চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘শিক্ষার্থীরা ভালো করে বাংলা বলতে পারে না, মিশিয়ে বলে সেটা খুবই দুঃখজনক’

গবেষণামূলক ও সাক্ষাতকারভিত্তিক গ্রন্থ ‘ভাষা সংগ্রামীর বাংলাদেশ’ থেকে সংক্ষেপিত

ভাষা সংগ্রামী হালিমা খাতুন। ১৯৩৩ সালের ৮ আগস্ট বাগেরহাটের বাদেকাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা মৌলভী আব্দুর রহিম, মা দৌলতুন নেছা।হালিমা খাতুন বাদেকাড়া পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে বাগেরহাটের মনমোহিনী গার্লস স্কুল থেকে ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। বাগেরহাট প্রফুল্লচন্দ্র কলেজে থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। ইংরেজিতে এমএ পাশ করার পর তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাশ করেন।

বিজ্ঞাপন

১৯৬৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্দান কলোরাডো থেকে প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় সমাবেশে ছাত্রীদের জড়ো করায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। মুসলিম গার্লস স্কুল ও বাংলা বাজার গার্লস স্কুলের ছাত্রীদের আমতলার সমাবেশে নিয়ে আসেন। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথম যে মেয়েদের দল বের হয় সেই দলের একজন ছিলেন হালিমা খাতুন।

১৯৫৩ সালে খুলনা করোনেশন স্কুল এবং আরকে গার্লস কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন হালিমা খাতুন। কিছুদিন রাজশাহী গার্লস কলেজে শিক্ষকতা করেন। পরে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে। সেখান থেকে অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন ১৯৯৭ সালে। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লেখা তার ৪৫ খানা বই প্রকাশিত হয়।

রচনা: ছোটদের সেরা গল্প, ভুতুর সকাল, বাঘ ভালুকের মন ভাল নেই, ছোটদের নির্বাচিত মজার গল্প, বনের ধারে আমরা সবাই, মস্ত বড় জিনিস, পরীর মেলা, মিনা’র শ্রেষ্ঠ গল্প, পাখি রক্ষা অভিযান, মন মাতানো এক ডজন, টগরদের অভিযান, বাচ্চা হাতির কাণ্ড, ধনুকের গুণ, বাঘের গলায় হাড়, গল্পগুলো মজার, শিশু কিশোর নির্বাচিত গল্প, স্কুলের নাম মনোমোহিনী, মুন্নীর স্কুল, শিশু কিশোর সমগ্র-১, শিশু কিশোর সমগ্র- ২, শিশু কিশোর সেরা গল্প, সবচেয়ে সুন্দর, পাখির ছানা, কাঁঠাল খাবো, শিশু-কিশোর শ্রেষ্ঠ রচনা, ছড়ায় সাগর নদী, রস কদম্ব, মজার মজার ছড়া, তৎসম দ্বীপ, ইসলাম: শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম।

হালিমা খাতুনের স্বামী মরহুম শামসুল হুদা। তাদের একমাত্র কন্যা প্রজ্ঞা লাবনী (বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী)।

সম্মাননা: ২০১৯ সালে একুশে পদক (মরনোত্তর) পান ভাষা সংগ্রামী হালিমা খাতুন। ভাষা আন্দোলনে অবদানের জন্য শিল্পকলা একাডেমি তাকে ভাষা সৈনিক সম্মাননা প্রদান করে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি পুরস্কার, লেখিকা সংঘ পুরস্কার সহ বিভিন্ন সময় নানা পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন হালিমা খাতুন।

২০১৮ সালের ৩ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন ভাষা সংগ্রামী হালিমা খাতুন।

২০০৬ সালে হালিমা খাতুনের সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন তারিকুল ইসলাম মাসুম

