চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শেষ ঠিকানায় পৌঁছে দিয়ে

বীর মুক্তিযোদ্ধা, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন রাজধানীর মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে।

বিজ্ঞাপন

সকাল ১১ থেকে সাড়ে ১২ টা পর্যন্ত শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন ও গার্ড অফ অনার প্রদান শেষে দুপুর ১ টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে বুলবুলের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

এরপর এফডিসিতে ২ টা ২০ মিনিটে দ্বিতীয় জানাজা ও চলচ্চিত্রের শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজকদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন শেষে বিকেল বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান বাদ মাগরিব তৃতীয় জানাজা শেষে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নয়, পরিবারের চাওয়ায় বর্ষীয়ান এই সংগীতজ্ঞকে দাফন করা হয় বুদ্ধিজীবীদের পাশে।

শতাধিক কালজয়ী গানের গীতিকার ও সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল গতকাল (মঙ্গলবার) ভোরে তার আফতাবনগরে নিজ বাসায় হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। সংগীত জীবনে প্রবেশের আগে মাত্র ১৫ বছর বয়সে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ২ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছিলেন ১৯৭১ সালে।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুতে সংগীত অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি দুজনেই তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ১৯৭৮ সালে ‘মেঘ বিজলী বাদল’ ছবিতে সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন। তিনি স্বাধীনভাবে গানের অ্যালবাম তৈরি করেছেন এবং অসংখ্য চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন।

বুলবুল অসংখ্য গানে সুর করেছেন, যার অধিকাংশ গানই তার নিজের রচিত। এসব গানে সুর দিয়েছেন এন্ড্রু কিশোর, সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, সামিনা চৌধুরী ও জেমসসহ দেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীরা।  বুলবুলের লেখা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গান নিম্নে দেয়া হলো-

‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ‘মাঝি নাও ছাইড়া দে ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে’, ‘সেই রেললাইনের ধারে, সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য’, ‘ও আমার আট কোটি ফুল দেখ গো মালি’, ‘মাগো আর তোমাকে ঘুম পাড়ানি মাসি হতে দেব না’, ‘একতারা লাগে না আমার দোতারাও লাগে না’, ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘আমার বুকের মধ্যেখানে’, ‘আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন’, ‘আমি তোমারি প্রেমও ভিখারি’, ‘ও আমার মন কান্দে, ও আমার প্রাণ কান্দে’, ‘আইলো দারুণ ফাগুনরে’, ‘আমার একদিকে পৃথিবী একদিকে ভালোবাসা’, আমি তোমার দুটি চোখে দুটি তারা হয়ে থাকব’, ‘আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে’, ‘পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমারই ছোঁয়াতে যেন পেয়েছি’।

‘তোমায় দেখলে মনে হয়, হাজার বছর আগেও বুঝি ছিল পরিচয়’, ‘কত মানুষ ভবের বাজারে’, ‘তুই ছাড়া কে আছে আমার জগৎ সংসারে’, ‘বাজারে যাচাই করে দেখিনি তো দাম’, ‘আম্মাজান আম্মাজান’, ‘স্বামী আর স্ত্রী বানায় যে জন মিস্ত্রি’, ‘আমার জানের জান আমার আব্বাজান’, ‘ঈশ্বর আল্লাহ বিধাতা জানে’, ‘এই বুকে বইছে যমুনা’, ‘সাগরের মতোই গভীর’, ‘আকাশের মতোই অসীম’, ‘প্রেম কখনো মধুর, কখনো সে বেদনাবিধুর’, ‘আমার সুখেরও কলসী ভাইঙা গেছে লাগবে না আর জোড়া’, ‘পৃথিবীর জন্ম যেদিন থেকে, তোমার আমার প্রেম সেদিন থেকে’।

এ ছাড়া রয়েছে- ‘পড়ে না চোখের পলক’, ‘যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে’, ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’, ‘কী আমার পরিচয়’, ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’, ‘তুমি আমার জীবন, আমি তোমার জীবন’, ‘তোমার আমার প্রেম এক জনমের নয়’, ‘তুমি হাজার ফুলের মাঝে একটি গোলাপ, জীবনে বসন্ত এসেছে’, ‘ফুলে ফুলে ভরে গেছে মন, ঘুমিয়ে থাকো গো সজনী আমার হৃদয় একটা আয়না’, ‘ফুল নেব না অশ্রু নেব’, ‘বিধি তুমি বলে দাও আমি কার’, ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা, হৃদয়ে সুখের দোলা’, ‘তুমি আমার এমনই একজন’, ‘যারে এক জনমে ভালোবেসে ভরবে না এ মন’।

আরও রয়েছে- ‘উত্তরে ভয়ঙ্কর জঙ্গল দক্ষিণে না যাওয়াই মঙ্গল’, ‘কোন ডালে পাখিরে তুই বাঁধবী আবার বাসা’, ‘একাত্তুরের মা জননী কোথায় তোমার মুক্তিসেনার দল’, ‘বিদ্যালয় মোদের বিদ্যালয় এখানে সভ্যতারই ফুল ফোটানো হয়’, ‘আমায় অনেক বড় ডিগ্রি দিছে’, ‘এই জগৎ সংসারে তুমি এমনই একজন’, ‘জীবন ফুরিয়ে যাবে ভালোবাসা ফুরাবে না জীবনে’, ‘পৃথিবী তো দুদিনেরই বাসা, দুদিনেই ভাঙে খেলাঘর’, ‘অনেক সাধনার পরে আমি পেলাম তোমার মন’, ‘ওগো সাথী আমার তুমি কেন চলে যাও’, ‘তুমি সুতোয় বেঁধেছ শাপলার ফুল নাকি তোমার মন’, ‘একদিন দুইদিন তিন দিন পর, তোমারি ঘর হবে আমারি ঘর’, কী কথা যে লিখি, কি নামে যে ডাকি’।

‘নদী চায় চলতে, তারা যায় জ্বলতে’, ‘চতুর্দোলায় ঘুমিয়ে আমি ঘুমন্ত এক শিশু’, ‘চোখের ভেতর কল বসাইছে’, ‘আমার জীবন নায়ে বন্ধু তুমি প্রাণের মাঝি’, ‘তুমি স্বপ্ন তুমি সাধনা’, ‘নদী চায় চলতে, তারা যায় জ্বলতে’, ‘আকাশটা নীল মেঘগুলো সাদা সাদা’, আমার তুমি ছাড়া কেউ নেই আর’, ‘শেষ ঠিকানায় পৌঁছে দিয়ে আবার কেন পিছু ডাকো’, ‘চিঠি লিখেছে বউ আমার’, ‘মাগো আর নয় চুপি চুপি আসাসহ আরও অনেক গান।

জীবদ্দশায় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং রাষ্ট্রপতির পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

শেষ ঠিকানায় পৌঁছে দিয়ে তবু পিছু ডাক থেকে যায়। সবসময় তাকে মনে রাখবে বাংলাদেশ।

ছবি- জাকির সবুজ