চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শুভ জন্মদিন, শাইখ সিরাজ

সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে নগর সভ্যতার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে। বনায়ন ধ্বংস করে ভূমিদস্যুরা মেতে উঠছে আবাসন প্রকল্পে। প্রকৃতির বিরূপ প্রভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। উর্বরা শক্তি হ্রাস পাচ্ছে কৃষি জমির। মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এমনই এক দাহকালে সমৃদ্ধ সবুজ রচনায়, বিশুদ্ধ অক্সিজেনের প্রত্যাশায় মানুষকে কৃষিতে অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছেন যে মানুষটি, আজ ৭ সেপ্টেম্বর, তাঁর জন্মদিন। শুভ জন্মদিন শাইখ সিরাজ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভুগোলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে ভৌগলিক গবেষণায় না গিয়ে নেমে পড়েছেন ফসলের মাঠে তাদের সঙ্গে, যাদের কথা বলা হয় বিভিন্ন সভা সেমিনারে, বছরের বিশেষ বিশেষ কয়েকটি দিনে। দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তিসহ নানা উপাধীতে ভূষিত করা হয় তাদের, বলা হয় কৃষকই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন। কিন্তু ওই বলা পর্যন্তই। বছরের বাকি সময়টায় আর তাদের কথা মনে রাখার প্রয়োজন পড়ে না। সেই কৃষকদের সুখ-দুঃখের কথা চার দশক ধরে তুলে ধরছেন শাইখ সিরাজ।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের সেই সাদা কালো যুগ থেকে ‘মাটি ও মানুষ’ নামের অনুষ্ঠান চালিয়ে গেছেন বছরের পর বছর। কীভাবে কৃষকের কষ্টের কথা একটু সরকারের নজরে আনা যায়, কীভাবে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্তা ব্যক্তিদেরকে চেয়ার ছেড়ে উঠিয়ে মাঠের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দায়িত্ববোধ পালনে সচেষ্ট করা যায়, সেই কাজটি করে গেছেন। কোন মৌসুমে কোন ফসলটি ফলানো দরকার, মাটির যত্ন নিতে কী ওষুধ ছিটানো দরকার তা কৃষি বিভাগ থেকে জেনে তবেই চাষাবাদ করলে ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে এসব বিষয়ে কৃষকের কাঁধে হাত রেখে পরম মমতার সঙ্গে পরামর্শ দিয়ে গেছেন তিনি।

শুধু খেতের ফসলাদি নিয়েই নয়, পুকুরে বা দীঘিতে কিংবা বিলে মাছ চাষের ব্যাপারেও উৎসাহ দিয়ে গেছেন, এখনো দিয়ে যাচ্ছেন। ‘জলপাই রঙের ফুল হাতা শার্টের কনুই পর্যন্ত গোটানো, খাকি রঙের ফুলপ্যান্ট, প্রখর রৌদ্রের ভেতর কৃষি জমির ঢেলামাটির ওপর দাড়িয়ে অনর্গল দিয়ে চলেছেন কৃষি বিষয়ে নানা পরামর্শ।’ এই মানুষটি গ্রাম বাংলার কৃষকের কাছে অতি পরিচিত আর আপন। নিজেদের মানুষ হিসেবে কৃষক বরণ করে নিয়েছেন তাকে। কারণ, শুধু ফসলের কথা বলে ক্ষান্ত হননি শাইখ সিরাজ। তাদেরও যে সুখ-দুঃখ আছে, উৎসব-পার্বণ আছে ভুলে যাননি তিনি। কৃষকের ঈদ কেমন করে কাটে? তাদেরও বিনোদনের প্রয়োজন, এই উপলব্ধি থেকে সরে যাননি শাইখ সিরাজ। আর তাইতো চ্যানেল আইতে প্রতি ঈদে আয়োজন করেন-কৃষকের ঈদ আনন্দ।

বিজ্ঞাপন

কলাগাছ বেয়ে উপরে ওঠার প্রতিযোগিতার আয়োজন করে পুরস্কার হিসেবে যখন মূকপ্রতিবন্ধি কোনো তরুণের হাতে তুলে দেন ব্রান্ড নিউ মোটরসাইকেলের চাবি তখন সেই তরুণের আনন্দ আর হাসিটাই যেন শাইখ সিরাজের কাছে বিশ্বের সেরা পুরস্কারের চেয়েও বড় মনে হয়। পাড়াগাঁয়ের সেই তরুণের হাসির কাছে নোবেল প্রাপ্তিও যেন তুচ্ছ হয়ে যায়।