তা. ই. মাসুম: আপনারা কীভাবে ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। আপনাদের ভূমিকা কী ছিল? আপনারা কী ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন? ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটায় কী ঘটেছিল? ৫২’র ২১শে ফেব্রুয়ারির আগের আন্দোলন কী ছিল এগুলো বলবেন? আপনাদের অবস্থাটা কেমন ছিল ঐ সময়ে? কীভাবে জড়িত হয়েছিলেন ভাষা আন্দোলনে?
হালিমা খাতুন: বলতে গেলে বলতে হয় ‘জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশ ভূমি’ এটা সুকান্তর কথা। বিৃটিশরা তখন নির্যাতন চালাচ্ছে। ওখান থেকেই মনের মধ্যে স্বাধীনতার একটা আকাঙ্খা জেগে উঠেছিল। এবং রবীন্দ্রনাথের বই পড়ে, রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে ভাষার প্রতি যে প্রীতি এবং মাতৃভাষার মধ্যে যে অন্তর্নিহিত ভালবাসা, যে শক্তি, যে সম্মান সেটা অন্তরে গেঁথে গিয়েছিল। এবং যতই সাহিত্য পড়েছি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, তাদের ভেতর দিয়ে এই দেশপ্রেম এবং ভাষা প্রেম প্রজ্জ্বলিত হয়েছে।

এবং তারপরেই রাষ্ট্র ভাষা। রাষ্ট্রভাষার পরে, পড়ালেখা করার সময়েই স্বদেশি আন্দোলনে যুক্ত হই। এবং তারপরে নেতাজী’র (সুভাষ চন্দ্র বোস) আদর্শে অনুপ্রাণিত হই। এবং তারপরেই দেশে আসে মাও সে তুং এর বাণী। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। এই এর মধ্যেই ১৯৪৭ সালে ভাষা আন্দোলন শুরু হয় ঢাকায়, তখন আমরা কলেজে পড়ি, কলেজে পড়ার সময় (বাংলা) ভাষাবিরোধী যে তৎপরতা তা আমাদেরকে দারুণভাবে মনের মধ্যে আঘাত করেছে এবং আমরা প্রসেশন করেছি, মিটিং করেছি।

তারপরে যখন এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম ১৯৫১ সালে তখন এসে দেখি ক্ষুব্ধ ছাত্র সমাজ। সাংঘাতিক রকম একটা উদ্বেল অবস্থা, কারণ তার কিছু আগে ঘোষণা করা হয়েছে উর্দু একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে। তো, আগেই বলেছিলাম কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আমাদের সংযোগ ছিল এবং ঢাকায় এসে সেটা আরো বাড়ে।

একজন নেত্রী ছিলেন জুঁইফুল রায়, বেশ বয়স্ক, খোকা রায়ের স্ত্রী। উনি আমাদের অনুপ্রাণিত, উৎসাহিত করতেন, গাইড করতেন। অবশ্য উনি তখন আন্ডরগ্রাউন্ড, বোরকা পড়ে আসতেন অন্য নামে। তো, তখন থেকেই আমরা ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত হয়ে পড়ি এবং যত মিছিল, মিটিং, প্রচারপত্র বিলি করা, পোস্টার লেখা এই সমস্ত কাজে যুক্ত হয়ে পড়ি। এবং ছাত্রীদের মধ্যে, স্কুলের ছাত্রীদের মধ্যে, তারপরে মিডফোর্ড স্কুলের মেয়েদের, মেয়ে ডাক্তারি পড়তো যারা, তাদের সাথে মিটিং করি এবং তাদের অনুপ্রাণিত করি।

সারা ফেব্রুয়ারি জুড়েই তো ঢাকা উত্তপ্ত ছিল। ২০ ফেব্রুয়ারি যখন আশঙ্কা করা হয় আগামীকাল ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করবে। তার কারণ হলো সেদিন, এখন যেখানে জগন্নাথ হল (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের) সেখানে ছিল পূর্ব পাকিস্তান সংসদ, অ্যাসেম্বলি, সেখানে হবে বাজেট সেশন। বাজেট সেশনে পাশ হবে বাংলা… কোনো অস্তিত্ব নেই, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।

