চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শাকিল: রাজনীতিতে পারিবারিক ঐতিহ্যের যে গৌরবের সংস্কৃতি

একটি উদারনৈতিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে অন্য দলের প্রতি শ্রদ্ধা এবং পরমতসহিষ্ণুতা যদি একজন রাজনীতিকের অন্যতম প্রধান যোগ্যতা হয় তাহলে মাহবুবুল হক শাকিলের মধ্যে শৈশবেই সেই বীজ রোপিত হয়েছিল। পরে নিজ যোগ্যতায় এগিয়ে গেলেও ছোটবেলায় তার বাবার রাজনৈতিক সহকর্মী কিংবা অন্য পক্ষের নেতাদেরকে ‘চাচা’ বা ‘কাকা’ ডেকে বড় হওয়া শাকিল তাই তার সংক্ষিপ্ত এক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছেও গ্রহণযোগ্য ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

সেই সংস্কৃতিটা তিনি কীভাবে নিজের মধ্যে লালন করে বড় হয়েছেন সেটা বুঝার আগে আমরা তার মৃত্যুর পর তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়াটা দেখতে পারি। শাকিলের মৃত্যুর অল্পক্ষণের মধ্যেই কানাডায় বসে এভাবে শোকলিপি লিখেছেন তার সময়ের আরেক ছাত্রনেতা এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সাহাবুদ্দিন লাল্টু: অবিশ্বাস্য রকমের একজন সদ্ভাবী মানুষ ছিলেন শাকিল। ছাত্ররাজনীতি কালীন সেইসব দিনে আমি, এ্যানি আর অসীম এই শাকিলের সাথে বছরের পর বছর ঢাবি ক্যাম্পাসে দল-মতের উর্ধ্বে গল্পগুজব করে কাটিয়েছি। শাকিল মনের দিক থেকে সত্যি একজন ভালো মানুষ ছিলেন। কখনই প্রতিপক্ষকে কষ্ট দেয় এমনভাবে কথা বলতেন না। তার জন্য মনটা আমার আজ শূন্যতায় খা-খা করছে! খুব কষ্ট অনুভব করছি। বিশ্বাস করতে পারছি না…!

৬ ডিসেম্বর শাকিলের মৃত্যুর দিনই ফেসবুকে আরেকটি পোস্টে সাহাবুদ্দিন লিখেছেন: এই সেদিনও কাকে যেন বলছিলাম, “রাজনীতি করছো ভালো কথা, কিন্তু প্রতিপক্ষকে এত মন্দভাবে আঘাত করে স্ট্যাটাস দিতে হবে কেনো? রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ থাকবেই। আর এটাই রাজনীতির সৌন্দর্য। রাজনীতি কি শুধু তুমিই করো? আর কি কেউ করে না? তুমি তো আর শাকিলের চেয়ে বেশিদিন আওয়ামী লীগ করে আসোনি। কই, তাকে তো কখনই রুচির বাহিরে একটি শব্দও ব্যবহার করতে দেখি না!” আজ সেই রুচির অহংকার শাকিল আমাদের মাঝে আর নেই! কষ্টটা যেন অনেক ভেতর থেকেই লাগছে।

মাহবুবুল হক শাকিলের মধ্যে এ রুচিবোধ গড়ে দিয়েছিল তার শৈশব। খোকা উকিল নামে পরিচিত তার বাবা অ্যাডভোকেট জহিরুল হক এখন ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক। আর টগর ম্যাডাম নামে পরিচিত শিক্ষক মা নুরুন্নাহার খানও শাকিলের বাবার সঙ্গে পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সে হিসেবে ময়মনসিংহে বসবাস করা আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা রফিকউদ্দিন ভূঁইয়া থেকে শুরু করে বিএনপি’র ফজলুল হককে চাচা ডেকে বড় হয়েছেন শাকিল।

শাকিলের বাঘমারার বাসা থেকে বের হয়ে ডানদিকে কয়েক কদম এগিয়ে গেলে ছিল জাতীয় পার্টির নেতা শামসুদ্দিন আহমেদ সুরুজ উকিলের বাসা। আরেকটু এগিয়ে গেলে আওয়ামী লীগের এমপি আবুল হোসেন আজাদীর বাড়ি। তার পাশে বিএনপি নেতা এবং জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের প্রধান সংগঠকের বসবাস। আর শাকিলের বাসা থেকে বেরিয়ে বামদিকে গেলে তখনকার ছাত্রলীগ নেতা এবং এখন জেলা পরিষদ প্রশাসক পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ইউসুফ খান পাঠানের বাড়ি। তারও কাছে তখনকার ওয়ার্ড কমিশনার আফাজউদ্দিনের। আরেকটু হাঁটলে আরেক ওয়ার্ড কমিশনার এবং শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি শাজাহান খানের বাসা। এদের কাউকে তিনি চাচা ডাকতেন, কাউকে কাকা। হাঁটার দূরত্বেই ময়মনসিংহ সিপিবি’র সভাপতি এমদাদুল হক মিল্লাতের বাড়ি। মিল্লাতের বয়স তখন কম ছিল বলে হয়তো তাকে ডাকতেন ভাই হিসেবে।

