চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শেখ হাসিনার মানবতা থেকে তার শত্রুও বঞ্চিত হয়নি

তখন ভোর পাঁচটা। ফজরের নামাজের পরপরই ঢাকার প্রবেশপথগুলো নিজেদের দখলে নিয়েছে তারা। ঢাকার উত্তরে গাবতলী বাস টার্মিনাল, টঙ্গী এবং দক্ষিণে সায়দাবাদের কাছে কাঁচপুর ব্রিজসহ রাজধানীকে ঘিরে ছয়টি প্রবেশমুখেই অবরোধ।

দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আগত হাজার হাজার শিক্ষক ও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দিয়ে অবরোধ, ধ্বংসযজ্ঞ, গাছ কেটে ফেলা, অগ্নিসংযোগসহ আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ে হামলা; অতঃপর রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র যেন যুদ্ধক্ষেত্র!

২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম এভাবেই তাদের অবস্থান জানান দিয়েছিল। প্রকাশ্যে কয়েকজন ব্লগারের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগসহ ১৩দফা দাবি তুললেও নেপথ্যে ছিল সরকার পতনের ষড়যন্ত্র যা বিএনপি নেত্রীর ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটামের মাধ্যমে পরিস্কার হয়ে উঠে।

কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক বা কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্রদের সমন্বয়ে ২০১০ সালে ১৯ মার্চ হাটহাজারীর দারুল উলুম মঈনূল ইসলাম এর মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফী এবং তার সহযোগিরা মিলেমিশে ‘হেফাজতে ইসলাম’ গঠন করার নেপথ্যের কাহিনী জানা যায়।

যদিও ‘হেফাজতে ইসলাম’ নামকরণ নিয়ে বিতর্ক আছে। এই নামে প্রায় ৬০ বছর আগে সিলেটের মৌলভিবাজারের বরুণার পীর শেখ লূৎফর রহমান মূলত ‘হেফাজতে ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করেন বলে জানা যায়।

জানা যায়, মূল হেফাজতে ইসলাম অর্থাৎ প্রায় ৬০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত সিলেট মৌলভিবাজারের বরুণা পীর শেখ লুৎফর রহমানের প্রতিষ্ঠিত ‘হেফাজতে ইসলাম’-এর সাথে হাটহাজারীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও তার সহযোগিদের ‘হেফাজতে ইসলাম’-এর তেমন কোন সম্পর্ক নেই, নেই নৈতিক ও আদর্শগত মিলও।

বাংলাদেশে দেওবন্দের ছাত্ররাই ১৯০৫ সালে হাটহাজারী কওমি ভিত্তিক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। আর এই মাদ্রাসাই কওমি ধারার প্রধান মাদ্রাসা হিসেবে বাংলাদেশে পরিচিতি অর্জন করে।

একটু অতীতের দিকে ফিরে তাকালে দেথা যায়, ব্রিটিশ আমলের পূর্বে শিক্ষা পদ্ধতি ছিল মক্তব, মাদ্রাসা ভিত্তিক। আর তখনকার সরকারি ভাষাও ছিল ফার্সি। মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষাও দেওয়া হতো ফার্সি ভাষায়।

হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ তখন ফার্সি ভাষা রপ্ত করতো। রাজা রামমোহন রায় আরবি ও ফার্সি ভাষার সুপন্ডিত ছিলেন এবং উভয় ভাষায় তিনি পুস্তকও রচনা করেছিলেন।

ব্রিটিশরা রীতিমত জোর করেই মুসলমানদের হাত থেকে ভারতের শাসন ক্ষমতা নিয়েছিল বলে বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়। আর মুসলমান সম্প্রদায়ও এটি সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। তখনকার সমাজে মুসলমানদের মাঝে শিক্ষিত ছিলেন আলেম সমাজ। তারাই বিভিন্নভাবে ইংরেজকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিলেন।

কিন্তু তারা সেসময় ব্রিটিশের হাতে পরাজিত হন। ব্রিটিশরা সে সময় ৫০ হাজার আলেমকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, আলমদের অভাবে দাফন কাফনের কাজ চলানোও তখন মুশকিল হয়ে পড়েছিল। ওই পরিস্থিতিতে আত্মগোপনে থাকা আলেমরা অস্ত্রের পথ পরিহার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন।