কিন্তু তা আমরা হতে দিব না। বাংলার যদি কোনো অস্তিত্ব না থাকে, উর্দুই যদি একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হয় তাহলে তো আমরা সমস্ত কৃতদাস হয়ে যাব। আমাদের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। আমরা ওদের মুখাপেক্ষী হয়ে যাব। কাজেই সমস্ত ছাত্রসমাজ একেবারে গর্জে উঠল যে, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। এবং ইতিপূর্বে যত আন্দোলন হয়েছে, বহু ছাত্র নির্যাতিত হয়েছে। তাদেরকে বন্দী করা হয়েছে, সেই জন্য তার সঙ্গে (স্লোগান) হলো; ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’।

এবং তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এখানকার নূরুল আমিন, তার সঙ্গে যুক্ত হলো; ‘নুরুল আমিন গদি ছাড়’ ‘নুরুল আমিনের কল্লা চাই’। এই সমস্ত স্লোগান দিয়ে আমরা সমস্ত ঢাকার রাস্তা মুখরিত করে তুলতাম। তারপরে ২০ তারিখে রাতে মিটিং হলো যে, ২১ তারিখ ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে কী হবে না? তো সেইটা অমীমাংসিত রয়ে গেল।

আমার ওপরে দায়িত্ব ছিল আমি এবং আরো কয়েকজন। এখন যেটা রোকেয়া হল ওখানেই থাকতাম, রোকেয়া হলের নাম ছিল তখন ‘ডাব্লিউএসআর’ (উইমেন স্টুডেন্ট রেসিডেন্স?)। তো সেখান থেকে…সবাই তো আর ঠিক উদ্বুদ্ধ হয়নি। তখনো আর আমরা তো সবে নতুন এসেছি, আর সবাই যাবে না। সেই জন্য আমি, তখনকার নেত্রী ছিলেন, ‘নাদেরা বেগম’, তার ওপরে পুলিশের হুলিয়া ছিল, মুনির চৌধুরীর বোন নাদেরা বেগম। এর আগের আন্দোলনগুলোতে তিনি সাংঘাতিক দাপট দেখিয়েছেন। পুলিশের সঙ্গে ফাইট করেছেন। তো, নাদেরা বেগমের কাছ থেকে চিঠি নিয়ে এসেছিলাম, অন্য সবাইকে মিছিলে যাওয়ার জন্য এবং স্কুলে স্কুলে পিকেটিং করার জন্য। কিন্তু খুব বেশি সাড়া দিল না।

আমরা কয়েকজন মিলে চলে গিয়েছিলাম স্কুলে। বাংলা বাজার গার্লস স্কুল আর মুসলিম গার্লস স্কুল জেলখানার সামনে (নাজিমুদ্দিন রোড)। এই দুই স্কুল থেকে পিকেটিং করে মেয়েদের নিয়ে এসেছিলাম। স্কুলের মেয়ে, ওরা সিক্স-সেভেন এইট এই সমস্ত ক্লাসে পড়ে। ওখান থেকেও বেরোতে নানা বাঁধা, ওরা দেয়াল টপকে, দেয়াল ভেঙে এসেছিল। আগেও অন্যান্য মিছিলের সময় ওদের এভাবে নিয়ে আসতাম। আর মিডফোর্ডের মেয়েদের খবর দিয়ে এলাম। ওরা তো বড়, ওরা নিজেরা এসেছিল। এসে আমরা জড়ো হয়েছিলাম মধুর দোকানের সামনে। মধুর দোকান ছিল পুরনো আর্টস বল্ডিং এর সামনে। ওখানে এখনো একটা সাইনবোর্ড দেয়া আছে (ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ওখানে) এখানেই প্রথম ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হয়।