এরকমই তার আরেক চাচা তখনকার সচিব এবং এখন ময়মনসিংহ জেলা বিএনপির সভাপতি এ কে এম মোশাররফ হোসেন। শাকিলের জানাযায় তার অংশগ্রহণ শুধুই কোন ‘প্রটোকল পার্টিসিপেশন’ ছিল না, সেটা ছিল মাহবুবুল হক শাকিলকে বড় হতে দেখার সময় তার কাছ থেকে পাওয়া শ্রদ্ধার প্রতিদান। সেরকমই কৃতজ্ঞতা প্রকাশে সেখানে ছিলেন বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী যার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দাবি তুলে ধরতে ৮০’র দশকে গঠিত জাতীয় কমিটির যুগ্ম-আহ্বায়ক ছিলেন মাহবুবুল হক শাকিল। এজন্য পরে শাকিলকে নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ক্ষতির শিকার হতে হলেও কোন অনুশোচনা ছিল না তার। কাদের সিদ্দিকীর মত-পথ পরে বদলে গেলেও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিবাদকারী হিসেবে কাদের সিদ্দিকীর ভূমিকাকে তিনি সবসময়ই শ্রদ্ধার চোখে দেখেছেন কারণ তার রাজনীতির মূলটাই ছিল বঙ্গবন্ধু এবং সে পথ ধরে শেখ হাসিনা।

বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনার জন্য মেধাবী শাকিলের আনুগত্য ছিল নিঃশর্ত। সেজন্য প্রথমে নব্বই দশকে একবার এবং পরে কয়েক বছর আগে আরেকবার কিছুটা দূরে সরে গেলেও শেখ হাসিনা আবারো তাকে কাছে টেনে নিয়েছেন। কিন্তু, দলীয় প্রধানের জন্য নিঃশর্ত আনুগত্য থাকলেও রাজনৈতিক কারণে তিনি বক্তৃতায় বা লেখায় প্রতিপক্ষকে অশালীন ভাষায় আক্রমণ করেছেন তেমন কোন নজীর নেই যে কারণে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতিও বলছেন, অবিশ্বাস্য রকমের একজন সদ্ভাবী মানুষ ছিলেন শাকিল।

আর শাকিলকে সৃষ্টিশীল সংগঠক হিসেবে উল্রেখ করে সে সময়ের আরেক ছাত্রনেতা এবং ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি লতিফুল বারী হামিম লিখেছেন: মাহবুবুল হক শাকিল একই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালযে পড়া প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের নেতা ছিলেন। চিন্তা ও চেতনায় ছিলো অগ্রণী। একজন কর্মচঞ্চল ও সৃষ্টিশীল সংগঠক হিসেবে নজর কেড়েছে সরকার প্রধান থেকে সকলের। আমাদের প্রত্যাশা ছিল সে আরো বৃহৎ পরিসরে নেতৃত্ব দেবে। ময়মনসিংহবাসীসহ দেশবাসীর সকলের মুখ উজ্জ্বল করবে। সে তার রাজনৈতিক অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গেল। আমরা হারালাম এক বন্ধুকে।

শাকিল এভাবে সকলের বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। এমনকি ছাত্রজীবনে চরমভাবে আওয়ামী লীগ বিরোধী ছাত্রনেতাদের কাছেও। বিপ্লবী ছাত্র সংঘের সাবেক সভাপতি মুখলেছউদ্দিন শাহীন যেমন ফেসবুকে লিখেছেন: শাকিলের মৃত্যু সংবাদ এখনও অবিশ্বাস্য লাগছে। বছর তিনেক আগে সর্বশেষ দেখা হয়েছিল একটি রেঁস্তোরায়। দেখা হওয়া মাত্রই উঠে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডশেক করেছিল। একটা হাত পেছনে ছিল, বুঝতে পারছিলাম হাতে সিগারেট, আর বিব্রত না করে আমার কার্ডটি দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেছিলাম। ও সব সময় একটু বেশি বিনয়ী ছিল, সেই ছেলেবেলা থেকেই। স্কুলের চার বছরের ছোট-বড় এমন বেশি কিছু না। তবু সেটা না মানলে যেন সীমা লঙ্ঘন হয় এমনটাই আচরণ করতো। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মধুর ক্যান্টিনে একবার বলেছিলাম, একটি বিশেষ কথা আছে, তখন সে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। প্রতিদিনই বলতো, কই বললেন না তো! সব ব্যপারে প্রবল সিরিয়াস। পরবর্তী ক্ষমতাকেন্দ্রিক আচরণ ও স্বভাবের সাথে পরিচিতি হইনি। শুধু এই রেস্টুরেন্টের ক্ষণিক দেখা ও আচরণ থেকে বুঝেছিলাম, বেশি পরিবর্তন হয়নি।