শুধু গ্রামের কৃষক নয়, শহুরে তরুণ-তরুণীদের মনে কৃষকের প্রতি মমত্ব গড়ে তুলতেই যেন আয়োজন করেন ‘ফিরে চল মাটির টানে’র অনুষ্ঠান। শিকড়ের প্রতি সম্মানবোধ শেখায় তরুণদের এই আয়োজন। যে তরুণ তার শিকড় আর ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করতে পারে সে ততটাই আধুনিক। এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তরুণেরা তাই ছুটে আসে শাইখ সিরাজের ডাকে।
কৃষি নিয়ে অনুষ্ঠানকেও জনপ্রিয় করা যায়, এটা শাইখ সিরাজ-ই বুঝিয়েছেন, মিডিয়ার কর্তাব্যক্তিদের উপলব্ধি করাতে সক্ষম হয়েছেন যে, প্রতিদিনের বুলেটিনে কৃষি খবর অপরিহার্য। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে অনেক মিডিয়ায় কৃষক ও কৃষি ভিত্তিক সংবাদ প্রচার করার প্রবণতা দেখা যায়। এটা যেন শাইখ সিরাজ-এরই অনুপ্রেরণার ফসল।

বৈরী জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলা করে এই নগরকে বাসযোগ্য রাখতে কঠিন এক অভিযানে নেমেছেন শাইখ সিরাজ। তিনি চষে বেড়াচ্ছেন রাজধানী ঢাকাসহ সকল শহরের ছাদ থেকে ছাদে। দেশের যে প্রান্তেই শোনেন কোনো গৃহিনী বা গৃহকর্তা মিলে বাড়ির ছাদে সবজি বাগান করছেন, ছুটে যান দলবল নিয়ে। কোনো প্রাপ্তির প্রত্যাশায় নয়, ‘সবুজের মাধ্যমে প্রাণরক্ষা’র ব্রত নিয়েই তার এই ছুটে চলা। যদি এই ক্ষুদ্র অনুষ্ঠানের মাধ্যমেও আরেকজন মানুষকে অনুপ্রাণিত করা যায় গাছ লাগাতে- সেটাই যেন তার পরম প্রাপ্তি।

শুধু দেশেই নয়, তিনি ছুটে যান বিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই কোনো বাঙালি বিদেশের মাটিতে স্বল্প পরিসরে ফলদ-বনজ বা সবজি বাগান করে থাকেন, তাদের নিয়েও তিনি অনুষ্ঠান করেন ‘প্রবাসে বাঙালির আঙিনা কৃষি’ নামে।

প্রাপ্তিও কম নেই তার ঝুলিতে, ১৯৯৫ সালে উন্নয়ন সাংবাদিকতায় পেয়েছেন একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন ২০১৮ সালে, ফিলিপাইনের গুসি শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন ২০১৫ সালে, জতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এ এইচ বুর্মা অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন ২০০৯ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের অশোকা ফেলো শাইখ সিরাজ এর বাইরেও পেয়েছেন অর্ধশত পুরস্কার। এছাড়া তার জীবন ও কর্মকাণ্ডের ওপর প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছে শ্রীলঙ্কার ইয়াং এশিয়া টেলিভিশন, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে।

না, এসব অর্জনে মুগ্ধতায় পেয়ে বসেনি দেশের উন্নয়ন সাংবাদিকতার পথিকৃত শাইখ সিরাজকে। প্রতিনিয়ত ছুটছেন কৃষকের খবর জানতে, জানাতে। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেডের চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি যেখানে কৃষির খবর, কৃষকের খবর পান, ছুটে যান ৬৪ বছরের এই মানুষটি, একজন তরুণ রিপোর্টারের মতই ব্যাপক কৌতুহল নিয়ে।

শাইখ সিরাজের কৃষি বিষয়ক বহুমুখি তৎপরতার মাধ্যমে ফিরে আসুক সবুজ মায়াময় পৃথিবী। আর তিনি হৃদয়ে মাটি ও মানুষকে নিয়ে সুস্থ ও সুন্দর থাকুন, জন্মদিনে এমনটাই প্রত্যাশা।