ঐখানে আমতলায় মধুর দোকানের সামনে আমরা জড়ো হই। তখন মিটিং চলতে থাকে, আমরা ছাত্রীদের নিয়ে এসে দেখি কি সারা ঢাকার ছাত্র সমাজ ওখানে এসে জড়ো হয়েছে। আর মিটিং চলছে, গাজী ভাই (আবু নছর মোহাম্মদ গাজীউল হক) সভাপতিত্ব করছেন। আর মুহুর্মুহু স্লোগান হচ্ছে, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’।

বিজ্ঞাপন

তবে আমরা শুধু রাষ্ট্রভাষা বাংলা, পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে তা আমরা বলি না। আমরা বলি যে, অন্যতম বাংলা। কারণ সবার ভাষা থাকবে। কারো মুখের ভাষা কেড়ে নেয়া যাবে না। কিন্তু তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার ও পাকিস্তানি শাষকগোষ্ঠী তাদের একমাত্র কথা হচ্ছে, উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে। সেটাতে আমরা কোনোক্রমেই সম্মত না। আমরা এর বিরোধিতা করব। জান দিব তো মুখের ভাষা কেড়ে নিতে দিব না।

আব্দুল লতিফ ভাই তখন গান তৈরি করলেন, ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়…’ তো মুখের ভাষাকে আমরা কিছুতেই বিসর্জন দিতে পারব না। জান যায় যাক, তবু ভাষার অধিকার কেড়ে নিতে দিব না। সেদিন আমরা আমতলায় জড়ো হয়েছিলাম। আর যখন ডিসিশন হচ্ছিল। কখনও মিটিং হচ্ছে। তখনও মিটিং অমিমাংসিত। কিন্তু যে ছাত্রছাত্রীরা, বিশেষ করে যে স্কুলের ছাত্রীদের আমি নিয়ে আসছিলাম, ওরা তো কিছুতেই মানবে না। আমরা কিছুতেই মানব না, আমরা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, আমরা রাজবন্দীদের মুক্তি চাই। আমরা ১৪৪ ভাঙব-ই ভাঙব-ই। যেমন করেই হোক ১৪৪ ধারা ভাঙব-ই ভাঙব।

তারপরে ঠিক হলো যে, মেয়েরা ৪ জন ৪ জন করে পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙবে। পুলিশ ছিল দরজায় একেবারে সারিবদ্ধভাবে। দুই পাশে বন্দুক নিয়ে। বন্দুক দিয়ে পথ আটকে। তো, মেয়েরা ৪ জন ৪ জন করে বেরোবে ১ জন বড় মেয়ে আর ৩ জন ছোট মেয়ে। আমি প্রথম দলেই ছিলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন, এখন তারা বড় হয়ে গেছেন। প্রফেসর জুলেখা, তারপরে অলি আহাদ সাহেবের বোন পারুল, তারপরে নূরী, তারপরে আক্তারী এরা ছিলেন। আর আমার সঙ্গে হোস্টেলের মেয়েরাও ছিলেন জুলী, শামসুন তিনি বোরকা পড়তেন তাই তার নাম ছিল বোরকা শামসুন। উনিই একমাত্র মেয়ে ইউনিভার্সিটিতে যিনি বোরকা পড়তেন, বরিশালের মেয়ে। ওর বাবা স্পিকার ছিলেন এক সময়।

আর আমার পেছনে আরেকটা দল ছিল আরো ৪ জনের। আর তার পেছনে ছিলেন শাফিয়া খাতুন। তার সঙ্গে ছিলেন ৪টি করে মেয়ে। আর তার পেছনে ছিলেন আরোকজন ওদের নামটা আমি ভুলে গেছি। তবে সর্বপ্রথমে যে ৪ জনকে নিয়ে বের হলাম আমি এবং আমার পেছনে ৪ জন এই ৮ জন আমরা যতদূর মনে পড়ে, আমরা সবার প্রধম ১৪৪ ধারা ভেঙে বের হই। বন্দুক ঠেলে, বন্দুকের নল ঠেলে। তখন কোনো ভয় পাইনি। আমরা শুধু স্লোগান দিতে দিতে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে গেছি। আমরা দুই দল বেরিয়েছি। তারপরে ২ দল মেয়ে বেরোলে, পুলিশ তাদের অ্যারেস্ট করে ভ্যানে তুলে নিয়ে গেছে। পরে ছেড়ে দিয়েছিল তেজগাঁর দিকে নিয়ে। মেয়েদের যখন অ্যারেস্ট করল, তখন আর ছেলেদের ১০ জন ১০জন করে কি! তখন তো একেবারে জনস্রোতের মতো, জোয়ারের মতো তারা বেরিয়ে আসল স্লোগান দিতে দিতে। আমরাও স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে চললাম।