জানা যায়, আত্মগোপন থেকে বের হয়ে আসার পর মওলানা কাসেম নানুতুবি প্রথম মাদ্রাসা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং মওলানা জুলফিকার আলী, মওলানা এয়াকুব, নানুতুবি, মওলানা ফজলুর রহমান, মওলানা রফিউদ্দীন এবং হাজী আবেদ হোসেনকে নিয়ে ১৮৬৬ সালে দেওবন্দে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকে কওমি মাদ্রাসার মূল গোড়াপত্তন ঘটে।

গোড়াপত্তন থেকেই কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের জীবন-মান আধুনিক করে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখে আসছি, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্ররা বাড়ি-বাড়ি ও পাড়া-মহল্লায় ঘুরে-ঘুরে মুষ্টি চাল ও নগদ অর্থ সংগ্রহ করতে। আজও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

আমার ব্যক্তিগত অফিসে অবসর সময়ে এই লেখাটি লেখার সময় হঠাৎ আমার অফিস ম্যানেজার বলল, স্যার কিছু ভাংতি হবে? কেন জিজ্ঞেস করায় কিছু মাদ্রাসার ছেলে আসছে সাহায্যের জন্য। ছোট ছোট বাচ্চাদের ডেকে নিয়ে এসে অনেকক্ষন কথা বলেছি। কোন মাদ্রাসা থেকে এসেছে, কে পাঠিয়েছে, কেন পাঠিয়েছে- তাদের সাথে চা-নাস্তা খেতে খেতে বিস্তারিত জেনেছি। আবার এই মাদ্রাসাগুলো নিয়ে আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহ করা তথ্য-উপাত্ত খুব সুখকরও নয়।

আসলে গোড়াপত্তন থেকেই অন্যের উপর নির্ভর করে কওমি মাদ্রাসা পরিচালিত করা, মুস্টি চাল, যাকাত-ফেতরা কিংবা বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে কওমি মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেও অনিশ্চিত জীবন-যাপন করা- এটি তৃতীয় বিশ্বের অমানবিক এবং অগ্রহণযোগ্য।

আবার অন্যদিকে যাদের হাতে কওমি মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে তারাও ধর্মীয় শিক্ষার সাথে সাথে আধুনিক শিক্ষা-দীক্ষায় দীক্ষিত হতে গোড়বিরোধী। যার কারণে রাষ্ট্র চাইলেও তাদের খুব সহজে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কওমি মাদ্রাসার মুল শিক্ষা নীতির সাথে আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতিও যোগ করা সম্ভব নয়।

১৮৬৬ সাল থেকে দেওবন্দ মাদ্রাসার অনুসারীরা যত কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছে, কেউই সরকারি অনুকুল্য গ্রহণ করেনি আর সরকারি সনদেরও তোয়াক্কা করেনি। এটা মুলত বলা হয়, প্রতিষ্ঠাতা আলেমদের ইংরেজ বিদ্বেষের ফল। আর তাই ইংরেজি শিক্ষাকেও তারা ঘৃণা করতেন বলে শোনা যায়।

১৮০০ সালে ব্রিটিশরা কলকাতায় আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তখন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ছিলেন একজন ইংরেজ। পর্যবেক্ষণে পাওয়া যায়, সেসময় মুসলমানদেরকে আধুনিক শিক্ষার দিকে টেনে আনার উদ্দেশ্যে ইংরেজরা এই শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। কারণ মুসলিম আলেম সম্প্রদায়ের মাঝে বিদ্রোহী প্রবণতা অনেক বেশি।

আমি সেদিকে যাচ্ছি না। আলীয়া মাদ্রাসায় শিক্ষার একটা কারিকুলাম ছিল। এটাকে বলা হতো আলিয়া নেছাব। আলিয়া মাদ্রাসার ৬৬ বছর পর যখন দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তারাও একটা শিক্ষার ক্যারিকুলাম স্থির করেছিলেন। আর এটাকে বলা হয় কওমি নেছাব।

আলিয়া মাদ্রাসাগুলো সরকারের সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকে এবং সনদও ‘সরকারি সনদ’। চাকরি পেতেও তাদের কোনও অসুবিধা হয় না। কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ থাকায় আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্ররা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক হতে কোনও অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে না। প্রতিভা থাকলে তারাও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়ও অংশগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু কওমি নেছাবে তা কখনও সম্ভব নয়।

একদিকে কওমি মাদ্রাসাগুলো দীর্ঘদিন ধরে তাদের সনদের স্বীকৃতি দাবি জানিয়ে আসছে আবার অন্যদিকে তারা সরকার প্রদত্ত কোনও কারিকুলামও মানবেন না বলে পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছে। এ নিয়ে সরকার আর কওমি মাদ্রাসাগুলোর মাঝে বিরোধ দেখা দিয়েছে।

আর এই বিরোধ কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিল বিএনপি-জামাত জোট। তারা পরিকল্পিতভাবে কওমি মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামকে ব্যবহার করে সরকার পতনের নীল নকশা এঁকেছিল। সেসময় বিএনপি-জামাতের নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য, শাপলা চত্বর হেফাজতের মঞ্চে তাদের উপস্থিতি, উত্তেজিত পরিস্থিতি সৃষ্টির ষড়যন্ত্র অতঃপর রাজধানী হয়ে উঠে যুদ্ধক্ষেত্র!

