চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

লেখকের স্বার্থ দেখবে কে?

বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশের বইমেলা এখন বাঙালির জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। এত দীর্ঘ সময়ব্যাপী বইমেলা পৃথিবীর আর কোথাও হয় বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের এ মেলা এখন সকলের কাছেই এক ঈর্ষণীয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

একজন ক্ষুদ্র লেখক হিসেবে দেশের বইমেলা সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা খুব একটা ইতিবাচক নয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, বইমেলার মূল প্রাণ হচ্ছে বই। বইয়ের লিখন, প্রকাশনা, বিপণন ও বিক্রয় নিয়ে এ মেলা জমে ওঠে। আর বইয়ের রচয়িতা হচ্ছেন লেখক। তারাই প্রকাশকদের মাধ্যমে বইমেলায় বই জোগান। তাদের লেখা বই প্রকাশকরা প্রকাশ করে স্টল সাজান। সেদিক দিয়ে বিচার করে বলা যায়, লেখকরাই হলো বইমেলার মূল কারিগর। তারাই বইমেলার মূল প্রাণভোমরা। অথচ বাণিজ্যিক দিক থেকে দেখলে বইমেলায় সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হন লেখকরা। মুখে স্বীকার না করলেও প্রকাশকরা কিন্তু আর্থিক দিক থেকে ঠিকই লাভবান হন।

একজন লেখককে একটি বই লেখার জন্য প্রচুর শ্রম দিতে হয়। হাজার হাজার ঘণ্টা শ্রম দিয়ে একটি বই লেখার পর তিনি যখন প্রকাশকের দ্বারস্থ হন, তখন তিনি প্রাপ্য সম্মানটুকুও পান না। রাজধানীর বাইরের লেখকরা যত মেধাবীই হোন না কেন এবং তারা যত ভালো ও মৌলিক গ্রন্থই রচনা করুন না কেন, প্রকাশকদের কাছে তাদের ভাত নেই।লেখকের সঙ্গে যেভাবে চুক্তিপত্র করা দরকার, অনেক প্রকাশকই তা করেন না। যেভাবে তাদের বিক্রয়লব্ধ অর্থ থেকে মুনাফা প্রদান করার কথা, তা দেন না। পরিবর্তে এমন একটা ভাব দেখান যে তার বই বাজারে খুব একটা চলবে না। প্রকাশক যেন অনুগ্রহ করে তার বই ছাপছেন। তারপর সে বই বিক্রি হলেও প্রকৃত বিক্রয় সংখ্যা তাকে বলা হয় না। এ ব্যাপারে প্রকাশকদের সততা প্রশ্নবিদ্ধ। হয়তো দেখা গেল একুশে মেলায় গ্রামের একজন গুণী লেখকের বই ৫০০ কপি বিক্রি হল; কিন্তু প্রকাশক তাকে হিসাব দিলেন ১৯ কপির। আবার সেই ১৯ কপির রয়্যালটিও তাকে ঠিকমতো দেয়া হয় না। এমন অসহায় পরিস্থিতিতে লেখকরা প্রকাশিত বইয়ের মলাটের ওপর তার নিজের নাম দেখেই খুশি!অথচ লেখকের শ্রমের ফসল বিক্রি করে আর্থিক সুবিধাটি ভোগ করেন প্রকাশকরা। প্রকাশকদের মধ্যে যে সৎ প্রকাশক একেবারেই নেই এমন নয়। তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম।

নামিদামি লেখকদের বেলায় কিন্তু এমনটি হয় না। প্রকাশকরা তাদের ঠিকই সম্মানী দেন। তাদের সঙ্গে লিখিত চুক্তিনামা সই করেন। সেখানে হয়তো উল্লেখ থাকে, লেখককে ১২ বা ১৫ শতাংশ রয়্যালিটি দেয়া হবে। যদিও এ ক্ষেত্রে কতটা সততার সঙ্গে হিসাব-নিকাশ করা হয় সে বিষয়ে প্রশ্ন আছে।