তখন পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করল, না টিয়ার গ্যাস, প্রথমে টিয়ার গ্যাস ছাড়ল। প্রচণ্ড রকম টিয়ার গ্যাস ছাড়তে লাগল। টিয়ার গ্যাসের বড় বড় শেল এসে পড়তে লাগল সামনে, চোখ দিয়ে পানি বেরোতে লাগল। আমরা তখন কোনো পথ দেখতে পাচ্ছিলাম না। তবুও আমরা ‘চল চল অ্যাসেম্বলি চল’ এই বলে স্লোগান দিয়ে এগুতে থাকলাম।

ভলান্টিয়াররা বালতি ভরে পানি এনে দিল। আঁচল ভিজিয়ে, রুমাল ভিজিয়ে আমরা চোখ ধুয়ে আরো এগিয়ে যেতে লাগলাম। আর তারপরেই পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে দিল। আর টিয়ার গ্যসের মাত্রাও আরো বাড়িয়ে দিল। এখন আমরা আর খুব বেশি দূর এগুতে পারলাম না সামনে। সামনেই ছিল মেডিকেল ইমার্জেন্সি, ইমার্জেন্সিতে ঢুকে পড়লাম মেডিকেলে কম্পাউন্ডে। মেডিকেল কম্পাউন্ডে তখন অনেক ইট জমা ছিল। বিল্ডিং তৈরি হচ্ছিল কিছু কিছু। যখন লাঠি চার্জ আর টিয়ার গ্যাস শুরু হয়েছে তখন ছাত্ররা ভেতর থেকে পুলিশদের লক্ষ্য করে ইট মারতে লাগল।

আমি অনেককে বললাম যে, ইট মেরো না। ওরা হয়তো গুলি-টুলি করতে পারে। সেই কথাই সত্যি হয়ে গেল! সাড়ে তিনটার দিকে ওরা গুলি শুরু করল। তখন একেবারে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো। ওদের…পুলিশের হুংকার, গুলির শব্দ, স্লোগান আর আহতদের আর্তনাদ! তাদের রক্তে ভেসে যেতে লাগল সমস্ত ঘাস। তাদেরকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হলো। নিয়ে যাচ্ছিল, আমরা তাদের সাথে গেলাম। কিছু সময় সেখানে থাকলাম। কিন্তু তখন তো উকে চিনি না বিশেষ! যাদের চেনা, ২-১ জনকে চিনলাম আবার কেউ অচেনা। আবার কে যে মৃত, কে যে জীবিত তখন বুঝতে পারিনি। তবে শুনেছিলাম অনেক লাশ পুলিশ গুম করে ফেলেছিল।

