চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শহীদ নাহিদ: কিছু স্মৃতি, কিছু আক্ষেপ

১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬। টালমাটাল দেশ। একদিকে বিএনপি সরকারের অধীনে একদলীয় নির্বাচন আর অন্যদিকে আওয়ামী লীগসহ সকল দলের সেই নির্বাচন বর্জন ও প্রতিরোধের ঘোষণা। রাজনৈতিক ভাবে মুখোমুখি থাকা দেশে প্রশাসনের সহযোগিতায় নির্বাচন করে ফেলে বিএনপি। সারাদেশে ব্যাপক সংঘাত-সংঘর্ষ ও হত্যার ঘটনা ঘটে।

বিজ্ঞাপন

সকল রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের এক দাবি ছিল নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। বিএনপি ওই দাবি মেনে নেয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অসারতা প্রমাণ করতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উক্তি ‘পাগল আর শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়’ সেসময় ব্যাপক আলোচনায়ও আসে। প্রশাসন ও দলীয় ক্যাডারদের সহযোগিতায় ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের সে নির্বাচনকে ঘিরে হতাহতের শঙ্কা থাকায় ভোটকেন্দ্রে মানুষের উপস্থিতিও ছিল কম। মাত্র ২১ ভাগ ভোট পড়ে সেই নির্বাচনে।

৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ওই সময় পর্যন্ত সর্বাধিক সংখ্যক (৪৯ জন) প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে অবশ্য ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের অধীনে আরেক নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক ১৫৩ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ওই নির্বাচনে বিএনপি ২৭৮ আসনে জেতে। বঙ্গবন্ধুর খুনির দল ফ্রিডম পার্টি ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১০টি আসনে জেতে। গোলযোগের কারণে বাকি আসনে ভোট স্থগিত হয়ে যায়।

ওই নির্বাচন এতখানি সংঘাতময় ছিল যে সারাদেশের দেড়শ’র বেশি ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিকূল অবস্থার কারণে দুই হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করতে হয় নির্বাচন কমিশনকে। প্রাণহানির সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ২৩, আহতের সংখ্যা ছিল সহস্রাধিক।

একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনের সংসদ বেশিদিন টেকেনি। সংসদের স্থায়িত্ব ছিল ১২ দিনের। অধিবেশনের কার্যদিবস ছিল মাত্র ৪। বিএনপি সরকারের প্রথম সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছিল ১৯ মার্চ ১৯৯৬ সালে এবং অধিবেশন স্থায়ী ছিল চার কার্যদিবস ২৫ মার্চ পর্যন্ত। ৩০ মার্চ সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। ওই দিন রাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেন খালেদা জিয়া। এর আগে ৩ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে খালেদা জিয়া ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল আনার ঘোষণা দেন৷ খালেদা জিয়ার পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ দেন। এরপর একই বছরের জুনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। এটা ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রথমবারের মত আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়া, একই সঙ্গে এটা ছিল বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর আওয়ামী লীগের ক্ষমতা গ্রহণ।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একদলীয় নির্বাচন প্রতিহত করতে গিয়ে সারাদেশে যত লোক প্রাণ হারিয়েছেন তাদের মধ্যে ছিলেন সিলেটের বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতা হুমায়ুন কবীর চৌধুরী নাহিদ। ওইদিন চারখাইয়ে পল্লিশাসন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের বুলেটের আঘাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান এই তরুণ।

শহীদ নাহিদের সঙ্গে আমার কিছু স্মৃতি ছিল, ছিল সখ্যও। আমার সিনিয়র ছিলেন তিনি বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজে। ভর্তির জন্যে বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজে প্রথম যেদিন যাই সেদিন কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকেই পড়েছিলাম জামায়াত-শিবিরের হাতে। ক্যাম্পাসের ফটকেই তারা আমাকে প্রথমে আটকায়, এরপর প্রায় জোর করেই পাশের একটা বারান্দায় নিয়ে গিয়ে তারা ভর্তি প্রক্রিয়ায় সার্বিক সহযোগিতার কথা বলে। তাদের সাহায্য ছাড়া ভর্তি এখানে সহজ হবে না বলে জানায়। আমি আমার রেজাল্টের কথা বলি; রেজাল্ট দিয়ে যেকোনো জায়গায় ভর্তি হতে পারব এমন বলেও তাদের সন্তুষ্ট করতে পারিনি। এমন সময় অন্য এক বারান্দায় ছাত্রলীগ নেতা হুমায়ুন কবীর নাহিদকে দেখে যেন প্রাণ ফিরে পাই, অনেকটা সাহস বুকে নিয়ে বলি- ‘ওই যে নাহিদ তিনি আমার পরিচিত, তিনি আমার ভাই হয়’! নাহিদের কথা শুনে শিবিরের ছেলেগুলো ছেড়ে দেয় আমাকে। যাওয়ার সময়ে বলে, প্রয়োজন হলে যেন দেখা করি। এর আগে ওরা আমাকে তাদের সহযোগিতা নিতে নানা কথা বলে। চার-পাঁচজনের ঘিরে থাকা দলের কেউ কেউ ওই সময় কথা বলছিল, কেউ বা তখন আমার সার্টের উপরের দিকের বোতাম খুলছিল-লাগাচ্ছিল। এটা হয়ত তাদের স্টাইলই ছিল। ভর্তি প্রক্রিয়ার সময় থেকে শুরু করে নানা সময়ে অন্য অনেকের সঙ্গে তাদেরকে এমন করতে দেখেছি।