বই প্রকাশ করতে হলে আমাদের দেশে কোনো না প্রকাশকের সঙ্গে পরিচয় বা খাতির থাকতে হবে। তা না থাকলে কেউকেটা গোছের কাউকে ধরতে হবে যার সঙ্গে প্রকাশকের খাতির আছে। তিনি বলে দিলে হয়তো প্রকাশক মহোদয় রাজি হন। এ ক্ষেত্রে প্রকাশকরা শুরুতেই শর্ত দিয়ে দেন যে, তাকে অন্তত দুই শ বই নগদে কিনে নিতে হবে। হোমড়া-চোমড়া কিংবা সেলিব্রেটি না হলে কোনো প্রকাশকই বই ছাপতে চান না। যার বই ছাপলে লাভ হবে, কেবল তার বই-ই প্রকাশকরা ছাপেন বা ছাপতে আগ্রহী হন! এ ব্যাপারে প্রকাশকদের বক্তব্য, ১৪০-১৬০ পৃষ্ঠার একটা বই দুইশ কপি ছাপতে ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকা ব্যয় হয়। প্রতিষ্ঠিত লেখক ছাড়া এ ধরনের বই ৫-১০ কপিও বিক্রি হয় না। এই বাস্তবতায় আমরা নতুন লেখকের বই ছাপব কীভাবে? প্রকাশকদের কথার মধ্যে অবশ্যই যুক্তি আছে। হাজার হাজার টাকা গচ্চা দিয়ে কেন একজন প্রকাশক বই ছাপতে যাবে? বইয়ের পাঠক নেই বলে ভালো বই বের হয় না, ভালো বই নেই বলে পাঠকরা পড়ে না, দুর্বল বিপণনের জন্য বাণিজ্য হয় না, বাণিজ্যে মন্দা বলেই বই-পণ্যের মান নিচু, আবার নিচু মানের পণ্য বলেই বাণিজ্যও দুর্বল-এই বৃত্তেই আছে বাংলা বই।

বিজ্ঞাপন

এত অবহেলা, অসম্মান, বঞ্চনার মধ্যেও লেখকরা কীভাবে নতুন বই রচনা করে যাচ্ছেন-এটা একটা বিস্ময় বটে। কোনো কোনো লেখক বলেন, তারা মনের আনন্দে লেখেন। নতুন সৃষ্টির আনন্দে নিয়ে বেঁচে থাকেন বলে লেখেন। তা হয়তো ঠিক। কিন্তু লেখকদের জন্য কেবল শুকনো আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন। এখন পেশাদারিত্বের যুগ। লেখকদের প্রাপ্য অধিকার দেওয়া দরকার। সরকারের তরফ থেকে বা বাংলা একাডেমির কাছ থেকে এ ব্যাপারে কোনো ভাবনা-চিন্তা কিংবা উদ্যোগ আছে বলে মনে হয় না।প্রতিবছর বইমেলায় কোটি কোটি টাকার বই বিক্রি হয়। লেখকের ঘাম আর রক্ত ঝরানো এ অর্থের কত অংশ লেখকের আর কত অংশ প্রকাশকের পকেটে যায়, তা নিয়ে কি সরকার বা বাংলা একাডেমি কোনো গবেষণা বা হিসাব-নিকাশ আছে বলে মনে হয় না।

তারা সংখ্যাতত্ত্বে বিশ্বাসী হয়ে কেবল কৃতিত্ব আর বাহবা নিতে ব্যস্ত। বইমেলা চলাকালে একেক দিন বাংলা একাডেমি থেকে বলা হয়, আজ ৩০২টি নতুন বই মেলায় এসেছে, আজ এসেছে ৪০৫টি নতুন বই। মেলা শেষে দাবি করা হয়, গত বছরের চেয়ে এবার অনেক বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এসব বইয়ের কত অংশ মানসম্পন্ন আর কত অংশ মানহীন তার হিসাব কেউ করেন না।

কিছু কিছু প্রকাশক আছেন, যারা দু-পাঁচশ বই কিনে নেওয়ার শর্তে কিংবা লেখকদের কাছে থেকে নগদ টাকা নিয়ে নিম্ন মানের বই ছাপেন! কিছু ডলার ছাড়লেই প্রবাসী লেখকদের বই প্রকাশে প্রকাশকরা আগ্রহী হয়ে ওঠেন-এমনটাও বিরল নয়।আসলে প্রকাশনা জগতে পেশাদারিত্বের পরিবর্তে চলছে এক চরম নৈরাজ্য। তারপরও যে কিছু ভালো বই বেরোচ্ছে, সেটাই বিস্ময়ের।

লেখকদের কল্যাণে, লেখকদের স্বার্থে কোনো উদ্যোগ যদি গ্রহণ করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ভালো বই প্রকাশ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা কী কিছু ভাববেন?

পুনশ্চ: অনেকে এ কথাও বলেন যে, বইয়ের পাঠকই কমে যাচ্ছে, তার আবার লেখক! যদি তাই হয়, তবে পাঠক বাড়ানোর উদ্যোগও নিতে হবে। কিন্তু লেখকের স্বার্থকে উপেক্ষা করা চলবে না!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)