আমি সারাদিনই প্রায় ওখানেই ছিলাম। কতক্ষণ ধরে গুলি চলেছিল ঠিক মনে নাই। যাহোক গুলি থামলে এরকম বেলা শেষে ঐ এখন যেখানে শহীদ মিনার, ওখানে গেলাম। ওখানে দিয়ে যে দৃশ্য দেখলাম! ওখানে রফিক বরকত ওরা শহীদ হয়েছিলেন। ওখানে ছিল বাঁশের চালা ঘর। বাঁশের ঘর আর কি, ব্যারাক।
সেই রক্তের স্মৃতিটা, আমার কাছে বাংলাদেশের পতাকার যে লাল সূর্যটা, ওটার সঙ্গে কোথায় যেন একটা মিল দেখায়। নিহত একজনের শার্ট এবং পাজামা ওখানে ঝোলানো ছিল গাছের ডালে অথবা খুঁটিতে, আমার ঠিক মনে নাই। রক্ত যে ঝরে পড়ছে সেই রক্ত শক্ত হয়ে ঝুলে ঝুলে আছে। এছাড়া আরো দেখি একটু পাশে বোধ হয় রফিক কিংবা অন্য কারো লাশ পড়ে আছে। এই স্মৃতি কখনোই ভুলবার নয়। এই…দেখলাম।
তা. ই. মাসুম: আরেকটা বিষয় শহীদ মিনার কখন তৈরি হল? কারা করল?
হালিমা খাতুন: ছাত্ররা, বিশষে করে মেডিকেল ছাত্ররা ওখানে শহীদ মিনার তৈরি করল। ইট এবং সিমেন্ট বালি দিয়েছিল কন্ট্রাক্টর। তিনি হলেন এখানকার সরদার ঢাকার, পুরান ঢাকার বিখ্যাত, নামটা ভুলে গেছি (পিয়ারু সরদার) উনি সমস্ত কিছু ফ্রি দিয়েছিলেন। এবং ছাত্ররাই এই শহীদ মিনার তৈরি করেছিল। তার পরদিন আমরা যখন শহীদ মিনারে আসলাম, তখন সমস্ত ঢাকা থেকে লোকজন আসতে থাকল এবং মায়েরা টাকা পয়সা তো দিলই! কেউ একজন গলার হার খুলে দিয়েছিল। আরো অনেক গয়না দিয়েছিল এবং টাকা পয়সা প্রচুর দিয়েছিল।
আর সে দিনও বিশাল মিছিল হয়। সাংঘাতিক মিছিল হয়, সেই মিছিলেও আমরা অংশগ্রহণ করি। ইউনিভার্সিটি থেকে সেই মিছিল হাই কোর্ট পর্যন্ত লম্বা হয়। আমরা সেখানে যাই।

আর তারপর থেকে আমাদের কাজ হলো সারা ঢাকা থেকে চাঁদা তোলা।আন্দোলনের সাহায্যের জন্য আর আহতদের সাহায্যের জন্য। আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য। আমরা দিনের পর দিন সারা ঢাকা থেকে চাঁদা তুলতাম।
এছাড়া পোস্টার লেখা, লিফলেট বিলি করা, মিটিং করা, মিছিল করা, এই করতে রইলাম। এরপরই এরই ফলশ্রুতিতে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে…এই গুলি চলার প্রতিবাদে সারা দেশ জেগে উঠল।

আগে ঢাকা শহরে মেয়েদেরকে নানাভাবে হেনস্থা করা হতো, টিজ করা হতো। কিন্তু তখন আর কোনো রকম বাঁধাবিপদ রইল না। এবং হোস্টেল থেকে আমাদেরকে বের হতে দিত না ক্লাস ছাড়া, এসময় আর কোন বাধা রইল না। আমরা তখন সবসময় যেতে পারলাম। এরই ফলশ্রুতিতে মুসলিম লীগের প্রতি বাঙালি জাতি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল এবং এই পথ ধরেই মুসলিম লীগের পতন হলো। এবং সেই মুসলিম লীগের পতনের কর্মকাণ্ডে আমরা সাংঘাতিক রকম কাজ করেছি।