কলেজের প্রথম দিন থেকে বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজে থাকা আমার দুই বছরের সময়ে আমি নাহিদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা ও ভালোবাসা পেয়েছি। একজন অগ্রজ হিসেবে কেবল আমিই নই আমাদের অনেককে বিবিধ সহযোগিতা দিয়ে গেছেন নাহিদ।

বিজ্ঞাপন

১৯৯৬ সালের নির্বাচনের সময়ে গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। আমাদের বাড়ি থেকে বেশিদূরের পথ নয় নাহিদদের বাড়ি। নির্বাচনের দিন যখনই শুনলাম চারখাইয়ে পুলিশের গুলিতে একজন নিহত হয়েছেন। সংবাদপ্রাপ্তির শুরুর মুহূর্তে আশঙ্কা জেগেছিল- ‘নাহিদ নয় তো’! পরে যখন নিহতের পরিচয় পেলাম তখনই নিশ্চিত হলাম এই নাহিদ সেই নাহিদ; আমাদের প্রিয় হুমায়ুন কবীর চৌধুরী নাহিদ।

নাহিদের সঙ্গে আমার এই পরিচিতি কেবল কলেজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আমাদের স্কুলবন্ধু রেকনের কাজিন হওয়ার সুবাদে কলেজের পরিচিতির বাইরে আমাদের সখ্য ছিল। তার মৃত্যু যেমন ওই সময়ে মন খারাপের উপলক্ষ ছিল, এখনও একই।

প্রতিবছর নাহিদের মৃত্যুদিনে তাকে একাকি স্মরণ করি। তার এলাকাবাসীও তাকে স্মরণ করে নিজেদের মত করে। তার স্মৃতিরক্ষার্থে স্থানীয়ভাবে সংগঠনও আছে। ওগুলো হয়ত বাৎসরিক স্মরণে তাকে সীমাবদ্ধ রেখেছে। তবে সম্প্রতি চারখাই বাজার সংলগ্ন চৌমোহনাতে ‘শহীদ নাহিদ চত্বর’ স্থাপিত হয়েছে। প্রতিদিন লক্ষ লোক অতিক্রম করে তার নামে স্থাপিত হওয়া এই চত্বর।

নাহিদের মৃত্যুর ২২ বছর পর স্থাপিত এই ‘শহীদ নাহিদ চত্বর’ বলছে সুরমা বুক দিয়ে অনেক জল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষজন অনেক কিছু ভুলে গেলেও অন্তত নাহিদকে সেভাবে ভুলে যায়নি। ২০১২ সালের এপ্রিলে বিয়ানীবাজারের চারখাইয়ের একটি অনুষ্ঠানে ইউনিয়নবাসীর দাবির মুখে স্থানীয় সাংসদ ও তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সিলেট-বিয়ানীবাজার সড়কের চারখাইয়ের চৌমোহনার গোলচত্বরটির নাম ‘শহীদ নাহিদ চত্বর’ হিসেবে নামকরণের ঘোষণা দেন। মন্ত্রীর এই ঘোষণার ছয় বছর পর গোল চত্বরে নামকরণ হয় শহীদ নাহিদের নামে।

বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতা হুমায়ুন কবীর চৌধুরী নাহিদ নেই আজ ২৩ বছর। কিন্তু তার স্মৃতি আছে। দুই যুগের কাছাকাছি এসে এই আমিও তার স্মৃতি রোমন্থনে বসেছি। চারখাই পাড়ি দেওয়া লক্ষ লোক প্রতিদিন দেখছে শহীদ নাহিদের নাম। এই নাহিদের রক্তের ওপর ভর করে দেশে বর্তমানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন। এই নাহিদের রক্তের কারণে পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসে দীর্ঘ ২১ বছর পর। নাহিদ না থাকলেও নাহিদের সেই আত্মদান বৃথা যায়নি, এর ফল ভোগ করছে তারই প্রিয় আওয়ামী লীগ।

নাহিদের আত্মদান আওয়ামী লীগ ভোগ করলেও তার পরিবারের জন্যে নাহিদ এখনও দীর্ঘশ্বাসের নাম। নাহিদের ভাই লিমন কিংবা পরিবারের সদস্যরা তার খুনের বিচার পায়নি। এ ধরনের খুনগুলোর বিচার হয় না বাংলাদেশে। সেই নির্বাচনের দিনের ২৩ খুনসহ বিভিন্ন নির্বাচনের সময়ে মারা যাওয়া মানুষদের পরিবার কখনও বিচার পায় না, এই বিচার কখনও পাবেও না। এটা আমাদের আইন ও বিচারিক ব্যবস্থার দুর্বল ও পাশবিক এক দিক বলেই মনে হয়।

দেশে একে একে এগারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অনেকগুলো নির্বাচন হয়েছে। এই নির্বাচনগুলোতে এ পর্যন্ত যত লোক মারা গেছেন তাদের কারও পরিবার বিচার পায়নি। আগামিতে দেশে আরও নির্বাচন হবে, সেগুলোতেও যদি কোন লোক মারা যায় তবে সেখানেও বিচার হবে বলে মনে হয় না। এই অমানবিক দিক নিয়ে আমাদের কোনো পর্যায়েই কোনো আলোচনা নাই।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে খুনের মহোৎসবের রাশ টানা উচিত। এসব নিয়ে সরকারের ভাবা উচিত, সকল পর্যায়ে আলোচনা শুরু করা উচিত। তা না হলে নাহিদের মত প্রাণ হারানো এমন হাজার-হাজার প্রাণগুলো শেষ পর্যন্ত তাদের পরিবার-স্বজন আর পরিচিতজনের আক্ষেপের প্রতিশব্দ হিসেবেই বিবেচিত হতে থাকবেন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)