চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শিক্ষক লাঞ্ছনা: মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়ের নিশানা

লাইক, প্রোফাইল, ট্যাবলেট, ক্লাউড। এই শব্দগুলো বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির যুগে বিশেষ অর্থ বহন করে। মাত্র এক দশক আগেও ইংরেজি ভাষার এমন কিছু শব্দের শুধুমাত্র একটি-ই অর্থ ছিল। কিন্তু প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশেষ অর্থে ব্যবহার ও প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশের কারণে শব্দগুলো এখন দুই বা ততোধিক অর্থ বোঝায়। শব্দের সাধারণ অর্থ ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে।

বিজ্ঞাপন

অধিকাংশ শব্দের অর্থ প্রযুক্তিগত, যা দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। জনপ্রিয় হয়েছে আরও একটি শব্দ। ‘ভাইরাল’। ফেসবুক জগতের অতি পরিচিত এই শব্দটির আভিধানিক অর্থ নেই। এক সময় এই শব্দটি দিয়ে বুঝানো হত ভাইরাসে আক্রান্ত বা ভাইরাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো বিষয়। যদিও এটির বর্তমান অর্থ দাঁড়িয়েছে ইন্টারনেটে কোনো বিষয় দ্রুত জনপ্রিয় হওয়া।

মে মাসের ১৩ তারিখ একটি সংবাদ আমাদের বিস্মিত করেছিলো। সংবাদটি ফেসবুকে ‘ভাইরাল’ হয়। ফলে এটির ব্যপ্তি ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশ সর্বত্র। সেই সংবাদে মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। প্রতিবাদ মুখর হয়ে নানান কাণ্ড-কীর্তি শুরু করেন। সব কিছু যেন ঘটতে থাকে বিদ্যুৎ গতিতে। আমরা সেসব কাণ্ড-কীর্তি দেখেছি। মুর্হু মুর্হু পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেছি। আমাদের পর্যবেক্ষণ টিকে থাকলেও থেমে গেছে সেই ঘটনার প্রতিবাদ। মাত্র ২ মাসে অনেকেই বিষয়টি ভুলেও গেছেন। প্রতিযোগিতার এই যান্ত্রিক জীবনে একটি ঘটনাকে নিয়ে এতো ভাবনা-চিন্তা করার সময় কম জনেরই আছে। তাই ঘটনার পরিবর্তন আসে। পরিবর্ধিত হয়ে আরও একটি ঘটনা জন্ম নেয়। ‘ফেসবুক’- এ সেটি ‘ভাইরাল’ হয়। প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। আবার থেমেও যায়। এ যেন এক অদ্ভুত খেলা। নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ। বাস্তবতার সাথে সংগতি। পরাজয়ে পরিসমাপ্তি।

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার কল্যাণদীতে পিয়ার সাত্তার লফিত উচ্চ বিদ্যালয়ে ইসলাম ধর্মকে অবমাননার অভিযোগ এনে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক  শ্যামল কান্তি ভক্তকে শারীরিক নির্যাতন ও স্থানীয় জাপা (এ) দলীয় এমপি সেলিম ওসমানের উপস্থিতিতে কান ধরে ওঠবস করানো হয়। এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেলে সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সরকারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল থেকে স্থানীয় সাংসদ সেলিম ওসমানকে ক্ষমা চাওয়ার দাবি করে। কিন্তু এমপি সংবাদ সম্মেলন করে সে দাবি নাকচ করেন। তিনি বলেন, শিক্ষককে নয়, নাস্তিককে শাস্তি দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে, এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা জানতে উচ্চ আদালত থেকে রুলও জারি করা হয়। ওই ঘটনার পরপরই প্রধান শিক্ষককে পুলিশ নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে ধরিয়ে দেয়া হয় চাকরিচ্যুতির নোটিশ।

সেখান থেকে ৭ দিন পর ২০ মে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। এ ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটি প্রাথমিক তদন্তে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্মকে অবমাননার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় না। ১৯ মে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ওই শিক্ষককে চাকরিতে পুনর্বহালের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, মাউশি’র প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই শিক্ষককে বরখাস্তের আদেশ অবৈধভাবে দেয়া হয়েছে। ওই আদেশ বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদ এজেন্ডাবহির্ভূতভাবে ওই শিক্ষককে বরখাস্ত করেছিল। স্কুল কমিটিও বাতিল করা হয়েছে। মন্ত্রী জানান, আপাতত নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে স্কুল পর্ষদ পরিচালনার জন্য একটি কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে।

