চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

টিভিতে শিশুদের ঈদ বিনোদন কই?

টেলিভিশনে শিশুদের ঈদ বিনোদন বলে কি কিছু আছে?

বিজ্ঞাপন

ঈদ উপলক্ষ্যে আমাদের টেলিভিশনগুলো নানা ধরণের অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে। সাতদিনব্যাপী আয়োজনে থাকে খণ্ড নাটক, ধারাবাহিক নাটক, বিরতিহীন নাটক, স্বল্পবিরতির নাটকসহ নাচ-গান, আড্ডা। একটি বা দুটি চ্যানেল শিশুদের জন্য নামকা ওয়াস্তে একটি নাটক আর গদবাধা হাস্যকর মাগাজিন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। জানি না সেই দু’একটি চ্যানেলে শিশুদের জন্য কিছু করা হয় তা আমাদের শিশুরা আদৌ জানে কি না বা দেখে কি না। কারণ ওগুলোর সম্প্রচার সময় নির্ধারণ করা হয় বিকেলের দিকে।

এই হচ্ছে আমাদের দেশের টেলিভিশনে শিশুদের অবহেলার চিত্র। অথচ যখন একটি টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হয় তখন কত না বুলি আউড়ে থাকে। দেশের কর্তাব্যক্তিদের ডেকে এনে জাঁকজমক অনুষ্ঠান করে ঘোষণা দেয়-আমাদের টেলিভিশন হবে সব শ্রেণীর দর্শকদের জন্য। ছোটদের জন্য ‘হ্যান করিব ত্যান করিব’ কত লেকচার শোনা যায়। ছোটদের মানসিক বিকাশে সহায়তার জন্য তাদের আনন্দদানের ব্যবস্থা করব। ওই লেকচার মিলনায়তনেই সীমাবদ্ধ থাকে, তারা আর মনে রাখে না। কারণ তাদের কাছে বড় হয়ে যায় অর্থ। কোন অনুষ্ঠান তৈরি করলে বা কিনলে অধিক অর্থ পাওয়া যাবে সেই ধরণের অনুষ্ঠান তৈরিতে আর কেনায় মত্ত হয়ে ওঠে।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, শিশুদের জন্য অনুষ্ঠান করলে বাজেট বেশি লাগে। তারপর স্পন্সর পাওয়া যায় না। আর ঈদের সময় স্বাভাবিকভাবে চ্যানেলের প্রতি সেকেণ্ডের মূল্য অন্য যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি। কেন একটি স্পন্সরহীন শিশুদের অনুষ্ঠান চালাবো? খুবই যুক্তিসংগত প্রশ্ন।

কিন্তু এটাও তো সত্য, ঈদের সময় মোটামুটি প্রতিটি চ্যানেল অন্য যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি আয় করে। যেহেতু টেলিভিশন একটি সামাজিক গনমাধ্যম, এর একটি দায়বদ্ধতা রয়েছে। সমাজের প্রতি সেই দায়বদ্ধতা থেকে শিশুদের কথা ভেবে কি দুটি-তিনটি নাটক রাখা যায় না? যা শিশুকে দেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত করে তুলতে সহায়তা করবে। কিংবা হাসির নাটকের মাধ্যমেও শিশুকে অনেক সামাজিক নিয়ম কানুন, প্রকৃত মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠতে সহায়তা করতে পারে। বড়দের অনুষ্ঠান প্রচার করলে না হয় বেশি অর্থ আয় হবে দুএকটা ছোটদের অনুষ্ঠান করে না হয় একটু কমই আয় হলো। তবুও সামাজিক দায়বদ্ধতা কিছুটা তো পালন করা হলো।

বিজ্ঞাপন

মূল কথা হলো, আমাদের শিল্প সংস্কৃতি সব কিছুই চলে গেছে ব্যবসায়ীদের হাতে। যারা চেনে শুধু টাকা। সেটা আলু পটল বিক্রি করে হোক আর টেলিভিশন নাটক বিক্রি বা অনুষ্ঠান তৈরিতে অর্থের যোগান দেওয়াই হোক। খুবই হাস্যকর কথা-ছোটদের নাটকের স্পন্সর পাওয়া যায় না, কিন্তু যদি ভালো পরিচালক আর ভালো গল্পের চিত্রনাট্য পাওয়া যায় তা হলে কেন স্পন্সর পাওয়া যাবে না? বিষয়টা বোধগম্য না। আমাদের টেলিভিশনের কর্তাব্যক্তিরা যদি দেশে শিশুদের জন্য যারা নিরবে নিভৃতে লেখালেখি করেন তাদের কাছে যান নাটকের জন্য গল্প আনতে বা নাটক লিখে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন তারা কি ব্যর্থ হবেন? মোটেও ব্যর্থ হবেন না। কারণ এ দেশে শিশু-কিশোরদের জন্য অনেক লেখক আছেন যারা শিশু-কিশোরদের কাছে অনেক জনপ্রিয়। শিশুকিশোররা প্রতিবছর বইমেলায় তাদের বইয়ের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন। রহস্য, গোয়েন্দা বা সাইন্স ফিকশনের সেই বইগুলো দিয়ে অনেক নাটক তৈরি করা সম্ভব। শুধু প্রয়োজন একটু আন্তরিকতা আর তাদের কাছে গিয়ে বলা। এই কাজটি করার লোকের অভাব। কারণ সহজেই পাওয়া যাচ্ছে ইয়ার্কি ফাজলামি আর ছ্যাবলামি মার্কা নাটক। স্পন্সরদাতারাই দিয়ে যাচ্ছে সেইসব নাটক। কেন খামোখা কষ্ট করে শিশুদের জন্য যারা লেখেন তাদের কাছে গিয়ে ধর্ণা দিব? এই মানসিকতার কারণে বঞ্চিত হচ্ছে আমাদের শিশুরা।