স্বভাবজাত বিনয়টা শাকিল হয়তো তার পরিবারের কাছ থেকে পেয়েছেন। বিশেষ করে তার মায়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মায়ের যে গল্প শুনেছি তাতে মনে হয়, মা তাকে সেভাবে বড় করেছেন। তবে রাজনীতিতে এসে পরমতসহিষ্ণুতা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে না করার শিক্ষাটা পেয়েছেন তখনকার রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে, রাজনীতিকদের মধ্যে পরিবারে-পরিবারে সম্পর্কে– যেটা অনেকে হারিয়ে ফেললেও রাজনীতিক বাবার মতো শাকিল বহন করে চলেছিলেন আজীবন। তবু, শাকিলের বেড়ে উঠার শহর মফস্বল ময়মনসিংহের সংস্কৃতি বিবেচনা করলে শাকিলরা ছিলেন ‘এলিট’ পরিবারের। কিন্তু, রাজনীতি যেমন তার বাবার ‘এলিটিস্ট’ চরিত্র অনেকটা মুছে দিয়েছে তেমনি শাকিলের ক্ষেত্রে তা পুরোটাই।

তৃণমূল থেকে উঠে আসা ওয়ার্ড কমিশনার আফাজউদ্দিনের জন্য যেমন ছিল তার অগাধ শ্রদ্ধা তেমনি মোড়ের সিঙ্গারা-সমুচা-চপ-চা বিক্রির রেস্টুরেন্ট মালিক চান মিয়া যিনি আওয়ামী লীগের যেকোন মিছিলকে উৎসবের উপলক্ষ মনে করে ওইদিন গরদের পাঞ্জাবি পরতেন তার জন্যও ছিল তার অসীম ভালবাসা ও শ্রদ্ধা। মুখলেছউদ্দিন শাহীন ঢাকার রেস্টুরেন্টে যে বিনয়ের উদাহরণ দিয়েছেন বাঘমারার চানমিয়ার রেস্টুরেন্টেও সেই বিনয়ের কোনো কমতি ছিল না। ওই চানমিয়ার সামনেও তিনি হাত পেছনে রেখেই কথা বলতেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, এরাই হচ্ছে আসল আওয়ামী লীগ যাদের একমাত্র নেতা শেখ হাসিনা এবং শেখ হাসিনার জন্য তাদের আনুগত্য তার মতোই নিঃশর্ত।

মহল্লার রেস্টুরেন্ট মালিক চানমিয়া কিংবা টিএসসি’র আবুল মামুদের সঙ্গে তার যেমন সহজ-স্বাভাবিক-বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল, তরুণ বয়স থেকেই তেমনি ছিল দেশের শীর্ষ পুঁজিপতিদের সঙ্গেও। ঘটনাচক্রে তারা উদ্যোক্তা শ্রেণীর, মধ্যস্বত্ত্বভোগী ব্যবসায়ী নন। এরকম না যে তিনি প্রধানমন্ত্রীর ডিপিএস কিংবা বিশেষ সহকারি হওয়ার পর তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক অনেক পুরনো, যখন তিনি মাঠের কর্মী, যখন পুলিশের ভয়ে তিনি নিজের বাসায় ঘুমাতে পারতেন না তখনও। সেই যোগ্যতা তিনি অর্জন করেছিলেন তার ব্যক্তিত্ব, সম্পর্ক গড়ে তোলার অভ্যাস ও চর্চা, পাঠাভ্যাস এবং তার মধ্য দিয়ে অর্জিত জ্ঞান-গরিমা দিয়ে। অন্য ছাত্রনেতারা যখন বড় বড় নেতার শুধু তল্পিবাহক, পদ-পদবীর জন্য তাদের মোসাহেবী, মাহবুবুল হক শাকিল তখন রীতিমতো তাদের সঙ্গে ‘রাজনৈতিক আড্ডা’য় যোগ দিতেন।

সেই আড্ডা তিনি যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া নবীন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দিতে পেরেছেন, তাদের হৃদয় জয় করতে পেরেছেন; তেমনি নিজের সৃষ্টিশীলতা দিয়ে হৃদয়-মন জয় করে নিয়েছেন সৃষ্টিশীল মানুষদেরও। আনিসুল হক থেকে শুরু করে সৈয়দ শামসুল হক পর্যন্ত তার বন্ধু ছিলেন। তিনি নিত্যদিন যোগ দিয়েছেন কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী, প্রয়াত চলচ্চিত্রকার বাদল রহমান, সাবেক মন্ত্রী জাকারিয়া চৌধুরীদের আড্ডায়। তার প্রাণের মানুষ রফিক আজাদের মৃত্যুতে তিনি ভেঙ্গে পড়েছিলেন, যে রফিক আজাদ তাকে ডাকতেন ‘বাপ’।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)