উচ্চ আদালতের জারিকৃত রুলের জবাবে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করলে আদালত তা দায়সারা উল্লেখ করে পুনরায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। তার জন্য আদালত আগামী ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করেন। গত ৯ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে কড়া পুলিশ প্রহরায় শ্যামল কান্তি ভক্তকে নগরীর নগর খানপুর এলাকার ভাড়া বাড়িতে নিয়ে আসে।

২ মাস পর স্বপদে নিজ কর্মস্থলে যোগদান করেছেন শ্যামল কান্তি ভক্ত। গত ১০ জুলাই নগরীর খানপুর এলাকার ভাড়া বাড়ি থেকে পুলিশ প্রহরায় কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তিনি তার স্কুলে যোগদান করেন। দায়িত্ব বুঝে নেয়ার পর তিনি বিভিন্ন ক্লাশ রুম ঘুরে দেখেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা হাততালি দিয়ে প্রধান শিক্ষককে বরণ করে। শ্যামল কান্তি ভক্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্কুলে আবার যোগদান করায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

বিজ্ঞাপন

এমনিভাবে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন আন্দোলনকারীরা। যখন তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়, তখন আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছিলো। স্কুল-হাসপাতাল-বিশ্ববিদ্যালয়সহ সর্বত্র সবাই প্রতিবাদী। হাজার নয়, লাখ লাখ মানুষ কানে ধরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছে। প্রকাশ্যে নিজের দু’কান ধরে দাঁড়িয়ে থেকেছে। কেউ নিজের ইচ্ছায়, কেউ কেউ অন্যের প্ররোচনায় আবার কেউ বা ভাইরাসের ভাইরালে। নিজের কান ধরার মাহাত্ম্য আমরা অনেকেই বুঝতে সক্ষম হইনি। কিন্তু তাতে কী? অবস্থা এমন হয়েছিলো, যেন একটা কান ধরার প্রতিযোগিতা। কান ধরার ছবি ফেসবুকে আপ করার প্রতিযোগিতা। ঘটনা এতোটা-ই বিস্তার লাভ করে যে, ফেসবুকের গন্ডি পেরিয়ে, সেসব ছবি ঠাঁই পেয়েছে জাতীয় দৈনিকে। ঠাঁই পেয়েছে ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে। অনলাইন পত্রিকায়।

শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের লাঞ্ছনার প্রতিবাদে মানববন্ধন করে বিপাকে পড়েন রাজধানীর রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মো. জাহীদুর রহমান। ১৮ মে তিনি কলেজের সামনে অন্য সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিবাদে মানববন্ধনে অংশ নেন। এর পর কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে ৩০ মে’র মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। তাকেও চাকরিচ্যুতি করা হবে বলে গুজব উঠে। এমন আরও বেশ কিছু দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয় ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে। বহু সাংবাদিকও রোষানলে শিকার হয়েছেন। স্থানীয় সাংবাদিকদের অনেকের দিন কাটছে সেলিম ওসমানের দেয়া হুমকির আতংকে।

শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের লাঞ্ছনার প্রতিবাদের প্রধান দাবি ছিল, সাংসদ সেলিম ওসমানকে ক্ষমা চাইতে হবে। আরও দাবি ছিল, সাংসদ সেলিম ওসমানকে শাস্তি দিতে হবে। তার সংসদ সদস্য পদ বাতিলের দাবিও উঠে। তার শাস্তির মাধ্যমে এক দৃষ্টান্ত স্থাপনের দাবি ছিলো। যাতে, অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতে কেউ কোন শিক্ষককে অপমান করার ধৃষ্ঠতা দেখাতে না পারে। প্রতিটি শিক্ষকের মর্যাদা বা সম্মান অটুট রাখার দাবি। লাঞ্ছিত শিক্ষকের উন্নত চিকিৎসার দাবি। তার পরিবারের নিরাপত্তা দেয়ার দাবি। তাকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি। আর্থিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতার দাবি।