অবশেষে, ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা চত্বর’-এর মাধ্যমে তাদের কান ধরিয়ে বিদায় দেওয়া হয়েছিল। মাঝখানে মাত্র পাঁচ বছরের দৃশ্যপট একেবারেই ভিন্ন। শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টি, রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় ভ্রান্ত পথে পরিচালিত কওমি মাদ্রাসার বিশাল জনগোষ্ঠীকে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেনে।

ব্রিটিশ, পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশ অর্থাৎ দীর্ঘ ১৫০ বছরে কওমি স্বীকৃতি অর্জনে বিভিন্ন সরকার প্রধানের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। আশ্বাস পেয়েছে কিন্তু কওমি স্বীকৃতি পায়নি, কোনো সরকার কওমিকে স্বীকৃতি দেয়নি।

শেখ হাসিনা হাজার বছরের চিন্তা ভাবনা থেকেই কওমি স্বীকৃতি প্রদান করেছে। ভিক্ষা ভিত্তিক জীবন থেকে বের হয়ে একটি সুস্থ সুন্দর জীবন লাভ করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। আর এই স্বীকৃতি প্রদানের ক্ষেত্রে সহ্য করেছেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার বিভিন্ন সমালোচনা, কটুক্তি। তারপরেও তিনি নিরবে সহ্য করে কওমির বিশাল জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়িয়েছেন, সনদ প্রদান করেছেন।

শেখ হাসিনা কখনও ধর্মকে ব্যবহার করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করেনি, করছে না। আবার ধর্মের বিরুদ্ধেও তিনি কখনও অবস্থান নেয়নি। প্রতিটি নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ তাদের ম্যানিফেস্টো ঘোষণা করে থাকে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান থেকে শেখ হাসিনা পর্যন্ত যত নির্বাচন হয়েছে, তার প্রত্যেক নির্বাচনেই তারা জাতির কাছে ম্যানিফেস্টো প্রদান করেছে। আর প্রত্যেক ম্যানোফেস্টোতে তারা জাতিকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাশীন হলে কখনও কোরআন ও সুন্নার বিরুদ্ধে কোনও আইন প্রণয়ন করবে না এবং তা তারা কখনও করেননি।

এদেশের মানুষ অসাম্প্রদায়িক শক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকাটাকে পছন্দ করে। সে কারণে ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করে তারা তেমন কোনও সুবিধা করতে পারেনি।

এই যেমন, জামায়াত ইসলামী একবার এককভাবে তিনশত আসনে নির্বাচন করেছিলো। আসন পেয়েছিলো মাত্র ২টি। তার কারণ, দেশের জনগণ কখনও ধর্ম নিয়ে রাজনীতি, ধর্ম নিয়ে খেলতামাশা, ধর্ম নিয়ে রাজনৈতিক ব্যবসা করা পছন্দ করেনি।

মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদি আর কনফুরিয়াস-সহ সব ধর্মের ঘটনাবৃত্তান্ত ইতিহাসের দুই তৃতীয়াংশ ব্যাপী লিখিত যা মানব সভ্যতার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এক সময় সমগ্র ইউরোপ খ্রিস্ট ধর্মের মানুষ প্রভাব বিস্তার করেছে। তখন গির্জার কর্তৃত্বকে অস্বীকার করার উপায় ছিল না।

যখন ক্যাথলিকদের প্রধান গির্জা ছিল ক্যানোসাতে তখন পোপ এর হুকুম পালন করতে গিয়ে স্বয়ং সম্রাট খালি পায়ে হেঁটে ক্যানোসা গিয়েছিলেন। খ্রিস্টধর্ম অনুরূপ আনুগত্য কোনও শাসক থেকে প্রত্যাশা করে না।

গির্জা তাদের কায়েমী স্বার্থ প্রতিষ্ঠায় সফল কাম হয়েছিল ইউরোপে। তাই তারা সম্রাটকে পর্যন্ত এই ব্যাপারে তোয়াক্কা করতো না।