আমাদের দেশে এখন সবই চলে সময়কে নির্ভর করে। যখন যেমন তখন তেমন। শুধু অভিনয় করে যাওয়া আর কি! দেশে অনেক এনজিও আছে, যারা শিশুদের নিয়ে কাজ করেন। শিশুদের কথা বলে প্রতিবছর বিদেশ থেকে ফান্ড কালেকশন করাই এদের কাজ। নিজেরা সেই ফান্ডের টাকায় বিলাসবহুল জীবনযাপন করবে। আর অক্টোবর মাসে বিশ্ব শিশু দিবস এলেই মৌসুমী শিশু দরদী হয়ে ওঠার চেষ্টায় মেতে থাকবে। সরকারি পর্যায়ের কিছু লোককে তখন অন্তর্ভুক্ত করে সভা সেমিনার আয়োজন করে নানা রকমের বিজ্ঞাপন তৈরি করবে। শিশু দরদী পোষ্টার ফেষ্টুন নিয়ে কিছু শিশুকিশোরকে যোগাড় করে শোভাযাত্রার মাধ্যমে ফান্ড হালাল করায় মেতে উঠবে।

এদের কিছু পোষা পত্রিকা আছে। যাদেরকে সারা বছরই নানা ধরণের বিজ্ঞাপন দিয়ে হাত করে রাখে। শিশুদের জন্য কাজ করছে এসব এনজিও, এ ধরণের সচিত্র খবর নিয়মিত ওই পত্রিকাগুলো প্রচার করে থাকে। সবচেয়ে অবাক হবার বিষয়, শিশুদের জন্য যত ফা- আনে এরা তার অর্ধেকও যদি টেলিভিশনের বিশেষ দিনগুলোতে খরচ করে শিশুদের জন্য, তা হলেও অনেক বিনোদিত হতে পারত আমাদের শিশুকিশোররা। কিছুই না ঈদ উপলক্ষে এসব এনজিও যদি মনে করে বড় বড় চ্যানেলের একটি বিশেষ সময়কে কিনে নিবে। সেই সময়টার যা খরচ সব তারা দিবে, তাহলেই আর স্পন্সরের পেছনে দৌড়াতে হয় না। নাটক বা গানের অনুষ্ঠানে বিজ্ঞাপন দিয়ে যেসব মধ্যস্বত্বভোগীরা দৌড়ঝাঁপ করে তাদেরকে তোয়াজ করা লাগে না। এতে করে ওইসব এনজিওর একটা প্রচার হয়ে গেল ঈদের সময়টায় আর শিশুকিশোররা পেল ভালো কিছু নাটক। একদিকে ওই চ্যানেলের সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টা রক্ষা পেল, অন্যদিকে এনজিও শিশুদের জন্য যে ফাণ্ড এনে থাকে বিদেশ থেকে তাও কিছুটা কাজে লাগল এবং সরকারের কাছেও ভালো থাকল। কারণ ঈদের সময়টায় বিশাল প্রচার পাওয়া যায়, যা সারা বছর পাওয়া যায় না।

আরেকটি বিষয়, যারা শিশুদের জন্য কাজ করেন নানা এনজিওতে তারা কখনোই এই ঈদের সময়টায় কেন শিশুদের উপযোগী অনুষ্টান প্রচার করে না চ্যানেলগুলো তা নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। কারণ তারা মুখে যা বলে তা আসলে বিশ্বাস করে না বোধহয়। শুধু বলার জন্যই কথা বলে থাকে বিভিন্ন সভা সেমিনারে। তাদের দিক থেকে কোনো উদ্যোগ নেই। কারণ তারা জানে তারা যদি চ্যানেলকে এ ব্যাপারে কিছু বলে তা হলে তাদেরকে আর ডাকবে না বিশেষ দিনগুলোতে। সুতরাং বলে কি দরকার বিরাগভাজন হওয়ার? এই নীতিতে চলছেন তারা। যার ফলে বঞ্চিত হচ্ছে আমাদের শিশুরা, আমাদের কিশোররা।

আমরা কি শিশুকিশোরদের জন্য তেমন নাটক তৈরি করতে পারি না, যা দেখে আমাদের শিশুকিশোররা পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার প্রেরণা পাবে। যে নাটক দেখে শিশুরা সমাজের ভুল বা খারাপ দিকগুলো সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবে বা নিজে স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন দেখবে। মানুষকে সম্মান দেওয়ার অনুপ্রেরণা পাবে। নিজের ভেতরে প্রতিবাদী চেতনার বীজ বপন করবে। যে নাটক দেখে ছোট থেকে মাদকের ভয়াল ছোবল সম্পর্কে সচেতন থাকবে। চারপাশের অন্ধকার থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখে অন্ধকার দূর করতে নিজের ভেতরে আলোর মশাল জ্বালাতে উৎসাহী হয়ে উঠবে। সর্বোপরি দেশকে ভালবাসতে শেখায় যে নাটক সেই ধরণের নাটক দেখাতে পারি না শিশুকিশোরদের?

আমাদের দেশের চ্যানেলগুলোর কাছে আগামী প্রজন্মকে সঠিক দিক নির্দেশনা দেবার জন্য তেমন নাটক বা অনুষ্ঠান আশা করি প্রতি ঈদের বিশেষ সময়ে। পারলে সারা বছরই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)