এসব দাবির একটিও পূরণ হয়নি। সাধারণ মানুষের দাবি পূরণে সরকার আগ্রহ দেখায়নি। সরকার হয়তো জানে, এসব ঝড় ক্ষণস্থায়ী। কয়েকদিন পর দাবি থাকবে না। কোন প্রকার ‘দাওয়া’ ছাড়াই এসব আন্দোলন ‘হাওয়া’ হয়ে যাবে। থেমে যাবে প্রতিবাদ। ভুলে যাবে প্রতিবাদের হেতু। এমন কি কার জন্যে এই প্রতিবাদ, সেই মানুষটিও দৃষ্টির অগোচরে চলে যাবে। স্মৃতি থাকবে। যেটি সহজে আর ‘ভাইরাল’ হবে না। সেই স্মৃতি মন্থরও করা হবে না।

ভাইরাস একটি ল্যাটিন শব্দ। যার অর্থ বিষ। একসময় রোগ সৃষ্টিকারী যে কোন বিষাক্ত পদার্থকে ভাইরাস বলা হতো। এখন ভাইরাস বলতে এক প্রকার অতি আণুবীক্ষণিক অকোষীয় রোগ সৃষ্টিকারী বস্তুকে বোঝায়। উদ্ভিদ ও প্রাণির বহু রোগ সৃষ্টির কারণ হচ্ছে ভাইরাস। ভাইরাস থেকে এসেছে ‘ভাইরাল’ শব্দটি।

তীব্র লাঞ্ছনার যন্ত্রণা সহ্য করে শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত এখন বেঁচে আছেন। সার্বক্ষণিক পুলিশ প্রহরায় রয়েছেন। তার মানসিক অবস্থা অনুমান করার ধৃষ্ঠতা আমাদের নেই। আমরা দেখলাম, একজন শিক্ষককে চুড়ান্ত পর্যায়ে লাঞ্ছনার পরও অপরাধীর কোন শাস্তি হলো না। বরং তাকে চাকরিচ্যুতি করা হয়। সেটা আবার ফিরিয়েও দেয়া হয়। এই মারপ্যাঁচের কোন ব্যাখ্যা আমাদের কাছে নেই। আমরা জানি না শিক্ষামন্ত্রী কিভাবে একটি বেসরকারি স্কুলের পরিচালনা কমিটি ভেঙ্গে দেন। ফিরিয়ে দেন চাকরিচ্যুত প্রধান শিক্ষকের চাকরি। এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেনি। বরং এই বিশেষ প্রকৃয়া সমাদৃত হয়েছে। যারা কান ধরে নানান ধরণের কাণ্ড-কীর্তি করছিলেন তারা খুশি হয়েছেন। নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করেছেন। তৃপ্তি পেয়েছেন। একেবারে শান্ত হয়ে গেছেন!

এটা কিসের শান্তনা? এটি কী প্রকৃত অর্থেই জয়? আন্দোলনের দাবিগুলো কি বাস্তবায়ন হয়েছে? কেউ কী একটিবার নিজের বিবেককে এই প্রশ্ন গুলো করেছেন? একেকটা ঘটনা এভাবেই ধামাচাপা পড়ে ফসিল হয়ে রয়েছে এদেশে। যেগুলো আর কোনদিন আলোর মুখ দেখবে না। আমরা দেখবো অপরাধীদের বুক ফোলানো গর্বের হাসি। বিদ্রুপের দৃষ্টি। বহাল তবিয়তে তারা ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। এটাই যেন রীতি।

নাম না জানা এক ভাইরাসে আক্রান্ত আমরা। এই ভাইরাস আমাদের বিবেক-বুদ্ধি, ধৈর্য্য-শক্তি, চিন্তা-চেতনাসহ আরও অনেক কিছু শেষ করে দিচ্ছে। আমরা ক্রমশ নিঃশব্দে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি। পরাজিত হচ্ছি। এই পরাজয় আমাদের মনস্তাত্ত্বিক। যেটা বারবার ‘ভাইরাল’ হয়ে ঘুরছে। ধীরে ধীরে আমাদের গ্রাস করে নিচ্ছে!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)