চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শত বাধা পেরিয়ে লন্ডনে

বিশ্বকাপ দিনলিপি-১

লন্ডন থেকে: ‘মনছবি মিসাইলের মতো লক্ষ্যভেদ করে’ কথাটি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি খুব বেশিদিন হয়নি। স্বপ্ন দেখলে, পেছনে ছুটলে, তা যত বড়ই হোক না কেনো বাস্তব হবে। এই আপ্তবাক্যটি পুরোপুরিই মিলে গেল আমার বেলায়। স্বপ্নপূরণের পথে শত বাধা পেরিয়ে আমি এখন ক্রিকেটের আঁতুড়ঘর লন্ডনে। পাঁচ বছর ক্রিকেট রিপোর্টিং করে প্রথম বিদেশ সফর, সেটিও আবার আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপের মতো মেগাইভেন্ট কাভার করতে!

বিজ্ঞাপন

যাত্রী পরিবহনে পৃথিবীর চতুর্থ ব্যস্ততম বিমানবন্দর হিথ্রো থেকে লন্ডন টিউবে (পাতাল ট্রেন) চড়ে হোয়াইট চ্যাপেলে পা রাখতেই দেখা গেল একদমই চেনাদৃশ্য। যেটি দেখে অভ্যস্ত বাংলাদেশে তা দেখলাম লন্ডনের সড়কেও। বাংলাদেশের জার্সি গায়ে শতশত মানুষ ফুটপাত দিয়ে হৈচৈ করতে করতে ঘরে ফিরে যাচ্ছেন। বাঙালি খাবার দোকান যেখানেই চোখে পড়ছে, ক্ষণিকের জন্য ঠায় দাঁড়াচ্ছেন। চিৎকার চেঁচামেচি করে ভাগাভাগি করছেন দ্য ওভালে বাংলাদেশের জয়ের রোমাঞ্চ, মাঠ থেকে ফেরার পথ ধরে। অন্যদের মাঝেও ছড়িয়ে দিচ্ছেন সেই উৎফুল্লের অনুরণন। অদ্ভুত এক ভালো লাগার অনুভূতি। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের স্বপ্নিল শুরু ঈদের আগেই ঈদ নিয়ে এসেছে লন্ডনে। বিশেষ করে বাঙালিদের মধ্যে।

পাতাল ট্রেনে এক স্কটিশ ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা হল। সাউথ আফ্রিকাকে সমর্থন জানাতে গিয়েছিলেন মাঠে। প্রিয় দল হারলেও বাংলাদেশ দলের খেলার খুব প্রশংসা ঝরল তার কণ্ঠে। ঝড়ের গতিতে ট্রেনে চড়ার আনন্দ কয়েকগুণ বেড়ে গেল তাতে। বিদেশবিভুঁইয়ে এসে যেচে বাংলাদেশের প্রশংসা শোনার মতো আনন্দ আর কী হতে পারে।

ট্রেনে ওঠার খানিক আগেই জানতে পারি বাংলাদেশ সাউথ আফ্রিকাকে হারিয়ে দিয়েছে। সিম কিনে মোবাইল ইন্টারনেট সচল করতেই জাহিদ নেওয়াজ খান (সম্পাদক-চ্যানেল আই অনলাইন) এর ইনবক্স- জানত, বাংলাদেশ জিতেছে। জবাবে বললাম জানতাম না। এখনই জানলাম! বিমানবন্দরে লাগেজ বুঝে পাওয়ার সময় জেনেছিলাম শুধু বাংলাদেশ ৩৩০ করেছে। জেতার আশাটা প্রত্যাশিত ছিল। তারপরও বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই সাউথ আফ্রিকা-বধ। একসঙ্গে বিমান জার্নি করা যমুনা টিভির রিপোর্টার সালাউদ্দিন সুমন, ক্যামেরা পার্সন জ্যাকি ভাইয়ের সঙ্গে হাইফাইভ সেরে নিলাম আমরা। বুকের পাটা কেমন যেন বড় হয়ে গেল ওই মুহূর্তে! বিশ্বকাপে যে বাংলাদেশ এবার বড় কিছু করতে এসেছে এখানে, সে বিশ্বাস বেড়েই চলেছে। বিশেষ এক অনুভূতি সেটি।

বিজ্ঞাপন

হোয়াইট চ্যাপেলে আনন্দের রেণু এতটা ছড়িয়ে পড়ার কারণ এটি বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা। এখানকার পার্লামেন্ট মেম্বার রুশনারা আলী যিনি প্রথম ব্রিটিশ বাংলাদেশি এমপি। তার চেয়েও বড় যে ব্যাপার, মোট জনসংখ্যার ৪০ ভাগই বাঙালি। ৬ জুন পর্যন্ত আমার নিবাস তার পাশের এলাকা শ্যাডওয়েল। এখানকার একটি বাসায় অতিথি হয়ে উঠেছি। এক রাতের মধ্যেই তাদের সঙ্গে গড়ে উঠেছে সখ্যতা। এসব কথা যখন লিখতে বসেছি, লন্ডন সময় তখন সোমবার রাত ২টা আর বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টা। বাংলাদেশের সঙ্গে সময়ের ব্যবধান ৫ ঘণ্টা।

