চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শ্রীলঙ্কায় হামলার নেপথ্যে পারিবারিক নেটওয়ার্ক

শ্রীলঙ্কায় ইস্টার সানডের অনুষ্ঠানে একাধিক গীর্জা ও হোটেলে ভয়াবহ হামলায় আড়াই শতাধিক নিরপরাধ মানুষকে হত্যার ঘটনার পেছনে ছোট কয়েকটি মুসলিম পরিবারের নেটওয়ার্ক কাজ করেছে বলে ধারণা করছে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা।

বিজ্ঞাপন

তবে কিভাবে ছোট ওই মুসলিম পরিবারগুলো এত বড় হামলা চালানোর পরিকল্পনা করলো তা ভাবিয়ে তুলেছে দেশটির গোয়েন্দাদেরকে। এ নিয়ে একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।

বিবিসি জানায়, গোয়েন্দাদের তথ্য মতে, জানুয়ারি মাসের মধ্যেবর্তী সময়ে ওই হামলার সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। দেশটির পশ্চিম সমুদ্র তীরবর্তী এলাকার পুত্তালাম জেলার একটি নারকেল বাগান থেকে ১০০ কেজি বিষ্ফোরক এবং দশটি ডিটেনেটোর উদ্ধার করা হয়। ওই সময় দেশের কোথাও সন্দেহভাজন ইসলামিক মৌলবাদী কোনো গোষ্ঠি আছে কি না তা খতিয়ে দেখাও হয়। তখন নতুনভাবে গড়ে ওঠা চারজনের একটি ‘মুসলিম মৌলবাদী গ্রুপকে আটক করেছিল পুলিশ।

এর ঠিক তিন মাস পরে ২১ এপ্রিল সকালে শ্রীলঙ্কায় ইস্টার সানডের অনুষ্ঠানে ৩টি গির্জা ও ৩টি পাঁচ তারকা হোটেলে সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় নিহত হয় ২৫৩ জন। এ ঘটনায় আহত হন ৫শ’রও বেশি।যাদের মধ্যে ৪০ জন বিদেশিও ছিলেন।

নারকেল বাগান থেকে উদ্ধার হওয়ার ওই ঘটনা, হামলার ঘটনা থেকে বিছিন্ন নয় বলে মনে করেন গোয়েন্দারা। নারকেল বাগান থেকে বিষ্ফোরক উদ্ধার হওয়াকে হামলার পূর্বাভাস হিসেবে ধরা হচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা যায় অনেক শ্রীলঙ্কান সিরিয়ায় আইসের সঙ্গে যোগ দিয়ে আবার তারা দেশে ফিরে আসেন। এর ফলে দেশের ইসলামিক মৌলবাদী গ্রুপগুলো সক্রিয় হতে থাকে।

মার্কিন ও ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার হামলার একাধিক সতর্কতা সত্ত্বেও এ ভয়াবহ হামলা হয়। ওই ঘটনার পর থেকে পুত্তালাম থেকে বোমা হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে দুইজনকে আটক করে। যাদের মধ্যে একজন ওই ভয়াবহ হামলার একটি অংশের প্রধান হিসেব কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এছাড়াও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভাজনের কারণেও বারবার সতর্ক করা হলেও তা আমলে নেয়নি প্রশাসন। তবে দেশটিতে ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাধ্যমে যে শান্তি ছিল সেটাও একটি কারণ।

শ্রীলঙ্কার কাউন্টার টেররিজমের সাবেক পরিচালক বলেন, আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো এবং তা একই গোপন রেখে হামলাকারীরা আমাদের হতবাক করেছে।

এত বড় হামলা চালোনোর জন্য নিরাপদ বাসা, বড় ধরনের প্ল্যান, পরিকল্পনাকারী ও হামলায় অংশগ্রহণকারীর মধ্যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, প্রশিক্ষিত বোমারু ও অর্থের প্রয়োজন। তাহলে এত কিছু কিভাবে গোয়েন্দা সংস্থার নজরের বাইরে এমন কি রাডারের বাইলে থেকে তারা করতে পারলো?

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে শ্রীলঙ্কার একটি গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, অল্প কিছু ডাই-হার্ড মৌলবাদী এবং আইএস প্রেমী গোপনে এ কাজ করেছে। নির্দিষ্ট কিছু পরিবার মৌলবাদী ধারণা পোষণ করেছে এবং তারা গোপনে সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করেছে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মেসেজের মাধ্যমে খুব সংরক্ষিতভাবে যোগাযোগ ও পরিকল্পনা করতো।

গোয়েন্দা সংস্থার ওই কর্মকর্তা বলেন, ৭০ জনের বেশি ওই হামলার জড়িত সন্দেহে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনও ওই ঘটনার জড়িতদের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বলতে রাজি হয়নি।

তবে হামলার মূল হোতা এখনো ধরা পড়েনি বলে মনে করেন গোয়েন্দা সংস্থা। তাই এখনো আরেকটি বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন গোয়েন্দা সংস্থা।

শ্রীলঙ্কায় ইস্টার সানডের অনুষ্ঠানে সিরিজ বোমা হামলার মূলহোতাও হোটেলে আক্রমণের সময় নিহত হয়েছে। এমনটাই জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা।

তিনি জানান: মৌলবাদ প্রচারক জাহরান হাশিম রাজধানীতে শাংরি লা হোটেলে নিহত হয়েছে।

সিরিসেনা বলেন: কলম্বোর বিখ্যাত পর্যটক হোটেল শাংরি-লাতে হামলার নেতৃত্ব দিচ্ছিলো জাহরান হাশিম।হাশিম ছাত্র জীবনে মাদ্রাসা থেকে বেড় করে দেয়া হয়। 

তারপর থেকে জাহরান হাশিম শ্রীলঙ্কার একজন কট্টরপন্থী জঙ্গি মুসলিম নেতা হতে থাকেন। শ্রীলঙ্কায় বেশ কিছু বুদ্ধ মূর্তির মুখ বিকৃত করার ঘটনায় তার কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কোনো কোনো ভিডিওতে জাহরান হাশিম অমুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংস হামলার ডাক দেন। গড়ে তুলেন ন্যাশনাল তাওহিদে জামায়ত নামের চরমপন্থী গ্রুপ।

হামলায় আরেকজনের ইসলামিক মৌলবাদ বিশ্বাসী জামালের নাম সনাক্ত করেছে গোয়েন্দা সংস্থা। জামাল চার সন্তানের জনক, সে আইএস এবং অন্যান্য বিদেশি ইসলামিক গ্রুপের সঙ্গে জড়িত। তিনি সম্ভ্রান্ত পরিবারের এবং চা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া পড়া লেখা করেছে। ২১ আগস্টে সে তাজ সমুদ্রে বোমা হামলায় অংশ নেয়ার কথা থাকলেও সম্ভবত সে বোমা ফাটাতে ব্যর্থ হোন।

কয়েক বছর আগে তার পরিবারে তার এই চরমপন্থার জন্য নিরাপত্তা সাহায্য চেয়েছিলেন বলে জানা যায়।

বোমা হামলার পর দেশটিতে মুসলিমরা সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠি মুসলিম সম্প্রদায়। দেশের প্রায় ১০ শতাংশ জনসংখ্যা মুসলিম। ১৯৯০ সালে তামিলরা মসজিদে হামলা চালালে ১৫০ জন নিহত হয়। ওই ঘটনার আগে প্রায় ৭৫ হাজার মুসলিম দেশটির তামিল অধ্যুষিত উত্তরজনপদ থেকে বিতারিত হয়।