মুসলিম লীগের বিপক্ষে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের যে সদস্য নূর জাহান মোর্শেদ তাকে জয়যুক্ত করার জন্য দিন-রাত আমরা কাজ করেছি। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সমস্ত এই কনস্টিটিউয়েন্সি ঘুরে ঘুরে দিনে রাতে সারাক্ষণ কাজ করেছি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খেয়ে না খেয়ে। মাঠে থেকে ছোলা খেয়ে, কোনো দিক থেকে পানি খেয়ে, এই ভাবে। তারপরে নূর জাহান মোর্শেদ জিতলেন আর কি।
তা. ই. মাসুম: মুসলিম লীগের প্রার্থী কে ছিলেন?
হালিমা খাতুন: মুসলিম লীগের প্রার্থীও বিখ্যাত মহিলা ঐ বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ। সেটা আমাদের কাজের ফলে। আর এই সময় তো সারা বাংলাদেশ জেগে গেল। একজন সাধারণ লোক সে তেল বিক্রি করত! আমাদের বাগেরহাটের, আমি বাগেরহাট থেকে এসেছি। উনি একটা গান বানালেন, ‘বাঙালি! ঢাকা শহর রক্তে ডুবালি!’ ‘শামসুদ্দিন’ তার নাম। ‘ওরে বাঙাললি, ঢাকা শহর রক্তে ডুবালি’।
এরপরের দিন গাজী ভাই’র গান হলো,

‘ভুলব না, ভুলব না, সে একুশে ফেব্রুয়ারি,
ভুলবনা, তারপর থেকেই প্রভাতফেরি।
লাঠি গুলি টিয়ার গ্যাস, মিলিটারি আর মিলিটারি!
ভুলবা, সে একুশে ফেব্রুয়ারি!

এই গান গেয়ে আমরা মিছিল করতাম, তার পরে প্রভাতফেরি করতাম। এরপরেই সারাদেশ জুড়েই আন্দোলন শুরু করলাম।
তা. ই. মাসুম: ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি কিভাবে দেখেন আপনি? এখন কী করা দরকার?
হালিমা খাতুন: এই ভাষা আন্দোলনের পথেই দেশ স্বাধীন হলো, মুসলিম লীগের পতন হলো, মাতৃভাষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া গেল। দেশ স্বাধীন হলো এবং তারপরেও দীর্ঘকাল ধরে দীর্ঘ সাধনার পরে এবং কয়েকজন বিদেশি বাঙালির অক্লান্ত চেষ্টা, তার নামও ‘রফিক’ তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। উনি এসেছিলেন। তাদের চেষ্টায় ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি লাভ করেছে।

এটা আমাদের যে কত বড় গৌরব সেটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আমাদের মতো একটা ছোট দেশ, এই দেশের আন্দোলন যেটা পৃথিবীর কোথাও ঘটেনি। ঘটলেও এই আকারে ঘটেনি। এরপরে অবশ্য আসামে (ভারত) হয়েছে। বাঙালির বিরুদ্ধে, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে, আন্দোলনে মানুষকে গুলি করে মেরেছে। আসামের শীলচরে।

কিন্তু বাংলাদেশে ৫২’র ২১শে ফেব্রুয়ারিতে যা ঘটেছিল, তারই ফলশ্রুতিতে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের যে স্বীকৃতি, সেটা একটা অসম্ভব পাওয়া আমাদের। তার জন্য আমরা সবাই গর্ব অনুভব করি। এবং এটা আমাদের দায়িত্বও এই মাতৃভাষাকে আমরা যাতে রক্ষা করতে পারি, লালন করতে পারি এবং গৌরবের আসনে চিরকাল বসিয়ে রাখতে পারি। তার জন্য আমাদের আজীবন চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এবং ভাষা মানুষের অস্তিত্বের অঙ্গ। ভাষা মানুষের মনুষ্যত্বের অঙ্গ কাজেই মানুষ হতে হবে। চর্চা করতে হবে। এবং ইতিহাসে অমর করতে হবে। তা. ই. মাসুম: সে ক্ষেত্রে আপনার কোনো প্রস্তাবনা আছে? ইউনেস্কোর সাথে, অন্যান্য দেশের সাথে যোগাযোগ করে তাদের দেশের পাঠ্যক্রমে আমাদের এই ইতিহাস তুলে ধরার বিষয়ে?
হালিমা খাতুন: নিশ্চয়ই! অন্যান্য দেশ হয়তো জানে না! এটা একটা…আমরা যেমন এক একটা দিবস পালন করি, হয়তো ভেতরের খবর কিছুই জানি না। মে দিবসের খবর হয়তো জানি। কিন্তু অন্যন্য দিবসের খবর তো আর বিশষে কিছু জানি না। তো আমাদের এই যে সাংঘাতিক একটা অবদান! ছাত্র সমাজের এই যে সংগ্রাম, শাসকদের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম, সেই সংগ্রামের ইতিহাস সারা দুনিয়ার পাঠ্যক্রমে স্থান পাওয়া উচিত এবং সার দুনিয়ার লাইব্রেরি এবং আর্কাইভসে এর ছবি, এই ঘটনা তুলে ধরা উচিৎ। এবং এনসাইক্লোপিডিয়াতেও এর অবস্থান থাকা উচিৎ।