সেহরির জন্য রান্না করছেন সুমন নামের এক মিষ্টভাষী যুবক। সমবয়সী আরও তিনজনকে নিয়ে থাকেন একই ফ্ল্যাটে। ৬ বছর ধরে আছেন লন্ডনে। পেয়েছেন ইংল্যান্ডের নাগরিকত্ব। হোয়াইট চ্যাপেল ও আশেপাশের এলাকার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জনগণের বীরত্বগাথার অনেক গল্পও জানতে পারছি। ঢাকা ও লন্ডনে একটি করে রাত নির্ঘুম কাটানোর মাঝে টানা সাড়ে ১২ ঘণ্টার বিমান ভ্রমণ করেও সচল আছি এখানকার হিমেল হাওয়ার কারণে। তাপমাত্রা ১৪ ডিগ্রি। শীতকালে বাংলাদেশে যেমন থাকে ঠিক তেমন। হঠাৎ বাতাসের বেগ বেড়ে শীত জেঁকে ধরে খুব।

এখন আসা যাক শত বাধা পেরিয়ে যুদ্ধ জয়ের গল্পে। যেটি শুরু হয়েছিল গত মার্চ মাসে। বিশ্বকাপ কাভার করতে হলে প্রথম শর্ত আইসিসির অনুমতি বা অ্যাক্রিডিটেশন লেটার প্রাপ্তি। যেটির পেছনে আশা-নিরাশার দোলাচলে কেটেছে এক মাস। প্রথা অনুযায়ী অনলাইনে আবেদন করলাম। বেশ কয়েকদিন পর তারা জানিয়ে দিল দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। দেশের বাইরে কোথাও যাইনি আগে, সেটি হয়ত দুর্বলতা হিসেবেই ধরেছিলেন তারা। বারবার মেইল করলাম। বোঝালাম বেশ কয়েকটি হোম সিরিজ কাভার করে এখন আমি প্রস্তুত আরও বড় মঞ্চে কাজ করার জন্য। আমাদের এডিটর তাদের মেইল করার পর কাজ হয়ে গেলে মুহূর্তেই। তিনি ঠিক কী লিখেছিলেন মেইল বার্তায় তা আজও কৌতূহলই থেকে গেছে।

পরের ধাপটা আরও কঠিন। ভিসার জন্য আবেদন। এপ্রিল মাসের শুরুতে আবেদন করলাম। ১৫দিন পর রেজাল্ট আসল রিফিউজড। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল! তৌফিক আহমেদ ভাইকে নিয়ে (মাল্টিমিডিয়া এডিটর, চ্যানেল আই অনলাইন) পরদিন এডিটর বসলেন আলোচনায়, কী করা যায় এখন। ভিসার জন্য আবার আবেদন করার সিদ্ধান্ত হল। আবেদন করলামও আরেকটু গুছিয়ে। ২ সপ্তাহ, ৩ সপ্তাহ, ৪ সপ্তাহ পার হল খবর নেই। ওদিকে বিশ্বকাপ শুরু হয়ে যাচ্ছে। আমার কাজের পরিসর চ্যানেল আই অনলাইনের নিউজরুমে হবে নাকি ইংল্যান্ডে, সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না। বিশ্বকাপ পরিকল্পনাই থমকে আছে। অফিস কর্তৃপক্ষের কথা ভেবে খারাপ লাগার প্রখরতা বাড়তে লাগল। হাল ছেড়ে না দেয়ার ইচ্ছা উল্টো অপরাধ বোধ জাগিয়ে তুলল।

তিতার পর মিঠা। আদতে এমনটাই হল। এক মাসের মাথায় গত ২৮মে সোনার হরিণ হাতে পেলাম! পাসপোর্টে ৬ মাস মেয়াদের ইউকে ভিসা। হাঁটু থরথর করে কাঁপছিল টের পেয়েছি সঙ্গে সঙ্গে! গুলশানে ২ নম্বরের ভিএফএস গ্লোবাল (বাংলাদেশে ইউকে ভিসার জন্য আবেদনের অফিস) থেকে বের হতে হতেই অফিসের সবাইকে জানালাম। ভিসা আবেদন ও প্রাপ্তির ব্যাপারে অগণিত মানুষ সাহায্য করেছেন, সমর্থন যুগিয়েছেন, তাদের মুখগুলো ভেসে উঠতে লাগল। সংখ্যাটা এত বড় যে এখানে আর প্রকাশ করলাম না।

আনন্দের রেশ থামার আগেই আরেক দুশ্চিন্তা। স্পন্সর পাবো তো, বিশ্বকাপে যাওয়া হবে তো! এডিটর চেষ্টা শুরু করলেন। ঘুম হারাম অবস্থার মতো আমার কাটল আরও কটা দিন। অবশেষ সাড়া দিল এ সি আই পিওর সল্ট। এবার উড়াল দেয়ার পালা। দ্রুত আমাকে পাঠিয়ে দেয়া হল ইউরোপের দেশটিতে। কাজের দায়িত্ব, রোমাঞ্চ, সর্বোপরি বিশেষ এক অনুভূতি নিয়ে এখানে আসা। সেটি থাকবে হয়ত বিশ্বকাপের ফাইনাল পর্যন্ত।