গির্জা ভূস্বামীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলো। অবশ্য তা করেছিলো ধর্মের নামে। যে কারণে সে ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা পুরোহিতদের পক্ষে সম্ভবও হয়নি। হিন্দুদের মাঝেও ব্রাহ্মণদের কায়েমী স্বার্থ ধর্মকে বিভ্রান্ত করেছে।

ইসলামের মাঝেও যে তেমন কিছু নেই তা নয়। কতিপয় মোল্লাদের আচরণে অনেক সময় ক্ষুব্ধ হয়েছে ধর্মপালন করা মানুষজন। আবার অনেকে ক্ষোভে ধর্ম পরিত্যাগও করেছিল।

অনেকে বলছেন, সরকার হেফাজতীদের জিতিয়ে দিয়েছে বলেই আবার ইসলামি জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বা উঠতে পারে, ধর্মীয় দাঙ্গা সৃষ্টিও হতে পারে- এমন ধারণার সাথে আমি ব্যক্তিগতভাবে একমত হতে পারছি না।

একটি উদাহরণ হিসেবে বলতে চাই, হাটহাজারী মাদ্রাসা সংলগ্ন দক্ষিণ পাশে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটা কালি মন্দির রয়েছে যার বয়স প্রায় ১১৭ বছর।

অথচ এই কালি মন্দির আর মাদ্রাসার মাঝে কোনও সংঘাত হয়নি।  শান্তিপূর্ণভাবে উভয়ে উভয়ের ধর্ম-কর্ম পালন করে আসছে। আর ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই মন্দিরটি যখন পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছিল, তখনও কেউ মন্দিরটি নষ্ট করেনি।

শাপলা চত্বরে খালেদা জিয়ার হেফাজত আর সোহরাওর্দী উদ্যানে শেখ হাসিনার হেফাজতকে আমি এক করে দেখতে রাজী নই। শাপলা চত্বরে নিয়ে আসা হয়েছে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে আর সোহরাওর্দী উদ্যানে এসেছে নিজেদের জীবনমান উন্নয়নের স্বীকৃতির কৃতজ্ঞতা জানাতে, ধন্যবাদ দিতে।

শাপলা চত্বরের মাদ্রাসার শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব দিয়েছে খালেদা জিয়া যার রাজনৈতিক অতীত বর্তমান আমাদের সকলের জানা। আর সোহরাওর্দী উদ্যানে তারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের স্বীকৃতি গ্রহণ করেছে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে আশাবাদী মানুষ। বিএনপি-জামাতের ষড়যন্ত্রের প্রায় একটি অকার্যকর রাষ্ট্রকে শেখ হাসিনা কীভাবে বিশ্বের বুকে সম্মান- মর্যাদার রাষ্ট্রে পরিণত করেছে- এটা নিশ্চয়ই আমার চেয়েও পাঠক বেশ ভালো জানেন বলে আমার বিশ্বাস।

আর মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের কীভাবে একটি সুশৃঙ্খল জাতিগোষ্ঠীতে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছে- এটিও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সমালোচনা করেছেন। কওমি মাদ্রাসার সনদ প্রদান, সোহরাওর্দী উদ্যানে তাদের ‘শোকরানা’ ও ‘কওমি জননী’ গ্রহণ নিয়েও অনেকে ব্যঙ্গ করেছে। আবার এই মাদ্রাসা শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের এভাবে ছেড়ে দেওয়া রাষ্ট্র সরাসরি তাদের সহযোগিতা করা নিয়েও অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

শাপলা চত্বরে কওমির শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের ধ্বংসযজ্ঞ আপনার ভাবনায়-এই উদ্বেগ আসাটা অতি স্বাভাবিক। কিন্তু শাপলা চত্বরের পরবর্তী পাঁচ বছরে তাদের পরিবর্তনও আমাদের আশার আলো দেখিয়েছে। যার নেপথ্যে কাজ করেছে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।

সোহরাওর্দী উদ্যানে আসা কওমি শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানো আমাকে সত্যিই আশার আলো দেখিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসি চত্বর রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে দাঁড়িয়ে নিজের মোবাইলে সেলফি-ছবি তোলার দৃশ্য আমাকের নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে।

কারণ, পাঁচ বছর আগেও তারা এটিকে মূর্তি বলত, ভাঙ্গার জন্য তেড়ে আসত। আজ স্মৃতি ধরে রাখার জন্য নিজের আধুনিক যন্ত্র মোবাইল ব্যবহার করছে। শুধু তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে প্রবেশ করে ঘুরে ঘুরে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন ছবি দেখেছে, ছবি তুলেছে।

