগুলো থেকে আফসোস করা হচ্ছে,  তাদের ছেলেমেয়েরা বিপথে যাচ্ছে। তারা নতুন করে সংগঠনের প্রয়োজনের কথা বলছে। আফসোস করে লাভ নেই। শূন্যতা হয়েছে বলেই নতুন নতুন সঙ্কট তৈরি হচ্ছে। সাংগঠিনকভাবে যুগোপযোগী আন্দোলন করতে হবে। আন্দোলনের ইস্যু নির্ধারণে দক্ষ হতে হবে। প্রগতির লক্ষ্যে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।

আয়শা খানম মনে করেন, সমাজের দর্শন হতে হবে নারী আর পুরুষ তার দুটি অঙ্গ। এটি অর্জনে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা হতে হবে জেন্ডার সেনসিটিভ। পরিবার, প্রশাসন, অফিস-আদালত প্রতিটি সেক্টরে জেন্ডার সচেতনতা থাকতে হবে। সাংস্কৃতিক চর্চার ভেতর দিয়েই সেটা অর্জিত হবে। রাষ্ট্রীয় দৃষ্টি এক্ষেত্রে পরিষ্কার ও স্বচ্ছ হতে হবে।