তাহলে মানুষ জানবে যে, আমরা ভাষার জন্য কী করেছি এবং ভাষা মানুষকে কী দিতে পারে? কী করতে পারে? ভাষা মানুষের অস্তিত্বের সাথে কীভাবে আঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এটার স্বীকৃতি মানুষ দিবে এবং মানুষ তাদের মাতৃভাষা সম্পর্কে সচেতন হবে।
তা. ই. মাসুম: আর কিছু বলবেন?
হালিমা খাতুন: তবে দুঃখ হলো যে, এখন, আজকালকার দিনে, আমরা ইংরেজি…আমরা কেন? ইংরেজি আমরা শিখেছি, কোন ভাষার প্রতিই আমরা বিদ্বেষী নই। একটা কেন? ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ১৬টা ভাষা জানতেন। অন্য ভাষার প্রতি তো আমাদের কোনো বিরোধ নেই। যতটা ইচ্ছা ভাষা শিখি কিন্তু বাংলার পরিবর্তে নয়। বাংলাও শিখতে হবে এবং ভালভাবে শিখতে হবে।

কিন্তু ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলগুলোতে বাংলার ওপর ততটা জোর দেয়া হয় না। এবং ছাত্র ছাত্রীরা ভাঙ্গা-ভাঙ্গা বাংলা বলে, ভাল করে বাংলা বলতে পারে না। মিশিয়ে বলে সেটা খুবই দুঃখজনক। সাধারণ মানুষও এমনকি সরকারি ভাষায়ও? মিডিয়ার ভাষাতেও যথেষ্ট ভুল থেকে যায়। অবশ্য ভুল, দুই একটা ভুল সবকিছুর মধ্যেই থাকে। থাকে, সেটা ক্ষমা করা যায়।

অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল ক্ষমা করা যায়, কিন্তু অবহেলার ভুল তো ক্ষমা করা যায় না। অবহেলার ভুলকে আমরা ক্ষমা করব না। আমরা এর বিরুদ্ধে জাগ্রত প্রহরীর মতো কাজ করব। এবং সেই জন্যই আমি লিখি। আমি এখন ক্লাস করতে পারি না, মিছিল করতে পারি না, স্লোগান দিতে পারি না। কিন্তু আমি লিখি, এখনো আমার কলম সজিব।

আমি ছোটদের জন্যই বেশি লিখি। এবং বড়দের জন্যও লিখি। বাংলা ইংরেজি দুই ভাষাতেই লিখি। আমি ছোটদের জন্য প্রচুর বই লিখেছি। প্রায় ৩০-৪০টা ছোটদের বই আছে। এবং সেটা শিশুরা যাতে আনন্দের মধ্যে দিয়ে পড়া শিখতে পারে এবং তার মধ্যে থেকে সত্য ন্যায়ের দিকে তাদের মন এগিয়ে যায় সেটাই চেষ্টা করি, চিন্তা করি। মোটের ওপর বাংলাদেশ তথা সারা পৃথিবী মানুষের বাসযোগ্য হোক এইটাই আমার কামনা। ধন্যবাদ।

চলবে…