আরও ভালো লেগেছে, অনুষ্ঠানের সরাসরি ভিডিও অনেকে মিলে একসাথে মোবাইল ব্যবহার করার মাধ্যমে দেখেছে। কমেন্ট করেছে, শেয়ারসহ নিজেদের সুন্দর-সুন্দর মতামতও তুলে ধরেছে।

আপনি নিজেও একান্তভাবে চিন্তা করলে স্পষ্ট বুঝতে পারবেন, শেখ হাসিনার মানবতা থেকে তার শত্রুও বঞ্চিত হয়নি। কে কোন দল করে, কার কোন আদর্শ আবার কে শেখ হাসিনাকে ভোট দিবে আবার কে দিবে না- এমনটা চিন্তা করে তিঁনি কখনও কোনো কাজ করেন না। বঙ্গবন্ধুর গোড়বিরোধী মানুষের বিপদে বঙ্গবন্ধু যেমন তার পাশে দাঁড়াতেন, ঠিক শেখ হাসিনা তার ব্যতিক্রম নয়।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে উপলব্ধি করেছেন,কওমি’র শিক্ষক-শিক্ষার্থী বাংলাদেশের জনগণ। সংবিধান অনুযায়ি রাষ্ট্রের সকল সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার তাদেরও আছে। তাই সকলের সমালোচনা নিজের মাথায় নিয়ে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জীবনমান উন্নত করার দায়িত্ব নিয়েছেন। সনদ দিয়েছেন, সম্মানিত করেছেন। জীবনের একটা মর্যাদা দিয়েছেন যা ব্রিটিশ আমল তথা ১৫০ বছরের মধ্যে কেউ দেয়নি।

আরেকটি কথা প্রায়ই হাস্যকর মনে হয় আমার কাছে। শেখ হাসিনা ভোটের রাজনীতির কারণে কওমি’র শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে আঁতাত করেছেন- এমন অভিযোগ তুলে অনেকে ব্যক্তিগত আক্রমন করেও শেখ হাসিনার সমালোচনা করেছেন। বলেছেন, কওমির একজন শিক্ষকও কোনোদিন শেখ হাসিনাকে ভোট দিবে না -আমি ব্যক্তিগতভাবে এটা বিশ্বাস করি না। শুধু ভোট নয়, শেখ হাসিনার প্রতি আস্থাশীল, শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস এবং বর্তমান বাংলাদেশ নিয়েও কওমির অধিকাংশ শিক্ষক-শিক্ষার্থী গর্ববোধ করে।

তার মূল কারণ, রাষ্ট্রপরিচালনা থেকে দেশের উন্নয়ন পুরো জাতির সামনে দৃশ্যমান। শেখ হাসিনা মসজিদ, মন্দির থেকে আরম্ভ করে সকল ধর্মের মানুষের জন্য একটি মর্যাদার বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে নতুন করে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।

যার যার ধর্ম পালনে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেছে। আমাদের একটি কথা মনে রাখতে হবে, ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানবসভ্যতা ধীরে-ধীরে আজকের আধুনিক পর্যায়ে এসেছে। ক্রমবিবর্তনে সভ্যতার যে উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে, তাতে ধর্মেরও বড় অবদান রয়েছে। সভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে যার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। আর তাকে অবজ্ঞার চোখে দেখা নিশ্চয়ই সুনাগরিকের দায়িত্ব নয়। আমার বিশ্বাস, কওমি শিক্ষক-শিক্ষার্থীও একদিন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবেন। আমি সেই আশার আলো দেখতে পাচ্ছি।

কম্পিউটার, মোবাইল, ইন্টারনেট ব্যবহার করার মাধ্যমে তারাও মিনিটের খবর মিনিটের মধ্যে জানতে পারবে। বিচার-বিশ্লেষণ করে সত্য-মিথ্যার তফাৎ খুঁজে পাবে, বুঝবে এবং অন্যদেরও বুঝাবে। শুধু ভোটই দিবে না, একদিন কওমির শিক্ষক-শিক্ষার্থী শেখ হাসিনাকে নিয়ে গল্প-কবিতাও লিখবে।

শিক্ষক ছাত্রের কাছে, ছাত্র তার বন্ধুদের কাছে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মাঝে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ছড়িয়ে দিবে- আমি এটাই বিশ্বাস করি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)